বিশ্বের বিস্ময় পূর্ব কলকাতা জলাভূমি—যে কারণে আজও বেঁচে আছে কলকাতা
East Kolkata Wetlands: আমাদের শরীরে কিডনি ঠিক যেরকম ভাবে শরীরকে সুস্থ রাখতে রক্ত থেকে সব নোংরা আর বর্জ্য ছেঁকে বের করে দেয়, সেরকম ভাবেই কলকাতার ক্ষেত্রে এই কাজটি করে পূর্ব কলকাতা জলাভূমি। তাই পরিবেশবিদরা একে ভালবেসে ডাকেন ‘কলকাতার প্রাকৃতিক কিডনি’।
এই তো সেদিনের কথা। টানা কয়েক দিনের রেকর্ড ভাঙা বৃষ্টিতে মুম্বইয়ের থমকে যাওয়ার ছবিগুলি চারিদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। জলমগ্ন রাস্তা, ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকা রেলের চাকা আর কোমর জলে দাঁড়িয়ে থাকা সাধারণ মানুষ। স্রেফ মুম্বই নয়, আজকাল পুরো ভারত জুড়েই একটু বৃষ্টি হলেই এইধরনের ছবি দেখা যায়। মেঘভাঙা বৃষ্টি আর হুট করে আসা প্রবল বর্ষণে শহরগুলির ঝাঁ-চকচকে কংক্রিটের ড্রেন আর পুরনো নগর পরিকল্পনা যেন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। কোটি কোটি টাকা খরচ করেও জলমগ্নতা থেকে রেহাই পাওয়া যায় না।
ঠিক এই দমবন্ধ করা পরিস্থিতির মাঝেই, আমাদের তিলোত্তমা কলকাতার ছবিটা কিন্তু একদম আলাদা। যে সমস্যার সমাধানে বড় বড় ইঞ্জিনিয়াররা হিমশিম খাচ্ছেন, কলকাতা সেই সমস্যার সমাধান করে চলেছে কোনো কৃত্রিম যন্ত্র ছাড়াই।
শহরের পূর্ব প্রান্ত ঘেঁষে রাজারহাট, সল্টলেক আর ইএম বাইপাসের ঠিক পাশেই রয়েছে পূর্ব কলকাতা জলাভূমি (East Kolkata Wetlands)। প্রায় ১২,৫০০ হেক্টরের এই বিস্তীর্ণ এলাকাটি আসলে কলকাতার এক মস্ত বড় ঢাল। এটি কোনো সিমেন্ট-কংক্রিটের তৈরি পরিকাঠামো নয়, বরং প্রকৃতির নিজের হাতে তৈরি এমন এক ব্যবস্থা, যা শহরকে বাঁচিয়ে রাখছে বছরের পর বছর।
তিলোত্তমার কিডনি
আমাদের শরীরে কিডনি ঠিক যেরকম ভাবে শরীরকে সুস্থ রাখতে রক্ত থেকে সব নোংরা আর বর্জ্য ছেঁকে বের করে দেয়, সেরকম ভাবেই কলকাতার ক্ষেত্রে এই কাজটি করে পূর্ব কলকাতা জলাভূমি। তাই পরিবেশবিদরা একে ভালবেসে ডাকেন ‘কলকাতার প্রাকৃতিক কিডনি’।
কলকাতা শহরের প্রতিদিনের ঘরকন্না এবং কলকারখানার উৎপাদিত নোংরা জলের প্রায় ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ— অর্থাৎ প্রায় ৭৫০ থেকে ৯৮০ মিলিয়ন লিটার অশোধিত নোংরা জল সরাসরি গিয়ে পড়ে এই পূর্ব দিকের জলাভূমিতে। অথচ, এই বিশাল পরিমাণ বিষাক্ত জলকে পরিষ্কার করার জন্য সেখানে কিন্তু কোনো কোটি কোটি টাকার আধুনিক ইলেকট্রিক ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট নেই, খরচ হয় না কোনো রাসায়নিক।
তাহলে এই ম্যাজিকটা হয় কীভাবে?
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Artificial Rain: তিনি ডক্টর সুধাংশু কুমার ব্যানার্জি। ভারতের আবহাওয়া দপ্তরের (IMD) প্রথম ভারতীয় ডিরেক্টর জেনারেল। তবে সহকর্মী আর শান্তিনিকেতনের প্রতিবেশীদের কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন অন্য এক ভালবাসার নামে—‘মেঘ ব্যানার্জি’।
এখানে কাজ করে প্রকৃতির চারজন নিজস্ব কর্মী— সূর্যের আলো, শৈবাল (Algae), জলজ উদ্ভিদ (যেমন কচুরিপানা) এবং জলের নিচে থাকা কোটি কোটি প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হওয়া অণুজীব। খোলা আকাশের নিচে থাকা এই বিশাল জলাশয়গুলিতে সূর্যের আলো যখন পড়ে, তখন অণুজীব আর শৈবালেরা মিলে নোংরা জলকে প্রাকৃতিকভাবেই পরিশোধন করতে শুরু করে। আর কচুরিপানাগুলি জল থেকে ক্ষতিকারক তেল, গ্রীস ও ভারী ধাতু শুষে নেয়। ফল? কোনো খরচ ছাড়াই প্রতিদিন শহরের নোংরা জল নিজে থেকেই একেবারে সাফ হয়ে যায়!
বিজ্ঞানীরা একেই বলেন ‘প্রকৃতি-ভিত্তিক সমাধান’। এর ফলে কলকাতা কর্পোরেশনের প্রতি বছর জল পরিশোধনের জন্য কয়েক হাজার কোটি টাকা বেঁচে যায়। ২০০২ সালে এই অনন্য অবদানের জন্য বিশ্বমঞ্চে একে আন্তর্জাতিক গুরুত্বসম্পন্ন একটি জলাভূমি বা ‘র্যামসার সাইট’ (Ramsar Site) হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এটি আজ বিশ্বের বৃহত্তম প্রাকৃতিক সম্পদ পুনরুদ্ধার বাস্তুতন্ত্রের অন্যতম সেরা উদাহরণ।
বর্জ্য থেকে সম্পদ
এই জলাভূমির আসল সৌন্দর্য শুধু জল পরিষ্কার করার মধ্যেই শেষ হয়ে যায় না। এখানে যা বর্জ্য, সেটাই আবার অন্য জায়গায় সম্পদ! পরিষ্কার হওয়া এই পুষ্টিগুণে ভরপুর জলকে কিন্তু ফেলে দেওয়া হয় না। একে কাজে লাগিয়ে এখানে গড়ে উঠেছে এক চমৎকার চক্রাকার অর্থনীতি (Circular Economy)। এই জলাভূমিতে প্রায় ২৫০ থেকে ২৬০টি মাছের ভেড়ি রয়েছে। পরিশোধিত এই পুষ্টিকর জলে হওয়া শৈবালগুলিই মাছের সেরা খাবার। এখান থেকে বছরে প্রায় ১০,০০০ থেকে ২০,০০০ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদন হয়, যা প্রতিদিন কলকাতার বাজারের মাছের চাহিদার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মেটায়। নোংরা জলের তলানি আর কলকাতার জৈব বর্জ্য দিয়ে তৈরি সার ব্যবহার করে ধাপা এবং তার আশেপাশের এলাকায় দেদার সবজি চাষ হয়। বছরে প্রায় ৫০,০০০ মেট্রিক টন তাজা সবজি এই অঞ্চল থেকে কলকাতার বাজারে আসে। হাজার হাজার হেক্টর জমিতে এই জলেই চাষ হয় বিঘার পর বিঘা ধান।
সবচেয়ে বড় কথা, এই পুরো ব্যবস্থার উপর নির্ভর করে এই অঞ্চলের প্রায় ২০,০০০ থেকে ৫০,০০০ মৎস্যজীবী, কৃষক ও তাঁদের পরিবারের জীবিকা টিকে রয়েছে। পরিবেশ রক্ষার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের পেটের ভাতের জোগান দেওয়া— এমন নিখুঁত ভারসাম্য পৃথিবীর খুব কম জায়গাতেই দেখা যায়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Kolkata Lightning: কলকাতায় ইদানীং আকাশ ভেঙে যে হারে বজ্রবিদ্যুৎ-সহ ঝড়-বৃষ্টি নামছে, তা আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবহাওয়ার এই খামখেয়ালিপনা আর হঠাৎ ধেয়ে আসা তীব্র বজ্রঝড় নিয়ে ইনস্ক্রিপ্ট কথা বলেছিল বিশিষ্ট পরিবেশবিদ ডঃ স্বাতী নন্দী চক্রবর্তী-র সঙ্গে।
কলকাতার মস্ত বড় ‘স্পঞ্জ’ আর নিখরচায় এসি
বর্ষাকালে যখন প্রবল বৃষ্টিতে কলকাতার রাস্তাঘাট ডুবে যাওয়ার উপক্রম হয়, তখন এই জলাভূমি রূপ নেয় এক বিশাল ‘স্পঞ্জ’-এর। শহরের সমস্ত অতিরিক্ত জলকে এটি নিজের বুকে টেনে নেয়। জল বয়ে যাওয়ার গতি কমিয়ে দিয়ে সেটিকে সাময়িকভাবে নিজের মধ্যে ধরে রাখে এবং ধীরে ধীরে তা ছেড়ে দেয়। এর ফলে কলকাতা শহর অনেকসময়ই মস্ত বড় বন্যার হাত থেকে বেঁচে যায়।
শুধু বন্যা আটকানোই নয়, এই জলাভূমি কলকাতার ভূগর্ভস্থ জলের স্তর ধরে রাখতে সাহায্য করে। এখানকার গাছপালা ও জলভাগ প্রচুর পরিমাণে কার্বন শোষণ করে (Carbon Sequestration), যা শহরের বিষাক্ত বাতাসকে শুদ্ধ করতে সাহায্য করে। এমনকী কলকাতার তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতেও এর ভূমিকা অনস্বীকার্য। এক কথায়, কলকাতা শহরের প্রাকৃতিক এসি এবং ফিল্টার— দুটোই হলো এই জলাভূমি।
আজ আমরা যেভাবে সাজানো-গোছানো তথ্য দিয়ে এই জলাভূমিকে চিনি, একসময় কিন্তু তা ছিল না। ১৮৮০-এর দশক থেকে স্থানীয় মৎস্যজীবী ও কৃষকরা তাঁদের বংশপরম্পরায় পাওয়া নিজস্ব পরিবেশগত জ্ঞান (Traditional Ecological Knowledge) দিয়ে এই জল শোধন ও চাষবাসের কাজটা করে আসছিলেন। তাঁরা কিন্তু কোনো বড় ডিগ্রিধারী ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন না, অথচ পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখার সবচেয়ে মোক্ষম কায়দাটা তাঁরাই জানতেন।
পরবর্তীতে ১৯৮০-এর দশকে কলকাতার এক কৃতি স্যানিটেশন ইঞ্জিনিয়ার ও পরিবেশবিদ ড. ধ্রুবজ্যোতি ঘোষ শহরের নোংরা জলের গতিপথ খুঁজতে গিয়ে প্রথম এই এলাকার বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব আবিষ্কার করেন। তিনিই প্রথম এই অঞ্চলের নাম দেন ‘ইস্ট কলকাতা ওয়েটল্যান্ডস’ বা ‘পূর্ব কলকাতা জলাভূমি’। তাঁরই একক লড়াই আর প্রচেষ্টায় এই অঞ্চল বিশ্ব দরবারে পরিচিতি পায় এবং রাষ্ট্রসংঘের তরফ থেকে তাঁকে সম্মানিত করা হয়।
পরবর্তীকালে ১৯৯২ সালে কলকাতার একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের (PUBLIC) করা মামলার ভিত্তিতে কলকাতা হাইকোর্ট এই জলাভূমি রক্ষার পক্ষে এক ঐতিহাসিক রায় দেয়, যা আজও ভারতে পরিবেশ রক্ষার ইতিহাসে এক মাইলফলক।
আন্তর্জাতিক স্তরে এত নামডাক থাকা সত্ত্বেও, পূর্ব কলকাতা জলাভূমি দিন দিন ছোট হয়ে আসছে। শহরের পরিধি যত বাড়ছে, ততই রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী আর প্রোমোটারদের নজর পড়ছে এই সস্তা জমির উপর। সল্টলেক বা নিউ টাউনের বিস্তারের চক্করে বেআইনিভাবে জলাভূমি ভরাট করে তৈরি হচ্ছে একের পর এক বহুতল ও আবাসন।
গত ৩০ বছরে এই জলাভূমির এক বিশাল অংশ চিরতরে হারিয়ে গিয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কলকারখানার রাসায়নিক বর্জ্য, প্লাস্টিক দূষণ এবং জলাশয়গুলিতে পলি জমে যাওয়ার মতো মারাত্মক সমস্যা। যদিও ২০০৬ সালে রাজ্য সরকার এই জলাভূমি সংরক্ষণের জন্য আইন এনেছে এবং একটি বিশেষ কমিটি (EKWMA) তৈরি করেছে, তবুও চোরাগোপ্তা জমি দখল আর ভরাট পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি।
বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করে দিচ্ছেন— প্রকৃতির দেওয়া এই সুরক্ষাকবচ যদি একবার ভেঙে পড়ে, তবে কলকাতার কপালে কিন্তু চরম দুঃখ আছে। একটু বৃষ্টি হলেই কলকাতা নিমেষের মধ্যে তাসের ঘরের মতো জলের তলায় চলে যাবে। বিপন্ন হবে শয়ে শয়ে প্রজাতির পরিযায়ী পাখি, মেছো বেড়াল, কচ্ছপ আর সাপের মতো জীববৈচিত্র্য। কাজ হারাবেন হাজার হাজার দরিদ্র মৎস্যজীবী ও কৃষক, আর টান পড়বে কলকাতার সস্তার মাছ ও সবজির বাজারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের এই চরম অনিশ্চয়তার যুগে পূর্ব কলকাতা জলাভূমি আমাদের চোখের সামনে থাকা এমন এক আদর্শ উদাহরণ, যা প্রমাণ করে যে প্রকৃতির বিরুদ্ধে গিয়ে নয়, বরং প্রকৃতির হাত ধরে চললেই মানবসভ্যতা সবচেয়ে সুরক্ষিত থাকতে পারে।






