বড় শহরে থাকার স্বপ্ন কি সত্যিই সুখের? কী বলছে স্বাস্থ্য সমীক্ষা?
সম্প্রতি মনিপালসিগনা হেলথ ইন্স্যুরেন্সের একটি সমীক্ষা ‘ইন্ডিয়া হেলথ কোশেন্ট (IHQ) ২০২৬’ প্রকাশিত হয়েছে। ভারতের ১৬টি প্রধান শহরের ২,৬০০ জন মানুষের উপর এই সমীক্ষাটি করা হয়েছে। শারীরিক, মানসিক, সামাজিক, কর্মজীবন এবং আর্থিক স্বাস্থ্যের উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে।
মফঃস্বলের মেয়ে দেবাঞ্জলি ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়েছে। ছোটবেলা থেকেই তার ইচ্ছে ছিল বড় শহরে কাজ করতে যাবে, তাই ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল। তারপর আজকের খবরের কাগজে চোখে পড়ল একটা সমীক্ষার রিপোর্ট। যার মূল কথা— বাইরে থেকে দেখলে শহরের জীবন চকচকে শপিং মল, জিম, আর প্রযুক্তির ছোঁয়ায় চমৎকার মনে হলেও শহরবাসীদের শরীর ঠিক নেই। কাগজে-কলমে ভারতের মানুষের স্বাস্থ্য বেশ ভালো। কিন্তু তাদের ঝকঝকে হাসির আড়ালে লুকিয়ে আছে এক অলক্ষ্য আশঙ্কায় দিন কাটানোর গল্প। যদি তাদের জিজ্ঞেস করা হয়— "কেমন আছ?" উত্তরে নিঃসন্দেহে পাওয়া যাবে— "সব ঠিক আছে"। কিন্তু বাস্তবে তীব্র আর্থিক টানাপোড়েন আর মানসিক চাপ ক্রমশ গ্রাস করছে তাদের।
সম্প্রতি মনিপালসিগনা হেলথ ইন্স্যুরেন্সের একটি সমীক্ষা ‘ইন্ডিয়া হেলথ কোশেন্ট (IHQ) ২০২৬’ প্রকাশিত হয়েছে। ভারতের ১৬টি প্রধান শহরের ২,৬০০ জন মানুষের উপর এই সমীক্ষাটি করা হয়েছে। শারীরিক, মানসিক, সামাজিক, কর্মজীবন এবং আর্থিক স্বাস্থ্যের উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে।
রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, দেশের মানুষের সার্বিক স্বাস্থ্যের গড় স্কোর ১০০-র মধ্যে ৬৫। এই নম্বরটিকে কাগজের পাতায় ‘ভালো’ বলা চলে। কিন্তু স্বাস্থ্যের যে পাঁচটি দিকের কথা বলা হলো, তার মধ্যে সবচেয়ে কম নম্বর পেয়েছে মানুষের ‘আর্থিক স্বাস্থ্য’— ১০০-র মধ্যে মাত্র ৬২।
টাকা-পয়সার এই টানাপোড়েন কিন্তু শুধু মাসের শেষে পকেটে টান পড়ার মধ্যেই আটকে নেই। এটি এখন সরাসরি মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও শরীরের উপর থাবা বসাচ্ছে। সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, ৪১% শহরের মানুষ মনে করেন— বর্তমানের খরচ চালানো এবং ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করার এই যে দড়িটানাটানি, এটাই তাঁদের সবচেয়ে বেশি অসুস্থ করে তুলছে। নিজের বা পরিবারের আর্থিক লক্ষ্য পূরণ করতে গিয়ে যে পরিমাণ হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতে হচ্ছে, তার চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে স্বাস্থ্য দিয়ে।
বাইরে হাসি, ভিতরে ‘স্ট্রেস’
এই সমীক্ষায় ভারতীয়দের নিজেদের স্বাস্থ্য নিয়ে ভাবনার যে ছবি ধরা পড়েছে, যা একাধারে অদ্ভুত এবং চিন্তার। সমীক্ষায় অংশ নেওয়া মানুষদের মধ্যে মাত্র ১% মানুষ বলেছেন যে তাঁদের শরীর খারাপ। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, তাঁদের মধ্যেই ৮২% মানুষ অকপটে স্বীকার করে নিয়েছেন যে তাঁরা মারাত্মক মানসিক চাপের (Stress) মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন! অর্থাৎ, শরীর ঠিক থাকলেও মন ভালো নেই শহরের সিংহভাগ মানুষের।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
২০২৪ সালের একটি আনুমানিক হিসাব (ICMR - NCRP) অনুযায়ী, ভারতে মাত্র এক বছরে প্রায় ৭৮,৪৯৯ জন নারী নতুন করে এই ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছেন এবং ৪২,৩৯২ জন প্রাণ হারিয়েছেন। সঠিক সময়ে টিকাদান এবং নিয়মিত স্ক্রিনিং না করানোর ফলেই এই মৃত্যুর হার এত বেশি।
যাঁরা এই মানসিক চাপের কথা জানিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে ৬৯% কোনোমতে পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছেন। কিন্তু ১৪% মানুষ স্পষ্ট বলেছেন, এই চাপ এখন আর তাঁদের নিয়ন্ত্রণে নেই। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, আমাদের তরুণ বা যুবপ্রজন্মই এই মানসিক চাপের শিকার হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। কাজ, কেরিয়ার আর ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা তাঁদের মানসিক শান্তি কেড়ে নিচ্ছে।
৩. আলস্য নাকি মানসিক চাপ?
মানসিক চাপ যে শুধু মাথার ভিতরেই ঘুরপাক খাচ্ছে, তা নয়। এটি আমাদের প্রতিদিনের আচরণেও প্রভাব ফেলছে। আমরা অনেক সময় ভাবি কোনো কাজ করতে ইচ্ছে না করাটা হয়তো আলসেমি, কিন্তু সমীক্ষা বলছে অন্য কথা।
মোটিভেশনের অভাব (৬৩%): মানসিক চাপে থাকা মানুষদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মানুষের প্রধান সমস্যা হলো, তাঁরা কোনো কাজে আর আগের মতো উৎসাহ বা প্রেরণা খুঁজে পাচ্ছেন না।
মেজাজ খিটখিটে হওয়া (৫৮%): অল্পতেই অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ছেন কিংবা খিটখিটে মেজাজের শিকার হচ্ছেন অনেকে।
দৈনন্দিন প্রভাব: এর পাশাপাশি রাতে ঠিকমতো ঘুম না হওয়া (৪৬%), কোনো বিষয়ে মনোযোগ দিতে না পারা বা সিদ্ধান্তহীনতা (৪৪%) এবং যার ফলে বাড়ি ও অফিস— দুই জায়গাতেই কাজের ক্ষমতা কমে যাওয়ার (৪০%) মতো সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
সুস্থতার নতুন ঠিকানা
এই রিপোর্টের একটি অত্যন্ত চমৎকার এবং ইতিবাচক দিক হলো— শারীরিক, মানসিক, আর্থিক কিংবা কর্মজীবনের সুস্থতা, সবকটি সূচকেই বড় বড় মেট্রো শহরগুলিকে পিছনে ফেলে দিয়েছে দেশের নন-মেট্রো বা ছোট শহরগুলি।
বড় শহরের ব্যস্ততা, যান্ত্রিক জীবন আর অতিরিক্ত খরচের তুলনায় ছোট শহরগুলির জীবনযাত্রা অনেক বেশি শান্ত ও গোছানো। তাই ভারতের মানুষ আগামীদিনে কতটা ভালো থাকবেন, তার রূপরেখা এখন আর বড় মহানগরগুলি নয়, বরং দেশের ছোট শহরগুলিই তৈরি করছে।
চিকিৎসা ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI)
ভবিষ্যতের চিকিৎসা ব্যবস্থায় প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়েও এই রিপোর্টে সাধারণ মানুষের মতামত নেওয়া হয়েছে এবং সেখানে যথেষ্ট আশাব্যঞ্জক ছবি ধরা পড়েছে। ভারতের প্রায় ৬৩% মানুষ চিকিৎসা ক্ষেত্রে এআই (AI) বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে বেশ আশাবাদী। মাত্র ৮% মানুষের এ বিষয়ে নেতিবাচক ধারণা রয়েছে।
মানুষ মনে করছেন এআই প্রযুক্তি এলে তিনটি বড় সুবিধা হবে— রোগের আগাম পূর্বাভাস পাওয়া যাবে (৩৫%), সঠিক রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা হবে (৩৪%), এবং সর্বক্ষণ রোগীর স্বাস্থ্যের উপর নজর রাখা যাবে (৩৩%)।
তবে সুবিধার পাশাপাশি মানুষের মনে গভীর ভয়ও রয়েছে। ৩৯% মানুষের ভয়, তাঁদের ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা বা ‘ডেটা প্রাইভেসি’ নষ্ট হতে পারে। আর ৩৮% মানুষ মনে করেন, রোবট বা প্রযুক্তির ভিড়ে চিকিৎসায় মানুষের যে সহানুভূতি, আবেগ বা ‘মানবিক ছোঁয়া’ থাকে, তা হয়তো হারিয়ে যাবে। তাই এআই-এর উপর মানুষের ভরসা বাড়াতে গেলে কড়া সরকারি নিয়মকানুন এবং কড়া তথ্য সুরক্ষা ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই।
মনিপালসিগনার এই রিপোর্ট আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে, ভালো স্বাস্থ্য মানে শুধু রোগমুক্ত শরীর নয়। জিম গিয়ে শরীর ফিট রাখা যায় কিন্তু রাতে যদি টাকার চিন্তায় ঘুম উড়ে যায়, তবে তাকে কোনোভাবেই ‘সুস্থ’ বলা যাবে না। ভারত যদি সত্যিই একটি সুস্থ জাতি হিসেবে গড়ে উঠতে চায়, তবে চিকিৎসার পাশাপাশি মানুষের আর্থিক নিরাপত্তা এবং মানসিক শান্তির দিকেও সমান নজর দিতে হবে। শরীর ভালো রাখার পাশাপাশি ‘পকেট’ ও ‘মন’ ভালো রাখাও যে সমান জরুরি, ২০২৬ সালের এই হেলথ রিপোর্ট আমাদের সেটাই মনে করিয়ে দিল।






