ঘুমের মধ্যেই স্মৃতি হারানোর ইঙ্গিত! মস্তিষ্কে ‘একাকী’ তরঙ্গের হদিস পেলেন বিজ্ঞানীরা
Lonely Waves: গভীর ঘুমের মধ্যেই কি স্মৃতিশক্তি হারানোর ইঙ্গিত লুকিয়ে রয়েছে? সাম্প্রতিক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা মস্তিষ্কে ‘লোনলি ওয়েভস’ বা একাকী তরঙ্গের সন্ধান পেয়েছেন। আলঝাইমার্সের সঙ্গে সম্পর্কিত টাউ প্রোটিন জমার কারণে এই তরঙ্গের স্বাভাবিক ছন্দ ও সমন্বয় ব্যাহত হতে পারে। স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়ার আগেই কি এই পরিবর্তন শনাক্ত করা সম্ভব?
গভীর ঘুমের মধ্যেও আমাদের মস্তিষ্কে চলে নানা ধরনের কাজ। দিনের বেলায় দেখা, শোনা, শেখা ও অভিজ্ঞতার অনেক কিছুই ঘুমের সময় স্মৃতি হিসেবে ধরে রাখতে সাহায্য করে মস্তিষ্ক। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় সমস্যা তৈরি হলে কী হতে পারে? সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা মস্তিষ্কে এমন কিছু অস্বাভাবিক বৈদ্যুতিক তরঙ্গের সন্ধান পেয়েছেন, যেগুলিকে বলা হচ্ছে ‘লোনলি ওয়েভস’ বা একাকী তরঙ্গ। গবেষকদের মতে, আলঝাইমার্স রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি প্রোটিন মস্তিষ্কে জমতে থাকলে গভীর ঘুমের সময় এই তরঙ্গগুলির স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হতে পারে। এর সঙ্গে স্মৃতি ধরে রাখার ক্ষমতা কমে যাওয়ার সম্পর্কও পাওয়া গিয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, আলঝাইমার্সের স্পষ্ট লক্ষণ দেখা দেওয়ার আগেই এমন পরিবর্তন ঘটতে পারে।
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলের ওমর শ্যারন ও তাঁর সহকর্মীদের এই গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে Nature Neuroscience পত্রিকায়। গবেষণার শিরোনাম ‘Human tau pathology is associated with lonely, nontraveling slow waves linked to memory impairment’।
স্মৃতি ধরে রাখতে গভীর ঘুম কেন জরুরি?
কোনো ঘটনা মনে রাখা, পুরনো অভিজ্ঞতা মনে করা কিংবা নতুন কিছু শেখার পর তা পরের দিনও মনে রাখতে পারার ক্ষমতাকে বলা হয় এপিসোডিক মেমরি। যেমন, বাজার থেকে বেরিয়ে এসে গাড়িটি কোথায় রেখেছিলেন তা মনে করার চেষ্টা করা, কিংবা ছোটবেলার কোনো বিশেষ ঘটনার কথা মনে করা—সবই এই স্মৃতির অংশ।
ঘুমের বিশেষ করে গভীর পর্যায়, অর্থাৎ নন-র্যাপিড আই মুভমেন্ট বা নন-REM ঘুম, স্মৃতি ধরে রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে মস্তিষ্কের বিপুল সংখ্যক স্নায়ুকোষ বা নিউরন একটি নির্দিষ্ট ছন্দে সাময়িকভাবে নিষ্ক্রিয় হয়, পরে আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে। এই সমন্বিত কাজের ফলে তৈরি হয় ধীরগতির বৈদ্যুতিক তরঙ্গ। এগুলি সাধারণত মস্তিষ্কের সামনের অংশ বা ফ্রন্টাল কর্টেক্স থেকে শুরু হয়ে অন্য অংশের দিকে ছড়িয়ে পড়ে।
এই তরঙ্গগুলি একসঙ্গে এবং নির্দিষ্ট ছন্দে মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া জরুরি। কারণ, এর মাধ্যমেই দিনের বেলায় শেখা তথ্য ও অভিজ্ঞতা দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতিতে পরিণত হওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Health : স্ট্রেপ্টোকোকাস অ্যাঞ্জিনোসাস নামের এক ব্যাকটেরিয়াটি মুখ থেকে ছড়িয়ে পড়ছে মাথাতেও
বিজ্ঞানীরা কীভাবে খুঁজে পেলেন এই ‘একাকী’ তরঙ্গ?
এই বিষয়টি বুঝতে গবেষকরা বিভিন্ন বয়সের মানুষের ঘুমের সময় মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ পরীক্ষা করেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন কুড়ির কোঠার সুস্থ তরুণ-তরুণী এবং ৬০ থেকে ৭৫ বছর বয়সি প্রবীণরা। মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক তরঙ্গের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতে ব্যবহার করা হয় ইলেকট্রোএনসেফালোগ্রাম বা EEG পরীক্ষা।
পরীক্ষায় দেখা যায়, তরুণদের মস্তিষ্কে ধীরগতির তরঙ্গগুলি একসঙ্গে অনেকটা দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ছে। মাথার ত্বকের উপর প্রায় এক হাতের সমান দূরত্ব পর্যন্ত এই তরঙ্গের বিস্তার দেখা যায়। কিন্তু বয়স্কদের ক্ষেত্রে তরঙ্গগুলি তুলনায় কম দূরত্ব অতিক্রম করছে।
এরপর গবেষকরা জানতে চান, এই পরিবর্তনের সঙ্গে আলঝাইমার্সের সম্পর্কিত প্রোটিন টাউয়ের কোনো যোগ রয়েছে কি না। সেই কারণে প্রবীণ অংশগ্রহণকারীদের মস্তিষ্কে টাউ প্রোটিনের পরিমাণ ও অবস্থান বুঝতে পজিট্রন এমিশন টোমোগ্রাফি বা PET স্ক্যান করা হয়।
সেখানে দেখা যায়, মস্তিষ্কের সামনের অংশে টাউ প্রোটিন যত বেশি জমেছে, গভীর ঘুমের সময় দীর্ঘ দূরত্বে ছড়িয়ে পড়া ধীরগতির তরঙ্গের সমন্বয় তত বেশি নষ্ট হয়েছে। আশ্চর্যের বিষয়, যাঁদের মধ্যে এই পরিবর্তন দেখা গিয়েছে, তাঁদের অনেকেরই তখনও আলঝাইমার্স রোগ ধরা পড়েনি। তাঁদের স্মৃতিশক্তির পরিবর্তন বয়সের স্বাভাবিক সীমার মধ্যেই ছিল।
স্মৃতিশক্তির পরীক্ষায় কী দেখা গেল?
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Mental Health: অনেক সময় আমরা খিদে অনুভব করি। কিন্তু সেইসময় আসলে আমাদের শরীরে জলের প্রয়োজন হয়। আর সেই খিদের অনুভূতি মেটাতে আমরা খাবার খাই। ফলে, শরীরে অপ্রয়োজনীয় ক্যালরি প্রবেশ করে এবং যা ওজন বাড়ার কারণ।
অংশগ্রহণকারীদের সন্ধ্যায় কয়েকটি শব্দেজোড় শেখানো হয়েছিল। পরের দিন তাঁদের সেই শব্দগুলি মনে করে বলতে বলা হয়। এর মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করা হয়, ঘুমের মধ্যে মস্তিষ্ক কতটা ভালোভাবে নতুন তথ্য স্মৃতিতে ধরে রাখতে পেরেছে।
ফলাফলে দেখা যায়, যাঁদের মস্তিষ্কের ধীরগতির তরঙ্গ কম দূরত্ব অতিক্রম করছিল এবং অন্য তরঙ্গের সঙ্গে সমন্বয় হারিয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছিল, তাঁরা আগের দিনের শব্দজোড় তুলনায় কম মনে রাখতে পারছেন। এই বিচ্ছিন্ন তরঙ্গগুলিকেই গবেষকরা ‘লোনলি ওয়েভস’ নাম দিয়েছেন।
এমনকী কয়েক বছর ধরে কিছু অংশগ্রহণকারীর মস্তিষ্কের পরিবর্তনও পর্যবেক্ষণ করা হয়। দেখা যায়, যাঁদের ফ্রন্টাল কর্টেক্সে টাউ প্রোটিনের পরিমাণ সময়ের সঙ্গে বেড়েছে, তাঁদের মস্তিষ্কের তরঙ্গের সমন্বয়ও কমেছে। পাশাপাশি, নতুন শেখা তথ্য পরের দিন মনে রাখার ক্ষমতাও হ্রাস পেয়েছে।
মেরুদণ্ডের তরল পরীক্ষাতেও ইঙ্গিত
গবেষণার ফল আরও ভালোভাবে যাচাই করতে বিজ্ঞানীরা অন্য একটি দলের প্রবীণদের মেরুদণ্ডের তরল বা সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড পরীক্ষা করেন। এই গবেষণায় ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ ইয়ো-এল জু সহযোগিতা করেন।
পরীক্ষায় দেখা যায়, যাঁদের মস্তিষ্কে বেশি বিচ্ছিন্ন ধীরগতির তরঙ্গ তৈরি হচ্ছে, তাঁদের মেরুদণ্ডের তরলে টাউ ও অ্যামাইলয়েড প্রোটিনের অনুপাতও বেশি। অ্যামাইলয়েডও আলঝাইমার্স রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি প্রোটিন।
দুটি আলাদা দলের উপর, আলাদা পদ্ধতিতে পরীক্ষা করেও কাছাকাছি ফল পাওয়ায় গবেষণার পর্যবেক্ষণ আরও শক্তিশালী হয়েছে।
ভবিষ্যতে কি আগেভাগে ধরা পড়বে স্মৃতিশক্তির সমস্যা?
এই গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, আলঝাইমার্সের স্পষ্ট লক্ষণ দেখা দেওয়ার আগেই মস্তিষ্কের ঘুমের তরঙ্গে পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যেতে পারে। ভবিষ্যতে এই ধরনের তরঙ্গ পর্যবেক্ষণ করে স্মৃতিশক্তির সমস্যা সম্পর্কে আগাম ধারণা পাওয়া সম্ভব কি না, তা নিয়ে নতুন গবেষণার পথ খুলে গিয়েছে। এমনকী স্মৃতি রক্ষার চিকিৎসা পদ্ধতি তৈরির ক্ষেত্রেও এই আবিষ্কার গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
তবে গবেষকরা একটি বিষয়ে সতর্ক করেছেন। টাউ প্রোটিন জমার কারণেই যে এই তরঙ্গগুলি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে, অথবা তরঙ্গের এই পরিবর্তনই যে টাউ প্রোটিন জমার কারণ, তা এখনও নিশ্চিত নয়। দুটি ঘটনার মধ্যে সম্পর্ক পাওয়া গেলেও কোনটি আগে ঘটছে, তা জানার জন্য আরও গবেষণা প্রয়োজন।






