জরায়ু মুখের ক্যান্সার রুখতে শুরু HPV টিকাকরণ, কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এই ভ্যাকসিন?
২০২৪ সালের একটি আনুমানিক হিসাব (ICMR - NCRP) অনুযায়ী, ভারতে মাত্র এক বছরে প্রায় ৭৮,৪৯৯ জন নারী নতুন করে এই ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছেন এবং ৪২,৩৯২ জন প্রাণ হারিয়েছেন। সঠিক সময়ে টিকাদান এবং নিয়মিত স্ক্রিনিং না করানোর ফলেই এই মৃত্যুর হার এত বেশি।
পাড়াপড়শি-আত্মীয়স্বজন থেকে শুরু করে নিজের বাড়িতে, ইদানীং একটু বেশিই জরায়ু মুখের ক্যান্সার বা Cervical Cancer-এর নাম শুনছেন না? এই রোগের বাড়াবাড়ির কথা আজকাল একটু বেশিই বেড়ে গিয়েছে না? তাই এই রোগ নিয়ে পাড়ায় কাকিমা-জ্যাঠিমাদের আড্ডাখানা থেকে শুরু করে মায়ের ফোনে মাসিদের সঙ্গে কথাবার্তায় আলোচনার বিষয় হলো এই রোগ।
এই ক্যান্সারের পিছনে যে প্রধান কারণটি লুকিয়ে আছে, তার নাম এইচপিভি (HPV) বা হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস। কিন্তু ভালো খবর হলো, সঠিক সময়ে সচেতনতা এবং একটি ভ্যাকসিন বা টিকার মাধ্যমে এখন এই মারণব্যাধিকে চিরতরে দূরে সরিয়ে রাখা সম্ভব। এবং পশ্চিমবঙ্গে শুরু হয়েছে এই টিকাকরণ কর্মসূচি।
এইচপিভি (HPV) আসলে কী এবং এটি কীভাবে ছড়ায়?
এইচপিভি হলো ভাইরাসের একটি বিশাল পরিবার। এটি প্রধানত প্রজননতন্ত্রের একটি অত্যন্ত সাধারণ সংক্রমণ। চিকিৎসকদের মতে, জীবনের কোনো না কোনো সময়ে প্রায় ৮০% যৌনসক্রিয় মানুষ এই ভাইরাসের সংস্পর্শে আসেন।
সংক্রমণ ও ঝুঁকির কারণ:
এটি মূলত স্পর্শের মাধ্যমে (ত্বক থেকে ত্বকের সংস্পর্শে) এবং অরক্ষিত যৌনমিলনের কারণে ছড়ায়।
কম বয়সে যৌন সম্পর্ক শুরু করা, একাধিক যৌনসঙ্গী থাকা, কিংবা ধূমপানের অভ্যাস এই ভাইরাসের সংক্রমণকে দীর্ঘস্থায়ী করে তোলে। এ ছাড়া যাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউনিটি দুর্বল (যেমন: HIV আক্রান্ত ব্যক্তি), তাদের ক্ষেত্রে এই ভাইরাসের ঝুঁকি অনেক বেশি।
এই ভাইরাসের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, অধিকাংশ ক্ষেত্রে শরীরে এর কোনো বাহ্যিক লক্ষণ থাকে না। ফলে মানুষ নিজের অজান্তেই এটি অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়।
ক্যান্সারের সঙ্গে এইচপিভির সম্পর্ক এবং ভারতের প্রেক্ষাপট
সব এইচপিভি ভাইরাসই কিন্তু ক্যান্সার তৈরি করে না। এর মধ্যে কিছু আছে কম ঝুঁকিপূর্ণ (Low-risk), যা সাধারণত সাধারণ আঁচিল বা ‘ওয়ার্ট’ তৈরি করে। তবে কিছু হাই-রিস্ক বা উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ টাইপ (যেমন: HPV-১৬ ও ১৮) দীর্ঘ সময় ধরে শরীরে রয়ে গেলে জরায়ু মুখের ক্যান্সার সৃষ্টি করে।
ভারতে এটি একটি অত্যন্ত গুরুতর জনস্বাস্থ্য সমস্যা। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভারতীয় নারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সাধারণ ক্যান্সার হলো স্তন ক্যান্সার, তারপরই সবচেয়ে বেশি সাধারণ জরায়ু মুখের ক্যান্সার।
২০২৪ সালের একটি আনুমানিক হিসাব (ICMR - NCRP) অনুযায়ী, ভারতে মাত্র এক বছরে প্রায় ৭৮,৪৯৯ জন নারী নতুন করে এই ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছেন এবং ৪২,৩৯২ জন প্রাণ হারিয়েছেন। সঠিক সময়ে টিকাদান এবং নিয়মিত স্ক্রিনিং না করানোর ফলেই এই মৃত্যুর হার এত বেশি।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মাত্র পাঁচ বছরে দিল্লিতে সময়ের আগে শিশু জন্মের সংখ্যা ৫১ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। হারের দিক থেকে বিচার করলে এই বৃদ্ধি ২১ শতাংশেরও বেশি। সহজ ভাষায় বললে, দিল্লির বুকে জন্ম নেওয়া প্রতি ৮ জন শিশুর মধ্যে ১ জন শিশু এখন প্রি-টার্ম বা সময়ের আগেই জন্মাচ্ছে।
জরায়ু মুখের ক্যান্সার রোধে এইচপিভি ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা
বিজ্ঞানীদের মতে, জরায়ু মুখের ক্যান্সার প্রতিরোধের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং প্রধান চাবিকাঠি হলো এইচপিভি ভ্যাকসিন।
আমেরিকার ২০১২-২০ সালের তথ্যানুযায়ী, ভ্যাকসিন নেওয়ার ফলে তরুণীদের মধ্যে জরায়ু মুখের ক্যান্সারের হার ৬৫% কমে গিয়েছে।
স্কটল্যান্ডের ১০ বছরের পর্যবেক্ষণে দেখা গিয়েছে, নারীদের মধ্যে ক্যান্সার পূর্ববর্তী ক্ষত বা ‘প্রি-ক্যান্সারাস লিশন’ ৮৮-৮৯% পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে।
কোন বয়সে এই টিকা সবচেয়ে বেশি কার্যকর?
এই ভ্যাকসিনটি শরীরে সবচেয়ে ভালো কাজ করে কোনো ধরনের সংক্রমণের সংস্পর্শে আসার আগে। সেই কারণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং বিশেষজ্ঞদের মতে, ৯ থেকে ১৪ বছর বয়সি কিশোরীদের এই টিকা দেওয়া সবচেয়ে বেশি কার্যকর। ভারতের দেশব্যাপী টিকাদান কর্মসূচিতেও বর্তমানে ১৪ বছর বয়সি কিশোরীদের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। ৯-১৪ বছর বয়সে এই টিকার ২টি ডোজই (০ এবং ৬ মাসের ব্যবধানে) শরীরকে দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা দিতে সক্ষম।
ভ্যাকসিন নিয়ে কিছু প্রচলিত ভুল ধারণা ও আসল সত্য
নতুন যেকোনো ভ্যাকসিন এলেই চারিদিকে কিছু রটনা ছড়ায়। এইচপিভি ভ্যাকসিনও তার ব্যতিক্রম নয়।
এই ভ্যাকসিন কি বন্ধ্যাত্ব, গর্ভপাত বা জন্মগত ত্রুটি ঘটায়?
একদমই না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) ‘গ্লোবাল অ্যাডভাইজরি কমিটি অন ভ্যাকসিন সেফটি’ দীর্ঘমেয়াদি তথ্য পর্যালোচনা করে জানিয়েছে, বন্ধ্যাত্ব বা গর্ভপাতের সঙ্গে এই ভ্যাকসিনের কোনো বৈজ্ঞানিক সংযোগ বা মিল পাওয়া যায়নি।
ভ্যাকসিনের কি মারাত্মক কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে?
বিশ্বব্যাপী ইতিমধ্যে ৫০ কোটিরও (500 million) বেশি বার এই ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে এবং ১৫ বছরেরও বেশি সময়ের তথ্য প্রমাণ করে যে এটি সম্পূর্ণ নিরাপদ। অন্যান্য সাধারণ টিকার মতোই এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া অত্যন্ত মৃদু ও সাময়িক (যেমন: ইনজেকশনের জায়গায় সামান্য ব্যথা, লাল হওয়া বা হালকা জ্বর), যা ১-২ দিনেই ঠিক হয়ে যায়।
টিকা নেওয়ার পর কী কী সতর্কতা মেনে চলা উচিৎ?
এইচপিভি ভ্যাকসিন নেওয়ার পর শরীরকে সুস্থ রাখতে এবং টিকার সঠিক কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে কিছু নিয়ম মেনে চলা জরুরি:
যা যা করা উচিৎ
১. ইনজেকশন নেওয়ার পর অন্তত ১৫-৩০ মিনিট টিকাদান কেন্দ্রেই বসে থাকা উচিৎ, যাতে কোনো আকস্মিক অ্যালার্জিজনিত সমস্যা হলে চিকিৎসকের সাহায্য নেওয়া যায়।
২. টিকা নেওয়ার পর দিন ৭-৮ ঘণ্টা ভালো করে ঘুমানো উচিৎ। এটি শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।
৩. প্রচুর পরিমাণে জল ও তরল খাবার খান, যাতে ক্লান্তি বা হালকা জ্বর দ্রুত কেটে যায়।
৪. পূর্ণ সুরক্ষার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় পর (সাধারণত ৬ মাস পর) দ্বিতীয় ডোজটি অবশ্যই নিন।
যা যা করা উচিৎ নয়
১. টিকা নেওয়ার পর ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা জিমে যাওয়া বা কোনো ধরনের ভারী শারীরিক পরিশ্রম এড়িয়ে চলুন।
২. ইনজেকশন দেওয়ার জায়গায় হাত দিয়ে ঘষাঘষি করবেন না। ব্যথা বা ফোলা কমাতে সেখানে হালকা ঠাণ্ডা সেঁক দিতে পারেন।
৩. অন্তত দুই দিন ধূমপান বা মদ্যপান থেকে দূরে থাকুন, কারণ এগুলো শরীরের ইমিউন সিস্টেমকে দুর্বল করে দেয়।
এইচপিভি ভ্যাকসিন জরায়ু মুখের ক্যান্সারের বিরুদ্ধে আমাদের সবচেয়ে বড় ঢাল হলেও এটি কিন্তু ১০০% সুরক্ষা দেয় না (কারণ এটি সব ধরনের এইচপিভি টাইপ কভার করে না)। তাই ২৫ থেকে ৬৫ বছর বয়সি নারীদের টিকার পাশাপাশি চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় অন্তর নিয়মিত জরায়ু মুখ পরীক্ষা বা স্ক্রিনিং (যেমন: প্যাপ স্মিয়ার বা HPV টেস্ট) করানো উচিৎ।






