গরুর গলায় স্মার্ট ব্যান্ড! বদলে দিল ডেইরি ব্যবসা, বাড়ল দুধ আর আয়
: Smart Cow Collar: এই কলারটি ২৪ ঘণ্টা গরুর শরীরের তাপমাত্রা, হাঁটাচলা ও আচরণের উপর নজর রাখে। মজার বিষয় হলো, বাইরে থেকে রোগের কোনো লক্ষণ স্পষ্ট হওয়ার আগেই এই এআই প্রযুক্তি বলে দিতে পারে যে পশুটি অসুস্থ হতে চলেছে।
মানুষের হাতে স্মার্টওয়াচ বা ফিটনেস ব্যান্ড দেখে আমরা অভ্যস্ত। কত পা হাঁটলাম, কেমন ঘুম হলো, হার্ট রেট ঠিক আছে কি না—সবই আঙুলের ডগায়। কিন্তু কখনো ভেবেছেন, একটা আস্ত গরুর গলায় যদি এমন একটা ‘স্মার্ট ব্যান্ড’ ঝুলিয়ে দেওয়া হয়, তবে কী হতে পারে?
শুনতে একটু অদ্ভুত লাগলেও, ভারতের লাখ লাখ দুগ্ধ খামারে এখন ঠিক এই ঘটনাই ঘটছে। প্রথম দেখায় গরুর গলায় জড়ানো বেল্টটিকে খুব সাধারণ মনে হতে পারে। কিন্তু এর ভিতরেই লুকিয়ে আছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) আর ইন্টারনেট অব থিংস (IoT)-এর মতো আধুনিক সব প্রযুক্তি। আর এই প্রযুক্তির হাত ধরেই বদলে যাচ্ছে ভারতের ডেইরি খাতের চেনা ছবিটা।
কর্পোরেট জগৎ ছেড়ে খামারের মাঠে
এর নেপথ্যে রয়েছে নাগপুরের একটি স্টার্টআপ—'ইভার্স ডট এআই' (eVerse.AI)। ২০২২ সালে এটি প্রতিষ্ঠা করেন আশিস সোনকুসারে। আইআইটি বম্বে থেকে কম্পিউটার সায়েন্সে পাস করার পর আশিস দীর্ঘ ২৫ বছর আমেরিকার IBM, Amazon Web Services (AWS)-এর মতো প্রথম সারির সংস্থায় বড় পদে কাজ করেছেন।
বিদেশে থাকার সময় তিনি দেখেছিলেন, ওখানকার খামারিরা কত উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করেন। অথচ ভারতের বিশাল পশুপালন খাতটি ডিজিটাল বিপ্লব থেকে অনেকটাই দূরে রয়ে গিয়েছিল। নিজের শিকড়ের টানে এবং ভারতের ক্ষুদ্র খামারিদের ভাগ্য বদলাতে তিনি দেশে ফিরে আসেন। তাঁর এই লড়াইয়ে সঙ্গী হন মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন শৈলেন্দ্র নরওয়াড়ে এবং পরিবেশ বিজ্ঞান ও কার্বন মার্কেট বিশেষজ্ঞ বিধি গৌর।
গরুর গলার ‘ফিটবিট’ ও ‘কাউ-জিপিটি’
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Project TACTO: কোনো স্ক্রিন ছাড়াই, স্রেফ হাতের স্পর্শ, বোতাম, সেন্সর আর অডিও বার্তার সাহায্যে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের কোডিং শেখাতে গালগোটিয়াস ইউনিভার্সিটির চার শিক্ষার্থী তৈরি করেছে এক অভিনব ডিভাইস—'TACTO'। প্রচলিত স্ক্রিন-নির্ভর শিক্ষার নিয়মকে বদলে দিয়ে কোডিংয়ের মতো জটিল বিষয়কে এই যন্ত্রটি অনায়াসে তাদের হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে।
এই স্টার্টআপের মূল ম্যাজিক লুকিয়ে আছে তাদের তৈরি ‘কানেক্টেড কাউ কলার’ (Connected Cow Collar)-এর মধ্যে। এটি আসলে গবাদি পশুর জন্য একটা ফিটবিট বা অ্যাপল ওয়াচ।
রোগের আগাম আভাস: এই কলারটি ২৪ ঘণ্টা গরুর শরীরের তাপমাত্রা, হাঁটাচলা ও আচরণের উপর নজর রাখে। মজার বিষয় হলো, বাইরে থেকে রোগের কোনো লক্ষণ স্পষ্ট হওয়ার আগেই এই এআই প্রযুক্তি বলে দিতে পারে যে পশুটি অসুস্থ হতে চলেছে। ফলে খামারিরা শুরুতেই চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারেন।
সঠিক সময়ে প্রজনন: ডেইরি খামারিদের একটা বড় সমস্যা হলো গরুর ‘হিট সাইকেল’ বা ঋতুচক্রের সঠিক সময়টি ধরতে না পারা। এই সময়টি মিস হলে খামারির খরচ বাড়ে এবং দুধের উৎপাদন পিছিয়ে যায়। এই স্মার্ট কলার সঠিক সময়ে সরাসরি খামারির ফোনে অ্যালার্ট পাঠিয়ে দেয়।
জিপিএস ট্র্যাকিং: মাঠে চরে বেড়ানোর সময় কোনো গরু হারিয়ে গেলে এর বিল্ট-ইন জিপিএস দিয়ে রিয়েল-টাইমে তার অবস্থান খুঁজে পাওয়া যায়।
এখানেই শেষ নয়, খামারিদের জন্য তারা এনেছে ‘কাউ-জিপিটি’ (CowGPT)। হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে নিজের আঞ্চলিক ভাষায় মুখে বলে বা লিখে গরুর পুষ্টি, স্বাস্থ্য ও যত্ন নিয়ে যেকোনো প্রশ্ন করলেই এই এআই অ্যাসিস্ট্যান্ট সঙ্গে সঙ্গে তার সমাধান বাতলে দেয়।
খামারিদের মুখে হাসি
প্রযুক্তি যে শুধু ল্যাবরেটরিতে আটকে নেই, তার বড় প্রমাণ মহারাষ্ট্রের খেড়ি গ্রামের অঙ্কুশ শেলকে। মাত্র পাঁচটি গরু নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে ডেইরি ব্যবসা চালাতেন অঙ্কুশ। কম দুধ উৎপাদন আর গরুর অসুখ-বিসুখ নিয়ে সারাক্ষণ চিন্তায় থাকতেন।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ভারতেই জন্ম প্রাঞ্জলির। তবে ছোটবেলাতেই, মাত্র ১১ বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে তিনি আমেরিকার ফ্লোরিডায় চলে যান। প্রাঞ্জলির বাবা ছিলেন একজন ইঞ্জিনিয়ার। বাবার কাজ দেখতে দেখতেই ছোট্ট প্রাঞ্জলির কম্পিউটারের প্রতি ভালবাসা তৈরি হয়।
দু বছর আগে তিনি এই স্মার্ট কলার ব্যবহার শুরু করেন। অঙ্কুশের কথায়, এখন কোনো গরু হিটে আসলেই মোবাইলে মেসেজ চলে আসে। কোনো গরু অসুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও আগেভাগে জানতে পারেন তিনি। ফলাফল? এখন তাঁর খামারের প্রতিটি গরু থেকে প্রতিদিন বাড়তি ২ থেকে ৩ লিটার দুধ পাওয়া যাচ্ছে। পাঁচটা গরুর খামার এখন নতুন বাছুর আর মোষ নিয়ে বেশ বড় আকার ধারণ করেছে। একই অভিজ্ঞতা ২৫ বছর বয়সি কম্পিউটার সায়েন্সের গ্র্যাজুয়েট সুজল ভাসনেরও, যিনি এখন প্রযুক্তির সাহায্যে তাঁদের পারিবারিক ডেইরি ব্যবসাকে অনেক লাভজনক করে তুলেছেন।
পরিবেশ রক্ষা করে বাড়তি আয়: ‘কার্বন ক্রেডিট’
ইভার্স ডট এআই শুধু খামারিদের আয়ই বাড়াচ্ছে না, পরিবেশের এক মস্ত বড় ক্ষতিও সামাল দিচ্ছে। আমরা জানি, গরু-মোষের পেট থেকে নির্গত মিথেন গ্যাস জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
কোম্পানিটি আমুল বা বানাস ডেইরির মতো বড় বড় সমবায়ের সঙ্গে হাত মিলিয়ে শুরু করেছে ‘মহারাষ্ট্র মিথেন মিশন’ এবং ‘বানাস মিথেন প্রোগ্রাম’। বিজ্ঞানসম্মত ও সুষম পশুখাদ্য ব্যবহারের মাধ্যমে তারা গরুর মিথেন গ্যাস নির্গমন প্রায় ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনছে।
এই ক্ষতিকারক গ্যাস কমানোর ফলে আন্তর্জাতিক নিয়মে তৈরি হচ্ছে ‘কার্বন ক্রেডিট’। ইভার্স ডট এআই তাদের বিশেষ ‘গ্রিন-কাউ’ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে নিখুঁতভাবে মেপে দেখায় কোন খামারে কতখানি দূষণ কমল। এরপর সেই কার্বন ক্রেডিট আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি করে আয়ের একটা বড় অংশ সরাসরি খামারিদের পকেটে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ, দুধ বিক্রি করে তো আয় হচ্ছেই, পরিবেশ বাঁচিয়েও খামারিরা পাচ্ছেন বাড়তি ইনসেনটিভ।
এক নতুন ভবিষ্যতের দিকে
আজ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে প্রায় ২২ লাখেরও বেশি খামারি এই স্টার্টআপের নানা প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন। আমুল, মাদার ডেইরির পাশাপাশি বিশ্বব্যাংক (World Bank) এবং গেটস ফাউন্ডেশনের মতো সংস্থাও আজ এদের কাজের সহযোগী।
প্রতিষ্ঠাতা আশিস সোনকুসারে মনে করেন, গরুকে কেবল গবাদি পশু না ভেবে গ্রামীণ অর্থনীতির ‘ভাগ্যবিধাতা’ হিসেবে দেখা উচিত। খামারিদের প্রতিদিনের ছোট ছোট সমস্যা—হঠাৎ দুধ কমে যাওয়া বা সঠিক সময়ে রোগ ধরতে না পারা—এই সবকিছুর সমাধান লুকিয়ে আছে সঠিক সময়ের সঠিক তথ্যের মধ্যে।
গরুর গলার ওই ছোট্ট বেল্টটি মানুষের চোখের আড়ালে থাকা হাজারো সংকেত ডিজিটাল স্ক্রিনে ফুটিয়ে তুলছে। আর অনুমানের উপর নির্ভর না করে বিজ্ঞানের হাত ধরে ভারতের ডেইরি খামারের আঙিনায় আসছে এক নতুন আলোর দিন।






