সংসারের শেকল ভেঙে ক্যামেরার সামনে: এক অসামান্যা নারীর লড়াই

inspirational woman story: সে শ্বশুরবাড়ির সবার কাছে অনুমতি চাইল যাতে আবার পড়াশোনা শুরু করা যায়। কিন্তু কেউ তার কথা শুনল না। সেই প্রত্যন্ত গ্রামে নিয়ম ছিল, ঘরের বউ মানেই ঘরের কাজ করবে আর সবার কথা শুনবে। পড়াশোনা করলে নাকি পরিবারের সম্মান নষ্ট হবে।

Arunima
৫ মিনিট
সংসারের শেকল ভেঙে ক্যামেরার সামনে: এক অসামান্যা নারীর লড়াই

পুরুলিয়ার প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে আসা এক অতি সাধারণ গৃহবধূর গল্প এটি। তবে এই কাহিনী কেবল টিকে থাকার নয়, বরং প্রতিকূল সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে নিজের অস্তিত্ব প্রমাণের। যে বয়সে একটি মেয়ের ডানা মেলে বিশ্ব জয়ের স্বপ্ন দেখার কথা, ঠিক সেই সময়েই তাকে স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছায় বন্দি হতে হয় সংসারের ঘেরাটোপে। জীবনের এই কঠিন বাস্তবতাকে জয় করেই তিনি আজ এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

পুরুলিয়ার গ্রাম্য সমাজে নিয়ম ছিল, ১৬ বছর পার হতে না হতেই মেয়েদের বিয়ের পিঁড়িতে বসিয়ে দেওয়া। 'মেয়েদের আবার স্বপ্ন কী? স্বামীর ঘর করাই তো চূড়ান্ত নিয়তি'—এমন এক রক্ষণশীল আবহে বড় হওয়া সেই মেয়েটির চোখে ছিল গনগনে আগুনের মতো জেদ। কিন্তু বিয়ের পর পড়াশোনা করে স্বপ্ন পূরণের বদলে তার দিন কাটত সংসারের হাড়ভাঙা খাটুনি আর অমানবিক প্রত্যাশা পূরণের চাপে। ভেতরে ভেতরে গুমরে কাঁদলেও নিজের শিক্ষা আর সত্তাকে হারিয়ে যেতে দেননি তিনি।

বিয়ের মাত্র এক বছরের মাথায় কোল জুড়ে আসে সন্তান। মাতৃত্বের এই অমোঘ বন্ধন যেন তার জীবনকে আরও আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে। তবুও সেই শেকল ভাঙার লড়াই থেমে থাকেনি।

একদিন মেয়েটি ঠিক করল—জীবন অনেক বড়, তাই এখনও অনেক সময় বাকি আছে। সে শ্বশুরবাড়ির সবার কাছে অনুমতি চাইল যাতে আবার পড়াশোনা শুরু করা যায়। কিন্তু কেউ তার কথা শুনল না। সেই প্রত্যন্ত গ্রামে নিয়ম ছিল, ঘরের বউ মানেই ঘরের কাজ করবে আর সবার কথা শুনবে। পড়াশোনা করলে নাকি পরিবারের সম্মান নষ্ট হবে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ড. জানকী আম্মাল: বিজ্ঞানের জন্য আজীবন নিবেদিত এক নারী

Dr Janaki Ammal: ভারত পুরোপুরিভাবে আখ আমদানিতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উপর নির্ভরশীল ছিল। কারণ ভারতীয় জলবায়ুতে যে ধরনের আখ উৎপন্ন হতো তা ছিল ভঙ্গুর প্রকৃতির এবং তাতে মিষ্টতা ছিল কম। অর্থাৎ সুইট সেক্টরে ভারত তখনও পরনির্ভরশীল। এই সমস্যারই সমাধান করেছিলেন বিজ্ঞানী ড. জানকী আম্মাল।

উপায় না দেখে সে চুপিচুপি পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করল। কিন্তু কতদিন আর এভাবে লুকিয়ে থাকা যায়? একদিন সে ধরা পড়ে গেল। বাড়িতে শুরু হলো প্রচণ্ড অশান্তি। তার বইপত্র আর দরকারি সার্টিফিকেট পুড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখানো হলো। সেই রাতে নিজের সন্তানকে বুকে জড়িয়ে সে অনেক কাঁদল। কিন্তু এই কান্না তাকে দুর্বল করল না, বরং আরও শক্ত করে তুলল। সে বুঝতে পারল, নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে এই লড়াই তাকে জিততেই হবে।

তার মনে তখন একটাই স্বপ্ন—সে একজন সাংবাদিক হয়ে উঠবে। সেই লক্ষ্য নিয়েই সে পড়াশোনা আর নতুন পরিকল্পনা শুরু করল। পথটা ছিল খুব কঠিন, পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ ছিল না। একা পথ চলা অনেক কষ্টের হলেও, নিজের অটুট সংকল্প থেকে সে এক পা-ও পিছিয়ে আসেনি।

অবশেষে সাংবাদিক হওয়ার স্বপ্ন বুকে নিয়ে তিনি পাড়ি দিলেন কলকাতার রাজপথে। শুরুতে অনেক বাধা আর প্রতারণার মুখে পড়লেও দমে যাননি। লড়াই চালিয়ে যেতে যেতেই সুযোগ পেলেন একটি নিউজ পোর্টালে কাজ করার। যেদিন প্রথমবার হাতে বুম এল, আনন্দে প্রায় লাফিয়ে উঠেছিলেন তিনি। আস্তে আস্তে পরিচিতি বাড়ল, ভিডিও ভাইরাল হলো—সবকিছুই যেন তার কাছে স্বপ্নের মতো মনে হতে লাগল।

এক হাতে ঘরের দায়িত্ব আর অন্য হাতে কাজের চাপ সামলানো ছিল অত্যন্ত কঠিন। তবে এই সাফল্যের পিছনে তার মেয়েদের অবদানও অনেক। মায়ের সান্নিধ্য ছাড়াই তারা বড় হয়েছে। মা যা রান্না করে দিয়ে যেতেন, সেটুকুর সঙ্গেই নিজেদের মানিয়ে নিয়েছে তারা। আসলে এই লড়াইটা তো কেবল তার একার ছিল না, ছিল তাদের সবার। মা আর মেয়েদের এই সম্মিলিত প্রচেষ্টাই আজ এক অসম্ভবকে সম্ভব করেছে।

সেই গ্রামের সাধারণ এক গৃহবধূর সাংবাদিক হয়ে ওঠার এই যাত্রাপথটি সত্যিই অনেকটা সিনেমাটিক। আর পাঁচজন সাধারণ গ্রাম্য মহিলার মতো তিনি নিজের জগতকে শুধু ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চাননি। নিজেকে হারিয়ে যেতে না দেওয়ার এই পথ চলা সহজ ছিল না; পদে পদে তাকে অনেক কটু কথা আর মানসিক আঘাত সইতে হয়েছে। তবুও তিনি দমে যাননি। নিজের সংকল্প আর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে তিনি অত্যন্ত সচেতনতার সঙ্গে লড়াই করেছেন এবং আজও সেই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।

জীবনের লড়াইয়ে যেমন জয় আছে, তেমনই আছে হেরে যাওয়ার ভয়। আগামীর দিনগুলোতে তার জন্য কী অপেক্ষা করছে, তা বলা হয়তো কঠিন। তবে এটুকু নিশ্চিত যে, তিনি নিজেকে আর কখনও হারিয়ে যেতে দেবেন না। নিজের পরিচয়ে বেঁচে থাকার এই অটল জেদই তাকে অনন্য করে রাখবে।

লিখেছেন
Arunima
Arunima
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।