শাসক বিরোধী গণআন্দোলনের সুযোগ নিয়ে ইরানে পুতুল সরকার বসাতে চাইছেন ট্রাম্প

Iran protests: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত আক্রমণাত্মক অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভকারীদের 'মুক্তির' আহ্বান জানিয়েছেন এবং প্রয়োজনে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। অন্যদিকে ইরানের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইজরায়েল এই বিক্ষোভকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বিক্ষোভকারীদের বীরত্বকে কুর্নিশ জানিয়েছেন

Asish Gupta
৭ মিনিট
শাসক বিরোধী গণআন্দোলনের সুযোগ নিয়ে ইরানে পুতুল সরকার বসাতে চাইছেন ট্রাম্প

তেহরানের আজাদি স্কয়ার এবং ইনকিলাব স্ট্রিটের মতো জমজমাট এলাকাগুলি এখন কার্যত নিরাপত্তা বাহিনীর দুর্গে পরিণত হয়েছে। ইন্টারনেটের অভাবে মানুষ 'স্টারলিঙ্ক' ডিভাইসের মাধ্যমে বাইরের জগতের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের চেষ্টা করছেন। তেহরানের বিখ্যাত গ্র্যান্ড বাজারে এখন তালাবদ্ধ দোকানের সারি। মুদ্রাস্ফীতি এতোটাই প্রকট যে, সকালে যে জিনিসের দাম ১ লক্ষ রিয়াল ছিল, বিকেলে তা হয়ত দেড় লক্ষে গিয়ে ঠেকছে। হাসপাতালগুলি আহত বিক্ষোভকারীতে পূর্ণ হলেও সেখানে গ্রেফতারের ভয়ে অনেকেই যেতে চাইছেন না। আমেরিকা-ভিত্তিক সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (HRAAN)-এর তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক দিনে ইরানে মোট ২,৫৭১ জন নিহত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলি বিক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে এবং ছাত্রীরা হিজাব ছাড়াই প্রকাশ্যে প্রতিবাদ জানাচ্ছে। তেলের বাজারেও এর প্রভাব পড়ছে; ১৩ জানুয়ারির তথ্য অনুযায়ী, ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম প্রতি ব্যারেল প্রায় ৬৪ ডলারে পৌঁছেছে। ট্রাম্পের নতুন শুল্ক নীতি অনুযায়ী, ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা দেশগুলির উপর ২৫% শুল্ক আরোপের ঘোষণা বিশ্ব সরবরাহ চেইনে বড় ফাটল ধরার ঝুঁকি তৈরি করেছে।

ইরানের বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশটি এখন সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এবং জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া গণবিক্ষোভ ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে এসে এক চরম নাটকীয় রূপ নিয়েছে। একে বিশ্লেষকরা একটি 'পারফেক্ট স্টর্ম' বা বহুমুখী সংকট হিসেবে অভিহিত করছেন। ইরানে অর্থনৈতিক বিপর্যয়, প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং বহিঃশক্তির সামরিক চাপ একত্রে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের অস্তিত্বকে এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে। এই সংকটের মূলে রয়েছে ইরানি মুদ্রার অভাবনীয় পতন।

চলতি বছরের শুরুর দিকেই মার্কিন ডলারের বিপরীতে রিয়ালের মান ১৪ লক্ষ ছাড়িয়ে গিয়েছে, যা মাত্র এক বছর আগেও ছিল ৭ লক্ষের আশেপাশে। এই মুদ্রাস্ফীতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে; গত এক বছরে খাদ্যদ্রব্যের দাম গড়ে ৭২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। গত ২৮ ডিসেম্বর তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারের ব্যবসায়ীরা দোকানপাট বন্ধ করে ধর্মঘট শুরু করলে ক্ষোভের এই আগুন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ঐতিহাসিকভাবেই ইরানে বাজারের ব্যবসায়ীদের অসন্তোষ বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পূর্বাভাস হিসেবে গণ্য করা হয়। একদিকে যখন সাধারণ মানুষ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে দেশের প্রভাবশালী শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে যে তারা কালোবাজার ও তেল বিক্রির মাধ্যমে 'নিষেধাজ্ঞা অর্থনীতি' থেকে লাভবান হচ্ছে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার প্রভাবে দেশটির মধ্যবিত্ত শ্রেণি স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ২৮ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে।

ইরানের অভ্যন্তরীণ এই অস্থিরতা আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিকেও চরমভাবে মেরুকরণ করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত আক্রমণাত্মক অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভকারীদের 'মুক্তির' আহ্বান জানিয়েছেন এবং প্রয়োজনে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। অন্যদিকে ইরানের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইজরায়েল এই বিক্ষোভকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বিক্ষোভকারীদের বীরত্বকে কুর্নিশ জানিয়েছেন। ইউরোপীয় দেশগুলির মধ্যে জার্মানির চান্সেলর ফ্রেডরিখ মার্জ কড়া ভাষায় জানিয়েছেন, কোনো সরকার যদি কেবল সহিংসতার মাধ্যমে ক্ষমতায় টিকে থাকতে চায়, তবে বুঝতে হবে তার সময় শেষ হয়ে এসেছে। বিপরীত মেরুতে রাশিয়া ও চিন এই বিক্ষোভকে বিদেশের উস্কানি হিসেবে অভিহিত করে তেহরানের সার্বভৌমত্বের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। কাতার এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করার চেষ্টা করছে যাতে অঞ্চলটি কোনো ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের কবলে না পড়ে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
কেন আগের সব আন্দোলনের চেয়ে আলাদা ইরানের বর্তমান বিক্ষোভ?

Iran protests 2025: হাসপাতালগুলিতে আহতদের ভিড় এতটাই বেড়েছে যে চিকিৎসা দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের। কিছু প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, মরদেহ রাখার জায়গাও অনেক ক্ষেত্রে অপ্রতুল হয়ে পড়েছে। যদিও সরকারি ভাবে হতাহতের সঠিক সংখ্যা প্রকাশ করা হয়নি, তবুও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও প্রবাসী ইরানিদের উদ্যোগে সংগৃহীত তথ্যে নিহতের সংখ্যা কয়েক হাজারে পৌঁছতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এই বিক্ষোভের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো নির্বাসিত যুবরাজ রেজা পাহলভির কৌশল পরিবর্তন। গত চার দশক ধরে অহিংস আন্দোলনের কথা বললেও, এবার ৬৫ বছর বয়সি‌ এই নেতা সরাসরি জনগণকে শহরের কেন্দ্রস্থলগুলি দখল করার এবং নিরাপত্তা বাহিনীকে পক্ষত্যাগের আহ্বান জানিয়েছেন। বিক্ষোভের মিছিলে এখন মাঝেমধ্যেই ১৯৭৯ পূর্ববর্তী 'সিংহ ও সূর্য' খচিত পতাকা দেখা যাচ্ছে, যা বর্তমান শাসনের প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ। তবে পাহলভির এই উত্থান বিরোধী শিবিরের মধ্যেও বিভেদ সৃষ্টি করেছে; কেউ কেউ মনে করেন তাঁর ফিরে আসা গৃহযুদ্ধের পথ প্রশস্ত করতে পারে। তেহরান সরকার এই পরিস্থিতিকে একটি 'অভ্যন্তরীণ সশস্ত্র যুদ্ধ' হিসেবে বর্ণনা করছে।

ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট করে তথ্যের আদান-প্রদান বন্ধ রাখা হয়েছে এবং নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর দমনে ইতোমধ্যে শত শত বিক্ষোভকারী নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। ইরানের শীর্ষ নেতারা অবশ্য স্বীকার করেছেন, কেবল নিষেধাজ্ঞা নয়, বরং দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক ব্যর্থতাও এই অর্থনৈতিক সংকটের জন্য দায়ী। ২০২৫ সালে ইজরায়েল ও আমেরিকার পক্ষ থেকে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলিতে যে হামলা চালানো হয়েছিল, তা দেশটির সামরিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোকে পঙ্গু করে দিয়েছে, যা সাধারণ মানুষকে বর্তমান শাসনের বিরুদ্ধে আরও বেশি সাহসী করে তুলেছে।

ইরানের বর্তমান পরিস্থিতির গভীরতর বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৬ সালের এই সংকট কেবল একটি সাময়িক বিক্ষোভ নয়, বরং এটি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের কাঠামোগত পতনের একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রক্রিয়ার অংশ। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের বর্তমান নেতৃত্ব এক অভূতপূর্ব 'বৈধতার সংকটে' ভুগছে। অতীতে বিক্ষোভগুলি দমনে সরকার যে ধরনের জনসমর্থন বা আদর্শিক ভিত্তি ব্যবহার করত, বর্তমানে তা প্রায় বিলীন। অর্থনৈতিক মন্দা ও দুর্নীতির কারণে খোদ শাসনব্যবস্থার অনুগত হিসেবে পরিচিত 'বাস্তুহারা' বা নিম্নবিত্ত শ্রেণির মধ্যেও চরম ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। যদি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তবে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পস (IRGC) সরাসরি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে একটি সম্পূর্ণ 'সামরিক শাসন' জারি করতে পারে। সে ক্ষেত্রে ধর্মীয় নেতৃত্বের প্রভাব কমে গিয়ে ইরান একটি প্রকাশ্য সামরিক একনায়কতন্ত্রে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এবার অনেক বেশি সরাসরি হস্তক্ষেপের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ওয়াশিংটনে বর্তমানে সাইবার আক্রমণ থেকে শুরু করে ইরানের তেল শোধনাগার বা নিরাপত্তা বাহিনীর সদর দফতরে সুনির্দিষ্ট সামরিক হামলার (Surgical Strike) পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলছে। ট্রাম্পের লক্ষ্য কেবল ইরানকে আলোচনার টেবিলে আনা নয়, বরং দেশের বর্তমান ব্যবস্থাকে আমূল বদলে দেওয়া। ভেনেজুয়েলার মতো ইরানেও ট্রাম্পের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কথা বলা শুধুমাত্র বাহানা, আসল উদ্দেশ্য সেখানকার তেলের দখল নেওয়া। ইজরায়েলও এই সুযোগে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতাকে স্থায়ীভাবে ধ্বংস করার চেষ্টা চালাচ্ছে আঞ্চলিক কর্তৃত্বকে কুক্ষিগত করার জন্য । তবে এই ধরনের বৈদেশিক হামলা হিতের বিপরীতও হতে পারে; এটি বিক্ষোভকারীদের মনে দেশপ্রেমের আবেগ জাগিয়ে তুলতে পারে, যা প্রকারান্তরে বর্তমান সরকারকেই সাময়িকভাবে শক্তিশালী করতে পারে।

রেজা পাহলভি যেভাবে নিজেকে একজন গণতান্ত্রিক উত্তরণের নেতা হিসেবে উপস্থাপন করছেন, তা অনেক ইরানির কাছে আশার আলো হয়ে দাঁড়িয়েছে। রেজা পাহলভির পাশে রয়েছে আমেরিকা ও পশ্চিমি প্রচারমাধ্যম। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, ৪৭ বছর নির্বাসনে থাকার পর তিনি কি মাঠ পর্যায়ের জটিল ভূ-রাজনীতি এবং দেশের সামরিক বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন? যদি শাসনব্যবস্থার পতন ঘটে, তবে ইরানে একটি 'ক্ষমতার শূন্যতা' তৈরি হতে পারে, যা সিরিয়া বা লিবিয়ার মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে। ইরানের প্রভাবশালী নিরাপত্তা বাহিনীগুলি কি স্বেচ্ছায় একজন নির্বাসিত রাজার অধীনে কাজ করতে রাজি হবে, নাকি দেশটিতে দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ শুরু হবে— সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। আগামী কয়েক সপ্তাহ হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি দেশব্যাপী ধর্মঘট আরও জোরালো হয় এবং তেল খাতের শ্রমিকরা সম্পূর্ণ কাজ বন্ধ করে দেয়, তবে সরকারের কোষাগার শূন্য হয়ে পড়বে। অন্যদিকে, জানুয়ারির শেষ নাগাদ মুদ্রাস্ফীতি যদি আরও বৃদ্ধি পায়, তবে মধ্যবিত্ত শ্রেণির পর বিশাল এক জনস্রোত রাজপথে নেমে আসতে পারে যা দমানো কোনো বাহিনীর পক্ষেই সম্ভব হবে না।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
কেন নোবেলজয়ী নার্গিসকে ভয় পায় ইরান?

Narges Mohammadi: জাতীয় নিরাপত্তাবিরোধী কার্যকলাপ ও রাষ্ট্রবিরোধী প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে মোট ৩১ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

২০২৬ সালের শুরুতে ইরানি রিয়াল যে নজিরবিহীন পতনের সম্মুখীন হয়েছে, তার পেছনে কেবল রাজনৈতিক অস্থিরতাই নয়, বরং ২০২৫-এর যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতিও সমানভাবে দায়ী। ২০২৫ সালের জুনে ইজরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ১২ দিনের সামরিক অভিযানে ইরানের তেল শোধনাগার, যেমন তেহরানের দক্ষিণ উপকণ্ঠে শাহরে শোধনাগার এবং গ্যাস ফিল্ডের একাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে জ্বালানি উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে এনেছে। নিষেধাজ্ঞার কারণে তেল বিক্রির আয় কমে যাওয়ায় ইরান সরকার বাজেট ঘাটতি মেটাতে দেদারসে টাকা ছাপিয়েছে, যা মূল্যস্ফীতিকে ৪২ শতাংশের উপরে নিয়ে গিয়েছে। ইরানের অর্থনীতির একটি বড় অংশ বিপ্লবী গার্ড বা আইআরজিসি-র নিয়ন্ত্রণে থাকায় কালোবাজারে কম দামে তেল বিক্রি করতে হচ্ছে, যার সুফল সাধারণ মানুষ পাচ্ছে না। প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের সরকার বৈদেশিক মুদ্রার ভর্তুকি কমিয়ে দেওয়ায় খাদ্যস্ফীতি ৭২ শতাংশে পৌঁছানোয় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা একদম নিঃশেষ হয়ে গিয়েছে।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ইরানের বিক্ষোভকারীদের 'সাহায্য' করার নাম করে যে সামরিক পদক্ষেপগুলি বিবেচনা করছে, তার একটি প্রাথমিক তালিকায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন তৈরির কারখানা (যেমন কেরমানশাহ ও সেমনান), পারমাণবিক স্থাপনার অবশিষ্টাংশ (নাতানজ ও ফোরদো), এবং কৌশলগত যোগাযোগ ও সাইবার পরিকাঠামো রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবার 'বাঙ্কার বাস্টার' বোমা ব্যবহার করে পারমাণবিক কেন্দ্রগুলি স্থায়ীভাবে ধ্বংস করার পরিকল্পনা করছে। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, এই ধরনের হামলা যদি ইরানের তেল রফতানির প্রধান কেন্দ্র খার্গ আইল্যান্ডে আঘাত করে, তবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ থেকে ১৩০ ডলারে উঠে যেতে পারে। অন্যদিকে, ইরান পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়ে রেখেছে। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। এই প্রণালীটি বন্ধ হলে সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেল রফতানি বন্ধ হয়ে যাবে, যা ভারত, চিন এবং জাপানের মতো দেশগুলির জন্য বিপর্যয়কর হবে। আমেরিকা এই পদক্ষেপকে ইরানের 'অর্থনৈতিক আত্মহত্যা' হিসেবে অভিহিত করে জানিয়েছে, তারা হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত রাখতে প্রয়োজনে সরাসরি সামরিক শক্তিতে হস্তক্ষেপ করবে। তবে, ভ্যারাইটি (Variety) ম্যাগাজিনের সঙ্গে একটি সাক্ষাৎকারে, বর্তমানে কার্যত নির্বাসিত জীবনযাপন করা বিখ্যাত ইরানি চলচ্চিত্র নির্মাতা জাফর পানাহি ডোনাল্ড ট্রাম্পের আক্রমণাত্মক বাগাড়ম্বর এবং বিদেশি হস্তক্ষেপের প্রতিশ্রুতির বিরুদ্ধে সতর্ক করেছেন। এমন এক সময়ে তিনি এই সতর্কতা দিলেন যখন ইসলামিক প্রজাতন্ত্রটি নিজের দেশে তাঁর বৈধতা হারাচ্ছে। পানাহি বলেন,

এই শাসনের পতন ইতোমধ্যেই ঘটে গিয়েছে। ... রাস্তায় যারা বিক্ষোভ করছে, তারা সেটাই বাস্তবে রূপ দিতে চায়।

তিনি আরও বলেন,

আন্তর্জাতিক সমর্থন ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু মানুষ নিজে কিছু করার সিদ্ধান্ত না নেওয়া পর্যন্ত কিছুই ঘটবে না। ... এটি দেশের ভেতর থেকে, মানুষের ইচ্ছার মাধ্যমেই আসতে হবে।

বর্তমান এই দৃশ্য অনেক দিক থেকেই ২০০৯ সালের সবুজ আন্দোলন বা ২০২২ সালের “নারী, জীবন, স্বাধীনতা” বিদ্রোহের কথা মনে করিয়ে দিলেও এবার পরিস্থিতি অনেক বেশি সংঘাতপূর্ণ। ইরানের ৩১টি প্রদেশেই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলির মতে, ইতোমধ্যে শত শত মানুষ নিহত হয়েছেন। রাষ্ট্রীয় এই সহিংসতা এখনও জনরোষ দমাতে পারেনি। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান দরিদ্র ইরানিদের জন্য কিছু অর্থনৈতিক ত্রাণ দেওয়ার চেষ্টা করলেও তা পরিস্থিতির উত্তাপ কমাতে পারেনি। বিক্ষোভকারীদের স্লোগানে এখন রাজনৈতিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের দাবি উঠছে এবং ১৯৭৯ সালের ক্ষমতাচ্যুত রাজতন্ত্রের প্রতীকগুলি প্রকাশ্যে দেখা যাচ্ছে। আঞ্চলিকভাবেও ইরান এখন দুর্বল; লেবানন এবং সিরিয়ায় তাদের ছায়া শক্তিগুলি হয় নির্মূল হয়েছে নয়ত অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছে। সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনেই এখনও একে পশ্চিমা ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছেন, কিন্তু স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসবিদ আব্বাস মিলানির মতে, বর্তমান মুহূর্তের বিশেষত্ব হলো বৈধতার চরম পতন এবং মানুষের মন থেকে শাসনব্যবস্থার 'ভয়' দূর হয়ে যাওয়া।

জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ভ্যালি নাসরের মতে, ইরান এখন এক সাড়াশির মধ্যে আটকা পড়েছে— একদিকে অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ আর অন্যদিকে বহিঃশক্তির সামরিক হুমকি। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্র আজ একটি 'জম্বি শাসনব্যবস্থায়' পরিণত হয়েছে। এর বৈধতা, আদর্শ এবং অর্থনীতি মৃতপ্রায়। একে যা বাঁচিয়ে রেখেছে তা হলো কেবল প্রাণঘাতী শক্তি। নৃসংশতা এই শাসনের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াকে বিলম্বিত করতে পারে, কিন্তু এর স্পন্দন ফিরিয়ে আনা এখন প্রায় অসম্ভব। আর ইসলামী শাসকদের এই চরম ব্যর্থতাকে পুঁজি করে ডোনাল্ড ট্রাম্প আসরে নেমেছেন ইরানের তেল লুঠ করে নিজ দেশের অর্থনীতিকে বাঁচাতে।

(মতামত লেখকের ব্যক্তিগত)

লিখেছেন
Asish Gupta
Asish Gupta
2 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

এসআইআর বির্তক: যে খবর স্বাভাবিক হওয়ার কথা, সেটাই আজ বিস্ময়

Gyanesh Kumar, SIR and Election Commission: এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে আপত্তি থাকা সত্ত্বেও কেন প্রক্রিয়া চালানো হল? জ্ঞানেশ কুমার কীভাবে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হলেন? ২০২৩ সালে আইন বদলে প্রধান বিচারপতিকে নির্বাচন কমিশনার বাছাইয়ের কমিটি থেকে সরানো হল কেন? এতদিন এই প্রশ্নগুলি গণমাধ্যম তুলল না কেন?

এসআইআর: বিশুদ্ধ ভোটার তালিকা তৈরির নামে যা পেল বাঙালি

Real Effect of SIR in bengal: ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গে ৯১ লক্ষ ভোটার বাদ যান, যারা ছিলেন মোট ভোটারের ১২ শতাংশ। যাদের মধ্যে ৩৪% ছিলেন মুসলিম , নারীরা সংখ্যায় ছিলেন ৬১.৮%, এছাড়াও ছিলেন, মতুয়া ও রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষেরা, যারা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। ফর্ম-৭-এর অপব্যবহার, অ্যালগরিদম-নির্ভর যাচাই, ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনালে ১ লক্ষ মামলা, সব মিলিয়ে ২০২৬-এর ভোটে যোগ্য নাগরিকরাও বাদ পড়েছিলেন।

‘সব নির্বাচনেই কারচুপি’, কেন এমন দাবি রাহুল গান্ধীর?

Rahul Gandhi election rigging claim: রাহুল গান্ধী কেন দাবি করলেন, ভারতের সব নির্বাচনেই কারচুপি হচ্ছে? নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে কী প্রশ্ন তুলেছেন তিনি? সরকারবিরোধী মনোভাব বা অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি কীভাবে ভোটের রাজনীতিতে কাজ করে? তাঁর অভিযোগের পক্ষে কী কী তথ্য ও প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে?

সিজেপির তিন দাবি, জ্ঞানেশ কুমার না সরলে ফের বড় আন্দোলন

Election Commission of India: নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতি এবং ২০২৩ সালের আইনের বৈধতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানিয়েছে সিজেপি। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, নির্বাচন প্রক্রিয়া স্থগিত করা এবং ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত আইন প্রত্যাহার।

থানার গেটেই মারধর প্রাক্তন আইপিএস হুমায়ুন কবীরকে, সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ?

Humayun Kabir: ঘটনার পর এখনও পর্যন্ত তিনি কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেননি বলেও জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তখন অভিযোগ করা সম্ভব হয়নি। সুস্থ হয়ে তিনি লিখিত অভিযোগ করবেন।

দুই কমিশনারের আপত্তিতে ফের আলোচনায় সীমা খান্না, কমিশনে ঠিক কী দায়িত্ব তাঁর?

Seema Khanna and ECINet: ভোটার তালিকা ও ইসিআইনেট (ECINet) নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তিতে সামনে এসেছে আইটি বিভাগের ভূমিকা এবং ডিরেক্টর জেনারেল (IT) সীমা খান্নার নাম। কে এই সীমা খান্না? নির্বাচন কমিশনে তাঁর দায়িত্ব কী? ভোটার তালিকা পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা নিয়েই বা কেন উঠছে প্রশ্ন?

সরকারকে ৪ দিনের সময়সীমা বেধে দিল চা-শ্রমিকরা, ঠিক কী কী দাবি?

Dooars tea workers: ২২ সেপ্টেম্বর বকেয়া মজুরি ও অন্যান্য পাওনা মেটানোর দাবিতে হাঁটাপাড়া, ধুমচিপাড়া ও গারগান্ডার চা-শ্রমিকরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পদযাত্রা শুরু করেন। একই দিনে তোর্সার প্রস্তাবিত ল্যান্ড পোর্ট প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষও জমি ও অধিকার রক্ষার দাবিতে পদযাত্রা করেন। দুই পদযাত্রাই পুলিশ আটকে দেয়।

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।