কেন আগের সব আন্দোলনের চেয়ে আলাদা ইরানের বর্তমান বিক্ষোভ?
Iran protests 2025: হাসপাতালগুলিতে আহতদের ভিড় এতটাই বেড়েছে যে চিকিৎসা দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের। কিছু প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, মরদেহ রাখার জায়গাও অনেক ক্ষেত্রে অপ্রতুল হয়ে পড়েছে। যদিও সরকারি ভাবে হতাহতের সঠিক সংখ্যা প্রকাশ করা হয়নি, তবুও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও প্রবাসী ইরানিদের উদ্যোগে সংগৃহীত তথ্যে নিহতের সংখ্যা কয়েক হাজারে পৌঁছতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ইরানে চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলন এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যে দেশটির আধুনিক ইতিহাসে এই আন্দোলন এক কথায় ব্যতিক্রমী বলছেন বহু বিশ্লেষক। ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর গত প্রায় পাঁচ দশকে নানা সময়ে অসন্তোষ, বিক্ষোভ ও গণআন্দোলন দেখা গেলেও এবারের পরিস্থিতিকে আলাদা করে চিহ্নিত করছে এর ব্যাপ্তি, সামাজিক বিস্তার, রাজনৈতিক ভাষা এবং আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট। শহর থেকে গ্রাম, মধ্যবিত্ত থেকে দরিদ্র— সমাজের নানা স্তরের মানুষ একসঙ্গে রাস্তায় নেমে আসায় এই আন্দোলন কেবল কোনো নির্দিষ্ট দাবি বা গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং ধীরে ধীরে এটি পরিণত হচ্ছে শাসনব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তনের দাবিতে।
ডিসেম্বরের শেষ দিকে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ প্রথমে অর্থনৈতিক অসন্তোষকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। দীর্ঘদিন ধরেই ইরান ভয়াবহ মুদ্রাস্ফীতি, কর্মসংস্থানের অভাব এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার চাপে বিপর্যস্ত। ডলারের তুলনায় ইরানি মুদ্রা রিয়ালের মান দ্রুত পতন সাধারণ মানুষের জীবনকে অনেকটাই সমস্যায় ফেলে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় ক্ষোভ জমছিল বহুদিন ধরেই। সেই ক্ষোভেরই প্রকাশ ঘটে তেহরানের কেন্দ্রস্থলে ব্যবসায়ীদের ধর্মঘটের মাধ্যমে। অল্প সময়ের মধ্যেই সেই প্রতিবাদ রূপ নেয় বৃহত্তর গণবিক্ষোভে।
তেহরান থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে অন্যান্য বড় শহরে। এরপর তা পৌঁছে যায় ছোট শহর ও প্রান্তিক এলাকাতেও, এমন অনেক জায়গায়ও আন্দোলন দেখা যায় যেখানে আগে বড় ধরনের রাজনৈতিক আন্দোলনের নজির ছিল না। ওয়াকিবহাল মহল বলছে, এই বিস্তারই এবারের আন্দোলনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। অতীতে দেখা গিয়েছে, ইরানের অনেক আন্দোলন নির্দিষ্ট সামাজিক শ্রেণি বা ভৌগোলিক পরিসরে সীমাবদ্ধ ছিল। ২০০৯ সালের বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর যে আন্দোলন হয়েছিল, তা মূলত বড় শহরের শিক্ষিত মধ্যবিত্তদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। আবার ২০১৭ ও ২০১৯ সালের আন্দোলনগুলো বেশি প্রভাব ফেলেছিল তুলনামূলকভাবে দরিদ্র অঞ্চলগুলোতে। কিন্তু এবারের বিক্ষোভ সেই বিভাজন ভেঙে দিয়েছে।
২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর যে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তার সঙ্গে এবারের বিক্ষোভের তুলনা টানছেন অনেকেই। নৈতিকতা পুলিশের হেফাজতে এক তরুণীর মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া সেই আন্দোলন নারীর অধিকার, ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রীয় দমননীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভকে একত্র করেছিল। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তা দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং সরকারকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান আন্দোলন তার চেয়েও বিস্তৃত এবং শক্তিশালী। কারণ, এটি কেবল কোনো নির্দিষ্ট সামাজিক ইস্যুতে আটকে নেই; বরং অর্থনীতি, রাজনীতি ও শাসনব্যবস্থার প্রশ্নকে একত্র করেছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Narges Mohammadi: জাতীয় নিরাপত্তাবিরোধী কার্যকলাপ ও রাষ্ট্রবিরোধী প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে মোট ৩১ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
এই আন্দোলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর স্লোগান ও ভাষা। বিক্ষোভকারীদের কণ্ঠে শোনা যাচ্ছে সরাসরি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক বক্তব্য। ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক’— এই ধরনের স্লোগান কেবল নীতিনির্ধারণের পরিবর্তন নয়, ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা ব্যক্তিদের অপসারণের দাবিকেও স্পষ্ট করছে। এমনকি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেইয়ের বিরুদ্ধেও প্রকাশ্যে স্লোগান উঠছে, যা অতীতে তুলনামূলকভাবে বিরল ছিল।
এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়াও কঠোর হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনী ও আধাসামরিক সংগঠনগুলিকে ব্যবহার করে বিক্ষোভ দমনের চেষ্টা করা হচ্ছে। বিভিন্ন শহর থেকে সংঘর্ষ, গুলিবর্ষণ ও ব্যাপক ধরপাকড়ের খবর আসছে। হাসপাতালগুলিতে আহতদের ভিড় এতটাই বেড়েছে যে চিকিৎসা দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের। কিছু প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, মরদেহ রাখার জায়গাও অনেক ক্ষেত্রে অপ্রতুল হয়ে পড়েছে। যদিও সরকারি ভাবে হতাহতের সঠিক সংখ্যা প্রকাশ করা হয়নি, তবুও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও প্রবাসী ইরানিদের উদ্যোগে সংগৃহীত তথ্যে নিহতের সংখ্যা কয়েক হাজারে পৌঁছতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সরকারি বিবৃতিতে ইরানি কর্তৃপক্ষ এই বিক্ষোভকে বিদেশি ষড়যন্ত্রের ফল বলে দাবি করছে। ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী একাধিকবার অভিযোগ তুলেছে, নিহত বিক্ষোভকারীদের মধ্যে অনেকে নাকি বিদেশি শক্তির মদতপুষ্ট সন্ত্রাসী। তাদের কথায়, ইজরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই অস্থিরতা উসকে দিচ্ছে। ইরানের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমে এমনও সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে যে, রাস্তায় নামলে প্রাণ হারানোর ঝুঁকি রয়েছে। এই ধরনের বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Hijab Protest in Iran: মাহশা হিজাব না পরে রাস্তায় বেরোন। তাই তাঁকে শিক্ষা দিতেই দেশের নীতি পুলিশ আমিনিকে গ্রেফতার করে। এরপরেই রহস্যজকভাবে কোমায় চলে যায় আমিনি।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এবারের আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যেই বিক্ষোভকারীদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন এবং ইরানি কর্তৃপক্ষের দমননীতির বিরুদ্ধে কড়া ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। এমন প্রকাশ্য অবস্থান অতীতে খুব একটা দেখা যায়নি। ২০০৯ সালের আন্দোলনের সময় তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তুলনামূলক ভাবে সংযত ভূমিকা নিয়েছিলেন, যার জন্য পরে তিনি প্রকাশ্যে আক্ষেপও করেছিলেন।
এই প্রেক্ষাপটে ইরানের নেতৃত্বের জন্য আন্তর্জাতিক পরিবেশও খুব একটা অনুকূল নয়। এক সময় যেসব আঞ্চলিক মিত্রের উপর ভরসা করত তেহরান, তাদের অবস্থানও এখন দুর্বল। সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের পতন ইরানের প্রভাব বলয়কে বড় ধাক্কা দিয়েছে। লেবাননে হেজবুল্লাহও সাম্প্রতিক সংঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত। ফলে আঞ্চলিক রাজনীতিতে ইরানের অবস্থান আগের তুলনায় অনেকটাই নড়বড়ে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
এবারের আন্দোলনে নেতৃত্বের প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অতীতে অনেক আন্দোলন নির্দিষ্ট নেতৃত্বের অভাবে ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে গিয়েছিল। ২০২২ সালের আন্দোলনেও কোনো স্পষ্ট কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব দেখা যায়নি। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে কিছু পরিচিত মুখের প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম হলেন নির্বাসনে থাকা রেজা পাহলভি। ইরানের শেষ শাহের পুত্র পাহলভি দীর্ঘদিন ধরেই বিদেশে থেকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরোধিতা করে আসছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর আহ্বান ও বক্তব্য এবারের বিক্ষোভে অংশ নেওয়া অনেক তরুণের মধ্যে আলোড়ন তুলেছে।
ইরানের ভেতরে সুসংগঠিত, ধর্মনিরপেক্ষ বিরোধী নেতৃত্বের অভাব দীর্ঘদিনের সমস্যা। সেই শূন্যস্থানেই পাহলভির উপস্থিতি কিছু মানুষের কাছে আশার আলো হিসেবে ধরা দিচ্ছে। তবুও, আন্দোলনের ভেতরে তাঁর ভূমিকা কতটা প্রভাবশালী হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। এই আন্দোলনের সামাজিক ভিত্তিও বদলে যাচ্ছে। শুরুতে যারা রাস্তায় নেমেছিলেন, তাদের বড় অংশ ছিল ব্যবসায়ী ও মধ্যবিত্ত। কিন্তু সময় এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে শ্রমজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী, নারী ও তরুণদের অংশগ্রহণ বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একে অপরকে আন্দোলনে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন তরুণরা। ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা সত্ত্বেও ভিডিও ও ছবি ছড়িয়ে পড়ছে, যা আন্দোলনের বাস্তব চিত্র বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরছে।
এই সমস্ত ঘটনার মধ্যে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান দাবি করেছেন, বিক্ষোভকারীরা দেশের শত্রুদের দ্বারা পরিচালিত। কিন্তু অনেকেই বলছেন বাস্তবতা হলো, অভ্যন্তরীণ সমর্থনের ক্ষেত্রেও সরকারের অবস্থান আগের মতো শক্ত নয়। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক দমননীতি এবং সামাজিক বিধিনিষেধ সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর হতাশা তৈরি করেছে। সেই হতাশাই এখন সরকারবিরোধী আন্দোলন তৈরি করছে।
ইরানের চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলনের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা বলা কঠিন। সরকার যদি দমননীতির পথেই এগোয়, তবে সহিংসতা আরও বাড়তে পারে। আবার আন্তর্জাতিক চাপ ও অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা মিলিয়ে কোনো রাজনৈতিক সমাধানের পথও খুলতে পারে। তবে নিশ্চিত ভাবে বলা যায়, এই আন্দোলন ইরানের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে, যার প্রভাব দেশটির ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণে বড় ভূমিকা নিতে পারে।






