যাদবপুর হকার উচ্ছেদ: সিপিএমই এখন প্রকৃত প্রধান বিরোধী দল?
CPI(M): পশ্চিমবঙ্গে হকার উচ্ছেদ, তৃণমূলের সাংগঠনিক সংকট এবং বিরোধী রাজনীতির শূন্যতার প্রেক্ষাপটে সিপিআইএম কি নতুন করে মানুষের ভরসাস্থল হয়ে উঠছে? যাদবপুর আন্দোলন, বামপন্থীদের রাস্তায় লড়াই এবং শ্রমজীবী মানুষের পাশে দাঁড়ানোর রাজনীতি কি বাংলায় বাম শক্তির পুনরুত্থানের ইঙ্গিত দিচ্ছে?
শুধুমাত্র আসন সংখ্যা এবং ভোটের শতাংশের নিরিখে প্রকৃত বিরোধীদল হয়ে ওঠা যায় না। এর জন্য প্রয়োজন জাগ্রত বিবেক এবং সংগঠিত নীতিবোধ। কিন্তু এর কোনটাই রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেসের মধ্যে নেই। নির্বাচনের ফল ঘোষণার এক মাস পেরিয়ে যাওয়ার পরও মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের অভাব অভিযোগ এবং দুঃখ দুর্দশা স্বপক্ষে সরব হতে রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেসকে দেখা গেল না। বর্তমানে তৃণমূল কংগ্রেস খণ্ডিত রাজনৈতিক সত্ত্বা নিয়ে টিকে রয়েছে।
রাজ্যজুড়ে রেল স্টেশনগুলিতে হকার উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে যে সংকট দেখা দিয়েছে তা নিয়ে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে জোড়াফুল। রাজ্যের প্রধান বিরোধী দলের সিংহভাগ অংশ বর্তমান শাসকদলের কাছে ভালো হয়ে উঠতে তৎপর। পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে তাদের প্রধান বিরোধিতা কার্যত স্পর্ধাহীন আলংকারিক জায়গায় পৌঁছে গিয়েছে।
অন্যদিকে, সর্বভারতীয় স্তরে কাকলি ঘোষ দস্তিদারের নেতৃত্বে প্রায় ২০ জন তৃণমূলের সাংসদ এনডিএর দিকে হেলে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে সিপিআইএম নেতৃত্বাধীন বৃহত্তর বামজোট। সম্প্রতি যাদবপুরে হকার উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে বুলডোজার, রাজ্য পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর সামনে দাঁড়িয়ে লড়াই করে গিয়েছেন সুজন চক্রবর্তী এবং সৃজন ভট্টাচার্যরা। আশুতোষ চট্টোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে যোগ্য সঙ্গত দিয়ে গিয়েছে প্রদেশ কংগ্রেস।
উচ্ছেদের চরমতম মুহূর্তে বামপন্থীদের এই লড়াই মানবিকতার স্বপক্ষে স্বাক্ষর বহন করে চলবে। পুলিশের লাঠির মারে রক্তাক্ত বামপন্থী কর্মীদের ছবি ইতোমধ্যেই সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। বিধানসভায় কেবলমাত্র একটি আসন পাওয়া দলটি যেভাবে রাজ্যজুড়ে উচ্ছেদ হয়ে যাওয়া হকারদের জন্য লড়াই করে চলেছে তাতে করে তারাই হয়ে উঠেছে রাজ্যের প্রকৃত 'প্রধান' বিরোধীদল।
অন্যদিকে, প্রায় ৮০ জন বিধায়ক থাকা সত্ত্বেও নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য লড়াই করে চলেছে তৃণমূল কংগ্রেস। বাংলার রাজনীতিতে গত ২৫ বছরের ইতিহাসে বর্তমান তৃণমূলের মতো এমন দুর্বলতম প্রধান বিরোধী দল আগে কখনোই দেখা যায়নি। ২০০১ এবং ২০০৬ এর বিধানসভা নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দলের বেঞ্চে বসা তৃণমূল কংগ্রেস আজকের তুলনায় অনেক বেশি কার্যকরী ভূমিকা পালন করেছিল। অথচ আজকের মতো তাদের ৮০ জনের বিধায়ক সংখ্যা ছিল না। এমনকি ২০১১ এবং ২০১৬ সালে প্রধান বিরোধী আসনে বসা বামফ্রন্ট এবং কংগ্রেস নিজেদের সাধ্যমত অন্যায়ের অত্যাচারের বিরুদ্ধে সরব হয়েছিল।
২০২১-এ রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল হিসেবে অবতীর্ণ হয় বিজেপি। গত পাঁচ বছরে তারাও সাধ্যমত রাজ্যের তৎকালীন শাসকদলের বিরুদ্ধে বারে বারে সরব হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল যেন নখ দন্তহীন কাগুজে বাঘে নিজেদের পরিণত করেছে। গত ১৫ বছরে যে সীমাহীন দুর্নীতি তারা করে গিয়েছে এবং যে ভাবে মুনাফা লোভীদের নিজেদের দলে যুক্ত করেছে তাতে করে এই দলের কাছ থেকে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রকৃত কর্তব্য আর আশা করা যায় না।
যে দলের কোনো প্রকার নীতি-আদর্শ এবং ঐক্যবদ্ধ চেতনা নেই সেই দল কখনোই মানুষের দুঃখ দুর্দশায় পাশে দাঁড়াতে পারে না। আর সেই শূন্যস্থানে নিজেদের রাজনৈতিক সত্ত্বার পূর্ণ সৃজন করেছে সিপিআইএম নেতৃত্বাধীন বৃহত্তর বাম ঐক্য। বাংলার রাজনীতিতে সংখ্যা তত্ত্বের বিচারে তারা অপ্রাসঙ্গিক হলেও শ্রমজীবী মানুষের ভরসা স্থল হয়ে উঠেছে লাল ঝান্ডা। যাদবপুরে বুলডোজারের ধ্বংসলীলা চলার রাতে প্রিজন ভ্যানের জানলা থেকে সংবিধান হাতে মানুষের স্বপক্ষে লড়াই করে যাওয়ার যে আহ্বান সৃজন ভট্টাচার্য করেছেন তাতে করে বামপন্থী রাজনীতির গ্রহণযোগ্যতা এ রাজ্যে আরও বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। এর আগে তৃণমূল জমানায় শূন্য হয়ে গিয়েও শিক্ষক দুর্নীতি থেকে শুরু করে অভয়া কান্ড, রেশন দুর্নীতি-সহ বিভিন্ন বিষয় গর্জে উঠেছিল বামপন্থীরা।
করোনা অতিমারীর সময় রেড ভলেন্টিয়ার্সরা জীবনকে বাজি রেখে আর্তের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। তৎকালীন শাসকদল এবং তাদের দরবারি বুদ্ধিজীবীরা বামপন্থীদের শূন্য বলে কটাক্ষ করলেও নিজেদের আদর্শ এবং কর্তব্য ও মানুষের প্রতি সহমর্মিতা বোধ থেকে একদিনের জন্যেও পিছিয়ে আসেননি সৃজন, শতরুপ, দীপ্সিতারা। তৃণমূল যখন বামপন্থীদের বৃদ্ধতন্ত্র বলে কটাক্ষ করে চলেছিল সেই সময় এই সকল তরুণ তুর্কি বামপন্থী নেতা-নেত্রীরা শ্রমজীবী মানুষের সহায় হয়ে উঠেছিল। তৎকালীন শাসক তৃণমূল শুধু কটাক্ষের মধ্যে দিয়েই নিজেদের আক্রমণকে সীমিত রাখেনি। একটার পর একটা সিপিএমের পার্টি অফিস দখল, ভাঙচুর। দলীয় কর্মীদের উপর আক্রমণ এবং মিথ্যে মামলায় ফাঁসানোর মতো চক্রান্ত তারা করে গিয়েছিল। কিন্তু মেহনতি মানুষের মর্যাদার প্রতীক লাল ঝান্ডাকে তারা দমাতে পারেনি।
গণতন্ত্র কেবলমাত্র ভোটের শতাংশ এবং বিধানসভায় আসনের নিরিখে বিচার হয় না। মানুষের কন্ঠকে সর্বস্তরে উজ্জীবিত করা এবং তার মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার অধিকারকে নিশ্চিত করার মধ্যে দিয়েই গণতন্ত্রের পূর্ণ সার্থকতা। আর সেই সার্থকতার পথে একটা জাতিকে আলো দেখিয়ে চলেছে বামপন্থীরা। গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে গোটা রাজ্যের রেল স্টেশনগুলিতে হকারদের রুটিরুজির উপর যে ভাবে উত্তর ভারতের মতো বুলডোজার চলেছে তাতে করে বহু মানুষ কর্মহীন ও বাস্তবচ্যুত হয়ে পড়েছে। সেখানে দাঁড়িয়ে সেই সকল বাস্তবচ্যুত মানুষের ভরসা স্থল হয়ে উঠেছে বামপন্থী আন্দোলন।
সমাজের এলিট এবং উচ্চ মধ্যবিত্তরা যখন সামাজিক মাধ্যমে হকারদের বিরুদ্ধে ক্রমাগত জনমত গড়ে তোলার জন্য সচেষ্ট ঠিক সেই সময় এক অসম লড়াইয়ের মধ্যে দিয়ে বামপন্থীরা এগিয়ে চলেছে। এই লড়াইয়ের মধ্যে কোনো প্রকারের রাজনৈতিক স্বার্থ জড়িয়ে নেই। যেটা রয়েছে সেটা পুরোপুরি নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে থেকে প্রতিরোধের পবিত্রতম কর্তব্যকে সম্পাদন করার অঙ্গীকার। এখন এই লড়াই সুদূরপ্রসারী হবে।
তৃণমূল কংগ্রেস ছাত্র সংগঠন যেভাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে নিজেদের একচ্ছত্র জমিদারি তৈরি করে গিয়েছে তাকে পুনরুদ্ধার করার দায়িত্ব এখন বাম মনোভাবাপন্ন ছাত্র সংগঠনগুলির। ছাত্র রাজনীতির ক্ষেত্রে এ লড়াই হবে এবিভিপি বনাম বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলির। দ্বিখন্ডিত হয়ে যাওয়া তৃণমূলীদের সমর্থন বর্তমান শাসকদলের দিকে থাকবে। ফলে আগামী দিনের যাবতীয় বিষয় মানুষের ভরসাস্থল হয়ে উঠবে সিপিআইএম।
বিধানসভায় আসন পাওয়াটা আদতে যে কেবল সংখ্যা মাত্র তাতে করে যে একটা রাজনৈতিক দলের প্রকৃত মান নির্ধারণ করা যায় না সেটাই বুঝিয়ে দিল সিপিআইএম। আগামী দিনে ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতি আরও প্রবলভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। সেখানে যোগ্য সঙ্গত দেবে গোদি মিডিয়া। আর সেখানেই ধর্মনিরপেক্ষ সমাজতান্ত্রিক গণতান্ত্রিক আন্দোলনের দিশা হয়ে উঠবে সিপিআইএম নেতৃত্বাধীন বৃহত্তর বাম ঐক্য। এখন প্রদেশ কংগ্রেসকে ঠিক করতে হবে সে জাতীয় কংগ্রেসের পথে হেঁটে মমতার প্রতি সমবেদনা প্রকট করবে নাকি বামপন্থীদের হাতকে তারা শক্ত করবে। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ এর মধ্যে দিয়ে চলেছে। একদিকে রয়েছে স্বার্থপর দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদদের দল যারা সকাল বিকেল জার্সি বদল করে চলে নিজেদের ব্যবসা-বাণিজ্যকে রক্ষা করার জন্য। এরা কোনো আদর্শের প্রতি বিশ্বাসী নয়।
অন্যদিকে, বিরাজ করে গোড়া ধর্মীয় মেরুকরণে বিশ্বাসী সাম্প্রদায়িক দলগুলি। এরই মধ্যে সংবিধান এবং গণতন্ত্রকে রক্ষা করার জন্য বৃহত্তর নিরবিচ্ছিন্ন গণআন্দোলনের পথে রাজ্যকে এগিয়ে নিয়ে যাবে বামপন্থীরা। উচ্ছেদ বিরোধী আন্দোলন তারই শুভ সূচনা। সামাজিক মাধ্যমে সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বরা এবং চৌঠা মে দুপুর সাড়ে বারোটার পর জার্সি বদল করা বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক এবং নেতা-নেত্রীরা বামপন্থীদের সেকু মাকু বলে কটাক্ষ করলেও দিনের শেষে শ্রমজীবী মানুষের ভরসার শেষ সম্বল হয়ে উঠবে সিপিআইএম।
(লেখকের মতামত ব্যক্তিগত)









