EXCLUSIVE: ১৪ জনকে হারাতে চেয়েছিল ক্যামাক স্ট্রিট, তালিকায় প্রথম মমতা: ঋতব্রত
Ritabrata Banerjee: তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরেই ১৪ জনকে নির্বাচনে হারিয়ে দেওয়ার তালিকা তৈরি হয়েছিল। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি অনুযায়ী, সেই তালিকায় প্রথম নাম ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। আর কারা ছিলেন ওই তালিকায়? নির্দেশ এসেছিল কোথা থেকে?
গত বিধানসভা ভোটে তৃণমূলের ১৪ জনকে হারিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। অভিষেকের ক্যামাক স্ট্রিটের দফতর সেই ১৪ জনের তালিকা তৈরি করেছিল। এমনই দাবি করলেন অধুনা রাজ্যের বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। বস্তুত, তাঁর দাবি, সেই তালিকায় প্রথম নামটি ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের! ঋতব্রতের বক্তব্য, সেই তালিকাটি তাঁর কাছে রয়েছে।
তা হলে কি তৃণমূলের অন্দরে 'প্যালেস ক্যু্' ঘটানোর পরিকল্পনা করেছিল অভিষেক শিবির?
বিরোধী দলনেতার দাবি, একেবারেই তাই! তাঁর কথার মর্মার্থ, মুখ্যমন্ত্রী তথা ভবানীপুরের প্রার্থী মমতাকে ভোটে হারিয়ে দল এবং সরকারের রাশ পুরোপুরি নিজের হাতে নিতে চেয়েছিলেন তাঁর ভাইপো তথা তৃণমূলের 'সেনাপতি' অভিষেক।
ইনস্ক্রিপ্টের পডকাস্ট ‘অনিন্দ্য এবং’-এ এমন বিবিধ বিস্ফোরক দাবি করেছেন ঋতব্রত। বলেছেন, তিনি যা যা বলছেন, যে সমস্ত অভিযোগ করছেন, তার প্রতিটির সাপেক্ষে তাঁর কাছে তথ্যপ্রমাণ রয়েছে। দরকার হলে তিনি আদালতেও তা পেশ করতে পারেন।
শুধু দলের প্রার্থীদের হারানোই নয়, ভোটের দিন সেইসমস্ত প্রার্থীর এজেন্টদের বুথে ঢুকতে না দেওয়া, ইচ্ছাকৃত ভাবে ভুল সই করানো, এমনকী নির্বাচনের আগে দলের ‘মোস্ট ইম্পর্টেন্ট’ কয়েকজনকে ‘আন্ডারগ্রাউন্ড’ করে দেওয়ার অভিযোগও তুলেছেন তিনি।
ঋতব্রতের কথায়, গোটা প্রক্রিয়াটির মধ্যে একটি নির্দিষ্ট ‘প্যাটার্ন’ রয়েছে। নির্বাচনে দলের টিকিট দেওয়ার পরই যদি কোনো প্রার্থীকে হারানোর পরিকল্পনা থাকে, তাহলে সেই টিকিট দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
কেন তিনি বিরোধী শিবিরে গেলেন? ঋতব্রতের বক্তব্য অনুযায়ী, ১৯ তারিখ কালীঘাটের দলীয় বৈঠকে একটা বাদানুবাদ হয়। তা পর ২০ তারিখ তিনি বিধানসভা ভবনে মুখ খোলেন। তাঁর কথায়,
আমি এটা বুঝেছিলাম। আমি যেখানে জিতেছি, আমি সেখানে মাত্র ৩০, ৩২ দিন ৩৫ দিন যেতে পেরেছি।
তিনি আরও বলেন,
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Ritabrata Banerjee: ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে কেন একনাথ শিন্ডে ও অজিত পাওয়ারের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে? বিদ্রোহী বিধায়কদের সমর্থনের দাবি কি তৃণমূলে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে? নাকি এটি শুধুই দলীয় অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ? মহারাষ্ট্রের মতো পরিস্থিতি কি সত্যিই পশ্চিমবঙ্গেও তৈরি হতে পারে?
একটা ১২-১৪ জনের তালিকা করা হয়েছিল হারিয়ে দিতে হবে। আমিও তাঁদের মধ্যে ছিলাম। এই ১৪ জনের মধ্যে দু'জন জিতেছেন। এই ১৪ জনের তালিকায় মন্টুরাম পাখিরা—চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য, অরূপ বিশ্বাস, অরুণাভ সেন ছিলেন। আমিও ছিলাম। ফিরহাদ হাকিমের নাম এই তালিকায় ছিল না। এই লিস্টের প্রথম নাম কিন্তু ডক্টর মমতা বন্দোপাধ্যায়।
এরপরেই বিস্ফোরক ঋতব্রত,
এগুলো ওখান (ক্যামাক স্ট্রিট) থেকেই করা।
ঋতব্রতে এও বলেন, প্রথম কয়েকদিন তাঁকে বিধানসভা কেন্দ্রে ঢুকতেই দেওয়া হয়নি। তাঁর কথায়,
আমায় প্রথম ৩ দিন ঢুকতে দেওয়া হয়নি। নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, আমায় হারিয়ে দেওয়ার।
এই অভিযোগের সঙ্গে ভোটের দিনের ঘটনাকেও যুক্ত করেছেন ঋতব্রত। তিনি বলেন,
নির্দিষ্ট তথ্য প্রমাণ রয়েছে। ভোটের দিন আমার কোনো এজেন্ট এলাকায় যেতে পারেনি। ইচ্ছাকৃত জাল সই করানো হয়েছে।
তাঁর দাবি, এর পিছনে ছিল 'গূঢ় ষড়যন্ত্র।'
ঋতব্রত উল্লেখ করেন,
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Trinamool Congress: ৫০-এর বেশি বিধায়কের সমর্থনে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়দের নতুন সমীকরণ স্পষ্ট করে দিল, দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত আর সকলের কাছে শেষ কথা নয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্ব, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভবিষ্যৎ এবং তৃণমূলের প্রকৃত ক্ষমতার কেন্দ্র কোথায়, সেই প্রশ্নই এখন রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে।
এই ১৪ জনের মধ্যে ১২ জন পরাজিত হয়েছেন। আমি এবং অরুণাভ সেন জিতেছি।
সম্পূর্ণ পডকাস্টের লিঙ্ক:
একই সঙ্গে তিনি প্রশ্ন তোলেন, নির্বাচনে একটি আসনও যদি গুরুত্বপূর্ণ হয়, তাহলে কাউকে টিকিট দিয়ে তাঁকে হারানোর পরিকল্পনা কেন থাকবে! তাঁর বক্তব্য,
নির্বাচনে যদি একটি আসনও গুরুত্বপূর্ণ হয়, তাহলে এই ১৪ জনকে টিকিট দিলে কেন? আচ্ছা, ওঁকে (মমতা) বাদ দিলে তো ওই ১৩ জনকে টিকিট দেওয়ারও দরকার ছিল না। তুমি টিকিট দিয়ে আবার তাকেই হারিয়ে দিতে চাইছ! ইউ আর কনফিডেন্ট, যে তুমি ২০০-র বেশি সিট পাবে। অথচ ৮০-তে আটকে গিয়েছ। সেই জয়ীদের মধ্যে যাঁদের হারিয়ে দিতে চেয়েছ, সেই তালিকার এমন দু’জনও আছেন।
নির্বাচনের আগে এবং পরে ঘটনাপ্রবাহের মধ্যেও যোগসূত্র রয়েছে বলে দাবি করেছেন ঋতব্রত। তিনি বলেন,
ভোটের আগে যখন বিষয়টি সামনে এল, তখন বলা হয়েছিল, এটা উপরমহলের পরিকল্পনা অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন করছে।
এর পরেই তিনি তাঁর ভোটের কাজে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ কয়েকজনের প্রসঙ্গ তোলেন। তাঁর কথায়,
আমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চারজন লোক আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে গেল। তাদের মধ্যে দু’জন আমার পরিকল্পনার দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
ঋতব্রতের দাবি, পরে একটি নির্দিষ্ট সূত্রে তিনি ওই চারজনকে গ্রেফতার করার নির্দেশ নিয়েও জানতে পারেন। তিনি বলেন,
পরে দেখেছি, পরপর সেই চারজনের নামই উঠে আসছে—যাদের গ্রেফতার করতে হবে। ক্যামাক স্ট্রিট থেকেই সেই নির্দেশ গিয়েছে।
অন্যদিকে, ঋতব্রত জানান, তৃণমূলের প্রতীক পাওয়ার বিষয়ে তিনি কিছু নথির জন্য অপেক্ষা করছেন। তাঁর কথায়,
আমি কিছু তথ্যের জন্য অপেক্ষা করছি—বিশেষ করে রাজনৈতিক দলের রেজিস্ট্রেশন সংক্রান্ত তথ্য। যেহেতু গত দু’দিন আমি দিল্লিতে ছিলাম, তাই তথ্যটা আজকে পাইনি। তবে আমি অবশ্যই দিয়ে দেব। এই বিষয়গুলোয় আমি খুব সতর্ক ও খুঁতখুঁতে।
ঋতব্রতের বক্তব্যে শুধু নির্বাচনে প্রার্থী হারানোর অভিযোগই নেই, টিকিট বণ্টনের সময় দলের ভিতরে কী ধরনের বার্তা দেওয়া হয়েছিল, সেই প্রশ্নও রয়েছে। তবে রাজনৈতিক দলের রেজিস্ট্রেশন সংক্রান্ত নথি হাতে পাওয়ার পর তিনি আরও তথ্য দেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
সম্প্রতি তৃণমূল কংগ্রেসের নাম ও নির্বাচন চিহ্ন নিয়ে নতুন করে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল। নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দুই প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরের জন্য পৃথক নাম ও প্রতীক নির্ধারণ করা হয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠী আগামী নির্বাচনে ‘মমতা অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ নামে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে এবং তাদের প্রতীক ‘ফুটবল প্লেয়ার’। অন্যদিকে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠীর নাম ‘ডেমোক্রেটিক তৃণমূল কংগ্রেস’ এবং তাদের প্রতীক ‘খাম’।
তৃণমূল কংগ্রেসের ঐতিহ্যবাহী ‘ঘাসের উপর জোড়াফুল’ প্রতীক এবং ‘অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ নামের অধিকার নিয়েই মূল বিরোধ তৈরি হয়েছিল। দু'পক্ষকে আলোচনার জন্য ডাকার পর কমিশন ‘ঘাসের উপরে জোড়াফুল’ প্রতীকটি স্থগিত রাখে এবং আপাতত কোনো পক্ষই ‘অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম ব্যবহার করতে পারবে না বলে জানায়। এরপর দু'পক্ষের কাছ থেকে বিকল্প নাম ও প্রতীকের প্রস্তাব চাওয়া হয়। সেই প্রস্তাবের ভিত্তিতেই নতুন নাম ও প্রতীক ঘোষণা করা হয়েছে।
এই রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নন্দীগ্রাম সিদ্ধান্তও সামনে এসেছে। মমতা মনোনীত প্রার্থী সঞ্চিতা দে শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে সাক্ষাতের পর নন্দীগ্রাম থেকে মনোনয়ন প্রত্যাহার করেন। এরপর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নন্দীগ্রামে কংগ্রেস প্রার্থীকে সমর্থনের কথা জানান এবং রেজিনগর নিয়ে পরে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলেন। এর পরেই কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানকে একটি পুরোনো হত্যার অভিযোগের মামলায় গ্রেফতার করা হয়।
এই গোটা রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘১৪ জনের তালিকা’র দাবি নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে দলের ভিতরের রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে। তবে তাঁর পডকাস্টে করা অভিযোগগুলির পাশাপাশি তিনি যে নথির কথা বলেছেন, সেই নথি প্রকাশ্যে এলে তাঁর দাবিগুলির ভিত্তি নিয়ে আরও স্পষ্ট ছবি পাওয়া যেতে পারে।








