সাধারণ স্কুল শিক্ষিকা থেকে রাষ্ট্রপতির দৌড়ে, আদিবাসী নেত্রী দ্রৌপদী মুর্মুর যাত্রা সহজ ছিল না

আসন্ন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে সরগরম হয়ে উঠেছে জাতীয় রাজনীতি। রামনাথ কোবিন্দের পর কে হতে চলেছেন ভারতের পরের রাষ্ট্রপতি, সেই নিয়ে জল্পনা তুঙ্গে। মঙ্গলবারই বিরোধী জোটের তরফ থেকে যশবন্ত সিনহাকে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। তবে বিজেপি জোট এনডিএ-র তরফ থেকে কে রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী হবেন, সেই নিয়ে অনেকদিন ধরেই আলোচনা চলছিল। বিজেপির প্রার্থী তালিকায় চর্চিত ছিল দু'টি নাম- কেরালার রাজ্যপাল আরিফ মহম্মদ খান, এবং ঝাড়খণ্ডের প্রাক্তন রাজ্যপাল দ্রৌপদী মুর্মু।

এই নিয়ে মঙ্গলবার বিজেপি শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। আর এরপরেই এনডিএ জোট গ্রহণ করল একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত। হিন্দু-দলিত রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দের পর এবার বিজেপির তরফ থেকে রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী হতে চলেছেন একজন আদিবাসী মহিলা নেত্রী। সাংবাদিক বৈঠকে জেপি নাড্ডা বিজেপি রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেন ঝাড়খণ্ডের প্রাক্তন রাজ্যপাল দ্রৌপদী মুর্মুর নাম। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে এই প্রথম কোনও আদিবাসী মহিলা নেত্রীকে প্রার্থী করেছে বিজেপি। আর যদি তিনি যশবন্ত সিনহাকে পরাজিত করতে পারেন, তাহলে ভারত পাবে দেশের প্রথম আদিবাসী মহিলা রাষ্ট্রপতি।

রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী হিসেবে নাম ঘোষণার পরেই সরাসরি সারা দেশের লাইমলাইট গিয়ে পড়ে দ্রৌপদী মুর্মুর ওপর। জেপি নাড্ডা বলেন, জোট-শরিকদের সঙ্গে আলোচনায় সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে ২০ জনের নাম এসেছিল। শেষ পর্যন্ত দ্রৌপদীর নাম চূড়ান্ত হয়েছে। কিন্তু কে এই দ্রৌপদী মুর্মু? সাধারণ একটি স্কুলের শিক্ষিকা থেকে কীভাবে তিনি হয়ে উঠলেন বিজেপির রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী? কীরকম ছিল তাঁর রাজনৈতিক জীবন?

আরও পড়ুন: রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগে ২০২৪-এর জন্য বিজেপিকে যে বড় চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলেন মমতা

কে এই দ্রৌপদী মুর্মু?
আদিবাসী নেত্রী দ্রৌপদী মুর্মুর জন্য ভারতীয় জনতা পার্টির রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী হয়ে ওঠার পথটা খুব একটা সহজ কোনওদিনই ছিল না। সাধারণ একটি স্কুলের শিক্ষিকা থেকে রাজনীতিতে পদার্পণ, এই যাত্রাপথটা ছিল যথেষ্ট দুর্গম। ২০ জুন, ১৯৫৮ সালে ওড়িশার ময়ূরভঞ্জ আদিবাসী জেলার বাইদাপসি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন দ্রৌপদী মুর্মু। তিনি ছিলেন আদিবাসী সাঁওতাল পরিবারের একজন মেয়ে। তাঁর বাবার নাম ছিল বিরিঞ্চি নারায়ণ টুডু।

কর্মজীবন
ওড়িশার ভুবনেশ্বরের রমাদেবী উইমেন্স কলেজ থেকে স্নাতক হওয়ার পর চাকরিতে যোগদান দ্রৌপদী মুর্মু-র। তিনি কলা বিভাগে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। তারপরেই উড়িষ্যা সরকারের সেচ এবং জলবিদ্যুৎ বিভাগে একজন জুনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট অর্থাৎ ক্লার্ক হিসেবে নিজের কর্মজীবন শুরু করেন দ্রৌপদী মুর্মু। কিন্তু সেই চাকরিটা খুব একটা ভালো লাগেনি তাঁর। এর পরেই উড়িষ্যার রাইরাংপুর জেলায় স্থিত অরবিন্দ ইন্টিগ্রাল এডুকেশন সেন্টারে একজন সহকারী শিক্ষক হিসেবে কাজ করতে শুরু করেন দ্রৌপদী।

স্বামী এবং দুই ছেলেকে হারিয়েছেন দ্রৌপদী

কর্মজীবন এবং রাজনৈতিক জীবন ভালো হলেও ব্যক্তিগত জীবনে অনেক সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিলেন দ্রৌপদী মুর্মু। শ্যামচরণ মুর্মুর সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়েছিল এবং তাঁদের তিনজন সন্তান হয়। এদের মধ্যে দু'জন পুত্রসন্তান এবং একজন কন্যা। কিন্তু, তাঁর ব্যক্তিগত জীবন কখনওই সুখের ছিল না। খুব কম বয়সেই নিজের স্বামী এবং দুই ছেলেকে হারিয়েছিলেন দ্রৌপদী। তাঁর কন্যার নাম ইতিশ্রী মুর্মু। জানা গিয়েছে, তাঁর কন্যার বিবাহ হয়েছে গণেশ হেমব্রমের সঙ্গে।

Draupadi Murmu Timeline

বিজেপি-তে যোগদান

১৯৯৭ সালে সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে আসার সিদ্ধান্ত নেন দ্রৌপদী মুর্মু। সেই সময় আদিবাসী মহিলা নেত্রী হিসেবে রাজনীতিতে আসা খুব একটা সহজ বিষয় ছিল না। কিন্তু তিনি তৎকালীন সময় অটলবিহারী বাজপায়ীর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে যোগদান করেন ভারতীয় জনতা পার্টিতে। সেই বছরই উড়িষ্যার রাইরাংপুর অঞ্চলের কাউন্সিলর এবং ওই এলাকার ভাইস চেয়ারপার্সন হিসেবে নির্বাচিত হলেন দ্রৌপদী। একটা সময় বিজেপির তফশিলি উপজাতি মোর্চার ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন দ্রৌপদী মুর্মু। দলীয় সূত্রে খবর, দক্ষতাঁর সঙ্গেই নিজের সময়ে সংগঠন সামলেছেন দ্রৌপদী।

উড়িষ্যা সরকারের মন্ত্রিত্ব

২০০০ সালের উড়িষ্যা বিধানসভা নির্বাচন ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম একটি মোড়-ঘোরানো সময়। সেবার নবীন পট্টনায়কের বিজু জনতা দল এবং ভারতীয় জনতা পার্টি একসঙ্গে উড়িষ্যার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল। সেই নির্বাচনের রাইরংপুর এলাকা থেকে নির্বাচিত হয়ে নবীন পট্টনায়কের নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন দ্রৌপদী। ২০০০ থেকে ২০০৪ পর্যন্ত সময়কালে বেশ কিছু মন্ত্রিত্ব দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করেছেন তিনি। ৬ মার্চ, ২০০০ থেকে ৬ আগস্ট, ২০০২ পর্যন্ত তিনি ছিলেন বাণিজ্য এবং পরিবহণ মন্ত্রী। ৬ আগস্ট, ২০০২ থেকে ১৬ মে, ২০০৪ পর্যন্ত মৎস্য এবং প্রাণীসম্পদ উন্নয়নের স্বতন্ত্র দায়িত্বে রাজ্য মন্ত্রী ছিলেন তিনি।

২০০৪ সালেও বিজেপি এবং বিজেডি সরকারের একজন গুরুত্বপূর্ণ বিধায়ক ছিলেন তিনি। নিজের বিধানসভা এলাকায় ভালো কাজ করার জন্য তাঁর সুখ্যাতি ছিল সম্পূর্ণ উড়িষ্যায়। ময়ুরভঞ্জের বিজেপি ইউনিটের সভাপতির দায়িত্বও সামলেছেন একটা সময়ে। মন্ত্রিত্ব এবং বিধায়ক পদ থাকলেও সব সময় তিনি দলের প্রতি ছিলেন নিষ্ঠাবান। ২০০৬ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত সময়কালে বিজেপি উড়িষ্যার তফশিলি জাতি এবং উপজাতি মোর্চার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব সামলেছেন দ্রৌপদী।

জোট ভেঙে গেলেও জিতেছিলেন নির্বাচনে

২০০৯ সালের বিধানসভা নির্বাচনের সময় ভারতীয় জনতা পার্টি এবং বিজু জনতা দলের মধ্যে জোট ভেঙে গেলেও দ্রৌপদী মুর্মু কিন্তু নিজের আসন টিকিয়ে রাখতে পেরেছিলেন। নিজের বিধানসভা এলাকায় সুখ্যাতি থাকার কারণে এলাকার মানুষ তাকে আরও একবার নির্বাচিত করেন বিধায়ক হিসেবে। বিজু জনতা দল বিধানসভা নির্বাচনে জয়লাভ করলেও, রাইরংপুর এলাকার আসনটি ধরে রেখেছিলেন দ্রৌপদী।

ছিলেন 'সর্বশ্রেষ্ঠ বিধায়ক'

উড়িষ্যা বিধানসভায় যাঁরা বছরের সর্বশ্রেষ্ঠ বিধায়ক থাকেন, তাঁদের একটি বিশেষ পুরস্কারে ভূষিত করে উড়িষ্যা সরকার। ২০০৭ সালে বছরের স্টার পারফরমার হিসেবে উড়িষ্যা সরকারের তরফ থেকে 'নীলকণ্ঠ পুরস্কারে' ভূষিত হয়েছিলেন দ্রৌপদী মুর্মু। সেই বছরের সেরা বিধায়ক হওয়ার কারণে তাঁকে এই পুরস্কার প্রদান করেছিল উড়িষ্যা সরকার।

বিজেপির গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন দীর্ঘদিন

দ্রৌপদী মুর্মু ভারতীয় জনতা পার্টির উড়িষ্যা রাজ্যের সংগঠনের একটা বড় মুখ ছিলেন একটা দীর্ঘ সময় পর্যন্ত। ভারতীয় জনতা পার্টির জনজাতি মোর্চার উপাধ্যক্ষ এবং অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব সামলেছেন দ্রৌপদী। ২০১৩ সালে বিজেপির রাষ্ট্রীয় মোর্চা-র সদস্য হিসেবে মনোনীত হয়েছিলেন দ্রৌপদী মুর্মু। বিজেপি তফশিলি জাতি এবং উপজাতি অংশের রাষ্ট্রীয় কার্যকারিণী হিসেবে ২ বছর দায়িত্ব সামলেছেন দ্রৌপদী।

ছিলেন ঝাড়খণ্ডের রাজ্যপাল

২০১৫ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার থাকাকালীন ঝাড়খণ্ডের প্রথম মহিলা রাজ্যপাল হিসেবে মনোনীত হয়েছিলেন তিনি। ১৮ মে, ২০১৫ থেকে শুরু করে ১২ জুলাই, ২০২১ পর্যন্ত ঝাড়খণ্ডের রাজ্যপাল ছিলেন তিনি। তিনি ঝাড়খণ্ডের নবম রাজ্যপাল ছিলেন এবং পেয়েছিলেন ঝাড়খণ্ডের প্রথম রাজ্যপালের মর্যাদা, যিনি পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্ণ করতে পেরেছিলেন।

গন্তব্য রাইসিনা হিল

এই বছরই যে প্রথম তাঁর নাম রাষ্ট্রপতি তালিকায় উঠে এসেছে, তা কিন্তু নয়। এর আগেও, ২০১৭ সালে রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী হিসেবে তাঁর নাম উঠে এসেছিল বিজেপি-র তালিকায়। কিন্তু সেই সময় বিহারের তৎকালীন রাজ্যপাল রামনাথ কোবিন্দকে বেছে নিয়েছিল কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন জোট। তবে এবার তেমনটা হয়নি। ২০২২ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য বিজেপির পদপ্রার্থী হিসেবে উঠে এসেছে তাঁর নাম। এবার তাঁর গন্তব্য হতে পারে রাইসিনা হিল। রাষ্ট্রপতি পদে বিরোধীদের প্রার্থী যশবন্ত সিনহাকে পরাজিত করতে পারলেই দ্রৌপদী হয়ে উঠবেন দেশের প্রথম আদিবাসী মহিলা রাষ্ট্রপতি। পাশাপাশি তিনি হবেন ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি, যিনি ভারতের স্বাধীনতার পর জন্মগ্রহণ করেছেন।

সম্ভাবনা কতটা?
প্রাথমিক হিসেব অনুযায়ী, ১৮টি বিরোধী দল সমর্থিত প্রার্থী যশবন্ত সিনহা-র থেকে রাষ্ট্রপতি হওয়ার দৌড়ে বেশ অনেকটাই এগিয়ে রয়েছেন দ্রৌপদী মুর্মু। উপজাতি সম্প্রদায় প্রতিনিধি হওয়ার কারণে প্রথম থেকেই প্রার্থী হিসেবে তাঁর নাম ভাসছিল। উপজাতি গোষ্ঠীর কেউ রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হলে রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ঝাড়খণ্ড, তেলেঙ্গানা, জম্মু-কাশ্মীর এবং উত্তর-পূর্ব ভারতে জনগোষ্ঠীর সমর্থন বিজেপির দিকে যেতে পারে বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।

পাশাপাশি উত্তরপ্রদেশ-সহ বেশ কয়েকটি রাজ্যে গত নির্বাচনে গেরুয়া শিবির বিপুল সমর্থন পেয়েছে। অন্যদিকে, আর দু'বছর পরেই হতে চলেছে লোকসভা নির্বাচন। সেক্ষেত্রে যদি রাষ্ট্রপতি হিসেবে কোনও মহিলাকে বিজেপি বেছে নেয়, তাহলে তাদের জন্য বড় বার্তা দেওয়া হবে বলে মনে করা হচ্ছে। পাশাপাশি, আদিবাসী ভোটের একটা বড় অংশ বিজেপির দিকে যেতে পারে এই সিদ্ধান্তে। এই বিষয়টা বিরোধী দলের নেতা-মন্ত্রীরাও ভালোই বুঝতে পারছেন। পাশাপাশি, মহিলাদের ব্যাপক সমর্থনও প্রাপ্তি করবে গেরুয়া শিবির। সেক্ষেত্রে বিষয়টি ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনের আগে গেরুয়া শিবিরকে কয়েক ধাপ এগিয়ে রাখবে বলে মনে করছে অভিজ্ঞ মহল।

অন্যদিকে, এই পদক্ষেপের ফলে বিজেপির 'নিম্নবর্গের পরিপন্থী' তকমাটাও অনেকাংশে ঘুচতে পারে। এর আগে ২০১৭ সালে হিন্দু-দলিত নেতা রামনাথ কোবিন্দকে রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী করার ফলে উত্তরপ্রদেশের নির্বাচনে হিন্দু-দলিতদের প্রতি একটা ইতিবাচক বার্তা দিতে পেরেছিল বিজেপি। পরবর্তী বিধানসভা নির্বাচনে তাঁর ফলও ভালোভাবেই উসুল করেছে শাসক দল। তাই এবার যদি দ্রৌপদী মুর্মু রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন, তাহলে আদিবাসী-অধ্যুষিত এলাকায় অনেকটাই সমর্থন লাভ করতে পারে বিজেপি। ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনের আগে বিজেপির জন্য এই বিষয়টা বেশি লাভজনক হবে বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।

More Articles

;