রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগে ২০২৪-এর জন্য বিজেপিকে যে বড় চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলেন মমতা

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিরোধী শিবিরের জয়-পরাজয় যাইই হোক, ২০২৪-এর আগেই বিজেপির ঘুম উড়িয়ে দিতে সফল হয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দুরন্ত স্ট্র্যাটেজি।

Kanad Dasgupta
৩ মিনিট
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগে ২০২৪-এর জন্য বিজেপিকে যে বড় চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলেন মমতা

শুধু বাংলায় নয়, এবার জাতীয় স্তরেও বিজেপিকে লড়তে হবে সেই তৃণমূলের সঙ্গেই। এক ঢিলে একাধিক পাখি মেরে তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গেরুয়া শিবিরকে এই বার্তাই দিতে পেরেছেন।

প্রথমে শত্রুঘ্ন সিনহা, এবার যশবন্ত সিনহা। তৃণমূল কংগ্রেসের গায়ে এতদিন সেঁটে ছিল আঞ্চলিক দলের লেবেল। কিছুদিন আগে আসানসোল লোকসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনে 'বিহারি বাবু' শত্রুঘ্ন সিনহাকে প্রার্থী করে হিন্দি বলয়ে পা রেখেছিল তৃণমূল‌। এবার দেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিরোধী দলের প্রার্থী হিসেবে তৃণমূল কংগ্রেসের সদ্য-প্রাক্তন সহ-সভাপতি, পূর্বতন বিহার, বর্তমান ঝাড়খণ্ডের যশবন্ত সিনহার নাম প্রস্তাব করে মাস্টারস্ট্রোক দিয়েছিলেন তৃণমূল নেত্রী‌। মমতার প্রস্তাবেই সিলমোহর লাগিয়েছেন বিরোধী নেতারা। ফলে এবার দেশের হিন্দিভাষী এলাকায় তৃণমূলের অবাধ বিচরণের পথ আরও প্রশস্ত হয়ে গেল। হিন্দি বলয়ের সেন্টিমেন্টকে মর্যাদা দিয়ে তৃণমূল এখন প্রকৃত অর্থেই জাতীয় দল। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ফল যাই-ই হোক, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই দূরদর্শিতার প্রভাব ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে পড়তে বাধ্য। আর ঠিক সেই কারণেই বিজেপির কপালের ভাঁজের সংখ্যা এক ধাক্কায় অনেকটাই বেড়ে যেতে পারে।

উড়িষ্যার ময়ুরভঞ্জ জেলার বাইদাপোসি গ্রামের দ্রৌপদী মুর্মুকে প্রার্থী করে বিজেপি কৌশলে সম্ভবত টেনে নেবে নবীন পট্টনায়কের বিজেডি-র সমর্থন ৷ উড়িষ্যায় যখন ভারতীয় জনতা পার্টি এবং বিজু জনতা দলের জোট সরকার ছিল, সেসময় দ্রৌপদী মুর্মু মন্ত্রী ছিলেন। হয়তো পাশের রাজ্য ঝাড়খণ্ডে বিজেপি-বিরোধী হেমন্ত সোরেনের ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চার আংশিক সমর্থনও হাতিয়ে নিতে পারে বিজেপি তথা এনডিএ। কারণ, ২০১৫ থেকে ২০২১ পর্যন্ত ঝাড়খণ্ডের প্রথম মহিলা রাজ্যপাল ছিলেন দ্রৌপদী মুর্মু। ঝাড়খণ্ডের সরকারের সঙ্গে তাঁর তেমন বিরোধও ছিল না। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটমূল্যে এখনও পিছিয়ে থাকা বিজেপি হয়তো এই সম্ভাবনার কথা মাথায় রেখেই দ্রৌপদী মুর্মুকে প্রার্থী করে জুয়া খেলতে নেমেছে। রাইসিনা হিলসের দখলদারির দৌড়ে বিজেপি ও তার সহযোগীদের ভোট ৪৮.৯ শতাংশ। সেখানে বিরোধীদের ভোট ৫১.১ শতাংশ। বিরোধীরা এক হলে সমস্যায় পড়তে পারে বিজেপি। তাই সুকৌশলে প্রার্থী বাছাই করেছেন মোদি-শাহ-নাড্ডা। বিরোধী শিবিরের ভোট ম্যানেজ করতে তাই আসরে নামানো হয়েছে দ্রৌপদী মুর্মুকে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
কে হবেন রাষ্ট্রপতি! বিরোধী ঐক্যের সর্পছিদ্রই বিজেপির পোয়াবারো?

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিরোধী শিবিরের সর্বসম্মত প্রার্থী স্থির করতে বিভিন্ন বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাদের ও মুখ্যমন্ত্রীদের চিঠি লিখেছেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

কিন্তু রাষ্ট্রপতি নির্বাচনই তো শেষ নয়। ২০২৪-এর লোকসভা ভোটেও লড়তে হবে বিজেপিকে। দেশের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী যশবন্ত সিনহাকে প্রার্থী করে হিন্দি বলয় তথা গো-বলয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এভাবে ঢুকে পড়ার মধ্যে তাই সিঁদুরে মেঘ দেখছে গেরুয়া শিবির‍।

বিজেপির বিপদ আরও আছে। আপাতত দু'টি বিপদের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের দলের সহ-সভাপতির নাম রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী হিসেবে প্রস্তাব করেছিলেন। দেশের বিজেপি- বিরোধী দলগুলি একবাক্যে তৃণমূল কংগ্রেসের ওই পদাধিকারীকেই প্রার্থী হিসেবে মেনে নিয়েছে। এর ফলে জাতীয় স্তরে এমন এক বার্তা গেছে, যা বিজেপির রক্তচাপ বাড়িয়ে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। এটা স্পষ্ট হয়েছে, বিরোধী নেত্রী হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ইতিমধ্যেই নিজেকে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পেরেছেন। তৃণমূল কংগ্রেসের এক জাতীয় স্তরের নেতাকে প্রার্থী হিসেবে সমস্ত বিরোধী রাজনৈতিক দল মেনে নিয়েছে, বিরোধী দলগুলি তাঁকেই ভোট দেবে, বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে দেশের বিরোধী শিবিরের মুখ তৃণমূল কংগ্রেসের এক নেতা। এইখানেই বিজেপির দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে হই হই করে জিতে গিয়েছেন তৃণমূল নেত্রী। মমতা বুঝিয়ে ছেড়েছেন, জাতীয় স্তরেও বিজেপির প্রধান প্রতিপক্ষ তৃণমূলই।

বিজেপির দ্বিতীয় বড় বিপদ, রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়ায় স্পষ্ট ধরা পড়েছে কংগ্রেসের চেয়ারপার্সন সোনিয়া গান্ধী বিরোধী নেত্রীর ভূমিকায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কতখানি পছন্দ এবং ভরসা করেন। বিরোধী দলের দু'দফার বৈঠকে একবারও কংগ্রেস নিজেদের প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করেনি। অথচ করার সুযোগ ছিল। কিন্তু সোনিয়া গান্ধীর ধারণা হয়েছে, একমাত্র মমতার হাতে নেতৃত্ব থাকলেই বিজেপিকে শক্ত চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়াতে হবে। ফলে প্রার্থী চূড়ান্ত করার বিষয়ে কংগ্রেস মমতার মতামতকেই গুরুত্ব দিয়েছেন প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত। বিজেপি আশা করেনি কংগ্রেস ও তৃণমূলের মিলমিশ এতখানি মসৃণ হবে। মমতাকে সামনে রেখে বিরোধীদের এই সহমত হওয়া কখনওই সম্ভবপর ছিল না, যদি কংগ্রেস নিজেদের প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করে বসত। সেই সুযোগটাই খুঁজছিল বিজেপি। কিন্তু সোনিয়া গান্ধীর পরিণত ভাবনা, বিজেপিকে হতাশ করেছে। মমতাও কৌশলগত কারণে যথাযথ মর্যাদা দিয়েছেন কংগ্রেসকে। এর ফলে গেরুয়া শিবিরের ওই 'কংগ্রেসমুক্ত ভারত' গড়ার স্বপ্নও খানিকটা কষ্টকল্পনাই হয়ে পড়ল।

সব মিলিয়ে এটাই দাঁড়িয়েছে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিরোধী শিবিরের জয়-পরাজয় যাইই হোক, ২০২৪-এর আগেই বিজেপির ঘুম উড়িয়ে দিতে সফল হয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দুরন্ত স্ট্র্যাটেজি। আর একই সঙ্গে দেশের বিরোধী শিবির এখনই পেয়ে গেছে বিজেপিকে বধ করার হাতিয়ার, যে অস্ত্রটিকে গেরুয়া শিবির চেনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নামে।

লিখেছেন
Kanad Dasgupta
Kanad Dasgupta
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

‘সব নির্বাচনেই কারচুপি’, কেন এমন দাবি রাহুল গান্ধীর?

Rahul Gandhi election rigging claim: রাহুল গান্ধী কেন দাবি করলেন, ভারতের সব নির্বাচনেই কারচুপি হচ্ছে? নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে কী প্রশ্ন তুলেছেন তিনি? সরকারবিরোধী মনোভাব বা অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি কীভাবে ভোটের রাজনীতিতে কাজ করে? তাঁর অভিযোগের পক্ষে কী কী তথ্য ও প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে?

সিজেপির তিন দাবি, জ্ঞানেশ কুমার না সরলে ফের বড় আন্দোলন

Election Commission of India: নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতি এবং ২০২৩ সালের আইনের বৈধতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানিয়েছে সিজেপি। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, নির্বাচন প্রক্রিয়া স্থগিত করা এবং ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত আইন প্রত্যাহার।

থানার গেটেই মারধর প্রাক্তন আইপিএস হুমায়ুন কবীরকে, সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ?

Humayun Kabir: ঘটনার পর এখনও পর্যন্ত তিনি কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেননি বলেও জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তখন অভিযোগ করা সম্ভব হয়নি। সুস্থ হয়ে তিনি লিখিত অভিযোগ করবেন।

দুই কমিশনারের আপত্তিতে ফের আলোচনায় সীমা খান্না, কমিশনে ঠিক কী দায়িত্ব তাঁর?

Seema Khanna and ECINet: ভোটার তালিকা ও ইসিআইনেট (ECINet) নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তিতে সামনে এসেছে আইটি বিভাগের ভূমিকা এবং ডিরেক্টর জেনারেল (IT) সীমা খান্নার নাম। কে এই সীমা খান্না? নির্বাচন কমিশনে তাঁর দায়িত্ব কী? ভোটার তালিকা পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা নিয়েই বা কেন উঠছে প্রশ্ন?

সরকারকে ৪ দিনের সময়সীমা বেধে দিল চা-শ্রমিকরা, ঠিক কী কী দাবি?

Dooars tea workers: ২২ সেপ্টেম্বর বকেয়া মজুরি ও অন্যান্য পাওনা মেটানোর দাবিতে হাঁটাপাড়া, ধুমচিপাড়া ও গারগান্ডার চা-শ্রমিকরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পদযাত্রা শুরু করেন। একই দিনে তোর্সার প্রস্তাবিত ল্যান্ড পোর্ট প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষও জমি ও অধিকার রক্ষার দাবিতে পদযাত্রা করেন। দুই পদযাত্রাই পুলিশ আটকে দেয়।

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।

এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই আপত্তি, ১০ মাসে দুই কমিশনারের ১৪ বার প্রশ্ন

Election Commission SIR: এসআইআর ঘিরে নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই তৈরি হয়েছে মতপার্থক্য। গত ১০ মাসে দুই নির্বাচন কমিশনার ১৪ বার আপত্তি জানিয়েছেন বলে দাবি দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। ফর্ম ৬ বদল, ভোটার তথ্যভান্ডারের কেন্দ্রীয়করণ, পশ্চিমবঙ্গের আপিল এবং প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনা নিয়েও উঠেছে একাধিক প্রশ্ন। ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও আইন মেনে চলার বিষয়টি ফের আলোচনায়।

হুথিরা যেভাবে স্থানীয় বিদ্রোহী থেকে মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিতে পরিণত হলো

Houthi Expansion in Yemen: ইয়েমেনে ফের কেন যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে? হুথিরা কীভাবে স্থানীয় জায়দি আন্দোলন থেকে শক্তিশালী সামরিক-রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হল? ইরানের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কতটা গভীর? মোখা ও হানিশ দ্বীপপুঞ্জ দখলের পর কেন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বাব আল-মান্দাব? এই সংঘাতের প্রভাব কি শেষ পর্যন্ত বিশ্ব বাণিজ্য, জ্বালানি পরিবহণ ও মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে পড়বে?