তৃণমূল মানে কে, প্রমাণিত ২১ জুলাইয়ের মঞ্চে
Ritabrata and Mamata July 21 Rally: একদিকে ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন কালীঘাট তৃণমূলের সমাবেশ। অন্যদিকে বিধানসভার বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন ঋত-তৃণমূলের সভা। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের জয়ী ৮০ জন বিধায়কের অধিকাংশই এখন ঋতব্রত শিবিরে। ফলে সাংগঠনিক শক্তির বিচারে সেই শিবিরই এগিয়ে। কিন্তু ২১ জুলাইয়ের জনসমাগম দেখাল, সাংগঠনিক সমর্থন আর জনসমর্থন এক নয়।
তৃণমূল কংগ্রেসের নাম ও প্রতীক নিয়ে লড়াইয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও নির্বাচন কমিশনের হাতে। কিন্তু সেই আইনি নিষ্পত্তির আগেই ২১ জুলাইয়ের শহিদ দিবসের দুই সমাবেশ যেন রাজনৈতিকভাবে অন্য এক প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিল। প্রতীক শেষ পর্যন্ত যে শিবিরের হাতেই যাক না কেন, তৃণমূল কংগ্রেস বলতে সাধারণ কর্মী-সমর্থক কাকে বোঝেন, তার স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলল একুশে জুলাই কলকাতার দুই মঞ্চে।
একদিকে ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন কালীঘাট তৃণমূলের সমাবেশ। অন্যদিকে বিধানসভার বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন ঋত-তৃণমূলের সভা। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের জয়ী ৮০ জন বিধায়কের অধিকাংশই এখন ঋতব্রত শিবিরে। ফলে সাংগঠনিক শক্তির বিচারে সেই শিবিরই এগিয়ে। কিন্তু ২১ জুলাইয়ের জনসমাগম দেখাল, সাংগঠনিক সমর্থন আর জনসমর্থন এক নয়।
কলকাতা হাইকোর্ট মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সভার জন্য বিড়লা প্ল্যানেটরিয়ামের পাশের রাস্তা নির্দিষ্ট করে দিয়েছিল। পাশাপাশি নির্দেশ ছিল, আড়াই হাজারের বেশি মানুষের জমায়েত করা যাবে না। কিন্তু সকাল থেকেই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কর্মী-সমর্থকদের ঢল নামে সেখানে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মঞ্চে ওঠার আগেই গোটা এলাকা কার্যত জনসমুদ্রে পরিণত হয়।
একুশে জুলাইয়ের সভায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়
অন্যদিকে মেয়ো রোডে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের সভায় মঞ্চে একাধিক বিধায়ক ও নেতার উপস্থিতি থাকলেও দর্শকাসনের বহু চেয়ার ফাঁকাই দেখা যায়। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, এই দৃশ্যই দুই শিবিরের বর্তমান বাস্তবতার সবচেয়ে বড় প্রতীক হয়ে উঠেছে।
বক্তৃতায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, প্রলোভন দেখানো সত্ত্বেও শহিদ পরিবারের সদস্যরা তাঁর সভায় এসেছেন। তাঁদের ধন্যবাদ জানান তিনি। একই সঙ্গে ঘোষণা করেন, এবার তিনি জেলায় জেলায় বেরোবেন। তাঁকে আটকানোর ক্ষমতা কারও আছে কি না, সেটাও দেখতে চান বলে মন্তব্য করেন।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Sonam Wangchuk: যন্তর মন্তরে সোনম ওয়াংচুকের অনশন শুরুর পর একের পর এক কী কী ঘটনা ঘটেছে? হাসপাতালে স্থানান্তর থেকে 'সংসদ চলো' কর্মসূচি, পুলিশের লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস, আদালতের হস্তক্ষেপ এবং কেন্দ্রের সঙ্গে বৈঠক—জানুন পুরো ঘটনাক্রম।
বিজেপির বিরুদ্ধে তোপ দেগে তিনি অভিযোগ করেন, ২১ জুলাইয়ের সভা বানচাল করতে সোমবার রাতে বিদ্যুতের তার কেটে দেওয়া হয়েছিল। সেই প্রসঙ্গ টেনে বিজেপিকে কটাক্ষ করে তিনি বলেন, “ওরা তারকাটা পার্টি”।
দলভাঙন নিয়েও এদিন স্পষ্ট বার্তা দেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ঋতব্রত শিবিরকে বিজেপির বি টিম বলে আক্রমণ করে তিনি বলেন,
যারা চলে গিয়েছে তারা আর ফিরে আসতে পারবে না।
তাঁর কথায়,
সব চোর চলে গিয়েছে, বেঁচে গিয়েছি।
ভয় দেখিয়ে কিছু মানুষকে কিছু সময়ের জন্য চুপ করানো গেলেও শেষ পর্যন্ত মানুষই জবাব দেবে বলেও দাবি করেন তিনি।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
NEET Protest vs Shaheen Bagh and Farmers' Protest: শাহিনবাগে ছিল নাগরিকত্বের প্রশ্ন, কৃষক আন্দোলনে জীবিকার লড়াই। কিন্তু দিল্লির নিট-দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলন কেন অন্যরকম? কীভাবে এই আন্দোলন ধর্ম বা জীবিকার গণ্ডি ছাড়িয়ে লক্ষ লক্ষ তরুণ-তরুণীর ভবিষ্যৎ, পরিশ্রমের ন্যায্য মূল্যায়ন এবং শিক্ষাব্যবস্থার জবাবদিহির প্রশ্নকে জাতীয় বিতর্কের কেন্দ্রে এনে ফেলল?
ভোটে হারের পরও অক্ষুণ্ন মমতা ম্যাজিক
অন্যদিকে মেয়ো রোডের সভা থেকে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় শহিদ পরিবারগুলির জন্য মাসে ১০ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন যদি তাঁদের দলকে স্বীকৃতি দেয়, তাহলে দলের তহবিল থেকেই এই অর্থ দেওয়া হবে। পাশাপাশি তৃণমূলের বিপুল সম্পদ এবং ১৯৯৩ সালের ২১ জুলাইয়ের তদন্ত কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশ না হওয়ার প্রশ্নও তোলেন তিনি।
রাজনৈতিক তাৎপর্যের দিক থেকে এ দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল দুই শিবিরে শহিদ পরিবারগুলির উপস্থিতি। কয়েকটি পরিবার ঋতব্রত শিবিরের সভায় গেলেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পরিবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সভায় উপস্থিত ছিলেন। সেই বিষয়টিও নিজের বক্তব্যে তুলে ধরেন মমতা।
মেয়ো রোডে একুশে জুলাইয়ের সভায় ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রতি বছর ২১ জুলাইয়ের মঞ্চ থেকেই তৃণমূলের রাজনৈতিক রণকৌশলের বার্তা দিতেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু এবার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা। তৃণমূল আর রাজ্যে ক্ষমতায় নেই। অন্যান্যবারের মতো ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনে সভা হয়নি। হাওড়া বা শিয়ালদহ স্টেশনেও অন্যান্য বছরের মতো কর্মীদের ঢল চোখে পড়েনি। তবু সভাস্থলে পৌঁছে দেখা গেল অন্য ছবি। বহু কর্মী শুধুমাত্র মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য শুনতেই কলকাতায় এসেছেন।
সভায় উপস্থিত কর্মীদের অনেকেই বলেন, নেতা নয়, কর্মীরাই নেতা তৈরি করেন। কেউ কেউ বলেন, দল ক্ষমতায় না থাকায় ভিড় কিছুটা কম হওয়াই স্বাভাবিক। তবে যারা এসেছেন, তাঁরাই প্রকৃত তৃণমূল। আবার অনেকেই ঋতব্রত শিবিরে যাওয়া নেতাদের কড়া ভাষায় আক্রমণ করে বিজেপির বি টিম বলেও কটাক্ষ করেন।
এক সময় বিরোধীরা তৃণমূলকে আক্রমণ করে বলতেন, দলে একটাই পোস্ট, বাকিরা ল্যাম্পপোস্ট। ২১ জুলাইয়ের দুই সমাবেশের ছবি যেন সেই পুরনো রাজনৈতিক সমালোচনাকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এল। অধিকাংশ বিধায়ক, সাংগঠনিক নেতৃত্ব এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি একদিকে থাকলেও কর্মীদের বড় অংশ যে এখনও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গেই নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয় খুঁজে পান, এ দিনের জনসমাগম অন্তত সেই বার্তাই দিল।
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে পরাজিত হলেও তৃণমূল ৪০.৬৮ শতাংশ ভোট পেয়েছে। সেই ভোটের বড় অংশ আদতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতার প্রতিফলন ছিল বলেই ২১ জুলাইয়ের সমাবেশ যেন বুঝিয়ে দিল।
এদিন শহিদ মিনারের পাদদেশে পৃথকভাবে শহিদ দিবস পালন করে কংগ্রেসও। কারণ ১৯৯৩ সালের ২১ জুলাই সচিত্র ভোটার পরিচয়পত্রের দাবিতে মহাকরণ অভিযানের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তৎকালীন যুব কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পরে কংগ্রেস ছেড়ে তিনি গড়ে তোলেন তৃণমূল কংগ্রেস।
নাম, প্রতীক এবং আইনি স্বীকৃতির লড়াই এখনও শেষ হয়নি। সেই সিদ্ধান্ত নেবে নির্বাচন কমিশন। কিন্তু ২১ জুলাইয়ের দুই মঞ্চ অন্তত একটি রাজনৈতিক বার্তা স্পষ্ট করে দিল। সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ এক জিনিস, আর মানুষের আবেগ ও রাজনৈতিক পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া আরেক জিনিস। সোমবারের কলকাতার দুই সমাবেশে সেই পার্থক্যটাই সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠল।







