শিক্ষা যখন ব্যবসা: যত কাণ্ড খান স্যারের কোচিংয়ে
ঘটনার পর থেকেই পুলিশ খুঁজছিল প্রিন্স আনন্দ নামের এক যুবককে, যিনি এই হামলার অন্যতম মূল চক্রী এবং ‘জ্ঞান বিন্দু’র ডিরেক্টর রওশন আনন্দের ভাই ছিলেন। ১৩ জুন রাতে নেপালের বিরাটনগরের এক হোটেলে অত্যন্ত রহস্যজনক পরিস্থিতিতে মারা যান তিনি।
২ জুন রাতের অন্ধকার চিরে হঠাৎ ধেয়ে আসে ঝাঁকে ঝাঁকে পাথর। ভাঙচুর হয় অফিস, ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় বড় বড় হোর্ডিং। লাঠির ঘায়ে রক্তাক্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন সিকিউরিটি গার্ড। তার পরেই আসে মুড়িমুড়কির মতো গুলির শব্দ!
মঙ্গলবার রাতে পাটনার কদমকুয়ান এবং মুসাল্লাহপুর হাট এলাকায় ঠিক এই সিনেম্যাটিক দৃশ্যটাই ঘটে যায়। আর এই পুরো ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে যিনি, তিনি আর কেউ নন—সোশ্যাল মিডিয়ার চেনা মুখ, কোটি কোটি ছাত্রের নয়নের মণি ‘খান স্যার’।
কিন্তু কেন এক শিক্ষকের কোচিং সেন্টারে মাঝরাতে এমন তাণ্ডব চলল? কেনই বা তার কয়েক দিন পর খোদ খান স্যারের বিরুদ্ধেই রুজু হলো ‘খুনের চেষ্টা’র মামলা?
২ জুনের সেই রাতে খান স্যারের ‘খান গ্লোবাল স্টাডিজ’ (KGS) কোচিং সেন্টারে আচমকাই চড়াও হয় ১৫-২০ জনের এক দল যুবক। অভিযোগ, তারা সবাই প্রতিপক্ষ বা প্রতিদ্বন্দ্বী একটি কোচিং সেন্টারের হয়ে সুপারি নিয়ে এসেছিল। চারিদিকে যখন ভাঙচুর আর চিৎকার চলছে, তখন পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে শূন্যে গুলি ছোঁড়েন খান স্যারের ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষীরা।
পরদিনই খান স্যার নিজে পুলিশের হাতে সিসিটিভি ফুটেজ তুলে দেন এবং সোজা আঙুল তোলেন কাছাকাছি থাকা ‘জ্ঞান বিন্দু জিএস একাডেমি’র মতো কিছু প্রতিদ্বন্দ্বী কোচিংয়ের দিকে। খান স্যারের স্পষ্ট দাবি ছিল—
"আমি সস্তায় পড়াই, গরিব ঘরের ছেলেমেয়েদের স্বপ্ন দেখাই। এটাই অনেকের ব্যবসার ক্ষতি করছে। ঈর্ষায় জ্বলছে ওরা।"
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Sayani Ghosh: তৃণমূলের অন্যতম পরিচিত মুখ সায়নী ঘোষ কেন বিদ্রোহী শিবিরে নাম লেখালেন? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুগত নেত্রী থেকে দলের বেসুরো সাংসদ হয়ে ওঠার নেপথ্যে কী রাজনৈতিক সমীকরণ কাজ করেছে?
প্রাথমিক তদন্তে নেমে পুলিশ তিনজনকে গ্রেপ্তারও করে, যার মধ্যে ছিল সেই প্রতিদ্বন্দ্বী কোচিংয়ের ডিরেক্টরও।
৪-৫ জুন নাগাদ পুরো ঘটনার মোড় ঘুরে গেল ১৮০ ডিগ্রি। যে খান স্যার নিজে অভিযোগকারী ছিলেন, পুলিশ উলটে তাঁর এবং তাঁর দুই সিকিউরিটি গার্ডের বিরুদ্ধেই এফআইআর দায়ের করে দিল! ধারাগুলিও মোটেও হালকা ছিল না—খুনের চেষ্টা, প্ররোচনা দেওয়া এবং বেআইনি অস্ত্র আইন।
পুলিশের দাবি ছিল, ধৃত গার্ডরা নাকি জেরায় কবুল করেছে যে খান স্যার নিজেই তাঁদের বলেছিলেন, “তোমরা গুলি চালাও, বাকিটা আমি দেখে নেব!”
ব্যস! এই খবর ছড়াতেই বিহারের ছাত্র মহলে আগুন জ্বলে ওঠে। ইন্টারনেট জুড়ে ট্রেন্ড করতে শুরু করে #SupportKhanSir। সাধারণ মানুষের অভিযোগ ছিল, পাটনার ক্ষমতাশালী ‘কোচিং লবি’ আর পুলিশের একাংশ একজোট হয়ে খান স্যারকে ফাঁসানোর চক্রান্ত করছে।
অবশেষে স্বস্তি মেলে পাটনা হাইকোর্টে। আদালত আপাতত খান স্যারের গ্রেপ্তারির উপর স্থগিতাদেশ দিয়েছে এবং পুলিশের কাছে ওই রাতের সমস্ত সিসিটিভি ফুটেজ তলব করেছে। আত্মরক্ষার খাতিরে গুলি চালানো আইনি অপরাধ কি না, এখন সেটাই খতিয়ে দেখছে আদালত।
সূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Cjp Lucknow protest: ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) লখনউয়ে লেখপাল ও সাব-ইন্সপেক্টর পরীক্ষার্থীদের আন্দোলনের পাশে দাঁড়িয়েছে। প্রশ্নপত্র ফাঁস, নিয়োগে অনিয়ম ও স্বচ্ছতার দাবিতে চলা এই বিক্ষোভে ছাত্রনেতাদের আটকের অভিযোগ উঠেছে। তবে পুলিশি বাধা সত্ত্বেও হাজার হাজার চাকরিপ্রার্থী তাঁদের দাবি আদায়ে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন।
এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই গত ১৩ জুন রাতে গল্পে এল এক নতুন মোড়। ঘটনার পর থেকেই পুলিশ খুঁজছিল প্রিন্স আনন্দ নামের এক যুবককে, যিনি এই হামলার অন্যতম মূল চক্রী এবং ‘জ্ঞান বিন্দু’র ডিরেক্টর রওশন আনন্দের ভাই ছিলেন।
পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে বন্ধুদের নিয়ে সীমান্ত পার হয়ে নেপালে পালিয়ে যান প্রিন্স। কিন্তু ১৩ জুন রাতে নেপালের বিরাটনগরের এক হোটেলে অত্যন্ত রহস্যজনক পরিস্থিতিতে মারা যান তিনি। আচমকা শরীর খারাপ হওয়ায় হাসপাতালে নিয়ে গেলে তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়। এটা স্বাভাবিক মৃত্যু নাকি এর পিছনে অন্য কোনো বড় হাত রয়েছে, তা নিয়ে এখন তোলপাড় চলছে দুই দেশের পুলিশ মহলে।
এদিকে ভাইয়ের এই আকস্মিক মৃত্যুর পর, গতকালই (১৫ জুন) মানবিকতার খাতিরে আদালত থেকে জামিন পেয়েছেন রওশন আনন্দ।
কিন্তু কে এই খান স্যার, যাঁকে সরাতে পাটনার বড় বড় বাঘা বাঘা কোচিং সেন্টারের মালিকরা উঠেপড়ে লেগেছে?
উত্তর প্রদেশের দেওরিয়ার এক সাধারণ পরিবারে জন্ম ফয়সাল খানের (যা পরে ছাত্রদের মুখে মুখে ‘খান স্যার’ হয়ে যায়)। ছোটবেলা থেকে ইচ্ছে ছিল দেশের সেবা করবেন, সেনাবাহিনীতে যোগ দেবেন। কিন্তু এনডিএ (NDA) পরীক্ষায় পাশ করলেও সামান্য শারীরিক ত্রুটির জন্য মেডিক্যাল টেস্টে বাদ পড়ে যান।
সেনাবাহিনীতে যাওয়া না হলেও, দেশের সেবা করা তিনি ছাড়েননি। পাটনায় এসে যখন তিনি ইতিহাস, ভূগোল আর জেনারেল স্টাডিজ পড়ানো শুরু করলেন, তখন তিনি দেখলেন শিক্ষাকে কীভাবে ব্যবসা বানিয়ে ফেলা হয়েছে। বড় বড় ইনস্টিটিউট যেখানে সিভিল সার্ভিস বা অন্যান্য সরকারি চাকরির প্রস্তুতির জন্য লাখ টাকা ফি নেয়, সেখানে খান স্যার ক্লাস শুরু করলেন মাত্র ২০০ থেকে ৫০০ টাকায়!
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Debosmita Pal Delhi Professor: বুধবার বিকেল আনুমানিক ৩টে ২০ মিনিট নাগাদ একটি দূরপাল্লার প্রাইভেট ক্যাবে করে পূর্ব দিল্লির বসুন্ধরা এনক্লেভের ‘সত্যম অ্যাপার্টমেন্টস’-এ পৌঁছয় রামপ্রসাদ ও বনশ্রী। সঙ্গে ছিল তাদের নাবালক ছেলে। লিফটে উঠলে সিসিটিভি ক্যামেরায় স্পষ্ট ভাবে মুখ দেখা যেতে পারে, এই আশঙ্কায় তারা মুখে মাস্ক পরে সিঁড়ি ব্যবহার করে সোজা উঠে যায় দেবস্মিতার ষষ্ঠ তলার ফ্ল্যাটে।
তাঁর পড়ানোর স্টাইলও অদ্ভুত সুন্দর। কোনো কঠিন বা গালভরা ইংরেজি শব্দ নয়, একেবারে খাঁটি ভোজপুরি মেশানো হিন্দি ভাষায়, পাড়ার দুই প্রতিবেশীর ঝগড়ার উদাহরণ দিয়ে তিনি বুঝিয়ে দেন ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ বা দেশের অর্থনীতি। কোভিডের সময়ে যখন তাঁর অনলাইন ক্লাস শুরু হলো, তখন তা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল। আজ ইউটিউবে তাঁর সাবস্ক্রাইবার সংখ্যা ২ কোটি ৬০ লক্ষেরও বেশি!
একবার দেশের একটি প্রথম সারির বড় অনলাইন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খান স্যারকে নিজেদের প্ল্যাটফর্মে টানার জন্য ১০৭ কোটি টাকার অফার দিয়েছিল। কিন্তু শর্ত ছিল একটাই—কোর্সের ফি বাড়িয়ে ১০ হাজার টাকা করতে হবে। খান স্যার এক লহমায় সেই ১০৭ কোটি টাকার অফার ফিরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন—
"আমি যদি ফি বাড়িয়ে দিই, তবে একজন রিকশাওয়ালার ছেলে বা ড্রেন সাফ করা ঝাড়ুদারের মেয়ে আইএএস (IAS) হওয়ার স্বপ্ন দেখা ছেড়ে দেবে। আমি সেটা হতে দেব না।"
খান স্যারের সঙ্গে আজ যা ঘটছে, তা কিন্তু ভারতের বা বিশেষ করে পাটনার শিক্ষা বাজারে প্রথম নয়। আমরা ‘সুপার ৩০’-এর প্রতিষ্ঠাতা আনন্দ কুমারের নাম তো আমরা জানিই। তিনিও যখন গরিব ঘরের ৩০ জন ছাত্রকে নিখরচায় আইআইটি (IIT) ক্র্যাক করাতে শুরু করেন, তখন তাঁর উপরও লাগাতার হামলা হয়েছিল। তাঁর এক ঘনিষ্ঠ সহযোগীকে ছুরি ও গুলি মারা হয়, আনন্দ কুমারের নামে একের পর এক মিথ্যে মামলা দেওয়া হয়।
শুধু পাটনা কেন, রাজস্থানের কোটা শহর বা দিল্লির মুখার্জি নগরেও এই ‘কোচিং ওয়ার’ দীর্ঘদিনের রোগ। এক কোচিংয়ের ভালো শিক্ষককে কোটি টাকা দিয়ে অন্য কোচিং ভেঙে নিয়ে যাওয়া, মাঝরাতে প্রতিদ্বন্দ্বী সেন্টারের পোস্টার ছিঁড়ে ফেলা বা নোটসপত্র পুড়িয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা আকছার ঘটে। কারণ, এই মাফিয়াদের কাছে ছাত্ররা কোনো ‘শিক্ষার্থী’ নয়, তারা হলো একেকটি ‘কাস্টমার’। আর সেই কাস্টমার হাতছাড়া হওয়া মানেই কোটি কোটি টাকার লোকসান।
আপাতত পাটনা হাইকোর্টের রক্ষাকবচ থাকায় খান স্যারের ক্লাস চলছে। কড়া নিরাপত্তার ঘেরাটোপে ছাত্ররা রোজ পড়তে আসছে। কিন্তু এই ঘটনাটি ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থার একটা কুৎসিত চেহারা আমাদের সামনে এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
যে দেশে শিক্ষাকে ‘দান’ বা ‘পবিত্র আলো’ বলে মনে করা হতো, সেই
শিক্ষা ব্যবসাতে পরিণত হয়েছে বহুদিন আগেই। কিন্তু ২ জুনের ঘটনা প্রমাণ করেছে, শিক্ষা এমন এক এক ব্যবসাতে পরিণত হয়েছে যে তার জন্য প্রতিদ্বন্দীরা একে অপরকে আক্রমণ করতেও পিছপা হবে না।
মামলা হয়তো একদিন মিটে যাবে, কিন্তু প্রশ্নটা থেকেই যাচ্ছে—টাকার জোরে চলা এই মাফিয়াতন্ত্রকে কি কোনোদিন উপড়ে ফেলা যাবে?







