সাদা শাড়ি ছেড়ে জিনস-স্নিকার্স, সায়নীর ইমেজ বদলের নেপথ্যে কী?

Sayani Ghosh: তৃণমূলের অন্যতম পরিচিত মুখ সায়নী ঘোষ কেন বিদ্রোহী শিবিরে নাম লেখালেন? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুগত নেত্রী থেকে দলের বেসুরো সাংসদ হয়ে ওঠার নেপথ্যে কী রাজনৈতিক সমীকরণ কাজ করেছে?

inscript
৪ মিনিট
সাদা শাড়ি ছেড়ে জিনস-স্নিকার্স, সায়নীর ইমেজ বদলের নেপথ্যে কী?

একসময় সায়নী ঘোষকে দেখা যেত সাদা সুতির শাড়িতে, কপালে ছোট্ট টিপ, সাধারণ খোঁপায় বাঁধা চুলে। তৃণমূল কংগ্রেসের তরুণ মুখ সায়নী ঘোষ যেন ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক নন্দনকাঠামোরই একটি সম্প্রসারণ। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, শুধু বক্তব্য বা সংগঠন নয়, পোশাক-পরিচ্ছদেও তিনি নিজেকে তৃণমূল সুপ্রিমোর ভাবমূর্তির সঙ্গে মিলিয়ে নিয়েছিলেন। কিন্তু ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের ভরাডুবির পর সেই ছবিটিই বদলে যেতে শুরু করেছে।

এখন আর তাঁকে খুব একটা শাড়িতে দেখা যায় না। বিমানবন্দরে কিংবা রাজনৈতিক সফরে দেখা যাচ্ছে জিনস, টি-শার্ট, স্নিকার্স বা আধুনিক কুর্তিতে। চুলেও এসেছে নতুন স্টেপ কাট। এই পরিবর্তন কি শুধুই ব্যক্তিগত ফ্যাশনের? নাকি এর পিছনে রয়েছে আরও বড় রাজনৈতিক বার্তা?

সায়নী ঘোষ নিজেই একসময় জানিয়েছিলেন, তাঁর এই সাদামাটা সাজ কোনো কৃত্রিম বিষয় নয়। ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে একটি বাংলা সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন,

আমি যে নেত্রীর দল করি, ওর দল করতে করতে আমাকে নরেন্দ্র মোদির মতো দেখতে হলে মুশকিল হয়ে যাবে। আমি যাঁর দল করি, তাঁর মতো সাধারণ থাকতে চাই। তাঁর মতোই মাটির কাছাকাছি থাকতে চাই।

এই বক্তব্যের মধ্যে রাজনৈতিক আনুগত্যের স্পষ্ট বার্তা ছিল। অর্থাৎ, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাধারণ জীবনযাপন এবং জনসংযোগের রাজনীতিকে নিজের মধ্যেও ধারণ করতে চেয়েছিলেন তিনি। ফলে প্রশ্ন উঠছে, কয়েক মাসের মধ্যেই সেই অবস্থান এতটা বদলে গেল কেন?

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বিজিবিএস নিয়ে শুভেন্দু যা বলছেন, তার নেপথ্যে কী ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ?

BGBS controversy: বেঙ্গল গ্লোবাল বিজনেস সামিট (বিজিবিএস) ঘিরে নতুন বিতর্ক। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর অভিযোগ, তৃণমূল আমলে একটি ইভেন্ট সংস্থাকে প্রায় ৬৩৫ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে।

রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এর উত্তর লুকিয়ে রয়েছে নির্বাচনের ফলাফলে। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের বড় ধাক্কার পর দলের অভ্যন্তরে অসন্তোষ ক্রমশ প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে। সেই সময় থেকেই সায়নী ঘোষকে দেখা যায় তথাকথিত ‘বিদ্রোহী’ সাংসদদের শিবিরে।

প্রথমে বিদ্রোহী সাংসদদের আলাদা সংসদীয় ব্লক গঠনের জল্পনা ছড়ায়। পরে জানা যায়, তাঁদের একাংশ এনসিপিআই-তে যোগ দেওয়ার রাস্তা খুঁজছেন। রাজনৈতিক মহলের মতে, দলত্যাগবিরোধী আইনের জটিলতা এড়াতেই এই কৌশল নেওয়া হয়েছিল।

ভারতের সংবিধানের দশম তফসিল অনুযায়ী, কোনো রাজনৈতিক দলের নির্বাচিত প্রতিনিধি দল ছাড়লে বা দলের নির্দেশ অমান্য করলে তাঁর সদস্যপদ খারিজ হতে পারে। একসময় দল ভাঙার ক্ষেত্রে এক-তৃতীয়াংশ বিধায়ক বা সাংসদের সমর্থনকে বৈধতা দেওয়া হলেও ২০০৩ সালের ৯১তম সংবিধান সংশোধনের পর সেই বিধান বাতিল হয়েছে। এখন কোনো ভাঙনকে বৈধ বলে গণ্য করতে হলে দলের কমপক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যকে একসঙ্গে অন্য দলে মিশে যেতে হয়।

এই কারণেই মাত্র ২০ জন সাংসদ নিয়ে আলাদা দল গঠন করলে তাঁদের সাংসদ পদ বিপদের মুখে পড়তে পারত। ফলে ‘নতুন তৃণমূল’-এর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি বলেই মনে করছেন অনেক বিশেষজ্ঞ।

আরও একটি কারণ সামনে আসছে। বিদ্রোহী সাংসদদের প্রথম লক্ষ্য ছিল বিজেপি-নেতৃত্বাধীন এনডিএ-কে সমর্থন করা। সংসদে আলাদা ব্লক হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার আবেদন করার প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছিল বলে খবর। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিজেপি নেতৃত্ব এই গোষ্ঠীকে গ্রহণ করতে আগ্রহ দেখায়নি বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়। ফলে নতুন রাজনৈতিক আশ্রয়ের সম্ভাবনাও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মুসলিম ভোট কেন পেল না তৃণমূল?

Mamata Banerjee defeat 2026: ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরাজয়ের প্রধান কারণ হলো মুসলিম ভোটারদের একটি বড় অংশের নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে কাঠামোগত ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে বাদ পড়ে যাওয়া।

এই পরিস্থিতিতে সায়নী ঘোষের অবস্থান বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। কারণ তিনি শুধুমাত্র সাংসদ নন, দীর্ঘদিন তৃণমূল যুব কংগ্রেসের সভাপতিও ছিলেন। অর্থাৎ, দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ হিসেবেই তাঁকে তুলে ধরেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।

অভিনয় জগত থেকে রাজনীতিতে আসার পর সায়নীর উত্থানও ছিল দ্রুত। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে আসানসোল দক্ষিণ কেন্দ্র থেকে প্রার্থী হলেও তিনি পরাজিত হন। তবে দল তাঁর উপর আস্থা হারায়নি। ২০২৩ সালে তাঁকে তৃণমূল যুব কংগ্রেসের সভাপতি করা হয়। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে যাদবপুর কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়ে তিনি সংসদে পৌঁছন।

কিন্তু ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর থেকেই দলের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে। কাকলি ঘোষ দস্তিদারের নেতৃত্বে যে ১৯ জন সাংসদের বিদ্রোহী গোষ্ঠীর চিঠি সামনে আসে, সেখানে সায়নী ঘোষের স্বাক্ষরও ছিল। সেই মুহূর্ত থেকেই তাঁকে তৃণমূলের ‘বেসুরো’ সাংসদদের অন্যতম মুখ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিধানসভা নির্বাচনের আগে এক সাক্ষাৎকারে সায়নী বলেছিলেন,

আমার নাম সায়নী ঘোষ, আমি চাড্ডা নই যে চাড্ডি হয়ে যাব।

তখন তিনি বিজেপিতে যোগ দেওয়া রাঘব চাড্ডাকে কটাক্ষ করেছিলেন। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই নিজেই যখন বিদ্রোহী শিবিরে নাম লেখান, তখন দিল্লি বিমানবন্দরে সাংবাদিকরা তাঁর সেই মন্তব্য মনে করিয়ে দেন। যদিও তিনি সরাসরি কোনো উত্তর না দিয়ে বলেন,

“আমি শুধুমাত্র আমার এলাকার ভোটারদের জবাব দেব।”

তাহলে কি সায়নী ঘোষের এই অবস্থান পরিবর্তন শুধুই আদর্শগত? নাকি এর পিছনে রয়েছে রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে হিসাবনিকাশ?

রাজনীতির ইতিহাস বলছে, বড় নির্বাচনী বিপর্যয়ের পর অনেক নেতা নিজেদের নতুনভাবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেন। দলের মুখপাত্র বা নেত্রীর ছায়া থেকে বেরিয়ে এসে আলাদা রাজনৈতিক পরিচয় গড়ার প্রবণতা নতুন নয়। পশ্চিমবঙ্গেও অতীতে বহু নেতার ক্ষেত্রে এমন উদাহরণ দেখা গিয়েছে।

তবে এখনও পর্যন্ত সায়নী ঘোষ প্রকাশ্যে তৃণমূল ছাড়ার ঘোষণা দেননি। নতুন কোনো রাজনৈতিক দলে যোগ দেওয়ার কথাও জানাননি। ফলে তাঁর পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। কিন্তু একটি বিষয় পরিষ্কার—যে নেত্রীকে একসময় নিজের রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত অনুপ্রেরণা বলে তুলে ধরেছিলেন, সেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছায়া থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা যে তিনি শুরু করেছেন, তার ইঙ্গিত এখন তাঁর বক্তব্যের চেয়ে অনেক বেশি স্পষ্ট তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান এবং জনসমক্ষে বদলে যাওয়া উপস্থিতিতেই।

লিখেছেন
inscript
inscript
17 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

মিডটার্ম নির্বাচন: সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেতে চলেছে ট্রাম্পের বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা

US Midterm Elections 2026: ভোটের লড়াইয়ে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টিকে পিছনে ফেলে এগিয়ে যেতে শুরু করেছে বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা।

রামলীলার পর কী? কী করবেন বিরোধীরা?

INDIA bloc Unity Under strain: ‘ভোট বাঁচাও, দেশ বাঁচাও’ স্লোগানে ১ নভেম্বর রামলীলা ময়দানে ২১ দল একজোট হলেও মঞ্চ শেষেই ভেতরের টানাপোড়েন স্পষ্ট। বাম নেতাদের বক্তৃতায় প্রাধান্য, ‘ফ্যাসিবাদ’ বিরোধী সুর। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘জাতীয় ভূমিকা’র সতর্কবার্তা। প্রিয়াঙ্কা, সুপ্রিয়া সুলে, সঞ্জয় রাউত বক্তৃতার সুযোগ না পাওয়ায় শরিক-অসন্তোষ।

ট্রাম্পের অভিবাসন নীতিতে বিপাকে ভারতীয়রা, মিডটার্ম নির্বাচনে কতটা প্রভাব পড়বে?

US Midterm Elections 2026: ২০২৬ সালের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভারতীয় বংশোদ্ভূত ভোটারদের ৬২% ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে। ট্রাম্পের এইচ-১বি ভিসা কড়াকড়ি ও অর্থনৈতিক নীতির জেরে ক্ষোভ বাড়ছে বলে জানাল কার্নেগির সমীক্ষা।

রামলীলার সভার জন্য ক্ষতি হয়েছে ছোট দোকানদারদের, কতটা প্রচার, কতটা সত্যি?

loss claim for Ramlila rally: রামলীলা ময়দানের সমাবেশ ঘিরে ছোট দোকানদারদের ‘২.৫ লক্ষ দোকান বন্ধ’ ও ‘১০-১১ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি’র দাবি আসলে, দিল্লির ব্যবসায়ী সংগঠন সিটিআই-এর অনুমান আসলে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের হিসাবের ভিত্তিতে করা হয়েছে। বিজেপি-কংগ্রেস পাল্টাপাল্টি অভিযোগে এই সংখ্যাগুলি এখন রাজনৈতিক হাতিয়ার।

এসআইআর: মূল টার্গেট ছিল বাংলা?

SIR West Bengal controversy: এসআইআরের নামে বাংলার নাগরিকদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার পরিকল্পনা কতটা সুপরিকল্পিত? নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা, বিচারকদের পর্যবেক্ষণ, ডিজিটাল কারচুপি ও সংখ্যালঘুদের লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ কী ইঙ্গিত দিচ্ছে?

শ্রমিক বিক্ষোভের নেপথ্যে আওয়ামী লীগ, বাংলাদেশ সরকারের অভিযোগের বাস্তব ভিত্তি কতটা?

Garment Workers' Protest in Bangladesh: বাংলাদেশে মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভ, আন্দোলনের পিছনে আওয়ামী লীগের ইন্ধন রয়েছে বলে অভিযোগ বাংলাদেশ সরকারের। কিন্তু শ্রমিকদের অসন্তোষের নেপথ্যে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, নাকি মূল্যবৃদ্ধি ও প্রকৃত মজুরি কমে যাওয়ার ক্ষোভ? সরকারের দাবির পক্ষে কতটা প্রমাণ রয়েছে?

সকালে জমা বিকেলে খরচ: আইনের শাসনের অবমাননা

Gaighata incident: গাইঘাটার ঘটনার পরমুহূর্তে শাসক দলের মন্ত্রী, নেতাদের প্রতিক্রিয়া পরিষ্কার করে দেয়, বন্দি অভিযুক্তকে হত্যার ঘটনা সরকারি নীতির ('সকালে জমা, বিকালে খরচ')—নগ্ন প্রয়োগ।

৫০ কোটি মানুষ দারিদ্র্যমুক্ত, মোদীর দাবির আড়ালে কোন পরিসংখ্যানগত বিতর্ক?

World Bank's claim about India's poverty decline: বিশ্বব্যাঙ্কের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১১-১২ থেকে ২০২২-২৩-এ ভারতের চরম দারিদ্র্য ২৭.১% থেকে ২.৬%-এ নেমেছে বলে দাবি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সেই পরিসংখ্যানকে রাজনৈতিক প্রচারের কাজেও লাগাচ্ছেন। কিন্তু, পরিসংখ্যানের আড়ালে আসল সত্য কি? কি বলছেন অর্থনীতিবিদরা?