হেরিটেজ স্বীকৃতি পেতে চলেছে কলকাতার পাঁচ পুরনো চায়ের দোকান
Old Tea Shops in Kolkata: কিছু পুরনো দোকানকে নতুন করে পরিচিতি দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে টি বোর্ড অফ ইন্ডিয়া। শুধু স্বীকৃতি দেওয়াই নয়, দোকানগুলির ভিতরের অংশ সংস্কার করে তাদের আরও সুন্দর করে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে।
সকালের ব্যস্ততা সবে শুরু হয়েছে। অফিস যাওয়ার তাড়া, রাস্তার ধারে মানুষের ভিড়, আর তারই মাঝে এক কাপ গরম চায়ের জন্য প্রিয় চায়ের দোকানে লাইন। কেউ চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে খবরের কাগজ পড়ছেন, কেউ আবার পরিচিত বন্ধুর সঙ্গে আড্ডায় মেতেছেন। কলকাতায় এমন দৃশ্য বহু বছরের পুরনো। শহরের কত রাস্তা, কত গলি বদলে গিয়েছে সময়ের সঙ্গে। কিন্তু কিছু চায়ের দোকান আজও ধরে রেখেছে তাদের পুরনো পরিচয়। সেই দোকানগুলির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বহু মানুষের স্মৃতি আর প্রতিদিনের জীবনের গল্প।
কলকাতার এমনই কিছু পুরনো দোকানকে নতুন করে পরিচিতি দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে টি বোর্ড অফ ইন্ডিয়া। শুধু স্বীকৃতি দেওয়াই নয়, দোকানগুলির ভিতরের অংশ সংস্কার করে তাদের আরও সুন্দর করে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে।
টি বোর্ডের প্রাথমিক তালিকায় জায়গা পেয়েছে পাঁচটি পরিচিত দোকান— ডেকার্স লেনের চিত্তবাবুর দোকান, ডালহৌসির কোনা দোকান, হরিশ মুখার্জি রোডের বলবন্ত সিং ধাবা, শ্যামবাজারের ন্যাশনাল ইকনমিক রেস্টুরেন্ট এবং শ্রীরামপুরের নরেশবাবুর টি স্টল। এই দোকানগুলির প্রত্যেকটির সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছে দীর্ঘদিনের ইতিহাস। এখানে চা খেতে আসা মানুষগুলিরর কাছে এগুলি নিছক দোকান নয়, বরং পরিচিত একটা জায়গা, যেখানে বারবার ফিরে আসতে ইচ্ছে করে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Tea Junction: ২০০৪ সালে সিটি সেন্টারে এক রাতে খুলে ফেলা হয়েছিল টি জংশন। পরবর্তীকালে ডানা মেলে আরও বেড়েছে তার আউটলেট সংখ্যা।
টি বোর্ডের উপাধ্যক্ষ সি. মুরুগান জানিয়েছেন যে, চিহ্নিত দোকানগুলি একশো বছরেরও বেশি সময় ধরে চা বিক্রির সঙ্গে যুক্ত। এত বছর ধরে মানুষের প্রতিদিনের জীবনের অংশ হয়ে থাকা এই দোকানগুলিকে স্বীকৃতি দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। দোকানগুলিকে একটি করে স্বীকৃতিপত্র দেওয়া হবে। পাশাপাশি, সেখানে টি বোর্ডের লোগোও লাগানো হবে।
সময়ের সঙ্গে অনেক দোকানের চেহারা বদলে যায়। কোথাও পুরনো সাজসজ্জা হারিয়ে যায়, কোথাও আবার জায়গার অভাবে আগের মতো করে সবকিছু ধরে রাখা সম্ভব হয় না। তাই এই উদ্যোগে দোকানগুলির ভিতরের অংশ সংস্কারের পরিকল্পনা করেছে টি বোর্ড।
দোকানমালিকেরা রাজি থাকলে টি বোর্ড নিজেদের খরচে এই সংস্কারের কাজ করবে। তবে দোকানগুলিকে নতুন করে সাজাতে গিয়ে তাদের পুরনো পরিচয় মুছে ফেলা হবে না। বরং যে বৈশিষ্ট্যগুলির জন্য এত বছর ধরে দোকানগুলি মানুষের কাছে পরিচিত, সেগুলি বজায় রেখেই সৌন্দর্য বাড়ানোর চেষ্টা করা হবে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Darjeeling history: ভারতের প্রথম ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ (জিআই) ট্যাগ প্রাপ্ত পণ্য বিশ্বখ্যাত ‘দার্জিলিং টি’। অথচ এই চা গাছ কিন্তু দার্জিলিং-এর ‘ভূমিপুত্র’ নয়। সাহেবরা নিজেদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে শান দিতেই এখানকার আদি বাস্তুতন্ত্রের খোলনলচে বদলে দিয়েছিল। দেশীয় বনভূমি ধ্বংস করে পাইন আর চা রোপণের মাধ্যমেই জন্ম নিয়েছিল আধুনিক পর্যটন মানচিত্রের এই ‘খাদের ধারের দার্জিলিং’।
প্রাথমিকভাবে পাঁচটি দোকানকে চিহ্নিত করা হলেও ভবিষ্যতে এই সংখ্যা বাড়তে পারে। কোন দোকান কত বছরের পুরনো, তার ইতিহাস কী এবং দীর্ঘদিন ধরে কীভাবে সেটি মানুষের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে, সেই বিষয়গুলি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। যোগ্য দোকানগুলিকে এই উদ্যোগে অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ থাকবে। তবে তার জন্য দোকানমালিকদের সম্মতি প্রয়োজন। টি বোর্ডের তরফে জানানো হয়েছে, এই কাজে অর্থের অভাব বাধা হয়ে দাঁড়াবে না।
কলকাতার বাইরেও দেশের বিভিন্ন শহরে পুরনো চায়ের দোকান খুঁজে বের করার কাজ চলছে। দিল্লি, চেন্নাই, হায়দরাবাদ ও বেঙ্গালুরু-সহ বিভিন্ন শহরে সমীক্ষা চালিয়ে এমন দোকানগুলিকে চিহ্নিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে দেশের চায়ের সংস্কৃতির সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত থাকা দোকানগুলিকে সামনে নিয়ে আসতে চায় টি বোর্ড।
অফিসে কাজের ফাঁকে, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় কিংবা দিনের শুরুতে এক কাপ চা প্রায় আমাদের সবারই অভ্যাস। পুরনো চায়ের দোকানগুলিও সেই অভ্যাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে। সময়ের সঙ্গে শহরের চেহারা বদলালেও এই দোকানগুলির মধ্যে বেশ কয়েকটা দোকান নিজেদের পুরনো পরিচয় ধরে রেখেছে।
টি বোর্ডের এই উদ্যোগ সফল হলে ঐতিহ্যবাহী দোকানগুলি নতুন পরিচিতি পাবে। দোকানগুলির সৌন্দর্য বাড়ার পাশাপাশি তাদের দীর্ঘদিনের ইতিহাসও মানুষের সামনে তুলে ধরা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও জানতে পারবে, কীভাবে ছোট ছোট চায়ের দোকান শহরের সামাজিক জীবন ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।







