এবার খোয়ালেন আইএমএ পদও! বিপাক বাড়ছে আরজি করের প্রাক্তন অধ্যক্ষ সন্দীপের
IMA Sandeep Ghosh: আইএমএ জানিয়েছে, আরজি করে নির্যাতিতার পরিবারের সঙ্গে কথা বলে এবং অন্য চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে সন্দীপের বিরুদ্ধে এই পদক্ষেপের সিদ্ধান্ত তারা নিয়েছে।

অধ্যক্ষ পদ আগেই খুইয়েছেন তিনি। এবার সর্বভারতীয় চিকিৎসক সংগঠন ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (আইএমএ) থেকেও সাসপেন্ড হলেন আরজিকর কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষ। আরজি করে মহিলা চিকিৎসককে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় স্বতঃপ্রণোদিত পদক্ষেপ করেছে সংগঠনটি। বুধবারই সন্দীপের কাছে এই সংক্রান্ত নির্দেশিকা পাঠানো হয়েছে।
আরজি কর হাসপাতালে তরুণী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় তোলপাড় গোটা রাজ্য। ঘটনায় প্রশ্ন উঠে গিয়েছে আরজি কর মেডিক্য়াল কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষের ভূমিকা নিয়ে। ঘটনার দুদিন পরেই স্বাস্থ্যভবনে গিয়ে পদত্যাগ করার দাবি করেছিলেন সন্দীপ। যদিও সেই দিনই তাঁকে আরজি কর থেকে সরিয়ে ন্য়াশনাল মেডিক্যালের অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ দিয়েছিল সরকার। তবে ন্যাশনাল মেডিকেলে বিক্ষোভের মুখে যোগদান করতে পারেনি সন্দীপবাবু। বরং হাইকোর্টের তীব্র ভর্ৎসনার মুখে ছুটিতে যেতে বাধ্য হন। তারপরেই সিবিআইয়ের ব়্যাডারে চলে আসেন সন্দীপ। তার পর থেকে প্রায় নিয়মিত সিবিআইয়ের চক্কর কাটতে হয়েছে তাঁকে। এমনকী দু'বার পলিগ্রাফ টেস্টের মুখেও পড়েন তিনি।
রজি করে মহিলা চিকিৎসকের দেহ উদ্ধার হয় গত ৯ অগস্ট। সেই সময়ে হাসপাতালের অধ্যক্ষ ছিলেন সন্দীপ। ওই চিকিৎসককে ধর্ষণ এবং খুন করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। ঘটনার তদন্তভার এখন সিবিআইয়ের হাতে। এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পরেই নিরাপত্তা এবং উপযুক্ত বিচারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন আরজি করের জুনিয়র চিকিৎসকেরা। তাঁদের বিক্ষোভের অন্যতম কারণ ছিলেন সন্দীপ। তাঁর পদত্যাগের দাবি জানানো হয়। আন্দোলনের চাপে পড়ে সন্দীপ নিজেই অধ্যক্ষ পদ থেকে ইস্তফা দেন। পরে তাঁকে ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ হিসাবে নিয়োগ করেছিল রাজ্য সরকার। সেখানেও বিক্ষোভ শুরু হয়। কলকাতা হাই কোর্ট এর পর সন্দীপকে লম্বা ছুটিতে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল। পরে ন্যাশনাল মেডিক্যালের দায়িত্ব থেকেও তাঁকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
RG Kar Hospital Incident: এই অপরাধ প্রসঙ্গে বারবার উঠে আসছে উত্তরবঙ্গ লবির নাম। শুধু সরকারি নয়, বেসরকারি চিকিৎসকদের ক্ষেত্রে, এমনকী স্বাস্থ্যদফতর, স্বাস্থ্যকর্মী, প্রায় প্রতিটা স্তরেই এই লবির কথা কান পাতলেই শোনা যাবে।
আইএমএ-র কলকাতা শাখার ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন সন্দীপ ঘোষ। প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত সন্দীপের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ স্বাস্থ্য দফতরে ছড়ি ঘোরানো কুখ্যাত উত্তরবঙ্গ লবিরও। এমনকী ওই তরুণীর দেহ উদ্ধারের সময়েও ঘটনাস্থলে ঘোরাফেরা করতে দেখা গিয়েছিল সেই লবির তাবড় ব্যক্তিদের। ইতিমধ্যেই ভাইরাল হওয়া ভিডিওয় দেখা গিয়েছে তাঁদের অনেককেই। এই লবির বিরুদ্ধে অসংখ্য অনিয়মের অভিযোগ। যদিও তার পরেও ক্ষমতাবলে স্বাস্থ্যদফতর তো বটেই, সরকারি ও বেসরকারি চিকিৎসকদের মাথার উপরেও ছড়ি ঘুরিয়ে গিয়েছে সেই লবি। আর তাদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত সন্দীপ।
সেই সন্দীপের বিরুদ্ধেও নানা ধরনের দুর্নীতি ও অনৈতিক কাজে যুক্ত থাকার ঝুড়ি ঝুড়ি প্রমাণ উঠে এসেছে তদন্তকারীদের হাতে। ইতিমধ্যেই সেই আর্থিক দুর্নীতির মামলায় স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এগিয়ে এসেছে ইডি। সিবিআইয়ের তদন্ত তো চলছেই। আর এসব দেখে-শুনেই এবার সন্দীপকে সাসপেন্ড করার সিদ্ধান্ত নিল সর্বভারতীয় চিকিৎসক সংগঠন ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন। আরজি করের ন্যক্কারজনক ঘটনার প্রেক্ষিতে আগেই তাঁর সদস্যপদ প্রত্যাহার করা হবে কি হবে না, তা ঠিক করতে একটি শৃঙ্খলারক্ষা কমিটি গঠন করেছিলেন ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের সর্বভারতীয় সভাপতি ড. আরভি অশোকান। সেই কমিটিই এদিন সর্বসম্মতিক্রমে ডঃ সন্দীপ ঘোষের আইএমএ সদস্যপদ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এক বিবৃতিতে আইএমএ জানিয়েছে, স্বতঃপ্রণোদিতভাবে আরজি কর মেডিকেল কলেজের স্নাতকোত্তর প্রশিক্ষণাধীন মহিলা চিকিৎসকের ধর্ষণ এবং হত্যার অভিযোগ এবং তার পরবর্তী ঘটনাবলী বিবেচনা করেছে কমিটি।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
RG Kar Doctor Rape-Murder: অভিযোগ, ওই বাইকটিতে চেপেই সেদিন আরজিকর হাসপাতালে গিয়েছিল ধৃত সঞ্জয়। ঘটনার আগে পাওয়া সিসিটিভি ফুটেজেও সেই ছবি ধরা পড়েছে।
আইএমএ জানিয়েছে, আরজি করে নির্যাতিতার পরিবারের সঙ্গে কথা বলে এবং অন্য চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে সন্দীপের বিরুদ্ধে এই পদক্ষেপের সিদ্ধান্ত তারা নিয়েছে। নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, আরজি করের ঘটনার পর স্বতঃপ্রণোদিত পদক্ষেপ করে আইএমএ। সংগঠনের জাতীয় প্রেসিডেন্ট আরভি অশোকান একটি কমিটি গঠন করেছিলেন। সেই কমিটির সদস্যেরা নির্যাতিতার বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন। নির্যাতিতার পরিবার সন্দীপের উপর ক্ষোভ উগরে দেন চিকিৎসক সংগঠনের কাছে। অভিযোগ, এই ঘটনায় সন্দীপের ভূমিকা মোটেই আশানুরূপ নয়। যে ভাবে তিনি গোটা বিষয়টি সামলানোর চেষ্টা করেছেন, তাতে সহানুভূতির অভাব ছিল। এ প্রসঙ্গে আইএমএ-র পশ্চিমবঙ্গ শাখার আধিকারিকদের সঙ্গেও কথা বলেছিল ওই কমিটি। সেখান থেকেও সন্দীপের বিরুদ্ধে নানাবিধ অভিযোগ আসে। নির্দেশিকায় আইএমএ আরও জানিয়েছে, সন্দীপের বিরুদ্ধে সংগঠনের অনেক চিকিৎসকই ক্ষুব্ধ। অভিযোগ, তিনি এই পেশাকে কলঙ্কিত করেছেন। অনেকেই তাঁর শাস্তির দাবি জানান। এর পরেই সন্দীপকে সাসপেন্ড করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আইএমএ।
গত ৯ অগস্ট আরজি কর হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চার তলার সেমিনার রুম থেকে উদ্ধার হয় এক তরুণী চিকিৎসকের ক্ষতবিক্ষত দেহ। ময়নাতদন্তে ধর্ষণের পাশাপাশি মেলে ভয়ঙ্কর মারধর ও নির্যাতনের প্রমাণ। এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পরেই নিরাপত্তা এবং উপযুক্ত বিচারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন আরজি করের জুনিয়র চিকিৎসকেরা। নির্যাতিতাকে সুবিচার এনে দেওয়ার লড়াইয়ে নেমেছিল গোটা রাজ্য, দেশ। সেই আন্দোলন, বিক্ষোভের ঢেউ এখনও চলছে। ঘটনায় কলকাতা হাইকোর্টে দায়ের হয়েছিল একাধিক জনস্বার্থ মামলা। সেই মামলার শুনানিতে সিবিআইয়ের হাতে তুলে দেওয়া হয় তদন্তভার। আরজি করের ঘটনায় স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মামলা দায়ের করে সুপ্রিম কোর্টও।
ইতিমধ্যেই আরজি কর মামলার তদন্তের কাজ চালাচ্ছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই। গত ১৬ অগস্ট থেকে প্রাক্তন অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষকে লাগাতার জিজ্ঞাবাদ করছে সিবিআই। প্রায় প্রতিদিনই সকালে উঠেই সিজিও কমপ্লেক্সে যেতে হচ্ছে তাকে, বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত। কোনও কোনওদিন আবার তার বাড়িতে এসে চড়াও হচ্ছেন সিবিআই আধিকারিকরা। তার বেলেঘাটার বাড়িতে একাধিক বার তল্লাশি চালিয়েছে সিবিআই। ইতিমধ্যেই দু-দু'বার পলিগ্রাফ টেস্ট করেছে সিবিআই। এবার আইএমএ-র পদও খোয়ালেন সেই সন্দীপ। যেভাবে একের পর এক সন্দীপের দুর্নীতি প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে, তাতে আর কী কী অপেক্ষা করছে আরজি করের প্রাক্তন অধ্যক্ষের জন্য, সেটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।





