সারদার নাগপাশ থেকে আংশিক মুক্ত কুণাল, কোন কারণে এখনও জেলে সুদীপ্ত সেন?

জেল থেকে ছাড়া পেয়ে ঘরের ছেলের মতো ঘরে ফিরে এসে সরব হয়েছেন কুণাল ঘোষ। বারবার তৃণমূলের হয়ে বিভিন্ন ইস্যুতে তাঁকে সুর চড়াতে দেখা গেছে। তিনি দলের মুখপাত্র। দলের হয়ে কথা বলবেন, সেটাই তো স্বাভাবিক। একটু বেশিই আওয়াজ তুলেছেন, তাতেই কি খুশি হয়েছেন দিদি? সে যাই-ই হোক, তিনি সারদা মামলায় বড় স্বস্তি পেলেন এটা ঠিক, তবে নিন্দুকরা বলছেন, এ তাঁর সাম্প্রতিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডর পুরস্কার নয় তো? রাজনীতিবিদরা বলে থাকেন, আইন তার নিজের পথে চলে। এক্ষেত্রে তার ব‍্যতিক্রম হয়েছে, একথা ধরে নেওয়ার মতো অখণ্ড যুক্তি এখনই হাতের নাগালে নেই। তবে চর্চাও চলবে আপন গতিতে।

সারদার প্রথম গ্রেপ্তারি মামলা থেকে অভিযোগমুক্ত হলেন তৃণমূলের রাজ্য সম্পাদক তথা মুখপাত্র কুণাল ঘোষ। এমপি-এমএলএ কোর্টের বিচারক মনোজ্যোতি ভট্টাচার্য তাঁকে অভিযোগমুক্ত বলে ঘোষণা করলেন। একই সঙ্গে সারদাকাণ্ডে প্রথম গ্রেপ্তারি মামলায় সুদীপ্ত সেন, দেবযানী মুখোপাধ্যায় এবং সোমনাথ দত্তকেও অভিযোগমুক্ত বলে ঘোষণা করা হয়েছে। সাজার একটা নির্দিষ্ট মেয়াদ আছে। আর সেই মেয়াদ পার করে জেলে রয়েছেন বলে জানিয়েছিলেন সারদা-কর্তা সুদীপ্ত। ৬ এপ্রিল সেই আবেদনে সাড়া দেন বিচারক। এবং তাঁকে জেল হেফাজত থেকে মুক্তি দেন। এদিনও আদালত তাঁকে অভিযোগমুক্ত ঘোষণা করেছে। তাও তাঁর ঠিকানা শ্রীঘর।

কুণালের গ্রেপ্তারি ও চ্যালেঞ্জ
সারদার যে মামলায় ২০১৩ সালের ২৩ নভেম্বর প্রথম গ্রেপ্তার হন, সেই মামলাকে চ্যালেঞ্জ করে কোর্টে গিয়েছিলেন কুণাল। এমপি-এমএলএ কোর্টে শুনানি চলছিল এযাবৎ। কুণালের আইনজীবী অয়ন চক্রবর্তী বলেন, "অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। অকারণে আমার মক্কেলকে হয়রান করা হয়েছে।" আদালতেও এই নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। শেষ পর্যন্ত বিচারক মনোজ্যোতি ভট্টাচার্য এই দিন কুণালকে অভিযোগমুক্ত ঘোষণা করেন। শুধু তাই নয়, একই সঙ্গে এই মামলায় সুদীপ্ত সেন, দেবযানী মুখোপাধ্যায় ও সোমনাথ দত্তকেও অভিযোগমুক্ত ঘোষণা করেন তিনি।

আরও পড়ুন: মেয়াদ শেষ, তবু কেন আজও জেলের ভিতর সুদীপ্ত সেন

দলের একাংশর বিরুদ্ধে তোপ
সারদা গোষ্ঠীর মিডিয়া কর্মীদের বেতন এবং প্রভিডেন্ট ফান্ড-সংক্রান্ত মামলাটি দীর্ঘদিন ধরে চলছিল। এতে কুণালকেই প্রথম গ্রেপ্তার করা হয়। সরকারি আইনজীবীও স্বীকার করেন, যেভাবে কুণালকে গ্রেফতার করা হয়েছিল, তাতে যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু ২০১৩-'১৪ সালে জমা দেওয়া চার্জশিটে তেমন কিছু নেই। এই দিন বিচারক বলেন, "শুধু কুণাল নন, অভিযুক্ত সকলকেই ডিসচার্জড ঘোষণা করছি।"

এই দিন অভিযোগমুক্ত হয়েই আদালতের বাইরে দাঁড়িয়ে দলের একাংশের বিরুদ্ধেই বিস্ফোরক অভিযোগ করেন কুণাল। নাম না করে তিনি বলেন, "যাঁরা আমার গ্রেপ্তারের পিছনে ছিলেন, তাঁদের চিনি। তাঁরাও আমাকে চেনেন। দু'তিন জন ভুল বোঝানোর কাজ করেছিলেন। ব্যক্তিগত রাগ মেটাতে ভুল গল্প তৈরি করেছেন। গ্রেপ্তারের দিন দলের কেউ সাহায্য করেনি। আমার লড়াই আমার মতো লড়ে নেব।"

সুদীপ্ত কেন শ্রীঘরে
আর্থিক প্রতারণার মামলায় সর্বোচ্চ শাস্তি সাত বছর জেল। কিন্তু ইতিমধ্যেই ন'বছর জেল হেফাজতে রয়েছেন সুদীপ্ত। কেন মুক্তির আবেদন করছেন না? সুদীপ্ত বলেন, ‘‘আমার পাশে আর কেউ নেই। আমার টাকা নেই। কোনও উকিল নেই। আমার হয়ে আবেদন করবেন কে?’’ আসলে যত দূর জানা গেছে, সুদীপ্ত সেনের নামে বিভিন্ন আদালতে প্রায় শতাধিক মামলা রয়েছে। তাই কোনও একটি মামলাতে তিনি রেহাই পেলেও, আসলে তাঁর স্বস্তি নেই। অন্য কোনও মামলায় তাঁকে বন্দি থাকতে হয়েছে।

২০১৩ সালের ২৩ এপ্রিল সারদা-কাণ্ডে কাশ্মীর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল সুদীপ্তকে। তাঁর বিরুদ্ধে রাজ্য পুলিশ বিভিন্ন জেলায় প্রায় ১৯৪টি মামলা রুজু করে। পরে তদন্তভার হাতে নিয়ে সুদীপ্তর বিরুদ্ধে চারটি মামলা দায়ের করে সিবিআই। পাশাপাশি, এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) এবং সেবি-ও সুদীপ্তর বিরুদ্ধে মামলা রুজু করে। সিবিআইয়ের তিনটি মামলায় সুদীপ্তর জামিন হয়েছে। রাজ্য পুলিশের অধিকাংশ মামলাতেও তিনি জামিন পেয়েছেন। তবে আর্থিক অবস্থার কারণে বেশিরভাগ মামলাতেই ‘বেল বন্ড’ জমা দেননি সুদীপ্ত।

শীর্ণকায় চেহারা। পায়ে শতশ্ছিদ্র হাওয়াই চটি। কাঁচাপাকা, প্রায় এক ফুট লম্বা দাড়ি। মুখের চামড়া কুঁচকে গিয়েছে। মাথায় বেশ কয়েক মাস না-কাটা চুল। বারবার টিভি ক‍্যামেরায় জেল থেকে আদালতে নিয়ে যাওয়ার সময় এরকম ছবি ধরা পড়ে তাঁর। এক সময়ে বিলাসবহুল জীবনে অভ্যস্ত সুদীপ্ত সেনের আজ ভিখিরির দশা। সব সম্পত্তি খুইয়েছেন। বেল বন্ড দেওয়ার টাকা তাঁর নেই। নেই আইনজীবী রাখার টাকা। আদালতে দাঁড়িয়ে তাঁকে নিজের জামিনের আবেদনও করতে দেখা গেছে।

সুদীপ্তর হয়ে আগে মামলা-লড়া আইনজীবী বিপ্লব গোস্বামী বলেন, ‘‘বিভিন্ন আদালতে মামলা রয়েছে। সব সময় উনি আমাদের খবর দেন না। সিবিআইয়ের মামলায় জামিনের জন্য আবেদন করা হয়েছে। সুদীপ্ত এখন আর কোনও মামলায় জামিনের বিষয়ে উৎসাহী নন। কোনও কথাই বলতে চান না। আমরাই জোর করে জামিনের আবেদন করে থাকি।’’

বারবার নানা মহলে এই প্রশ্ন মাথাচাড়া দিয়েছে, কুণাল বুক ফুলিয়ে রাজনীতির অলিন্দে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, আর মেয়াদ শেষের পরেও হাজতবাস সুদীপ্তর, কেন?

এর উত্তর খুঁজতে গেলে প্রথমেই বলা দরকার, দুটো মামলা ধারে ও ভারে আলাদা। সারদা গোষ্ঠীর মিডিয়া কর্মীদের বেতন এবং প্রভিডেন্ট-সংক্রান্ত মামলায় জড়িয়েছিলেন কুণাল। আর সুদীপ্তর মাথায় আর্থিক প্রতারণা-সংক্রান্ত একাধিক মামলার খাঁড়া ঝুলছিল। কোনও কোনও মামলায় তিনি জামিন পেলেও একদিকে সব খুইয়ে তাঁর বেল বন্ড দেওয়ার ক্ষমতা হয়নি। তার ওপর বহু মামলার খাঁড়া এখনও তাঁর মাথায়। সুদীপ্ত সেন কবে বন্দি-মুক্তির স্বাদ পাবেন, কে জানে!

More Articles

;