মেয়াদ শেষ, তবু কেন আজও জেলের ভিতর সুদীপ্ত সেন

যে কোন ধারায় সাজার একটা নির্দিষ্ট মেয়াদ থাকে। সেই মেয়াদ পার করে যাবার পরেও এখনও জেলে রয়েছেন বলেই আদালতে আর্জি রেখেছিলেন সারদা-কর্তা সুদীপ্ত সেন। অবশেষে সেই আবেদনে সাড়া দিলেন কলকাতার বিচার ভবনের সিবিআইয়ের বিশেষ আদালতের বিচারক সৈয়দ মাসুদ হোসেন। দীর্ঘ ৭ বছর পর একটি মামলা থেকে মুক্তি পেলেন সুদীপ্ত সেন। তবে, জেলমুক্তি এখনই নয়। তার মাথায় রয়েছে একাধিক মামলার খাঁড়া। সেইসব মামলায় তদন্তের কারণেই বাইরে বেরোনো হচ্ছে না সুদীপ্ত সেনের।

কে ছিলেন এই সুদীপ্ত সেন?

একজন রিয়েল এস্টেট এজেন্ট থেকে সরাসরি একজন মিডিয়া ব্যারন, সুদীপ্ত সেনের উন্নতিটা ছিল একেবারে উল্কার গতিতে। নব্বইয়ের দশকের শেষ দিক থেকেই ব্যবসায় পদার্পণ সুদীপ্ত সেনের। প্রথমদিকে শুধুমাত্র রিয়েল এস্টেটের ব্যবসা ছিল তার। কিন্তু তারপরেই চিত্রটা পাল্টাতে শুরু করে। ২০০৬ সালে তিনি শুরু করেন বাংলার ইতিহাসের সব থেকে বড় চিটফান্ড সারদা। খাতায়-কলমে তিনি জানিয়েছিলেন, তিনি মা সারদার ভক্ত এবং মা সারদার আদর্শ বাংলার সবথেকে নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষের কাছে পৌঁছে দেবার জন্যই তিনি শুরু করেছিলেন এই সারদা গ্রুপ। এই সারদা গ্রুপ অফ কম্পানিজের অধীনে ছিল দুটি কোম্পানি। একটি হলো সারদার টুর এন্ড ট্রাভেল এবং অন্যটি হলো একটি নন-ব্যাঙ্কিং অরগানাইজেশন। আদতে এই নন-ব্যাঙ্কিং অর্গানাইজেশনটি ছিল সারদা চিটফান্ড।

তবে এই দুটি ছাড়াও, সারদা কোম্পানির আরো কিছু ছোট ছোট ব্যবসা ছিল। সারদা রিয়েলটি, সারদা কনস্ট্রাকশন, সারদার একাধিক মিডিয়া চ্যানেল সবকিছুই ছিল এই সারদা গ্রুপের অধীনে। ২০০৯ সালে এই গ্রুপের পরিধি আরো বাড়তে শুরু করে যখন তারা পশ্চিমবঙ্গের মিডিয়াতে প্রবেশ করে। এই বছরেই পশ্চিমবঙ্গের লঞ্চ হয় চ্যানেল টেন। এটি একটি বাংলা খবরের চ্যানেল হলেও, এর মূল কাজটি ছিল সারদা গ্রুপের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি। ২০১০ সালে সুদীপ্ত সেন নিয়ে আসেন একটি ইংরেজী এবং একটি বাংলা সংবাদপত্র। ইংরেজি সংবাদপত্রটির নাম ছিল বেঙ্গল পোস্ট এবং বাংলা সংবাদপত্রটির নাম ছিল সকালবেলা। এই দুটি সংবাদপত্রের মাধ্যমে বাংলার মিডিয়া জগতেও পসার বৃদ্ধি করতে শুরু করেন সুদীপ্ত সেন।

তবে, তার কর্মীদের কাছে তিনি ছিলেন একেবারেই অজানা। তার কোনো কর্মী তাকে তেমন ভাবে চিনত না। সুদীপ্ত সেন আসলে কে, কি তার পরিচয়, তার আবির্ভাব কিভাবে? কোন কিছু নিয়েই তেমন কোনো তথ্য ছিল না কারোর কাছে। এমনকি সারদা মিডিয়া লিমিটেডের উচ্চপদস্থ কর্মচারীরাও খুব কম সময়ই তাকে দেখেছিলেন। এই সারদা মিডিয়া কোম্পানি প্রধান মুখ ছিলেন বর্তমান তৃণমূল কংগ্রেস মুখপাত্র কুণাল ঘোষ। সেই সময়, এক বাম নেতা অভিযোগ করেছিলেন, সুদীপ্ত সেন নাকি সঞ্চয়ীনি সেভিংস অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানির কর্ণধার ভূদেব সেনের পুত্র। তবে এই নিয়ে এখনো পর্যন্ত কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

আরও পড়ুন-অস্ত্রেও রাশিয়াকে টেক্কা, ‘চাণক্য’ জেলেনস্কির কূটবুদ্ধির জোরে এগিয়ে ইউক্রেন

সারদা চিটফান্ডের শুরু

যে কোন সাধারণ চিটফান্ডের মতোই কাজ করতে শুরু করেছিল সারদা। কম সময়ে বেশি রোজগারের ফাঁদ পেতে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে শুরু করেছিল এই কোম্পানিটি। ২৫ শতাংশ কমিশন দেওয়া হতো এই নেটওয়ার্ক এজেন্টের। এছাড়াও, সেবির তরফ থেকেও এই সারদা গ্রুপকে কালেক্টিভ ইনভেস্টমেন্ট স্কিম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই ২,৫০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করে সারদা। একাধিক ফিল্মস্টার, সরকারের বড় বড় ইভেন্ট, দুর্গাপুজো, এই সমস্ত কিছুর মাধ্যমে জাল বিস্তার শুরু করেছিল সারদা গ্রুপ। শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, উড়িষ্যা, আসাম এবং ত্রিপুরাতেও ছড়িয়ে পড়েছিল এই সংস্থাটি।

কী ভাবে কাজ করত সারদা?

সারদা সংস্থাটি পশ্চিমবঙ্গ এবং অন্যান্য রাজ্যের সব থেকে নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের মধ্যে খুব তাড়াতাড়ি ছড়িয়ে পড়ে। এই সংস্থাটি এই সমস্ত মানুষদের থেকে টাকা নিয়ে তাদেরকে অত্যন্ত উচ্চ রিটার্ন দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সেবির সমস্ত নিয়ম-নীতিকে লংঘন করেই এই সংস্থা কাজ করতো। সেবির নীতি অনুযায়ী, কোন সংস্থা সঠিক ব্যালেন্স শিট ছাড়া ৫০ এর বেশি মানুষের কাছ থেকে কিন্তু টাকা সংগ্রহ করতে পারবে না। পাশাপাশি, যদি সেবি দ্বারা সেই সংস্থা মানকপ্রাপ্ত না হয় তাহলে সেই সংস্থা কোন সাধারণ মানুষের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করতে পারবে না।

২০০৯ সালে যখনই সংস্থার বিরুদ্ধে সেবি ব্যবস্থা নেওয়া শুরু করে, ঠিক তখনই এই গ্রুপটি ২৩৯ টি সংস্থায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। একটি কর্পোরেট কমপ্লেক্স তৈরি করে কাজ করতে শুরু করে সারদা। ট্যুরিজম প্যাকেজ, ফরওয়ার্ড ট্রাভেল এবং হোটেল বুকিং, টাইম শেয়ার ক্রেডিট ট্রান্সফার, রিয়েল এস্টেট, ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফিনান্স, মোটরসাইকেল ম্যানুফ্যাকচারিং ইউনিট তৈরি করে সারদা গ্রুপ অফ কোম্পানি নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়। এতগুলি সংস্থায় ভাগ হয়ে গেলেও, তখনও তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল সাধারণ মানুষের টাকা আত্মসাৎ। ১৯৮২ চিটফান্ড আইন অনুযায়ী, অনেকে এই সংস্থায় বিনিয়োগ পর্যন্ত করে। কিন্তু, রাজ্য সরকারের এই আইনে অনেক ফাঁক ছিল, যার ব্যাপারে অবগত ছিলেন না এই কোম্পানির বিনিয়োগকারীরা।

সুদীপ্ত সেন - দ্যা মাস্টারমাইন্ড

এসিবিকে দেওয়া একটি ১৮ পাতার চিঠিতে পশ্চিমবঙ্গের সব থেকে বড় চিটফান্ড কেলেঙ্কারি মাথা সুদীপ্ত সেন লিখেছিলেন, "আমি আমার ব্যবসা কখনোই নিজে বড়লোক হবার জন্য শুরু করিনি। আমি মা সারদার আদর্শ এবং তার নীতিতে বিশ্বাস রাখি এবং ভারতের গরিব এবং নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষদের মধ্যে সেই আদর্শবাদকে ছড়িয়ে দিতে চাই।"

কিন্তু, এত বড় চিটফান্ড কেলেঙ্কারির এই মাস্টারমাইন্ডের উত্থান বড় অদ্ভুত ভাবে। তার পাসপোর্ট অনুযায়ী ১৯৫৯ সালের ৩০ মার্চ তার জন্ম হয়। জন্মসূত্রে তার নাম ছিল শংকরাদিত্য। তার বাবা নৃপেন্দ্র নারায়ণ এবং তার মা রানু সেন ঢাকা থেকে দেশভাগের সময় এদিকে আসেন।

১৯৬০ এর গোড়ার দিক থেকে এন্টালির হাজরা বাগান লেনে নিজের তিন ভাই এবং বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকতে শুরু করেন সুদীপ্ত। ১৯৭০ সালের নকশাল আন্দোলন তাকে দারুণ ভাবে উদ্বুদ্ধ করেছিল। সেই সময় নকশাল আন্দোলনের প্রধান নেতা চারু মজুমদারের নকশালপন্থী চিন্তাধারায় তিনি দীক্ষিত হন এবং পরবর্তীতে নকশাল আন্দোলনে অংশ নেন। ১৯৭১ সালে জেল হেফাজত হওয়ার পরে সুদীপ্ত সেন নকশাল আন্দোলন থেকে দূরে সরে আসেন এবং সন্তোষপুর সার্ভে পার্কের একটি বাড়িতে বসবাস শুরু করেন। যদিও তার নামে মামলা এই প্রথম ছিল না। এর আগে ১৯৯০ সালে তার নাম উঠেছিল মানব পাচার চক্রের মামলাতেও। অনেকে বলেন, তিনি প্লাস্টিক সার্জারি করে নিজের চেহারা পরিবর্তন করেছেন। অনেকের বক্তব্য আবার, ২০০৪ পর্যন্ত সুদীপ্ত নাম নিয়ে উত্তরপ্রদেশে গা-ঢাকা দিয়েছিলেন তিনি।

সিবিআইকে দেওয়া একটি চিঠিতে সুদীপ্ত সেন লিখেছিলেন, সারদা গ্রুপ সম্পূর্ণরূপে রিয়েল এস্টেট ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত একটি গ্রুপ ছিল। তবে, তার কোম্পানিতে কাজ করা কর্মীরা সব সময় এই দাবি করে এসেছেন সুদীপ্ত সেনের মূল ব্যবসা ছিল চিটফান্ড। সারদা গ্রুপের ওয়েব সাইটেও তেমনভাবে চিটফান্ডের কোনো উল্লেখ ছিল না। তবে সারদা কাজ করতো বিভিন্ন এজেন্টের মাধ্যমে। সারদা গ্রুপ সরাসরি কারো সঙ্গে যুক্ত হতো না। সেই সাধারণ মানুষের সঙ্গে যুক্ত হতেন সারদা গ্রুপের এজেন্টরা। এই কারণেই সারদা গ্রুপের ওয়েবসাইটে চিটফান্ড নিয়ে কোন উল্লেখ থাকে না। তবে, বিনিয়োগকারীদের থেকে টাকা নিয়ে কিছু কাজ তো দেখাতে হবে। তাই, খাতায়-কলমে দেখানোর জন্য তারা বিভিন্ন রুগ্ন সংস্থার কিছু ওয়্যারহাউজ জলের দরে কিনতে শুরু করে। ২০১১ সালে তারা ক্রয় করে গ্লোবাল মোটরসের হুগলি ফ্যাক্টরি, যা আগেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সেখানকার ১৫০ জন কর্মচারীকে কয়েক মাসের মাইনে দিয়ে এমন ভাবে দেখানো হয়েছিল যেন, সেই ফ্যাক্টরি এখনও কাজ করে। সারদা কোম্পানির বিভিন্ন বিজ্ঞাপনে থাকত জনপ্রিয় বাংলা অভিনেতা অভিনেত্রীদের মুখ। এমনকী তৃণমূল সাংসদ শতাব্দী রায় একটা সময় পর্যন্ত সারদা গ্রুপের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর ছিলেন।

সারদা কেলেঙ্কারির পর্দাফাঁস

২০০৯ সাল থেকেই সারদা কোম্পানির বিরুদ্ধে একাধিক প্রমাণ জোগাড় করতে শুরু করে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক নেতারা। প্রথম থেকেই সারদা গ্রুপের সঙ্গে একটা যোগাযোগ ছিল তৃণমূল কংগ্রেসের। ২০১১ নির্বাচনেও তৃণমূল কংগ্রেসের প্রচারে অন্যতম ভূমিকা নিয়েছিল সারদা গ্রুপ। কিন্তু, ২০১২ সালে সেবি সরাসরি এই সংস্থার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ শুরু করে। এই সংস্থাকে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করা থেকে বিরত থাকার আদেশ দেওয়া হয়। ২০১৩ সালের জানুয়ারি মাসে প্রথমবার ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে সারদা গ্রুপ। এই সংস্থার মিডিয়া চ্যানেলের কর্মীদের দেওয়া পে চেক বাউন্স হতে শুরু করে। এই মাসেই প্রথমবার তাদের ব্যয় আয়ের থেকে কম হয়ে যায়। তার পরের কয়েক মাসে লাগাতার কমতে শুরু করে এই সংস্থার আয়।

২০১৩ সালের এপ্রিল মাসের ১৫ তারিখ, নববর্ষের দিন এই সংস্থা দেউলিয়া বলে ঘোষিত হয় এবং বিধাননগর থানায় এই সংস্থার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ দায়ের হতে শুরু করে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে কোটিপতি বিনিয়োগকারী, সকলেই সুদীপ্ত সেনের বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগ আনেন। পশ্চিমবঙ্গ পুলিশকে ১৮ পাতার একটি চিঠি লিখে পশ্চিমবঙ্গ থেকে পালিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নেন সুদীপ্ত সেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। ২০১৩ সালের ২০ এপ্রিল কাশ্মীরের শোনমার্গে সরকারি দেবযানী মুখোপাধ্যায় এর সঙ্গে গ্রেফতার হন সুদীপ্ত সেন।

তদন্তকারীরা জানতে পারে, শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গ কিংবা ভারত নয়, দুবাই, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং সিঙ্গাপুর থেকেও অর্থলগ্নি সংগ্রহ করেছে সারদা গ্রুপ। তৎক্ষণাৎ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের তরফ থেকে একটি স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিম গঠন করা হয় এই মামলার পরিপ্রেক্ষিতে। তবে খুব একটা বেশি দিন এই সিট তদন্ত করতে পারেনি। এই মামলা পৌঁছে যায় সিবিআইয়ের হাতে। আসাম থেকে এই মামলার তদন্ত শুরু করে সিবিআই। সেই রাজ্যের পুলিশের কাছে দায়ের করা মামলার পরিপ্রেক্ষিতে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট অর্থ জালিয়াতির মামলা শুরু করে একাধিক রাঘববোয়ালদের বিরুদ্ধে। ২০১৪ সালে সুপ্রিম কোর্ট এই মামলার তদন্ত তুলে দেয় সিবিআইয়ের হাতে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সিটের তরফ থেকে যা তদন্ত করা হয়েছিল তার সমস্ত নথি চলে আসে সিবিআইয়ের হাতে।

রাজনৈতিক যোগসাজশ

এই সারদা চিটফান্ড মামলার সঙ্গে সরাসরি ভাবে জড়িত ছিল তৃণমূল কংগ্রেস। ২০১০ সালে এই সংস্থা যখন ক্ষতির সম্মুখীন হতে শুরু করেছে, সেই সময়ই রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে যোগসাজশ করতে শুরু করেন সুদীপ্ত সেন। দুজন বড় মাপের তৃণমূল কংগ্রেস সাংসদ ছাড়াও এই মামলায় প্রশ্ন উঠতে শুরু করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে। কংগ্রেস পরিচালিত কেন্দ্রীয় সরকার এই মামলা থেকে হাত ধুয়ে নিতে শুরু করে ১৯৮২, চিটফান্ড আইনের দোহাই দিয়ে।

২০১০ থেকেই মিডিয়া হাউজ এর পাশাপাশি বাংলা সিনেমা জগতে প্রডিউসার হিসেবে উত্থান হয় সুদীপ্ত সেনের। সেই সূত্রে তৃণমূল সাংসদ শতাব্দী রায় এবং তৎকালীন রাজ্যসভার সংসদ মিঠুন চক্রবর্তীর সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে সুদীপ্ত সেনের। সেই সময়ে সারদা গ্রুপের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর ছিলেন মিঠুন চক্রবর্তী এবং শতাব্দী রায়। ২০১০ সালে সারদা গ্রুপের মিডিয়া হাউজের সিইও হিসেবে নিযুক্ত হন তৎকালীন তৃণমূল সাংসদ কুণাল ঘোষ। মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রিতে ৯৮৮ কোটি টাকা খরচ করে ১,৫০০ সাংবাদিক নিয়োগ করে এই সংস্থা। ২০১৩ পর্যন্ত পাঁচটি ভাষায় আটটি সংবাদপত্র পুরোদমে চলছিল এ গ্রুপের অধীনে। শোনা যায়, সে সময় কুনাল ঘোষের মাসিক আয় ছিল ১৬ লক্ষ টাকা।

কুনাল ঘোষ ছাড়াও তৎকালীন তৃণমূল কংগ্রেস সাংসদ সৃঞ্জয় বোস এই মামলার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তৎকালীন পরিবহণমন্ত্রী মদন মিত্র ছিলেন এই কোম্পানির কর্মচারী ইউনিয়নের সর্বময় কর্তা। কলকাতা পুলিশকে তুষ্ট রাখার জন্য তাদেরকে পেট্রোল চালিত মোটরসাইকেল গিফট করেছিল শারাদা গ্রপ অফ কম্পানিজ। এছাড়াও, নকশাল আক্রান্ত একাধিক জেলায় মোটরসাইকেল এবং অ্যাম্বুলেন্স উপহার দিয়েছিল এই সংস্থাটি।

অনেকেই বলেন, শুধু তৃণমূল কংগ্রেস নয়, কংগ্রেসের সঙ্গেও গোপন আঁতাত ছিল সারদা গ্রুপের। তৎকালীন কেন্দ্রীয় রাজ্য মন্ত্রী মাতাং সিং এবং আসামের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী বিজেপি নেতা হিমন্ত বিশ্ব শর্মার সাথে বেশ ভালো যোগাযোগ ছিল সুদীপ্ত সেনের। হিমন্ত বিশ্ব শর্মার স্ত্রী রিংকি শর্মাও এই মামলায় অন্যতম অভিযুক্তদের মধ্যে একজন ছিলেন। আসামে তার টিভি চ্যানেলে সারদা গ্রুপের বিজ্ঞাপন চালানোর জন্য তিনি মোটা অংকের টাকা নিয়েছিলেন বলে অভিযোগ তুলেছিল সিবিআই।

তবে তৃণমূল কংগ্রেস এই মামলায় ছিল সবথেকে বড় অভিযুক্ত। সৃঞ্জয় বসু, মদন মিত্র এবং কুণাল ঘোষের মতো তৃণমূল নেতাদের গ্রেফতার করেছিল সিবিআই। তৎকালীন টিএমসি ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং প্রাক্তন পশ্চিমবঙ্গের ডিজিপি রজত মজুমদারকেও গ্রেফতার করেছিল সিবিআই। ইস্টবেঙ্গল ফুটবল ক্লাবের প্রাক্তন সদস্য দেবব্রত সরকারকেও গ্রেপ্তার করা হয়। যুব তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান শঙ্কুদেব পণ্ডা, তৃণমূল সাংসদ শতাব্দী রায় এবং তাপস পালও ছিলেন সিবিআইয়ের নজরে। তৎকালীন সময়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডানহাত হিসেবে পরিচিত মুকুল রায়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল তিনি নাকি এই মামলার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তবে পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। আসামের গায়ক এবং পরিচালক সদানন্দ গগৈ এবং ওড়িশার প্রাক্তন অ্যাডভোকেট জেনারেল অশোক মহান্তিকেও জিজ্ঞাসাবাদ করে সিবিআই। তবে এই মামলার সবথেকে সন্দেহজনক বিষয়টি ছিল আসামের প্রাক্তন ডিজিপি শংকর বড়ুয়ার আত্মহত্যা। শোনা যায় এই মামলায় সিবিআই যখন তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে এবং তার বাড়ির খানাতল্লাশি করে, তার পরেই তিনি আত্মহত্যা করেন।

পুলিশ কমিশনারের ভূমিকা

শুধু রাজনৈতিক নেতারা নন, এই মামলায় অভিযোগের তীর উঠেছিল পুলিশের বিরুদ্ধেও। বিধান নগর থানার তৎকালীন কমিশনার রাজীব কুমারকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডেকে পাঠিয়েছিল সিবিআই। ২০১৩ এপ্রিলে সারদা কেলেঙ্কারি ফাঁস হওয়ার পরেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এর তরফ থেকে যে তদন্ত কমিটি বসানো হয়েছিল তার প্রধান ছিলেন এই রাজীব কুমার। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল তিনি নাকি সুদীপ্ত সেন এবং তৃণমূলের প্রথম সারির নেতাদের বিরুদ্ধে থাকা প্রমাণ লোপাট করেছেন। রাজীব কুমার তদন্ত শুরু করার প্রথমেই সারদার সল্টলেকের মিডল্যান্ড পার্কের অফিস থেকে কিছু তথ্য প্রমাণ সংগ্রহ করেন। এর মধ্যে ছিল একটি লাল রঙের ডায়েরি এবং একটি পেনড্রাইভ। এই দুটি জিনিস ছিল সারদা মামলার অন্যতম বড় প্রমাণ। রাজীব কুমারের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, এই দুটি প্রমাণকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। এছাড়াও সিবিআইয়ের অভিযোগ ছিল, সুদীপ্ত সেনের ল্যাপটপ এবং সেলফোন গায়েব করেছেন রাজীব কুমার নিজেই। যদিও রাজিব কুমারের বিরুদ্ধে এখনো পর্যন্ত কোন তথ্য প্রমাণ মেলেনি। দেবযানী মুখোপাধ্যায় জেরার সময় সিবিআইকে জানিয়েছিলেন, সারদার অফিস থেকে এই সমস্ত তথ্য প্রমাণ সংগ্রহ করেছিলেন রাজীব কুমার। তবে সিবিআইয়ের দাবি ছিল এই সমস্ত প্রমাণ কখনোই তাদের হাতে আসেনি।

শুধু তৃণমূল নয়, তালিকা দীর্ঘ

জেলে বসেই সারদা-কর্তা সুদীপ্ত সেনের লেখা একটি চিঠি সিবিআইয়ের হাতে তুলে দিয়েছিল আদালত। আলিপুর আদালত এর চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সিবিআই এর হাতে ওই চিঠি তুলে দিয়ে তদন্ত করে দেখার নির্দেশ দিয়েছিলেন। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের আগে এই চিঠি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ওই চিঠিতে সুদীপ্ত সেন শুভেন্দু অধিকারী এবং বিমান বসু সহ একাধিক রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে টাকা নেওয়ার অভিযোগ জানিয়ে ছিলেন। ডিসেম্বর ২০২০ সালে সারদা-কর্তা সুদীপ্ত সেন মুখ্যমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীকে একটি চিঠি লেখেন। ওই চিঠিতে শুভেন্দু অধিকারী, বিমান বসু, সুজন চক্রবর্তী এবং অধীর রঞ্জন চৌধুরীর বিরুদ্ধে অভিযোগ জানান তিনি। তিনি জানিয়েছিলেন এই চার রাজনৈতিক নেতা বিপুল অঙ্কের টাকা আত্মসাৎ করেছিলেন তার থেকে। তিনি অভিযোগ জানিয়েছিলেন, শুভেন্দু অধিকারী তার থেকে নিয়েছিলেন ৬ কোটি টাকা। সুজন চক্রবর্তী নিয়েছিলেন ৯ কোটি টাকা। বিমান বসু তার কাছ থেকে নিয়েছিলেন ২ কোটি টাকা। এছাড়াও লোকসভার কংগ্রেস দলনেতা অধীর চৌধুরী তার কাছ থেকে ৬ কোটি টাকা নিয়েছেন বলে চিঠিতে অভিযোগ করেছিলেন তিনি।

এখন মামলা কোথায় দাঁড়িয়ে?

সারদা-কর্তা সুদীপ্ত সেন এবং এই কাণ্ডে জামিন পেলেও তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। তাই এখনই তাদের জেল মুক্তি হচ্ছে না। সম্প্রতি সুদীপ্ত সেনের আইনজীবী আদালতে জানিয়েছিলেন, "প্রিভেনশন অফ মানি লন্ডারিং আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ সাজা সাত বছর। কিন্তু সুদীপ্ত সেন সাত বছরের বেশি সময় ধরে জেল হাজতে রয়েছেন তাই তাদের মুক্তি দেওয়া হোক।"

যদিও তদন্তকারী সংস্থার আইনজীবী অভিজিৎ ভদ্র বলেন, 'যেহেতু তিনি অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং দুটি ক্ষেত্রেই মামলার তদন্ত চলছে তাই এই মুহূর্তে মামলা থেকে মুক্তি দেওয়া সঠিক হবে না।' যদিও দুই পক্ষের বক্তব্য শোনার পর বিচারক ১ লক্ষ টাকার ব্যক্তিগত বন্ডে তাকে মুক্তি দেন। তাদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে, যার একটি থেকে মুক্তি পেলেন সুদীপ্ত সেন। যদিও বাকি মামলার কারণে এখনই জেল থেকে বাইরে বের হতে পারবেন না তিনি।

More Articles

;