সিবিআই শিবিরেই বগটুই কাণ্ডে অভিযুক্ত লালনের ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার, কতটা চাপে গোয়েন্দারা?
Bagtui Case Lalan Sheikh : অভিযুক্তের পরিবারের আরও দাবি, সিবিআই এত মার মেরেছে যে উঠে দাঁড়াতেও পারছিলেন না লালন!

ফের উত্তেজনা বাড়াল বগটুই! সিবিআই (CBI) হেফাজতেই মৃত্যু বগটুই কাণ্ডের মূল অভিযুক্ত লালন শেখের (Lalan Sheikh)। রামপুরহাটে সিবিআইয়ের অস্থায়ী শিবিরে ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার হল লালনের। কয়েকদিন আগেই ঝাড়খণ্ডের পাকুড় এলাকা থেকে গ্রেফতার হন এই তৃণমূল নেতা। গত ৪ ডিসেম্বর গ্রেফতারির পর থেকেই আদালতের নির্দেশে সিবিআই হেফাজতে ছিলেন ভাদু শেখের ভাই।
এই ঘটনার পরই বিতর্ক বাড়িয়েছে লালন শেখের পরিবার। তাঁদের অভিযোগ, 'মঙ্গলবারের ঘটনা আত্মহত্যার নয়, খুন করা হয়েছে লালনকে!' অভিযুক্তের পরিবারের আরও দাবি, 'সিবিআই এত মার মেরেছে যে উঠে দাঁড়াতেও পারছিলেন না লালন!' জানা গিয়েছে, সিবিআইয়ের ওই অস্থায়ী শিবিরের শৌচাগার থেকে মঙ্গলবার বিকেল ৫টা নাগাদ লালনের ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার হয়। তারপর সেই দেহের ভিডিওগ্রাফি করায় সিবিআই। ইতিমধ্যেই রামপুরহাট মেডিক্যাল কলেজের পুলিশমর্গে রাখা হয়েছে লালনের দেহ। ময়নাতদন্ত করা হবে ওই মৃতদেহের।
রক্তাক্ত বগটুই
২২ মার্চ। সকাল সকাল ফের প্রকাশ্যে আসে মমতার কেষ্ট মণ্ডলের বীরভূম! বোমা, গুলির লড়াইয়ে বারবার খবরের শিরোনামে আসা এই জেলা নতুন করে সুর চড়ায় ফের। কিন্তু সেই ঘটনা ছিল আরও ভয়ঙ্কর। জানা যায়, রামপুরহাট শহর থেকে কাছেই জাতীয় সড়কের পাশের একটি গ্রাম জ্বলছে দাউ দাউ করে! সঙ্গে ভেসে আসছে পোড়া মাংসের গন্ধ!
তখনও ভয়বহতা আঁচ করেনি গোটা রাজ্য। বেলা গড়াতেই জানা যায়, ওই গ্রামেই পুড়ে খাক হয়েছে একাধিক বাড়ি। আর একের পর এক ঘরে, বারান্দায়, উঠোনে পড়ে রয়েছে দগ্ধ লাশ! অভিযোগ ওঠে পুড়িয়ে মারার। জীবন্ত জ্বালিয়ে মারার অভিযোগে আর্তনাদ করতে থাকেন বেঁচে যাওয়া কয়েকজন। যাঁদের প্রত্যেকেরই প্রিয়জনকে পুড়িয়ে মেরেছে দুষ্কৃতীরা। কিন্তু কেন?
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Justice Abhijit Ganguly: বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, "কুণাল ঘোষের কথা আমি খুব এনজয় করি। রোজ কিছু না কিছু বলেন। তবে আমি কোনও অতিরিক্ত মন্তব্য করব না।"
বগটুই-নেপথ্যে
২১ মার্চ। বোমা মেরে খুন করা হয় বীরভূমের বড়শোল গ্রাম পঞ্চায়েতের উপপ্রধান ভাদু শেখকে। চায়ের দোকানে বসে থাকা অবস্থায় আচমকা তাঁকে লক্ষ্য করে বোমা মারে দুষ্কৃতীরা! মৃত্যু হয় ভাদুর।
এই মৃত্যুই চরম পর্যায়ে পৌঁছয় ওই দিন রাতে। ভাদুর পাশের এলাকায় বাস সোনা শেখদের। তাঁদের দিকেই আঙুল ওঠে খুনের। সরব হয় তৃণমূল নেতা ভাদুর ঘনিষ্ঠরা। একাংশের অভিযোগ, ওই খুনের প্রতিশোধ নিতেই 'প্রশাসনের সঙ্গে যোগসাজশে' বগটুই গ্রামে হামলা চালায় লালন শেখ এবং তাঁর দলবল। একাধিক বাড়ির দরজা বাইরে থেকে আটকে দিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় একের পর এক-কে। অভিযোগ ওঠে, পুলিশ-দমকল ঘটনাস্থলের কাছাকাছি থাকলেও কোনও ব্যবস্থা নেয়নি সেদিন!
উত্তাল রাজ্য
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Anubrata Mondal in jail: একটা সময় তাঁর কথাতেই বাঘে-গরুতে এক ঘাটে জল খেত। এখন অবশ্য জেলের ওপারে অনুব্রত মণ্ডল।
দেশজুড়ে সমালোচনার মুখে পড়েন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিদ্ধ হয় তৃণমূল-সরকার। অস্বস্তি বাড়ে ক্রমশ। উত্তাল হয় মহানগরী। ঘটনাস্থলে তড়িঘড়ি পৌঁছন বিজেপি-র রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদার। আগেভাগেই ঘুরপথে ওই এলাকায় পৌঁছে যান বামনেতা মহাম্মদ সেলিম। কিন্তু সুকান্ত মজুমদারকে গ্রামের মুখ থেকেই ফিরে আসতে হয়। বাধার সম্মুখীন হন বিজেপি নেতা।
আদালতে বগটুই-কাণ্ড
এই ঘটনার নৃশংসতায় অবাক হয় আদালত! মামলা ওঠে কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চে। সেদিন রাজ্যের সিট-র তদন্তে সন্তোষ প্রকাশে করেননি বিচারপতিরা। তদন্তভার দেওয়া হয় সিবিআইকে। তদন্তকারী সংস্থাকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তদন্তভার হাতে নেওয়া এবং ১৫ দিনের মধ্য প্রাথমিক তদন্ত-রিপোর্ট জমা করতে বলে আদালত। নির্দেশের পরেই রামপুরহাট পৌঁছন সিবিআইয়ের তদন্তকারী আধিকারিকরা। অস্থায়ী শিবির তৈরি হয় রামপুরহাটে।
বগটুই এবং মুখ্যমন্ত্রী মমতা
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Anubrata Mondal: একাধিকবার কর্মীদের উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করলেও সর্বদা রাজনৈতিক ভাবে গরম থাকা বীরভূমের বাঘের এই পরিস্থিতিতে তৈরি হয়েছে শূন্যতা।
ঘটনার আকস্মিকতা এবং রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনার রেশ কাটতে না কাটতেই ঘটনাস্থলে পৌঁছন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কথা বলেন স্থানীয়দের সঙ্গে। দেখা করেন ভাদু শেখের পরিবারের সঙ্গেও। মৃতদের পরিবারের জন্য ৫ লাখ টাকার ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। দেন চাকরির প্রতিশ্রুতি। ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ি সারিয়ে দেওয়ার খরচ থেকে শুরু করে আহতদের ১ লাখ, জখম শিশুদের জন্য ৫০ হাজার টাকা-সহ একাধিক প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসেন মমতা। ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়েই ক্ষতিপূরণের চেক তুলে দেন মৃতদের পরিবারের সদস্যের হাতে। এখানেও ওঠে প্রশ্ন। সাক্ষীদের প্রভাবিত করছেন মমতা, এই অভিযোগে মামলাও হয় আদালতে।
লালন-পর্বে সিবিআই
৮ এপ্রিল ভাদু শেখের খুনের ঘটনার তদন্তভারও সিবিআইয়ের হাতে তুলে দেয় আদালত। অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে ওই খুনের ঘটনায় মূল অভিযুক্ত সোনা শেখ গ্রেফতার হয় সিবিআইয়ের হাতে। এদিকে প্রথম থেকেই খোঁজ চলছিল বগটুই-গণহত্যায় নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত লালন শেখের। মৃত ভাদু শেখের ভাই যে ভিন রাজ্যে লুকিয়ে রয়েছেন এই খবর আসে সিবিআইয়ের কাছে। গত সপ্তাহে পড়শি রাজ্য ঝাড়খণ্ড থেকে গ্রেফতার করা হয় লালন শেখকে। ৪ ডিসেম্বর গ্রেফতারের পর রামপুরহাটের বিশেষ আদালতে হাজির করানো হয় অভিযুক্তকে। বগটুই-গণহত্যার ঘটনার অন্যতম সাক্ষী মিহিলাল শেখের দাবি ছিল, ''সেদিন রাতে লালন শেখ এবং তার দলবল হামলা করেছিল। খুনের ঘটনায় জড়িত লালন!''
লালন-বিড়ম্বনা
রামপুরহাটে সিবিআইয়ের অস্থায়ী শিবিরে ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার হয়েছে লালনের। আর মঙ্গলবারের এই ঘটনায় অভিযুক্তের পরিবারের তরফে খুনের অভিযোগ করা হয়েছে। এই ঘটনার পরেই স্বাভাবিকভাবে চাপে পড়েছেন গোয়েন্দারা। সূত্রের খবর, কীভাবে এই ঘটনা ঘটল? আদৌ নজরদারির অভাব ছিল? গুরুত্বপূর্ণ বন্দির ক্ষেত্রে এই অবস্থা কেন? কার গাফিলতি? একাধিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে শুরু করেছেন সিবিআইয়ের উচ্চপদস্থ কর্তারা। সূত্রের দাবি, ইতিমধ্যেই দিল্লির সিবিআই-কেন্দ্র থেকে জরুরিবার্তা পৌঁছে গিয়েছে কলকাতায়! এই ঘটনার তদন্তে নিযুক্ত গোয়েন্দাদের উপরেই গাফিলতির অভিযোগ উঠতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে। এদিকে আদালতেও সিবিআই হেফাজতে বন্দি-নিরাপত্তা নিয়ে উঠতে পারে প্রশ্ন।
ঠিক এই পরিস্থিতিতে প্রায় ১০ খুনে মূল অভিযুক্ত লালনের মৃত্যু নিয়ে অস্বস্তি বেড়েছে সিবিআই কর্তাদের মধ্যেও। যদিও এই ঘটনা খুন নয় আত্মহত্যার, এমনই বলছে সিবিআই-সূত্র।বগটুই মামলার ভবিষ্যৎ?
মুল অভিযুক্ত লালন শেখের মৃত্যু নিয়ে ধোঁয়াশা ফের তৈরি করেছে বগটুই-রহস্য! জিজ্ঞাসাবাদ এবং বহু তথ্যের উঠে আসার ক্ষেত্রে খানিকটা বাধার মুখে পড়তে চলেছেন গোয়েন্দারা। দাবি, মূল অভিযুক্ত লালন, যাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল বেশি। সেই তিনিই, ঠিক কী ঘটেছিল, কেন ঘটেছিল, কীভাবে ঘটেছিল, -একাধিক বিষয়ে স্পষ্ট দিকনির্দেশ করতে পারতেন। এবার সেই মূল অভিযুক্তের অস্বাভাবিক মৃত্যুর ফলে একাধিক সম্ভাবনা নষ্ট হয়েছে!
যদিও আর এক অংশের দাবি, ৪ থেকে ১২ ডিসেম্বর, প্রায় ৯ দিনের মধ্যে একাধিকবার জেরা করা হয়েছে লালনকে। আর সেই জেরার ফলে উঠে আসা তথ্যে যে পুরো ঘটনার অনেকটাই প্রকাশ হয়নি, এই বিষয়েও নিশ্চিত নন অনেকেই। তাই, লালনের মৃত্যু বগটুই-জট খুলতে দেরি করবে ঠিকই, তবে তদন্তে যে মারাত্মক ক্ষতি হবে না, এমনটাই বলছেন অনেকেই।







