যে দোল ভুলে গিয়েছে বাঙালি
Dol Jatra in Bengal: এককালে দোল উৎসবের সপ্তাহখানেক আগে থেকেই কুমোর পাড়ায় চলত সাজ সাজ রব। চাঁচরের আগুনের চারপাশে সাজানোর জন্য মৃৎশিল্পীরা তৈরি করতেন বিশেষ ধরনের মাটির পুতুল, সরা এবং পশুপাখির অবয়ব।
ফাল্গুনের পূর্ণিমা মানেই বাঙালির কাছে দোলযাত্রা। আবির, গান আর বসন্তের মাতাল হাওয়ায় এ এক অনন্য উৎসব। উত্তর ভারতের 'হোলি' আর বাংলার 'দোল'-এর মধ্যে মৌলিক পার্থক্য লুকিয়ে আছে এর আধ্যাত্মিকতায়। বৈষ্ণব ঐতিহ্যে রাধা-কৃষ্ণের প্রেম আর চৈতন্য মহাপ্রভুর জন্মতিথিকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই উৎসবের পরতে পরতে জড়িয়ে ছিল এমন কিছু লোকশিল্প, যা আজ আধুনিকতার ভিড়ে প্রায় বিলুপ্ত।
উৎসবের আঙিনায় হারিয়ে যাওয়া ‘চাঁচর’ ও মৃৎশিল্প
বসন্তের পূর্ণিমা আসার আগেই গ্রামবাংলার বাতাসে এক অদ্ভুত পোড়া খড়ের গন্ধ ভেসে আসত। দোলের আগের দিন ‘ন্যাড়াপোড়া’ বা ‘চাঁচর’ উৎসব কেবল এক টুকরো খড়কুটো জ্বালানোর আনন্দ ছিল না, এটি ছিল অশুভ শক্তির বিনাশ আর নতুনের আবাহন। কিন্তু এই উৎসবকে কেন্দ্র করে বাংলার মৃৎশিল্পীদের যে ব্যস্ততা ও শৈল্পিক ছোঁয়া ছিল, আজ আধুনিকতার ভিড়ে তা প্রায় বিলুপ্তির পথে।
এককালে দোল উৎসবের সপ্তাহখানেক আগে থেকেই কুমোর পাড়ায় চলত সাজ সাজ রব। চাঁচরের আগুনের চারপাশে সাজানোর জন্য মৃৎশিল্পীরা তৈরি করতেন বিশেষ ধরনের মাটির পুতুল, সরা এবং পশুপাখির অবয়ব। অনেক জায়গায় এই উৎসবে মাটির ছোট ছোট ঘর বা ‘মঠ’ তৈরি করা হতো, যা লোকজ বিশ্বাস অনুযায়ী অত্যন্ত পবিত্র বলে মনে করা হতো। গ্রামীণ শিল্পীরা কাদা মাটি দিয়ে নিপুণ হাতে তৈরি করতেন ঘোড়া, হাতি এবং ঘরগৃহস্থালির ছোট ছোট খেলনা। সেই সব পুতুল বা সরায় কোনো কৃত্রিম রঙ থাকত না; লাল মাটি, খড়িমাটি আর ভেষজ নির্যাস দিয়ে চলত অলংকরণ। এই লোকজ শিল্পটি কেবল উৎসবের অঙ্গ ছিল না, এটি ছিল বাংলার গ্রামীণ অর্থনীতির এক প্রাণস্পন্দন।
আজকাল শহর থেকে গ্রাম—সর্বত্রই চাঁচর উৎসব এক দায়সারা আচারে পরিণত হয়েছে। সেই হাতে গড়া মাটির শৈল্পিক মূর্তির জায়গা দখল করেছে যান্ত্রিক ছাঁচে ঢালা প্লাস্টিকের খেলনা। কুমোরদের সেই চাকার ঘূর্ণন আজ স্তিমিত, আর তাদের নিপুণ হাতের কারুকার্য হারিয়ে গিয়েছে সস্তা আধুনিকতার আড়ালে।
দোলের চাঁচর উৎসব
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Dol utsav : দোলের দিনে এই যে জমিয়ে রং খেলার রেওয়াজ, সেই রেওয়াজ শুরু হল কীভাবে? পুরাণ নাকি কোনও মিথ, কী রয়েছে নেপথ্যে?
‘শোলার গয়না’ ও ‘আলপনা’র বিস্মৃতি
বাংলার বনেদি বাড়িগুলোর দোলমঞ্চ বা রাধা-কৃষ্ণের পালকি সাজাতে একসময় অপরিহার্য ছিল শোলার কাজ। বিশেষ করে বীরভূম, মালদহ এবং মুর্শিদাবাদের মালাকার শিল্পীরা মাসখানেক আগে থেকেই ব্যস্ত হয়ে উঠতেন। জলাভূমি থেকে সংগৃহীত শোলা দিয়ে তৈরি হতো দেব-দেবীর মুকুট, গয়না এবং দোলমঞ্চের উপরিভাগের সূক্ষ্ম অলংকরণ। শোলার তৈরি সেই বিখ্যাত ‘কদম ফুল’ ছিল এক আশ্চর্য স্থাপত্য। সাদা ধবধবে শোলার উপর ভেষজ রঙের আলতো ছোঁয়ায় যে মায়াবী জগত তৈরি হতো, তার তুলনা মেলা ভার। আজ সেই পরিবেশবান্ধব শোলার স্থান দখল করেছে সস্তা ও ক্ষতিকারক থার্মোকল। মেশিনে কাটা রুক্ষ নকশা আর সিনথেটিক রঙের ভিড়ে হারিয়ে গিয়েছে শিল্পীর হাতের ছোঁয়া আর সেই নমনীয় সৌন্দর্য।
একইভাবে, দোলমঞ্চের মেঝেতে একসময় জীবন্ত হয়ে উঠত ‘বসন্ত আলপনা’। এটি সাধারণ আলপনার চেয়ে ছিল কিছুটা ভিন্ন। চালের গুঁড়োর প্রলেপে আঁকা এই বিশেষ আলপনায় ফুটে উঠত ঋতু পরিবর্তনের সংকেত—লতা-পাতা, কলকা আর জ্যামিতিক নকশার এক অদ্ভুত জাদুকরী মিশেল। দোলমঞ্চের চারপাশ ঘিরে আলপনার সেই শ্বেতশুভ্র বলয় যেন অশুভ শক্তিকে দূরে রাখার এক পবিত্র সীমানা ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ধৈর্য আর শৈল্পিক বোধ ফিকে হয়ে আসছে। এখন আর কেউ ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যয় করে পিটুলি গোলা জলে আঙুল ডুবিয়ে আলপনা আঁকেন না; বরং তার জায়গা নিয়েছে প্লাস্টিকের সস্তা স্টিকার বা ছাপানো নকশা।
দোলমঞ্চ ও পোড়ামাটির শিল্পশৈলী
বাংলার প্রাচীন মন্দির স্থাপত্যের এক অনন্য এবং অবহেলিত অধ্যায় হলো ‘দোলমঞ্চ’। আমরা সচরাচর আটচালা বা রত্নশৈলীর মন্দিরের কথা শুনলেও, দোলমঞ্চের গঠনশৈলী ছিল একেবারেই ভিন্ন। এটি কেবল একটি ধর্মীয় কাঠামো ছিল না, বরং বাংলার সমাজজীবন ও শিল্পের এক মিলনমেলা ছিল। বীরভূম, বাঁকুড়া, মেদিনীপুর এবং হুগলির গ্রামগুলোতে ঘুরলে আজও দেখা যায় এই দোলমঞ্চের ভগ্নস্তূপ।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Dol Yatra 2023 at Nabadwip, Mayapur : প্রতিবছরের মতো এবারেও নবদ্বীপে সাজো সাজো রব। এই স্থান থেকে যাতে কোনও ভক্তরাই বিনা প্রসাদে না ফেরেন তার জন্যও শুরু হয়ে গিয়েছে ব্যবস্থাপনা।
দোলমঞ্চের মূল বিশেষত্ব হলো এর ‘সর্বতোভদ্র’ বা চারদিক খোলা কাঠামো। সাধারণত একটি উঁচু বেদীর উপর চারটি বা আটটি স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে থাকে এই অলঙ্কৃত গম্বুজ। কেন এই চারদিক খোলা রাখা হতো? তার পিছনে ছিল এক গভীর বৈজ্ঞানিক ও নান্দনিক বোধ। উৎসবের দিন যাতে দূর-দূরান্ত থেকে আসা অগণিত ভক্ত চারপাশ থেকেই আরাধ্য দেবতাকে দর্শন করতে পারেন এবং আবির যাতে অবাধে বাতাসের সঙ্গে মিশে যেতে পারে, সেজন্যই এই স্থাপত্যশৈলী।

দোলমঞ্চ
বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুর বা বীরভূমের জয়দেবের মতো এলাকায় এই দোলমঞ্চগুলোর গায়ে দেখা যায় পোড়ামাটি বা টেরাকোটার অবিশ্বাস্য কাজ। লাল ইটের উপর খোদাই করা থাকত রাধা-কৃষ্ণের বৃন্দাবনলীলা, রাসচক্র কিংবা সমকালীন বাংলার পালকি ও নৌকার ছবি। এই স্থাপত্যগুলো ছিল মূলত জনপদের প্রাণকেন্দ্র। দোল উৎসবের দিন যখন খোল-করতালের শব্দে আকাশ-বাতাস মুখরিত হতো, তখন এই নোনা ধরা ইটের গায়েও যেন প্রাণ ফিরত।
দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, সংরক্ষণের অভাবে আজ বাংলার বহু প্রাচীন দোলমঞ্চ স্রেফ ভগ্নস্তূপে পরিণত হয়েছে। ইটের খাঁজে বাসা বেঁধেছে আগাছা আর বট-পাকুড়ের শিকড়। লর্ড কার্জনের আমলে কিছু প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব পেলেও, বর্তমানে বহু ঐতিহাসিক দোলমঞ্চ স্থানীয়দের অবহেলায় গোয়ালঘর বা ডাস্টবিনে পরিণত হয়েছে।
আবিরের ঘরোয়া রসায়ন
রাসায়নিক রঙের দাপটে আজ আমরা ভুলে গেছি বাংলার নিজস্ব ‘আবির’ তৈরির কারিগরি। একসময় পলাশ, শিমুল আর নীলকণ্ঠ ফুলের পাপড়ি শুকিয়ে তৈরি হতো প্রাকৃতিক রং। সাথে মেশানো হতো চন্দন বা টীকোও। এই রং তৈরির ক্ষুদ্র শিল্পটি ছিল গ্রামীণ অর্থনীতির অংশ। আজ সেই ভেষজ সুগন্ধের বদলে বাজার দখল করেছে ক্ষতিকারক কেমিক্যাল।
রাসায়নিক রঙের দাপটে আজ আমরা ভুলে গেছি বাংলার নিজস্ব ‘আবির’ তৈরির কারিগরি। একসময় বাংলার ঘরে ঘরে আবির তৈরি ছিল এক উৎসব। কেমিক্যাল নয়, বরং গাছ থেকে ঝরে পড়া ফুল আর লতাপাতা দিয়ে তৈরি হতো বসন্তের আবির। পলাশ, শিমুল কিংবা নীলকণ্ঠ ফুলের পাপড়ি রোদে শুকিয়ে চূর্ণ করে তাতে মেশানো হতো চন্দন বা টীকোর মিহি গুঁড়ো। কেবল রঙের ছটা নয়, সেই আবিরে লেগে থাকত এক অদ্ভুত ভেষজ সুগন্ধ।
ফুল দিয়েই তৈরি করা হতো আবির
এই আবির তৈরির প্রক্রিয়াটি কেবল শখের ছিল না, এটি ছিল বাংলার গ্রামীণ অর্থনীতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। দোলযাত্রার মাসখানেক আগে থেকেই গ্রামবাংলার আঙিনায় আঙিনায় শুরু হতো সাজ সাজ রব। কুটির শিল্পের এই ক্ষুদ্র রূপটি গ্রামীণ নারীদের আয়ের এক অনন্য পথ প্রশস্ত করত। চালের মিহি গুঁড়ো বা ‘পিটুলি’কে ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করে তাতে মেহেন্দি পাতার সবুজ, অপরাজিতার নীল কিংবা হলুদের উজ্জ্বলতা মিশিয়ে তৈরি হতো বাহারি সব রঙ। আজ সেই ভেষজ সুগন্ধের বদলে বাজার দখল করেছে সিসা (Lead), পারদ,ক্রোমিয়াম ও অভ্রযুক্ত ক্ষতিকারক কেমিক্যাল, যা আমাদের ত্বক ও পরিবেশ—উভয়কেই বিষিয়ে দিচ্ছে।
বাঙালির দোলযাত্রা কেবল রঙের খেলা নয়, এটি ছিল গান, শিল্প আর স্থাপত্যের এক অপূর্ব কোলাজ। আধুনিকতার গতির সাথে তাল মেলাতে গিয়ে আমরা আমাদের এই শৈল্পিক শেকড়গুলোকে আলগা করে ফেলছি। তবুও, কিছু শিল্পমনা মানুষের চেষ্টায় যদি আবার সেই শোলার কাজ বা ভেষজ রঙের প্রথা ফিরে আসে, তবেই সার্থক হবে বাংলার বসন্ত।








