মাটি-টবের ঝামেলা নেই, শুধু জলে পুরনো বোতলেই বেড়ে উঠবে এই গাছগুলি
Low cost indoor gardening: মাত্র ৯৮ বর্গফুটের ছোট্ট একটি ব্যালকনিতে প্রায় ৫০টি গাছ নিয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন নিজের এক টুকরো সবুজ স্বর্গ। দীপালী কর্পোরেট জীবনের ব্যস্ততা ও মানসিক চাপ কাটিয়ে গাছের পরিচর্যায় খুঁজে পেয়েছেন আনন্দ। দীপালীর মূল দর্শন হলো ‘ওয়াবি-সাবি’ (Wabi-Sabi)—অর্থাৎ অপূর্ণতার ভিতরেও সৌন্দর্য খুঁজে পাওয়া, ধীর জীবনযাপন এবং ফেলে দেওয়া বা পুরনো জিনিসকে নতুন করে কাজে লাগানো।
ঘরকে একটু শান্ত, সুন্দর আর প্রাণবন্ত করে তুলতে আমরা কত কী-ই না করি! অথচ ঘরজুড়ে এক চিলতে সবুজের ছোঁয়া আনতে কিন্তু হাজার হাজার টাকা খরচ করে ফ্যান্সি প্ল্যান্টার বা দামি ডেকোরেশন আইটেম কেনার একদম প্রয়োজন নেই।
নয়ডার পরিচিত গার্ডেনার ও ইনস্টাগ্রাম ক্রিয়েটর দীপালী কাত্রে (যাঁকে অনেকেই চেনেন WabiSabiWithDipalee হিসেবে) ঠিক এই কথাই আমাদের মনে করিয়ে দেন। মাত্র ৯৮ বর্গফুটের ছোট্ট একটি ব্যালকনিতে প্রায় ৫০টি গাছ নিয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন নিজের এক টুকরো সবুজ স্বর্গ। দীপালী কর্পোরেট জীবনের ব্যস্ততা ও মানসিক চাপ কাটিয়ে গাছের পরিচর্যায় খুঁজে পেয়েছেন আনন্দ। দীপালীর মূল দর্শন হলো ‘ওয়াবি-সাবি’ (Wabi-Sabi)—অর্থাৎ অপূর্ণতার ভিতরেও সৌন্দর্য খুঁজে পাওয়া, ধীর জীবনযাপন এবং ফেলে দেওয়া বা পুরনো জিনিসকে নতুন করে কাজে লাগানো।
আপনিও যদি খুব কম খরচে, কোনো ঝক্কি ছাড়াই নিজের ঘর বা ব্যালকনি সবুজে ভরিয়ে তুলতে চান, তবে কাচের পুরনো বোতল বা আচারের জারই হতে পারে আপনার সেরা সঙ্গী।
১. মানি প্ল্যান্ট
নতুন বাগান শুরু করার জন্য মানি প্ল্যান্টের চেয়ে ভালো অপশন আর হতেই পারে না। এর হৃদয়াকৃতি সবুজ পাতা এবং লতানো রূপ খুব সহজেই ঘরের যেকোনো তাক, জানলা বা ফাঁকা কোণকে উজ্জ্বল করে তোলে।
নতুন বাগান শুরু করার জন্য মানি প্ল্যান্ট হলো সেরা অপশন
কেন বাছবেন?
পুরনো কাচের বোতল, জ্যাম-আচারের জার বা যেকোনো পাত্রে শুধু জল দিয়েই এই গাছ দীর্ঘদিন বাঁচিয়ে রাখা যায়। এটি বাতাস থেকে ক্ষতিকর উপাদান দূর করতে সাহায্য করে এবং ঘরে একটি চিরন্তন নান্দনিক রূপ এনে দেয়।
উজ্জ্বল অথচ পরোক্ষ আলোতে এটি সবচেয়ে ভালো বাড়ে। তবে কম আলোতেও টিকে থাকে। বোতলে রাখলে সপ্তাহে অন্তত একবার জল বদলে দিন। আর মাটিতে লাগালে উপরের মাটি শুকিয়ে গেলে তবেই জল দিন।
২. সিঙ্গোনিয়াম
তীরের মতো সুন্দর ও ধারালো পাতার জন্য সিঙ্গোনিয়াম অনেকেরই খুব প্রিয়। সবুজ, গোলাপি ও সাদা মিশ্রিত নানা রঙের সিঙ্গোনিয়াম পাওয়া যায়, যা ঘরের ভিতরে আলাদা একটা বৈচিত্র্য ও সতেজতা নিয়ে আসে।
কেন বাছবেন?
এটি মাটিতে যেমন বেড়ে ওঠে, তেমনই জলেও দারুণভাবে বেড়ে ওঠে। কোনো স্বচ্ছ কাচের পাত্র বা সুদৃশ্য বয়ামে সাজিয়ে এটি পড়ার টেবিল, ঘরের তাক বা যেকোনো ডেস্কে রাখা যায়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Lotus Farming India: ২০২০ সালে গতানুগতিক চাষের ঝুঁকি এড়িয়ে তিনি পা বাড়ান ফুল চাষে। নিজের শেষ সঞ্চয়ের ১.০৮ লাখ টাকা দিয়ে চুক্তি করেন লক্ষ্ণৌর ‘ন্যাশনাল বোটানিক্যাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট’ (NBRI)-এর সঙ্গে। সেখান থেকে নিয়ে আসেন ‘নমঃ-১০৮’ (লক্ষ্মী কমল) নামের বিরল ১০৮ পাপড়ির পদ্ম চাষের প্রযুক্তি, ৪০০টি চারা ও বীজ।

সিঙ্গোনিয়াম
ঘরের উজ্জ্বল আলোতে এটি খুব ভালো থাকে। তবে যে জাতগুলির পাতায় গোলাপি বা সাদার ছোঁয়া বেশি, সেগুলিকে একটু বেশি আলোতে রাখলে পাতার রং সুন্দর ফুটে ওঠে।
পাতা হলুদ হতে শুরু করলে বুঝবেন জল বেশি হচ্ছে। আর পাতার ডগা বাদামি হয়ে গেলে বুঝবেন ঘরে আর্দ্রতা কম বা গাছে নিয়মিত জল দেওয়া হচ্ছে না। প্রুনিং বা মাঝেমধ্যে ডাল ছাঁটাই করলে গাছটি বেশ ঘন ও সুন্দর থাকে। (তবে এই গাছটি পোষা প্রাণীদের জন্য কিছুটা বিষাক্ত, তাই পোষ্য থাকলে একটু উঁচুতে রাখুন।)
৩. টার্টল ভাইন বা ইঞ্চ প্ল্যান্ট
আপনি যদি ঘর বা ব্যালকনিতে ঝুলন্ত কোনো লতানো গাছ চান, তবে টার্টল ভাইন আপনার মন জয় করবেই। এর ছোট ছোট ঘন সবুজ পাতা দ্রুত বাড়ে এবং নিচের দিকে সুন্দরভাবে ঝুলে পড়ে।

ব্যালকনিতে ঝুলন্ত টার্টল ভাইনের সৌন্দর্য চোখে পড়ার মতো
কেন বাছবেন?
টার্টল ভাইন জায়গা খুব বেশি নেয় না। কিন্তু ঝুলে পড়া লতাপাতার কারণে ছোট ঘরেও একটা আস্ত আরবান জাঙ্গলের ফিল তৈরি হয়।
আলো-বাতাসযুক্ত জায়গায় এটি সবচেয়ে ভালো বাড়ে। কড়া রোদ থেকে দূরে রাখুন, কারণ সরাসরি রোদে এর পাতা পুড়ে যেতে পারে। মাটিতে বা পাত্রে জল যেন জমে না থাকে, কারণ অতিরিক্ত জলে এর শিকড় পচে যায়।
৪. লাকি বাম্বু
সবচেয়ে কম যত্নে বেঁচে থাকা গাছগুলির মধ্যে অন্যতম হলো লাকি বাম্বু। বাস্তু ও ফেং শুই মতে এই গাছ ঘরে সৌভাগ্য ও সমৃদ্ধি নিয়ে আসে।

সবচেয়ে কম যত্নে বেঁচে থাকা গাছগুলির মধ্যে অন্যতম লাকি বাম্বু
কেন বাছবেন?
কোনো মাটি ছাড়াই, শুধু জলের বোতল বা কাচের পাত্রে এই গাছ বছরের পর বছর বেঁচে থাকে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Anurag Bhandari: আমাদের চারপাশে আজ পরিবেশ সচেতনতা বা ‘সাসটেইনেবিলিটি’ নিয়ে কত বড় বড় কথা হয়। কিন্তু অনুরাগ সেটাকে স্রেফ মুখের কথায় আটকে না রেখে বাস্তবে করে দেখিয়েছেন। ভারতের ফার্নিচার ইন্ডাস্ট্রি থেকে প্রতি বছর লাখ লাখ টন বর্জ্য তৈরি হয়, যার বেশিরভাগটাই জমা হয় আবর্জনার স্তূপে। অনুরাগ এই অপচয় কমানোর লড়াইয়ে নেমেছেন।
কাঠিগুলির নিচের অংশ জলে ডুবিয়ে রাখুন। কাঠিগুলিকে সোজা রাখতে নিচে কয়েকটি ছোট নুড়ি বা রঙিন পাথর দিয়ে দিতে পারেন। তবে খেয়াল রাখবেন, গাছের পাতা যেন জলে ডুবে না থাকে।
পরোক্ষ আলোতে রাখুন। প্রতি ৭ থেকে ১০ দিন পর পর পাত্রের জল বদলে দিন। সাধারণ ট্যাপের জলে ক্লোরিন থাকতে পারে, তাই জল এক রাত কোনো পাত্রে রেখে তারপর ব্যবহার করলে ভালো হয়।
ফিলোডেনড্রন
দেখতে অনেকটাই মানি প্ল্যান্টের মতো হলেও ফিলোডেনড্রনের পাতাগুলি আরও একটু ঘন, চকচকে ও গাঢ় সবুজ হয়।

কম যত্নেও ঘরের শোভা বাড়ায় ফিলোডেনড্রন
কেন বাছবেন?
এটি অত্যন্ত শক্তপোক্ত একটি গাছ। ঘরের আর্দ্রতা কম হলেও এটি নিজের মতো বেড়ে ওঠে। উজ্জ্বল আলো থেকে শুরু করে ঘরের বেশ কম আলোতেও এটি মানিয়ে নিতে পারে। বোতলে রাখলে নিয়মিত জল বদলে দেওয়া ছাড়া এর আর তেমন কোনো বাড়তি যত্নই লাগে না।
৬. স্পাইডার প্ল্যান্ট
ঘর বা বারান্দার বাতাস পরিষ্কার রাখতে স্পাইডার প্ল্যান্টের জুড়ি নেই। এর লম্বাটে পাতা আর বিশেষ গড়ন ঘরকে এক আধুনিক রূপ দেয়।
স্পাইডার প্ল্যান্টের বিশেষ গড়ন ঘরকে এক আধুনিক রূপ দেয়
কেন বাছবেন?
বড় স্পাইডার প্ল্যান্ট থেকে ছোট ছোট বাচ্চা গাছ ঝুলে বের হয়। এগুলি কেটে নিয়ে জলে বা মাটিতে বসালেই সম্পূর্ণ নতুন একটা গাছ তৈরি হয়ে যায়—একদম বিনা খরচে!
পরোক্ষ আলোতে এটি সবচেয়ে ভালো থাকে। বাচ্চা গাছ কাটিং করে জলে রাখার সময় খেয়াল রাখতে হবে যেন শুধু গাছের গোড়াটা জলে ডোবে, পাতা নয়।
৭. ওয়ান্ডারিং জিউ বা ট্রেডেসক্যানটিয়া
সবুজের পাশাপাশি ঘরে যদি একটু বেগুনি বা রূপালি রঙের ছোঁয়া চান, তবে ওয়ান্ডারিং জিউ হতে পারে চমৎকার একটি পছন্দ।

ঘরে বেগুনি বা রূপালি রঙের ছোঁয়া আনতে রাখুন ওয়ান্ডারিং জিউ
কেন বাছবেন?
এর পাতায় বেগুনি ও রূপালি রঙের দারুণ স্ট্রাইপ বা ডোরাকাটা দাগ থাকে।
এটি খুব দ্রুত বাড়ে। তবে এর রঙিন রূপ ধরে রাখতে কিছুটা উজ্জ্বল আলো প্রয়োজন। ৫-৭ দিন পর পর কাচের বোতলের জল বদলে দিলে এটি খুব সুন্দরভাবে বেঁচে থাকে।
এছাড়াও চাইনিজ এভারগ্রিন, পিস লিলি, কোলাস, পুদিনা ইত্যাদি গাছও খুব কম খরচে এবং কম যত্নে ঘরে রাখা যায়।
বোতল বা জারে ইনডোর গার্ডেনিংয়ের জন্য কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখা জরুরি:
১. স্বচ্ছ কাচের পাত্র ব্যবহার করুন: আচারের বয়াম, কোল্ড ড্রিঙ্ক বা সসের খালি কাচের বোতল ভালো করে ধুয়ে ব্যবহার করুন। স্বচ্ছ কাচের ভিতর দিয়ে গাছের শিকড় বেড়ে ওঠা দেখতে দারুণ লাগে।
২. জল পরিষ্কার রাখুন: জলের মধ্যে গাছে ছত্রাক বা ব্যাকটেরিয়া যাতে না জমে, তাই প্রতি ৭ থেকে ১০ দিন পর পর জল বদলে দিন। জল ঘোলাটে মনে হলেই বদলে ফেলা ভালো।
৩. পাতা ডোবাবেন না: পাত্রে গাছ রাখার সময় খেয়াল রাখবেন যেন শুধু কাটিংয়ের গোড়া বা নোড জলে ডুবে থাকে। পাতা জলে ডুবে থাকলে তা পচে জল নষ্ট হয়ে যাবে।
৪. কড়া রোদ এড়ান: ঘরের যে জানলা বা কোণে আলো আসে কিন্তু কড়া রোদ সরাসরি পড়ে না, সেখানে এসব গাছ রাখুন। সরাসরি রোদ কাচের পাত্রের জল গরম করে গাছ নষ্ট করে দিতে পারে।
৫. খাবার বা পুষ্টি: মাসে একবার খুব সামান্য পরিমাণে জলে দ্রবণীয় তরল সার (একদম পাতলা করে) জলে মিশিয়ে দিতে পারেন, তবে তা না দিলেও গাছ জল থেকেই প্রয়োজনীয় রসদ টেনে নেয়।
ঘর সুন্দর করতে প্রচুর টাকা নয়, প্রয়োজন সামান্য সৃজনশীলতা। দামি টবের বদলে নিজের হাতে জমানো পুরনো বোতলেই দিব্যি ঘর অপূর্ব লাগবে দেখতে।






