আবর্জনা থেকেই লাখ টাকার ফার্নিচার বানান অনুরাগ ভাণ্ডারী!
Anurag Bhandari: আমাদের চারপাশে আজ পরিবেশ সচেতনতা বা ‘সাসটেইনেবিলিটি’ নিয়ে কত বড় বড় কথা হয়। কিন্তু অনুরাগ সেটাকে স্রেফ মুখের কথায় আটকে না রেখে বাস্তবে করে দেখিয়েছেন। ভারতের ফার্নিচার ইন্ডাস্ট্রি থেকে প্রতি বছর লাখ লাখ টন বর্জ্য তৈরি হয়, যার বেশিরভাগটাই জমা হয় আবর্জনার স্তূপে। অনুরাগ এই অপচয় কমানোর লড়াইয়ে নেমেছেন।
আহমেদাবাদের এক অলস দুপুর। চারিদিকের কোলাহল থেকে একটু দূরে, বোপাল-আম্বলি রোডের ভাণ্ডারী ফার্মহাউসের একটা ঘরে পা রাখলেই আপনার মনে হতে পারে—ভুল করে কোনো বাতিল জিনিসের গুদামে চলে এসেছেন! এক কোণে পড়ে আছে মরচে ধরা টিএমটি স্টিলের রড, একদিকে উইপোকায় খাওয়া পুরনো কাঠের তক্তা, প্লাস্টিকের পিভিসি পাইপ, ভাঙা চেয়ার, আর একপাশে রাখা ধুলোবালি মাখা ম্যানহোলের এক মস্ত ঢাকনা।
আপনি হয়তো মুখ ফিরিয়ে বলতে যাবেন, “ধুর! এ তো সব আবর্জনা।” কিন্তু ঠিক সেই সময়ই জানতে পারবেন এই আবর্জনা দিয়েই একজন শিল্পী এতকিছু বানান যা দেখলেই চোখ ধাঁধিয়ে যায়। সেই শিল্পী বা কলাকার অনুরাগ ভাণ্ডারী। অনুরাগ নিজেকে বলেন ‘কলাকার’, আর তাই তাঁর এই জাদুর দুনিয়ার নাম দিয়েছেন ‘এক কলাকার ডিজাইনস’ (Ek Kalakaar Designs)।
অনুরাগ পড়াশোনা করেছিলেন ট্রান্সপোর্টেশন ডিজাইন নিয়ে। ডিগ্রি শেষ করে আর পাঁচটা সাধারণ ছেলের মতোই ঢুকে পড়েছিলেন পারিবারিক স্টিল ম্যানুফ্যাকচারিং ব্যবসায়। কেটে গেল দীর্ঘ দশটি বছর। কিন্তু মনের ভিতর কোথাও একটা খটকা লেগেই থাকত। ব্যবসা সামলানোর সেই চেনা ছক, লাভ-ক্ষতির হিসেব—এসব যেন কিছুতেই তাঁর মনের সঙ্গে মিলছিল না। অনুরাগ বুঝতে পারছিলেন, তাঁর মনটা ব্যবসার গণ্ডিতে বাঁধা পড়ার নয়, তাঁর টান তো সৃজনশীলতায়।
২০১৭ সালে পারিবারিক কিছু বিরোধের জেরে হঠাৎ করেই ফ্যামিলি বিজনেস থেকে আলাদা হয়ে যান অনুরাগ। সামনে তখন শুধুই এক কুয়াশাঘেরা ভবিষ্যৎ। কী করবেন, কোন পথে হাঁটবেন, কিচ্ছু জানা নেই। হাতে জমানো পুঁজিও নামমাত্র। কিন্তু কথায় বলে না, আপনি যখন মন থেকে কিছু চান, তখন গোটা বিশ্ব আপনাকে সাহায্য করার জন্য পথ তৈরি করে দেয়! অনুরাগের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই হলো। নিজের ফার্মহাউসের ওই বাতিল জিনিসপত্রের ঘরটার দিকে তাকিয়েই তিনি তাঁর জীবনের আসল উদ্দেশ্য খুঁজে পেলেন। তিনি ঠিক করলেন, আসবাবপত্র বা ফার্নিচার ডিজাইনের জগতেই তিনি পা রাখবেন। তবে অন্য সবার মতো করে নয়, একটু ভিন্নভাবে।

অনুরাগ ভাণ্ডারী
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Clay Speaker: কোনো তার নেই, কোনো ব্লুটুথ কানেকশন নেই, এমনকী চার্জ দেওয়ারও ঝক্কিও নেই। শুনতে একটু অবিশ্বাস্য হলেও, কেরলের এক প্রতিভাবান শিল্পী ঠিক এই জাদুটিই বাস্তবে ঘটিয়ে দেখিয়েছেন।
২০১৯ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে পথ চলা শুরু করে ‘এক কলাকার ডিজাইনস’। অনুরাগের মূল মন্ত্র একটাই—“ফ্লড অ্যান্ড ফ্যাবুলস” (Flawed and Fabulous)। অর্থাৎ, যে জিনিসের মধ্যে খামতি আছে বা যা অসম্পূর্ণ, তাকেই তার নিজস্ব রূপ দিয়ে অসাধারণ করে তোলা।
আমাদের চারপাশে আজ পরিবেশ সচেতনতা বা ‘সাসটেইনেবিলিটি’ নিয়ে কত বড় বড় কথা হয়। কিন্তু অনুরাগ সেটাকে স্রেফ মুখের কথায় আটকে না রেখে বাস্তবে করে দেখিয়েছেন। ভারতের ফার্নিচার ইন্ডাস্ট্রি থেকে প্রতি বছর লাখ লাখ টন বর্জ্য তৈরি হয়, যার বেশিরভাগটাই জমা হয় আবর্জনার স্তূপে। অনুরাগ এই অপচয় কমানোর লড়াইয়ে নেমেছেন।
সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, অনুরাগ আর পাঁচজন ডিজাইনারের মতো খাতা-কলমে আগে কোনো ডিজাইন বা আইডিয়া তৈরি করেন না। তাঁর কাজের পদ্ধতি একদম উল্টো! তিনি প্রথমে উপাদান বা ম্যাটেরিয়াল খোঁজেন। প্রায় প্রতি সপ্তাহান্তেই তাঁকে দেখা যায় আহমেদাবাদের বিভিন্ন স্ক্র্যাপ মার্কেট বা ভাঙাচোরার বাজারে ঘুরে বেড়াতে। সেখান থেকে তিনি কুড়িয়ে আনেন কনস্ট্রাকশনের বাড়তি রড, ঢেউখেলানো টিনের শিট, পুরনো টায়ার কিংবা প্লাস্টিকের পাইপ। তারপর সেই উপাদানগুলির দিকে তাকিয়ে তিনি ভাবেন—একে দিয়ে কী বানানো যায়? একেই বলে ‘ম্যাটেরিয়াল ড্রিভেন ডিজাইন’।

অনুরাগ প্রকৃতির রূপকে কোনো কৃত্রিম প্রলেপ দিয়ে ঢাকতে চান না। তিনি কাঠকে তার সবচেয়ে স্বাভাবিক রূপেই রেখে দিতে ভালোবাসেন। ফার্মহাউসের কোনো পুরনো কাঠে যদি উইপোকায় খাওয়ার দাগ থাকে, অনুরাগ সেটাকে নষ্ট না করে একটা শিল্প বা আর্ট হিসেবে রেখে দেন। হ্যাঁ, তবে সুরক্ষার খাতিরে পোকা দূর করতে কাঠে বিশেষ প্রাকৃতিক ওষুধ স্প্রে করা হয় ঠিকই, কিন্তু তার ভিতরের আদিম রূপটা একই থাকে। আর লোহার মরচে বা ময়লা পরিষ্কার করতে ব্যবহার করা হয় হাই-প্রেসার জলের স্প্রে ও স্যান্ডিং পদ্ধতি।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
গত পাঁচ বছর ধরে তাঁর বাড়িতে কোনো ডাস্টবিন বা আবর্জনার বালতি নেই! শুনলে অবাক লাগাই স্বাভাবিক, কিন্তু এই ব্যস্ত শহরের বুকেই এক ফোঁটা আবর্জনা না জমিয়ে সম্পূর্ণ ‘জিরো-ওয়েস্ট’ বা বর্জ্যহীন জীবন কাটানো যে সম্ভব, তা হাতেনাতে প্রমাণ করে দেখিয়েছেন এই মিডিয়া কর্মী।
ইন্টেরিয়র ডিজাইনের কোনো প্রথাগত ব্যাকগ্রাউন্ড না থাকায় অনুরাগ বাজারের চলতি ফ্যাশন বা ট্রেন্ডের খোঁজ রাখেন না। তাঁর কথায়, তিনি কোনো ট্রেন্ড ফলো করেন না। তিনি যা বানান, মন থেকে বানান। আর এই মন থেকে বানানো জিনিসগুলিই যখন বাজারে আসে, তখন তা মানুষের চোখ ধাঁধিয়ে দেয়।
অনুরাগের স্টুডিও থেকে বেরোনো একেকটি আসবাবের পিছনের গল্প শুনলে সত্যি অবাক হতে হয়। যেমন ধরুন তাঁর সেই বিখ্যাত ‘রুট টেবিল’ বা শিকড়-টেবিল। একবার এক কালবৈশাখী ঝড়ে আস্ত একটা গাছ উপড়ে পড়েছিল। অনুরাগ দেখলেন, গাছটির শিকড়গুলি একদম অক্ষত আছে। তিনি সেটিকে স্টুডিওতে এনে লম্বালম্বিভাবে কেটে চমৎকার একটি টেবিল বানিয়ে ফেললেন। আর নিচে বসিয়ে দিলেন একটি আয়নার বাক্স (mirror box)। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে, গাছের শিকড়গুলি যেন শূন্যে ভেসে আছে!
কিংবা তাঁর তৈরি প্লাস্টিকের পিভিসি পাইপের ‘স্ট্যান্ডিং ল্যাম্প’গুলির কথাই ধরুন। সাধারণ পাইপের গায়ে সুন্দর সুন্দর ফুটো করে নিচে লাইট বসিয়ে দেওয়া হয়। দিনের বেলা একে সাধারণ প্লাস্টিকের পাইপ মনে হলেও, রাতের অন্ধকারে যখন এই ল্যাম্প জ্বলে ওঠে, তখন কেউ বিশ্বাসই করতে পারবে না যে এটা ফেলে দেওয়া বর্জ্য দিয়ে তৈরি। এছাড়া চন্দ্রযান-৩ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে রিসাইকেল্ড মেটাল স্ল্যাগ দিয়ে তৈরি তাঁর ‘মুন টেবিল’ কিংবা আস্ত একটা ম্যানহোলের ঢাকনাকে কংক্রিট আর আয়রন বারের উপর বসিয়ে বানানো টেবিল—সবই এক একটি মাস্টারপিস। আর এই কারণেই তাঁর তৈরি একটি বেঞ্চ বা চেয়ারের দাম শুরু হয় ১৮,০০০ টাকা থেকে আর টেবিল ২৫,০০০ টাকা বা তার উপর। কাজের জটিলতা অনুযায়ী দামের তারতম্য হয়।
শুরুর দিকে পথটা অবশ্য এত সহজ ছিল না। করোনা মহামারির লকডাউনের সময়েও অনুরাগ দমে যাননি। দিনের পর দিন স্টুডিওতে একা একা সময় কাটিয়ে নিজের কাজকে আরও নিখুঁত করে তুলেছেন। বন্ধুদের কাছ থেকে ফিডব্যাক নিয়ে ফিনিশিংয়ের কাজ আরও উন্নত করেছেন।
অনুরাগ মাঝেমধ্যে একটু হেসে, আবার কিছুটা আফসোস করে বলেন, তাঁকে প্রায়ই মানুষকে বোঝাতে হয় যে এই সুন্দর জিনিসটা আসলে আবর্জনা থেকে তৈরি। মাঝেমধ্যে তাঁর বেশ ভালো লাগে এটা ভেবে যে কাজটা এত নিখুঁত হয়েছে যে কেউ ধরতেই পারছে না এটি বর্জ্য দিয়ে তৈরি। কিন্তু আবার কখনো কখনো একটু খারাপও লাগে যখন দেখেন, ওই ফেলনা জিনিসটাকে এমন একটা রূপ দেওয়ার পিছনে কতটা হাড়ভাঙা খাটুনি গেছে, তা মানুষ বুঝতেই পারছে না।

তবে অনুরাগের এই সততা ও পরিশ্রমের দাম আজ সারা ভারত দিচ্ছে। কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী—সব জায়গাতেই আজ পৌঁছে যাচ্ছে ‘এক কলাকার ডিজাইনস’-এর তৈরি পণ্য। Architectural Digest (AD) Design Show, Raw Collaborative কিংবা অতি সাম্প্রতিক Design Democracy-র মতো বড় বড় প্রদর্শনীতে আজ তাঁর তৈরি ফার্নিচার সগর্বে শোকেস করা হচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়াতেও লক্ষাধিক মানুষ আজ এই ‘কলাকার’-এর কাজের ভক্ত।
অনুরাগ শুধু এখন নিজের কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। তিনি টিম বড় করছেন, তাঁর এই দর্শনের সঙ্গে মিল রেখে আরও নতুন নতুন ডিজাইনারদের যুক্ত করছেন। খুব তাড়াতাড়ি বাচ্চাদের ফার্নিচারের একটি নতুন ব্র্যান্ডও নিয়ে আসছেন তিনি। ভবিষ্যতে সাধারণ বর্জ্যের সঙ্গে হেম্প উড বা বাঁশ এবং মাটির মতো পরিবেশবান্ধব উপাদান মিলিয়ে আরও নতুন কিছু করার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।
সবশেষে অনুরাগের একটি কথাই আমাদের মনে দাগ কেটে যায়—“বর্জ্য জিনিসকে সুন্দর করে তোলা কঠিন ঠিকই, তবে দিনের শেষে এই রূপান্তরই তো আসল তৃপ্তি!”






