১০৮ পাপড়ির পদ্ম চাষেই ৬৫ লক্ষ টাকার ব্যবসা সঞ্জীব রেড্ডির
Lotus Farming India: ২০২০ সালে গতানুগতিক চাষের ঝুঁকি এড়িয়ে তিনি পা বাড়ান ফুল চাষে। নিজের শেষ সঞ্চয়ের ১.০৮ লাখ টাকা দিয়ে চুক্তি করেন লক্ষ্ণৌর ‘ন্যাশনাল বোটানিক্যাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট’ (NBRI)-এর সঙ্গে। সেখান থেকে নিয়ে আসেন ‘নমঃ-১০৮’ (লক্ষ্মী কমল) নামের বিরল ১০৮ পাপড়ির পদ্ম চাষের প্রযুক্তি, ৪০০টি চারা ও বীজ।
ওড়িশার গঞ্জামের এক প্রত্যন্ত গ্রাম কল্যাণপুরের ছেলে এ. সঞ্জীব রেড্ডি। বাঁধাধরা ৯ থেকে ৫টার করপোরেট জীবন ছিল তাঁর। মাস শেষে অ্যাকাউন্টে মাইনে ঢোকার নিশ্চিন্তি ছিল। এসি ঘরের স্বাচ্ছন্দ্য ছিল। এক নিরাপদ ভবিষ্যৎ ছিল। কিন্তু তাঁর স্বপ্ন এই নিশ্চিত আরামদায়ক জীবন ছিল না, ছিল স্বাধীনভাবে নতুন কিছু গড়ে তোলার। আর সেই স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরেই শুরু হয় তাঁর একের পর এক উদ্যোগ। প্রথমেই সফল হননি তিনি। একের পর উদ্যোগ ব্যর্থ হয়। তাই, বারংবার আর্থিক ক্ষতিরও মুখে পড়েন। তবে, শূন্য থেকে ফের শুরু করেন তিনি। এবং শেষ পর্যন্ত গড়ে ওঠে তাঁর ৬৫ লক্ষের টার্নওভারের এক সাম্রাজ্য!
১৯৯৫ সালে বিজ্ঞান স্নাতক সঞ্জীব লারসেন অ্যান্ড টুব্রো (L&T)-র মতো স্বনামধন্য সংস্থায় প্ল্যানিং অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ শুরু করেন। তখন তাঁর বার্ষিক বেতন ছিল প্রায় ৯৬ হাজার টাকা। চাকরির পাশাপাশি গুরুগ্রাম থেকে দূরশিক্ষার মাধ্যমে বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে ডিপ্লোমা করছিলেন ঠিকই, তবে তাঁর নজর ছিল অন্যদিকে। চাকরির প্রতি মাসের বেতন থেকে টাকা জমাতেন কেবল একটিই উদ্দেশ্যে, নিজের ব্যবসা শুরু করবেন। অবশেষে ২০০০ সালে নিশ্চিত চাকরি ছেড়ে দেন তিনি।
কিন্তু উদ্যোক্তা হওয়ার পথটা যে কতটা কঠিন, তা তিনি টের পান খুব দ্রুতই। ২০০১ সালে নিজের জমানো মূলধন সম্বল করে ২,০০০ বর্গফুট এলাকা জুড়ে ধানকাড়া মাশরুম (paddy straw mushroom) চাষ শুরু করেন। শুরুর দিকে ব্যবসা ভালো মুনাফা দেয়, কিন্তু ২০০৫ সালে উৎসাহের বশে চাষের অনুপযোগী শীতকালে ফলন বাড়াতে গিয়ে মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েন। ভুল সিদ্ধান্তের মাসুল হিসেবে তাঁর প্রথম ব্যবসা পুরোপুরি ডুবে যায়। জমানো পুঁজি ও এতদিনের পরিশ্রম এক নিমেষে জলে চলে যায়। সংসার চালাতে বাধ্য হয়ে তিনি আবার বিজয়ওয়াড়ার একটি ল্যাবরেটরিতে সেলস অফিসার হিসেবে চাকরি করা শুরু করেন। তবে নিজের ভিতরের স্বপ্নটাকে তিনি মুছে যেতে দেননি।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Plastic Recycling: বর্জ্য প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি হচ্ছে আধুনিক ব্যাগ, ফ্যাশনেবল ওয়ালেট কিংবা ঘরের সুন্দর প্ল্যান্টার! প্রথম শুনলে হয়তো একটু খটকা লাগতে পারে—‘ফেলে দেওয়া জঞ্জাল দিয়ে আবার ফ্যাশন?’ কিন্তু এই অসম্ভবকেই সম্ভব করে দেখিয়েছেন কণিকা আহুজা। দিল্লির বর্জ্যের পাহাড়কে তিনি রূপ দিয়েছেন এক অনন্য সামাজিক ও পরিবেশবান্ধব উদ্যোগে, যার নাম ‘লিফাফা’ (Lifaffa)।
মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে ২০১৩ সালে আবারও চাষবাসে ফিরে আসেন সঞ্জীব। এবার আগের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে ১০,০০০ বর্গফুট এলাকা জুড়ে বিশাল এক মাশরুম ইউনিট গড়ে তোলেন। ব্যবসা লাভের মুখ দেখতে শুরু করে। কিন্তু ২০১৯ সালে ‘সাইক্লোন হুডহুড’-এর আঘাতে এক রাতেই তাঁর মাশরুমের পুরো পরিকাঠামো মাটির সঙ্গে মিশে যায়। বছরের পর বছরের কষ্টার্জিত সাফল্য চোখের সামনে ধূলিসাৎ হয়ে যায়। রাতারাতি আবার শূন্যে নেমে এসেও তিনি ভেঙে পড়েননি। বরং উপলব্ধি করেন, প্রতিটি ধাক্কা মানুষকে নতুন কিছু শেখায়। তিনি নিজের কাছে প্রতিজ্ঞা করেন—এবার এমন এক ব্যবসায়িক মডেল তৈরি করবেন যা ঝড়েও অটুট থাকবে।
২০২০ সালে গতানুগতিক চাষের ঝুঁকি এড়িয়ে তিনি পা বাড়ান ফুল চাষে। নিজের শেষ সঞ্চয়ের ১.০৮ লাখ টাকা দিয়ে চুক্তি করেন লক্ষ্ণৌর ‘ন্যাশনাল বোটানিক্যাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট’ (NBRI)-এর সঙ্গে। সেখান থেকে নিয়ে আসেন ‘নমঃ-১০৮’ (লক্ষ্মী কমল) নামের বিরল ১০৮ পাপড়ির পদ্ম চাষের প্রযুক্তি, ৪০০টি চারা ও বীজ। গ্রামের পঞ্চায়েতের চারটি বড় পুকুর লিজ নেওয়ার পাশাপাশি তামিলনাড়ু থেকে আরও চারা আনিয়ে শুরু করেন এক নতুন লড়াই।
ধর্মীয় গুরুত্ব ও বাজারে কম জোগানের কারণে মাত্র দুই মাসের মধ্যে ফুল ফুটতেই এই বিশেষ পদ্মের চাহিদা আকাশ ছোঁয়। দিল্লি, কলকাতা, লুধিয়ানার মতো বড় বড় শহরে সরবরাহ শুরু হয়। শুধু পদ্ম বিক্রি করেই প্রথম দিকেই তাঁর আয় ৫ লক্ষ টাকা ছাড়িয়ে যায়। আজ সেই পুকুরগুলি থেকে বছরে ৩০,০০০-এর বেশি বিরল পদ্ম ফোটে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Anurag Bhandari: আমাদের চারপাশে আজ পরিবেশ সচেতনতা বা ‘সাসটেইনেবিলিটি’ নিয়ে কত বড় বড় কথা হয়। কিন্তু অনুরাগ সেটাকে স্রেফ মুখের কথায় আটকে না রেখে বাস্তবে করে দেখিয়েছেন। ভারতের ফার্নিচার ইন্ডাস্ট্রি থেকে প্রতি বছর লাখ লাখ টন বর্জ্য তৈরি হয়, যার বেশিরভাগটাই জমা হয় আবর্জনার স্তূপে। অনুরাগ এই অপচয় কমানোর লড়াইয়ে নেমেছেন।
এই সাফল্য তাঁকে আরও উৎসাহিত করে তোলে। ২০২৩ সালে কারাতালি গ্রামে জমি লিজ নিয়ে তিনি আফ্রিকান গাঁদা ফুল চাষ শুরু করেন। কলকাতা থেকে আনা মাত্র ৫৫০ টাকার চারা দিয়ে শুরু হওয়া সেই খামার আজ ৭,০০০ গাছের এক বাগানে পরিণত হয়েছে, যেখানে প্রতি একরে ৮ থেকে ১০ টন ফুল উৎপাদন হয়। তবে লাভের পাশাপাশি তিনি জোর দেন প্রকৃতির উপর। রাসায়নিক সার ও বিষাক্ত কীটনাশক সম্পূর্ণ ত্যাগ করে নিজের তৈরি ‘জীবামৃত’, ‘বীজামৃত’ ও ‘অগ্নিঅস্ত্র’-এর মতো সম্পূর্ণ জৈব পদ্ধতি ব্যবহার করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
ব্যবসা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সঞ্জীব বুঝতে পারেন, শুধু নিজের খামারের ফুলের উপর নির্ভর করে বাজার ধরে রাখা সম্ভব নয়। তিনি ব্যবসায়িক মডেলে বড় বদল আনেন। স্ত্রী টি. জয়শ্রী রেড্ডির নামে নথিভুক্ত ‘হ্যাপি দোকান’কে একটি সাধারণ খামার থেকে বদলে দেন বড় এক ফুল সংগ্রহ ও বিতরণ প্রতিষ্ঠানে। নিজে চাষ করার পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন রাজ্যের চাষীদের কাছ থেকে সরাসরি ফুল সংগ্রহ করা শুরু করেন। আজ তামিলনাড়ু থেকে পদ্ম, ওড়িশা, অন্ধ্রপ্রদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ থেকে গাঁদা, কর্ণাটক ও মহারাষ্ট্র থেকে গোলাপ এবং ছত্তিশগড় থেকে জারবেরা আনিয়ে প্রায় ২৫ ধরনের ফুলের জোগান বজায় রাখে তাঁর সংস্থা।
সঞ্জীব রাতারাতি অতিরিক্ত মুনাফা না করে সামান্য লাভে ফুল সরবরাহ করেন, যাতে সাধারণ দিন হোক বা উৎসবের মরসুম, গ্রাহকরা তাঁর উপর ভরসা রাখতে পারেন। আর তাজা ফুল গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দিতে তিনি ব্রহ্মপুরের কোল্ড স্টোরেজ ব্যবহার করেন।
আজ সঞ্জীব রেড্ডির ‘হ্যাপি দোকান’-এর বার্ষিক টার্নওভার ৬৫ লক্ষের গণ্ডি পার করে গিয়েছে! তাঁর এই প্রতিষ্ঠানে ১২ জন স্থায়ী কর্মী মাসে প্রায় ১৫,০০০ টাকা বেতনের পাশাপাশি বিনামূল্যে থাকা ও খাওয়ার সুযোগ পান। আর ব্যস্ত মরসুমে কাজ পান বহু স্থানীয় মানুষ। স্ত্রীর দক্ষ প্রশাসনিক পরিচালনায় আজ আরও জমি লিজ নিয়ে জুঁই, রজনীগন্ধা, সেবতী ও অলঙ্কারিক পাতার চাষের পাশাপাশি রায়াগাড়ার ৩৫০ একর জমির গাঁদা ফুল বিপণনের দায়িত্ব নিচ্ছেন তিনি।






