'অস্পৃশ্যদের খাবার' থেকে বিশ্বজোড়া জনপ্রিয়তা, মাদ্রাজ কারির অজানা ইতিহাস
Madras Curry: একসময় 'অস্পৃশ্যদের খাবার' বলে অবহেলিত মাদ্রাজ কারিই আজ বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় ভারতীয় পদ। কীভাবে ঔপনিবেশিক ভারতে নিম্নবর্ণের ভারতীয় রাঁধুনিদের হাত ধরে এই খাবার ব্রিটিশদের রান্নাঘরে পৌঁছে বিশ্বজোড়া পরিচিতি পেল?
ভারতীয় খাবারের কথা উঠলে বিশ্বের অনেক দেশেই 'মাদ্রাজ কারি'র নাম শোনা যায়। ব্রিটেন থেকে অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে আমেরিকা—প্রায় সর্বত্রই এই নামের কোনো না কোনো পদ রেস্তোরাঁর মেনুতে দেখা যায়। কিন্তু এই খাবারের ইতিহাস শুধু রন্ধনপ্রণালীর নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ঔপনিবেশিক শাসন, বর্ণপ্রথা, সামাজিক বৈষম্য এবং দীর্ঘদিন আড়ালে থেকে যাওয়া 'নিম্নবর্ণের' ভারতীয় শ্রমিকদের অবদান। ইতিহাসবিদ এস. গুণশেকরনের গবেষণা দেখায়, যে খাবার একসময় 'অস্পৃশ্যদের খাবার' বলে অবজ্ঞার শিকার হয়েছিল, সেটিই পরে বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় কারিতে পরিণত হয়।
অষ্টাদশ শতকে মাদ্রাজ, অর্থাৎ বর্তমান চেন্নাই, ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ব্রিটিশ সেনা, ব্যবসায়ী, কেরানি ও প্রশাসনিক কর্মীরা সেখানে বসবাস শুরু করেন। কিন্তু ভারতীয় সমাজে তাঁদের সহজে গ্রহণ করা হয়নি। অনেক উচ্চবর্ণের হিন্দু ইউরোপীয়দের গোমাংসভোজী বলে 'অশুচি' মনে করতেন। তাঁদের সঙ্গে খাওয়া, একই পাত্র ব্যবহার করা বা সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তোলা এড়িয়ে চলতেন। অনেক ক্ষেত্রে ইউরোপীয়দের স্পর্শ করা বাসন পর্যন্ত ভেঙে ফেলা হতো। তাঁদের রান্নাকে তাচ্ছিল্য করে 'পড়িয়া ফুড' বা 'পারিয়া ফুড' বলেও উল্লেখ করা হয়েছে সমসাময়িক লেখায়।
উচ্চবর্ণের বহু মানুষ ব্রিটিশদের বাড়িতে চাকরি করতে রাজি হতেন না। কারণ সেখানে গোমাংস রান্না করতে হতো, মদ পরিবেশন করতে হতো। মুসলিম কর্মীদের ক্ষেত্রেও ধর্মীয় কারণে মদ পরিবেশন নিয়ে আপত্তি ছিল। ফলে ইউরোপীয় পরিবারগুলির রান্নাঘরের প্রধান ভরসা হয়ে ওঠেন 'নিম্নবর্ণ' ও তথাকথিত অস্পৃশ্য সম্প্রদায়ের মানুষ। তাঁরাই রান্না করতেন, বাজার করতেন, মশলার ব্যবহার শেখাতেন এবং ধীরে ধীরে ইউরোপীয়দের ভারতীয় স্বাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতেন।
প্রথম দিকে ব্রিটিশরা নিজেদের দেশ থেকে আনা টিনজাত খাবারের উপর নির্ভর করতেন। কিন্তু গরম আবহাওয়া, দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা এবং সংরক্ষণের অসুবিধার কারণে সেই ব্যবস্থা বেশি দিন টেকেনি। খুব দ্রুত তাঁরা স্থানীয় উপকরণ ও রান্নার দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হন। সেখান থেকেই শুরু হয় এক নতুন ধরনের রান্নার পরীক্ষা-নিরীক্ষা। ভারতীয় মশলা, কারিপাতা, নারকেল, আম, ধনে, জিরে, গোলমরিচ, শুকনো লঙ্কা, আদা, হলুদ দিয়ে তৈরি হতে থাকে এমন এক কারি, যা ভারতীয় স্বাদকে ধরে রেখেও ইউরোপীয়দের রুচির উপযোগী করে সাজানো হয়েছিল। পরে এই মিশ্রণ থেকেই তৈরি হয় বিখ্যাত 'মাদ্রাজ কারি'।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
750 ml wine bottle: বিশ্বের অধিকাংশ ওয়াইনের বোতল কেন ৭৫০ মিলিলিটারের? এর পেছনে রয়েছে শতাব্দীপ্রাচীন ইতিহাস, ফ্রান্স-ব্রিটেনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক, কাচের বোতল তৈরির প্রযুক্তি এবং ওয়াইন সংরক্ষণের বিজ্ঞান। কীভাবে এই মাপ আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে পরিণত হলো? আজও কেন তা অপরিবর্তিত রয়েছে?
ব্রিটিশদের রান্নাঘরে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল যে শাসক ও শাসিতের সম্পর্ক অন্যভাবে ধরা পড়ত। বাইরে ব্রিটিশরা শাসক, আর ভারতীয়রা শাসিত। কিন্তু রান্নাঘরের ভিতরে অনেক সময় পরিস্থিতি উল্টো হয়ে যেত। ব্রিটিশ গৃহিণীরা ভারতীয় রাঁধুনিদের উপর নির্ভর করতেন। রান্নার খুঁটিনাটি, মশলার ভারসাম্য, আগুনের তাপ, কোন উপাদান কখন দিতে হবে—সবকিছুই জানতেন স্থানীয় রাঁধুনিরা। ফলে কর্তৃত্বের পাশাপাশি পারস্পরিক নির্ভরতাও তৈরি হয়েছিল।
ঊনবিংশ শতকের বিখ্যাত রন্ধনলেখক কর্নেল কেনি হারবার্ট, যিনি 'ওয়াইভার্ন' নামে লিখতেন, তাঁর বইয়ে এই সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছিলেন, রাঁধুনি ও গৃহস্বামীর মধ্যে ভালো সম্পর্ক না থাকলে ভালো রান্না সম্ভব নয়। তিনি আরও স্বীকার করেছিলেন, অনেক সময় ভারতীয় রাঁধুনিরাই ইউরোপীয়দের তুলনায় অনেক ভালো কারি তৈরি করতেন। যদিও পরে তিনি সেই কৃতিত্বের একটি বড় অংশ ইউরোপীয় গৃহিণীদের দিতেও চেয়েছিলেন, তবু তাঁর লেখাতেই স্পষ্ট ভারতীয় রাঁধুনিদের দক্ষতা ছাড়া এই রান্নার বিকাশ সম্ভব হতো না।
শুধু মাদ্রাজ কারিই নয়, একই সময়ে আর একটি পদ ইউরোপীয়দের মন জয় করে। সেটি হলো মুলিগাটনি স্যুপ। তামিল শব্দ 'মিলাগু তান্নির' থেকে এসেছে এই নাম, যার অর্থ 'গোলমরিচের জল'। দক্ষিণ ভারতের সাধারণ মরিচ-জলের পদকে ব্রিটিশরা নিজেদের স্বাদ অনুযায়ী বদলে ঘন, মাংসসমৃদ্ধ স্যুপে রূপান্তরিত করেন। পরে সেটিও ব্রিটেনে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। একইভাবে মাদ্রাজ কারিও স্থানীয় রান্না থেকে আন্তর্জাতিক খাবারে পরিণত হয়।
মাদ্রাজ কারির জনপ্রিয়তা এতটাই বেড়েছিল যে সেটি রাজপরিবার পর্যন্ত পৌঁছে যায়। ১৮৭৬ সালে ভারতের সফরে এসে প্রিন্স অব ওয়েলস বিশেষভাবে মাদ্রাজের আসল কারি খাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়, তাঁর এতই ভালো লেগেছিল তিনি ইংল্যান্ডে রাজপ্রাসাদে সেই স্বাদের কারি রান্না করার জন্য একজন মাদ্রাজি রাঁধুনিকে পাঠানোর অনুরোধ করেন। শেষ পর্যন্ত ঔপনিবেশিক প্রশাসন একজন রাঁধুনিকে ইংল্যান্ডে পাঠায়। এই ঘটনাই প্রমাণ করে, কয়েক দশকের মধ্যেই মাদ্রাজ কারি সাম্রাজ্যের অভিজাত মহলেও নিজের জায়গা করে নিয়েছিল।
এরপর শুরু হয় বাণিজ্যিক সাফল্যের নতুন অধ্যায়। উনিশ শতকে বাজারে আসতে থাকে 'মাদ্রাজ কারি পাউডার' এবং 'মাদ্রাজ কারি পেস্ট'। যারা ভারত থেকে ফিরে গিয়েছিলেন, তাঁদের কাছে এই পণ্যগুলি ছিল পুরনো স্বাদ ফিরিয়ে আনার মাধ্যম। বিভিন্ন বিজ্ঞাপনে দাবি করা হতো, এগুলিই আসল মাদ্রাজের স্বাদ। অস্ট্রেলিয়া, ব্রিটেন-সহ বহু দেশে এই কারি পাউডারের বাজার তৈরি হয়। ভেনকাটাচেল্লাম ব্র্যান্ডের মাদ্রাজ কারি পাউডার মেলবোর্নের আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতেও প্রদর্শিত হয়েছিল। এভাবেই একটি আঞ্চলিক রান্না ধীরে ধীরে বিশ্ববাজারের পণ্যে পরিণত হয়।
আজকের দিনে বিশ্বের নানা দেশে 'মাদ্রাজ কারি' নামে যে পদ পরিবেশন করা হয়, তার স্বাদ অবশ্য এক নয়। কোথাও তা ঝাল, কোথাও মিষ্টি, কোথাও আবার ঘন গ্রেভিযুক্ত। স্থানীয় উপকরণ ও রুচি অনুযায়ী এর রূপ বদলেছে। কিন্তু এই পরিবর্তনের মধ্যেও একটি বিষয় অপরিবর্তিত থেকেছে—এটি ভারতীয় রান্নার এক শক্তিশালী আন্তর্জাতিক পরিচয় হয়ে উঠেছে। ভারতীয় মশলার ব্যবহার এবং বহুসাংস্কৃতিক প্রভাবই এর জনপ্রিয়তার মূল কারণ।
তবে এই ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্ভবত অন্যত্র। বিশ্বজোড়া জনপ্রিয়তার গল্পে যাঁদের অবদান ছিল সবচেয়ে বেশি, সেই 'নিম্নবর্ণের' ভারতীয় রাঁধুনিদের নাম ইতিহাসে প্রায় নেই। রান্নার কৃতিত্ব অনেক সময় ইউরোপীয় গৃহিণী, ঔপনিবেশিক লেখক কিংবা ব্যবসায়ীদের নামে নথিভুক্ত হয়েছে। অথচ রান্নার আসল কৌশল, মশলার ভারসাম্য এবং স্থানীয় জ্ঞান এসেছিল সেই সব মানুষের কাছ থেকে, যাঁদের সমাজ দীর্ঘদিন 'অস্পৃশ্য' বলে দূরে সরিয়ে রেখেছিল।
আজ যখন কোনও বিদেশি রেস্তোরাঁয় 'মাদ্রাজ কারি' পরিবেশন করা হয়, তখন তার সঙ্গে অদৃশ্যভাবে জুড়ে থাকে সেই সব নামহীন ভারতীয় রাঁধুনিদের শ্রম, যাঁদের অবদান ছাড়া এই বিশ্বজনীন খাবারের জন্মই হতো না।








