পশ্চিমবঙ্গ বিরোধী-শূন্য হয়ে যাবে? মমতার উপর হামলা ভাবাচ্ছে বাংলাকে
Mamata Banerjee Car Attack: হালিশহরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গাড়িতে হামলার ঘটনা বাংলার বদলে যাওয়া রাজনৈতিক পরিবেশের ইঙ্গিত? বিরোধী নেতাদের উপর হামলা, গ্রেফতার, দলবদল এবং নেতাজিকে ঘিরে বিতর্কের মধ্যে রাজনৈতিক সহিষ্ণুতার জায়গা কি ক্রমেই কমছে? প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীরই যদি নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত?
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বিরোধিতা নতুন কিছু নয়। বরং এই রাজ্যের রাজনৈতিক ইতিহাসই তৈরি হয়েছে তীব্র মতাদর্শগত লড়াই, মিছিল, আন্দোলন, পাল্টা মিছিল এবং সরকারের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে। কিন্তু রাজনৈতিক মতবিরোধ যখন ব্যক্তিগত আক্রমণ, হিংসা কিংবা ভয় দেখানোর মতো পরিস্থিতি তৈরি করে, তখন প্রশ্নটা আর শুধু কোনো একটি দলের থাকে না। প্রশ্ন ওঠে গণতন্ত্রের রাজনৈতিক পরিসর নিয়েই।
গত ৯ অগাস্ট উত্তর ২৪ পরগনার হালিশহরে যে ঘটনা ঘটল, সেই প্রশ্নটিই নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী এবং তৃণমূল কংগ্রেসের সভানেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেছেন, মৃত তৃণমূল কর্মীর পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার সময় তাঁর গাড়িতে বড় বড় পাথর, চটি এবং কাদা ছোড়া হয়। তাঁর দাবি, পুলিশ সেখানে উপস্থিত থাকলেও হামলা ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। এমনকি গাড়ির জানলা খোলা থাকলে তিনি গুরুতর আহত, এমনকি নিহতও হতে পারতেন বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
ঘটনার যে অংশটি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক নেই, তা হলো মমতার কনভয়কে ঘিরে বিক্ষোভ এবং তাঁর গাড়িতে কাদা ও অন্যান্য জিনিস ছোড়ার ঘটনা। তবে হামলার পিছনে কারা ছিল, তা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলির বক্তব্য সম্পূর্ণ আলাদা। মমতা এর জন্য বিজেপি-সমর্থিত দুষ্কৃতীদের দায়ী করেছেন এবং পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বিজেপি অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের বক্তব্য, মমতার সফরকে কেন্দ্র করে স্থানীয় মানুষের ক্ষোভ থেকেই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। ফলে এই মুহূর্তে রাজনৈতিক অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে ধরে নেওয়ার বদলে তদন্তের ফলের অপেক্ষা করাই যুক্তিসঙ্গত।
কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক, একটি প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর গাড়িতে পাথর ছোড়ার মতো ঘটনা গণতান্ত্রিক সমাজে কোনোভাবেই স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রতিবাদের ভাষা হতে পারে না। সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হতে পারে, কোনো নেতার বিরুদ্ধে স্লোগান হতে পারে, তাঁর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামা যেতে পারে। কিন্তু গাড়িতে পাথর ছোড়া সেই সীমা অতিক্রম করে।
আজ যদি একজন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে যাওয়ার পথে নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেন, তাহলে সাধারণ রাজনৈতিক কর্মী বা সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তার প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Egg-Throwing Politics in Bengal: ডিম ছোড়া কি সত্যিই জনরোষের বহিঃপ্রকাশ, নাকি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে অপমান করার নতুন কৌশল? আইনের শাসনের বদলে কি জনতার হাতে বিচার তুলে নেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে পশ্চিমবঙ্গে?
অবশ্য হালিশহরের ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা হিসেবেও দেখা যায় না। গত কয়েক মাসে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে শাসক ও বিরোধী—দুই শিবিরের নেতাকর্মীদের ঘিরেই একের পর এক সংঘর্ষ, হামলা, গ্রেফতার এবং পাল্টা অভিযোগ সামনে এসেছে। মে মাসে সোনারপুরে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপর হামলা হয়। তাঁকে ঘিরে বিক্ষোভের সময় পাথর, জুতো ও ডিম ছোড়ার ঘটনাও সামনে এসেছিল। তৃণমূল এই ঘটনাকে রাজনৈতিক হামলা বলেছিল, বিজেপি অবশ্য নিজেদের যোগ অস্বীকার করেছিল।
রাজনৈতিক হিংসার বিরুদ্ধে নীতিগত অবস্থান যদি সত্যিই গণতান্ত্রিক হয়, তাহলে সেই অবস্থান দল নির্বিশেষে একই হওয়া দরকার।
বারুইপুরের নাবালিকা ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের পর উত্তেজনার ঘটনায় সিপিআই(এম) নেতা মহম্মদ লাহেক আলিকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তাঁর বিরুদ্ধে হিংসা উসকে দেওয়া-সহ একাধিক ধারায় মামলা করা হয়েছে। পুলিশি তদন্তে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হলেও লাহেক আলি অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং তাঁর আইনজীবী তদন্তকে পক্ষপাতদুষ্ট বলে দাবি করেছেন। মামলায় প্রাক্তন বাম সাংসদ সুজন চক্রবর্তীর নামও আসে।
এখানে আসল প্রশ্ন, কোনো রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তদন্ত হবে না কেন? অবশ্যই হবে। আইন ভাঙার অভিযোগ থাকলে গ্রেফতারও হতে পারেন। কিন্তু একই সঙ্গে দেখতে হবে, তদন্তটি স্বচ্ছ কি না, রাজনৈতিক পরিচয় তদন্তের গতিপথকে প্রভাবিত করছে কি না এবং একই ধরনের অভিযোগে শাসক ও বিরোধী—দুই পক্ষের ক্ষেত্রেই কি একই মাপকাঠি ব্যবহার করা হচ্ছে।
সরকারের ভুল ধরিয়ে দেওয়ার জন্য, প্রশাসনের উপর নজর রাখার জন্য, মানুষের অসন্তোষকে তুলে ধরার জন্য এবং ক্ষমতাকে জবাবদিহির মধ্যে রাখার জন্যও কিন্তু শক্তিশালী বিরোধী পরিসর প্রয়োজন। এ কথা বলতেই হয়, সরকারের ভুল ধরিয়ে দেওয়ার মতো শক্তিশালী বিরোধী না থাকলে, প্রশাসনের উপর মানুষের নজরদারিও কমে যায়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
West Bengal Politics: দুর্মূল্যের বাজারে ক্রেটের পর ক্রেট ডিম ছুড়ে রাজনৈতিক প্রতিবাদ দেখানো হচ্ছে। কিন্তু এই ডিমের জোগান দিচ্ছে কারা? প্রদীপ্ত ভট্টাচার্যের ‘নধরের ভেলা’র মতোই প্রশ্ন উঠছে—মঞ্চে যারা দৃশ্যমান, তারা কি শুধু পদাতিক? আর নেপথ্যের রিংমাস্টারদের স্বার্থই বা কী?
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাম্প্রতিক দলবদলের রাজনীতি। পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতার সঙ্গে রাজনৈতিক আনুগত্যের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যাওয়া নেতাদের নিয়েও একই প্রশ্ন উঠেছে। ফলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই যদি কেবল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয় এবং নিজের শিবিরে আসা অভিযুক্তদের ক্ষেত্রে তা নরম হয়ে যায়, তাহলে সাধারণ মানুষের কাছে আইনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।
রাজনীতিতে এই ‘ভালো’ ও ‘খারাপ’ নেতার ভাগাভাগি গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক। কেউ দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত হলে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে অভিযোগের গুরুত্ব বদলে যেতে পারে না। তিনি যে দলেরই হোন, তদন্তের মুখোমুখি হওয়া উচিত। আবার অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে অপরাধী বলাও উচিত নয়। আইনকে রাজনৈতিক আনুগত্যের উপর নির্ভরশীল করে ফেললে শেষ পর্যন্ত আইনের বিশ্বাসযোগ্যতাই নষ্ট হয়।
এরই মধ্যে বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতির আরও একটি অস্বস্তিকর দিক সামনে এসেছে—ইতিহাস ও বাঙালির আইকনদের নিয়েও ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক টানাপড়েন। সম্প্রতি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে নিয়ে বিজেপির এক সাংসদের মন্তব্যকে কেন্দ্র করে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিজেপির প্রবীণ নেতা তথাগত রায়ও দলের নেতৃত্বের সমালোচনা করেছেন। তাঁর মতে, নেতাজির মতো বাঙালির শ্রদ্ধেয় ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে নিয়ে অসম্মানজনক মন্তব্য করলে তার রাজনৈতিক প্রভাবও গুরুতর হতে পারে।
নেতাজি কোনো একটি রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নন। তাঁর রাজনৈতিক চিন্তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, তাঁর ইতিহাস নিয়ে গবেষণা হতে পারে, তাঁর সিদ্ধান্তের সমালোচনাও হতে পারে। কিন্তু তাঁকে রাজনৈতিক গালাগালির ভাষায় নামিয়ে আনা বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবক্ষয়েরই লক্ষণ। একইভাবে কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে শুধু নিজের দলের বা মতাদর্শের প্রতীক হিসেবে দেখানোর চেষ্টাও বিপজ্জনক।
মজার বিষয়, নেতাজির উত্তরসূরি পরিবারের সদস্য চন্দ্রকুমার বসু কিছুদিন আগেই তৃণমূলে যোগ দিয়েছিলেন। পরে আবার তৃণমূল ছেড়ে তিনি মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলিকে নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন। ফলে বোঝাই যায়, নেতাজির উত্তরাধিকার নিয়ে রাজনৈতিক টানাপড়েন কতটা জটিল।
তবে প্রশ্ন থাকছেই, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি কি ক্রমশ বিরোধী-শূন্য হয়ে যাবে?
বিরোধী দলের কর্মী কি নির্ভয়ে সভা করতে পারেন? কোনো নেতা কি সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলার পর প্রতিহিংসার আশঙ্কা ছাড়াই নিজের রাজনৈতিক কাজ চালাতে পারেন? পুলিশের কাছে অভিযোগ করলে রাজনৈতিক পরিচয় না দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হয় কি? প্রশাসন কি শাসক এবং বিরোধী—দুই পক্ষের ক্ষেত্রেই একই নিয়ম মেনে চলে? এই প্রশ্নগুলির উত্তরই বলে দেয় একটি রাজ্যের গণতন্ত্র কতটা সুস্থ। হালিশহরের ঘটনা তাই বাংলার রাজনৈতিক ভাষা আজ কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে, তারই একটি প্রতীকী মুহূর্ত আরও স্পষ্ট করে তুলে ধরেছে।
বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে তীব্র লড়াই ছিল, কিন্তু সেই লড়াইয়ের সঙ্গে ছিল মতাদর্শ, বিতর্ক, যুক্তি এবং মানুষের অংশগ্রহণ। আজ সেই জায়গায় যদি ব্যক্তিগত আক্রমণ, ভয় দেখানো, কাদা ছোড়াছুড়ি এবং ইতিহাসের আইকনদের নিয়ে কুরুচিকর রাজনৈতিক বাকযুদ্ধ জায়গা করে নেয়, তাহলে প্রশ্নটা কোনো একটি দলের বিরুদ্ধে নয়। প্রশ্নটা গোটা রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিরুদ্ধে।
প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর গাড়িতে হামলা যেমন নিন্দনীয়, তেমনই যে কোনো বিরোধী কর্মী বা নেতার উপর হামলাও নিন্দনীয়। কোনো দলের কর্মী গ্রেফতার হলে তাঁর বিরুদ্ধে প্রমাণ থাকলে বিচার হোক, কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে আইন প্রয়োগের অভিযোগ যেন না ওঠে। আর দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত কেউ দল বদলে ক্ষমতাবান শিবিরে গেলেই যদি হঠাৎ সেই অভিযোগের গুরুত্ব কমে যায়, তাহলে মানুষের আস্থা আরও ক্ষয়ে যাবে। গণতন্ত্রে শেষ কথা বলে মানুষ। সেই মানুষই সরকার বদলায়, বিরোধী দলকে শক্তিশালী করে, আবার প্রয়োজনে প্রত্যাখ্যানও করে।








