মনোজ তিওয়ারি থেকে ঋদ্ধিমান সাহা, বাইশ গজে বাংলার ভাগ্যে শুধুই অবহেলা?

স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শুরু করে একাধিক ক্ষেত্রের মাধ্যমে ভারতের ইতিহাসে সর্বদা নিজেদের নাম উল্লেখযোগ্যভাবে প্রতিষ্ঠা করে চলেছে বাঙালি। এক্ষেত্রে যে জগৎ নিয়ে অবশ্য সেরকমভাবে আলোচনা করা হয় না, তা হল ক্রিকেট দুনিয়া। ক্রিকেটের বাইশ গজে বাঙালির অবদান যে কোনও অংশে কম নয়, তা মানতে হবে। তবে এক্ষেত্রে সম্মানের চেয়ে আমাদের কপালে ঢের বেশি জুটেছে অবহেলা। অতীত থেকেই একের পর এক দুর্দান্ত প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও ভারতীয় দলে সুযোগ পাননি বাংলার অনেকেই। যথেষ্ট সুযোগের অভাবে হারিয়ে গেছে সেই সব প্রতিভা।

বাইশ গজে বাঙালিদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নাম যদি কেউ করে থাকেন, তাহলে তিনি অবশ্যই 'দাদা' তথা বাংলার 'মহারাজ' এবং ভারতীয় দলের প্রাক্তন অধিনায়ক সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়। দেশ-বিদেশের মাঠে সর্বত্রই দাপট দেখিয়ে গিয়েছেন তিনি। তবে সৌরভের প্রসঙ্গ বাদ দিলে বাংলার কপালে জুটেছে খালি বঞ্চনা। বিগত বেশ কয়েক বছরে সেই বঞ্চনার ইতিহাস তুলে ধরলে দেখা যাবে যেন আরও বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে সেই তালিকাটি, যেখানে নাম রয়েছে যথাক্রমে অশোক দিন্দা থেকে শুরু করে ঋদ্ধিমান সাহা, মনোজ তিওয়ারি এবং লক্ষ্মীরতন শুক্লার।

উল্লেখ্য, বাংলা দলে অসাধারণ পারফরম্যান্স করলেও  তাঁদের ডাক পড়েনি ভারতীয় দলে কিংবা সুযোগ পেলেও হয়তো বসে থাকতে হয়েছে রিজার্ভ বেঞ্চে; এহেন অনেক উদাহরণ রয়েছে। এক্ষেত্রে সৌরভ-পরবর্তী সময় প্রধান যে দু'টি নাম আমাদের মধ্যে ভেসে আসে, তা অবশ্যই মনোজ তিওয়ারি এবং উইকেটকিপার ঋদ্ধিমান সাহা। তবে ভারতীয় দলে সুযোগ না পাওয়ার নেপথ্যের কারণ কী?

আরও পড়ুন: মিতালির ২৩ বছরের কেরিয়ার চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে যে কোনও পুরুষ ক্রিকেটারকে

মনোজ তিওয়ারি
একদা বাংলা দলের অধিনায়ক এবং বর্তমানে তৃণমূল কংগ্রেস বিধায়ক মনোজ তিওয়ারির তুলনা একসময় করা হতো বিরাট কোহলির সঙ্গে। অবাক লাগলেও এটি সত্য ঘটনা এবং এর জন্য ফিরে যেতে হবে বেশ কয়েক বছর আগে; যে-সময় ভারতীয় দলের অধিনায়ক ছিলেন মহেন্দ্র সিং ধোনি। বাংলা দলে সেই মুহূর্তে অসাধারণ পারফরম্যান্স করে চলেছেন মনোজ। একের পর এক শতরান এবং বল হাতেও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন তিনি। এর পরে ভারতীয় দলে সুযোগ দিলে অবশ্য নিরাশও করেননি বাংলার এই ক্রিকেটার। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে একটি ম্যাচে শতরান করে দলকে জেতাতে সহায়তা করেন মনোজ।

এক্ষেত্রে, ২০১১ সালের সেই ভারত বনাম ওয়েস্ট ইন্ডিজ ম্যাচের কথা হয়তো ভুলতে পারবে না বহু বাঙালি ক্রিকেটপ্রেমীই। কীভাবে পরপর উইকেট হারানোর মাঝে ব্যাট করতে নেমে ঠান্ডা মাথায় সেঞ্চুরি করেছিলেন বাংলার এই ক্রিকেটার, তা কখনওই ভোলার নয়। কিন্তু তারপরেও একাধিক সময়ে রিজার্ভ বেঞ্চে বসে কাটাতে হয় তাঁকে। এরপর অন্য একটি ম্যাচে বল হাতে চারটি উইকেট নিলেও শ্রীলঙ্কা থেকে ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবং অস্ট্রেলিয়া সফরে ম্যাচের পর ম্যাচ মাঠের বাইরে থেকেই তাঁকে দেখতে হয় খেলা। জায়গা হয় না প্রথম একাদশে! সম্প্রতি বিধানসভা ভোটে দাঁড়িয়ে জয়লাভ করেন তিনি এবং পুনরায় একবার বাংলা দলের হয়ে খেলা শুরু করলেও এই মুহূর্তে দেশের হয়ে খেলার স্বপ্ন তাঁর আর নেই বললেই চলে।

ঋদ্ধিমান সাহা

এবার আসা যাক বাংলার উইকেটরক্ষক-ব্যাটসম্যান ঋদ্ধিমান সাহার কথায়। দীর্ঘ দশ বছরের বেশি সময় ধরে দেশ তথা বিশ্বের অন্যতম সেরা উইকেটরক্ষক হিসেবে পরিচিত এই বঙ্গতনয়। গ্লাভস হাতে তাঁর পারফরম্যান্স প্রাক্তন ভারতীয় অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনিকে হার মানাতে বাধ্য বলে মত অনেক ক্রিকেট বিশেষজ্ঞর। তবে বাংলার এই ক্রিকেটারের ভাগ্যেও জুটেছে কেবল বঞ্চনা। দেশের অন্যতম সেরা উইকেটরক্ষক-ব্যাটসম্যান হয়ে মাত্র ৪০টি টেস্ট খেলেন ঋদ্ধি এবং ওয়ান ডে ক্রিকেটে তাঁর ম্যাচ-সংখ্যা মোটে ৯।

বলে রাখা ভালো, ২০১০ থেকে দীর্ঘ বেশ কয়েক বছরে ভারতীয় দলের অধিনায়ক এবং উইকেটরক্ষক দুই ক্ষেত্রেই মহেন্দ্র সিং ধোনি নিজের জায়গা পাকা করায় ঋদ্ধির পক্ষে সুযোগ পাওয়া বেশ মুশকিল হয়ে দাঁড়ায়। আর বর্তমানেও, ধোনির পরবর্তী সময়ে ঋষভ পন্থ উঠে আসায় দলে জায়গা পাওয়া কঠিন হয়েছে তাঁর কাছে। উল্লেখ্য, ২০১০ সালে সাউথ আফ্রিকার বিরুদ্ধে ভারতীয় দলের হয়ে নিজের প্রথম টেস্ট ম্যাচ খেললেও এরপর দীর্ঘ ১২ বছরের কেরিয়ারে মাত্র ৪০টি টেস্ট খেলেন তিনি, যার মধ্যে তিনটি শতরানও রয়েছে।

তবে অপর এক মহলের কথায়, উইকেটরক্ষক হিসেবে ভরসাযোগ্য হলেও ব্যাটিং ফর্ম ধারাবাহিক না হওয়াই তাঁর দল থেকে বাদ পড়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তবে আইপিএলে চিত্রটি অনেকটাই উল্টো। অতীতে পাঞ্জাব এবং বর্তমানে গুজরাতের হয়ে প্রায় প্রতিটি ম্যাচেই খেলতে দেখা যায় ঋদ্ধিকে। তবে বাংলার হয়ে ঘরোয়া ক্রিকেট এবং আইপিএলে ভালো খেললেও জাতীয় দলের দরজা তাঁর জন্য এক প্রকার বন্ধই থাকে।

এর ওপর বর্তমানে এক সাংবাদিকের সঙ্গে ঋদ্ধিমান সাহার গন্ডগোলের জেরে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে, যা নিয়ে এই মুহূর্তে বাংলা দলের হয়ে খেলা প্রায় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে এই ক্রিকেটারের। ফলে ৩৭ বছর বয়সে এসে জাতীয় দলের হয়ে খেলা আর সম্ভব হবে কি না, সেই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে উঠেছে।

মনোজ তিওয়ারি থেকে শুরু করে ঋদ্ধিমান সাহা হোক কিংবা অন্যান্য ক্রিকেটার, বাংলার ক্রিকেটারদের ভাগ্যে জুটেছে কেবল অবহেলা। তবে বর্তমানে সেই চিত্র পাল্টাতে মরিয়া বহু তরুণ প্রতিভাই। সকল ক্রিকেটপ্রেমীদের একটাই আশা, "বাংলা থেকে আবারও উঠে আসুক সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো কোনও এক খেলোয়াড়।"

More Articles

;