মিতালির ২৩ বছরের কেরিয়ার চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে যে কোনও পুরুষ ক্রিকেটারকে

মিতালিকে নিয়ে তৈরি বায়োপিক ‘শাবাশ মিঠু’ মুক্তি পাবে ১৫ জুলাই। এই ছবিতে মিতালির ভূমিকায় দেখা যাবে তাপসী পান্নুকে। তার আগেই অবসর নিলেন তিনি।

Piya Saha
৩ মিনিট
মিতালির ২৩ বছরের কেরিয়ার চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে যে কোনও পুরুষ ক্রিকেটারকে

"সমস্ত যাত্রার মতো, এটিও অবশ্যই একদিন না একদিন শেষ হত। তেমনটাই হল। আমি অবসর নিলাম ক্রিকেট থেকে।" গতকাল নিজের ট্যুইটার অ্যাকাউন্টে লিখেছেন মিতালি। ভারতের মহিলা ক্রিকেটের ইতিহাসে শেষ হল এক সোনালী অধ্যায়। শেষ বিশ্বকাপ অভিযান ভালো যায়নি ভারতের, তাই অনেকেই আশা করেছিলেন এবার হয়তো বিদায় নিতে পারেন মিতালি। কয়েক মাস যেতেই তাঁর এই ঘোষণা। সব ধরনের ক্রিকেট থেকে বিদায় নিলেন ভারতের মহিলা ক্রিকেটের অধিনায়ক মিতালি রাজ।

৩৯ বছর বয়সি মিতালি মহিলাদের ওয়ান ডে ক্রিকেটের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক। এই ফরম্যাটে তিনি মোট ৭৮০৫ রান করেছেন। ৮৯টি টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে মিতালির রানের পরিমাণ ২৩৬৪ এবং ১২ টেস্ট ম্যাচে ৬৯৯ রান রয়েছে তাঁর ঝুলিতে। ভারতের মহিলা ক্রিকেট নিয়ে মাতামাতি শুরুর অন্যতম কারণ তিনি। কারণ মিতালি রাজের অধীনেই ভারত ২০১৭ সালে মহিলাদের ওয়ান ডে বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছেছিল।

১৯৯৯ সালের জুন মাসে আয়ারল্যান্ডের বিরুদ্ধে ভারতীয় ক্রিকেটে অভিষেক ঘটে মিতালি রাজের। দীর্ঘ ২৩ বছরের ক্রিকেটজীবন পরবর্তী প্রজন্মকে সাহস জুগিয়েছে নতুন করে স্বপ্ন দেখার। বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ভারতের হয়ে শেষ ম্যাচ খেলেছিলেন মিতালি। ভারত ওই ম্যাচে হেরে বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয়। কিন্তু ওই ম্যাচেও মিতালি ৮৪ বলে ৬৮ রান করেছিলেন।

ট্যুইটারে এক আবেগঘন পোস্টে মিতালি রাজ লিখেছেন, "ছোটবেলাতেই লক্ষ্য স্থির করে নিয়েছিলাম যে ভারতের হয়ে নীল জার্সি পরব। দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করা ছিল আমার কাছে সবচেয়ে সম্মানের। এই যাত্রার বেশিরভাগ সময়ই ভালোভাবে কাটিয়েছি। খারাপ অভিজ্ঞতা রয়েছে খুব কম। প্রতিটি অভিজ্ঞতাই আমাকে নতুন কিছু শিখিয়েছে। গত ২৩ বছর আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর, পরিপূর্ণ এবং উপভোগ্য বছর ছিল।" তিনি আরও লিখেছেন, "দেশকে জেতাতে সবসময়ই আমি আমার সেরাটা দিয়েছি। ভারতকে প্রতিনধিত্ব করার যে সুযোগ আমাকে দেওয়া হয়েছে, তা আমার হৃদয়ের খুব কাছের।"

তবে ব্যাট তুলে রাখলেও যে ক্রিকেটের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিন্ন হচ্ছে না, সেকথাও জানিয়েছেন মিতালি।তিনি কোনও না কোনওভাবে খেলাটার সঙ্গে যুক্ত থাকতে চান। ফলে ভবিষ্যতে তাঁর কোচ হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। মিতালি জানিয়েছেন, "এত দিন ধরে দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে ব্যক্তি হিসেবেও তাঁর অনেক পরিবর্তন হয়েছে। ধন্যবাদ জানিয়েছেন ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডকেও।"

১০ বছর বয়সে ক্রিকেটে হাতেখড়ি হয় মিতালির। বাবা দোরাই রাজ ছিলেন ভারতীয় বিমানবাহিনীর অফিসার। মূলত,‌ বাবার ইচ্ছেতেই ক্রিকেট খেলা শুরু করেন। মাত্র ১৪ বছর বয়সেই জাতীয় দলে যোগ দেওয়ার সুযোগ এসেছিল তাঁর সামনে। ১৯৯৭ সালে মহিলা ক্রিকেট বিশ্বকাপ দলে তাঁকে নেওয়ার কথা হয়েছিল। তবে শেষ মুহূর্তে বাদ পড়েন মিতালি। প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচেই শতরান করেছিলেন। ২০০১-'০২ মরশুমে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে টেস্টে অভিষেক হয় তাঁর। তৃতীয় টেস্টে মাত্র ১৯ বছর বয়সে দ্বি-শতরান করেন। ২০০৫ সালে তাঁর নেতৃত্বে মহিলা বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠে ভারত। সেখানে হেরে যায় অস্ট্রেলিয়ার কাছে। তাঁর ঝুলিতে একাধিক রেকর্ড রয়েছে। তাঁর রেকর্ডের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো:

১) একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে মিতালি রাজ সর্বোচ্চ রানের অধিকারী। মোট ৭৮০৫ রান রয়েছে তাঁর ঝুলিতে। ইংল্যান্ডের শার্লট এডওয়ার্ডস ১৯১ ম্যাচে ৫৯৯২ রান করে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন।

২) একজন মহিলা ক্রিকেটার হিসেবে সর্বাধিক একদিনের ম্যাচ খেলেছেন মিতালি। দীর্ঘ ২৩ বছরের ক্রিকেটজীবনে ২৩২টি একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন ভারতের হয়ে।

৩) ১৬ বছর বয়সে অভিষেক ম্যাচেই ১১৪ রান করে অপরাজিত ছিলেন তিনি। একদিনের ক্রিকেটে সর্বকনিষ্ঠ মহিলা ক্রিকেটার হিসেবে সেঞ্চুরি করেন মিতালি।

৪) ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটার হিসেবে মিতালিই প্রথম টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটজীবনে দু'টি সেঞ্চুরি করেছিলেন।

৫) ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটারদের মধ্যে টি-টোয়েন্টিতে সর্বাধিক রানও মিতালির ঝুলিতে। ৮৯টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচে ২৩৬৪ রান করেছেন।

৬) মাত্র ২২ বছর বয়সেই ভারতীয় মহিলা টেস্ট ক্রিকেটের অধিনায়ক হন মিতালি। বিশ্ব মহিলা ক্রিকেটের ইতিহাসে সবচেয়ে কমবয়সি অধিনায়ক হিসেবে মিতালি তৃতীয়। অধিনায়ক হিসেবে প্রথম টেস্টে ইংল্যান্ডের বিরূদ্ধে ভারত ড্র করে।

৭) সবচেয়ে কমবয়সি মহিলা ক্রিকেটার হিসেবে টেস্টে দ্বিশতরানের ইনিংস খেলেন এই মহিলা ক্রিকেটার। মিতালি মাত্র ১৯ বছর বয়সেই এই নজির গড়েন।

৮) একমাত্র ভারতীয় ক্রিকেটার মিতালি, যিনি ৪টি বিশ্বকাপে নেতৃত্ব দিয়েছেন ও তার মধ্যে ২বার ফাইনালে পৌঁছেছেন

৯) একমাত্র ভারতীয় ক্রিকেটার হিসেবে ওয়ান ডে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে টানা ৭টি ম্যাচে অর্ধশতরান করেছেন মিতালি।

১০) ২০২১ সালের মার্চ মাসে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে ওয়ান ডে ম্যাচে বিশ্বের দ্বিতীয় মহিলা ক্রিকেটার হিসেবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ১০,০০০ রান পূর্ণ করেন মিতালি রাজ।

শুধু ক্রিকেট নয়, ভরতনাট্যমেরও তালিম রয়েছে তাঁর।ভালোবাসেন বই পড়তেও। মিতালিকে নিয়ে তৈরি বায়োপিক ‘শাবাশ মিঠু’ মুক্তি পাবে ১৫ জুলাই। এই ছবিতে মিতালির ভূমিকায় দেখা যাবে তাপসী পান্নুকে। পরিচালনা করেছেন সৃজিত মুখোপাধ্যায়।

লিখেছেন
Piya Saha
Piya Saha
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

নারী টেস্টে এত অনীহা কেন, লর্ডসের ইতিহাসও বদলাবে না সেই ছবি?

Women’s Test Cricket: লর্ডসে ভারতের নারী ক্রিকেট দলের ঐতিহাসিক জয় নারী টেস্ট ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ বদলানোর সুযোগ এনে দিয়েছে? এত সাফল্য ও জনপ্রিয়তার পরও কেন এই ফরম্যাটে নিয়মিত ম্যাচ নেই?

শিব-পরশুরামের যুদ্ধবিদ্যা কালারিপায়াট্টু থেকেই জন্ম কুংফুর!

Kalaripayattu Indian Martial Art: ভারতীয় পৌরাণিক ঐতিহ্যে কালারিপায়াট্টুকে স্রেফ যুদ্ধের কৌশল হিসেবে দেখা হয়নি, বরং এটিকে মানব শরীরের অভ্যন্তরীণ প্রাণশক্তিকে জাগিয়ে তোলার এক মহান সাধনা বলে মনে করা হয়।

দু'হাজার বছর পুরনো ‘আত্য পাত্যা’: এই খেলাই শিখিয়েছিল যুদ্ধের কৌশল!

Atya Patya Traditional Indian Game: আনুমানিক ১০০ থেকে ৩০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রচিত প্রাচীন তামিল সাঙ্গম সাহিত্য ‘নাটতৃণৈ’-তে এই খেলার প্রথম লিখিত প্রমাণ পাওয়া যায়। অতএব, এই খেলার বয়স প্রায় দুই হাজার বছরেরও বেশি। সেখানে বলা আছে, প্রাচীন চোল রাজবংশের সেনারা যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার আগে নিজেদের ক্ষিপ্রতা, দ্রুত দৌড়ানোর ক্ষমতা আর শরীরকে এক নিমেষে বাঁকানোর চপলতা বাড়াতে এই খেলায় মেতে উঠত।

১৬ বছর পর ফের ভারতের পথে ললিত মোদী

Lalit Modi return to India: দীর্ঘ সময় পর দিল্লির আপিল ট্রাইব্যুনাল তাঁর বিরুদ্ধে থাকা আর্থিক অনিয়মের বড় অভিযোগ ও জরিমানা বাতিল করে দেওয়ার পরেই এই আলোচনার সূত্রপাত। সোশ্যাল মিডিয়ায় ললিত মোদী নিজেই স্পষ্ট করেছেন, সমস্ত বড়সড় আইনি জটিলতা কাটার পর ২০২৬ সালের শেষ দিকে অথবা ২০২৭-এর শুরুতেই ফের তিনি ভারতে পা রাখতে চলেছেন।

গোলের আড়ালে ঘৃণার খেলা: ২০২৬ বিশ্বকাপে ট্রাম্প, ফিফা আর ফুটবলের পরাজয়

Trump FIFA World Cup: এই বিশ্বকাপ শুধুই একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়; মাঠের লড়াই ছাপিয়ে তা হয়ে উঠেছে ভূ-রাজনীতি, বর্ণবিদ্বেষ এবং বাণিজ্যিক আধিপত্যের এক জটিল ময়দান।

একটা রাজপুত্তুর যার মুকুট হারিয়ে গিয়েছে

Lionel Messi Retirement: তিনটে ফাইনালের বোঝা। একে একে ছেড়ে যায় সহযোদ্ধারা। রক্তাক্ত মাসচেরানো চলে যান, কুন আগুয়েরোর অসুখ... তবু লিও পড়ে থাকে, আমরা পড়ে থাকি আর কিছুদিন। বৃত্ত সম্পূর্ণ করতে প্রয়োজন ছিল একজন স্ক্যালোনির, তিনি সেটুকু সেতু নির্মাণের দায়িত্ব নিলেন। আমরা অপেক্ষা করলাম লুসাইলে। আমরা তো কবেই হেরে গিয়েছিলাম, সৌদি আরব শুধু চিনিয়ে দিয়েছিল আশপাশটা।

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬: যেভাবে ১৫ বিলিয়ন ডলারের ব্যবসায় পরিণত হল ফুটবল

FIFA Revenue 2026: 'কুইন্টেট প্রাইভেট ব্যাংক'-এর সাম্প্রতিক একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, শেয়ারবাজারের দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের অনুঘটক হওয়ার চেয়ে বিশ্বকাপ আসলে একটি শক্তিশালী স্বল্পমেয়াদি বাণিজ্যিক উদ্দীপক হিসেবেই বেশি কাজ করে। ফিফা, সম্প্রচারকারী সংস্থা, স্পোর্টসওয়্যার ব্র্যান্ড এবং আতিথেয়তা (হসপিটালিটি) ক্ষেত্রগুলি বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আয় করলেও, কোম্পানির শেয়ারের দামে সেই ইতিবাচক প্রভাব দীর্ঘ সময় ধরে রাখা বেশ কঠিন।

যখন ইউরোপে নারীরা গৃহবন্দি, তখন অসমে মেয়েরা খেলছিলেন ধোপখেল

Dhop Khel Assam: আহোম রাজাদের রাজপ্রাসাদ থেকে বিহুর মেঠো মাঠ—অসমের মাটিতে একসময় গমগম করত ধোপখেলের আওয়াজ। ফুটবল, কাবাডি আর দূরন্ত নিশানার এই অদ্ভুত রোমাঞ্চকর খেলাটি শুধু পুরুষদের বীরত্ব প্রমাণের লড়াই ছিল না; যখন ইউরোপে নারীদের জীবন ছিল চার দেওয়ালে বন্দি, তখন অসমে মেয়েরাও মাঠে নেমে মেতে উঠতেন ধোপখেলে।