যুদ্ধ চাই না স্লোগান উঠছে রাশিয়ার প্রতিবাদী মিছিলেও, শেষ হয়ে এল তবে পুতিনের দিন?

Sindhu Som
৩ মিনিট
যুদ্ধ চাই না স্লোগান উঠছে রাশিয়ার প্রতিবাদী মিছিলেও, শেষ হয়ে এল তবে পুতিনের দিন?

কোনও দেশেরই সাধারণ মানুষ যুদ্ধ চায় না। যুদ্ধ রাষ্ট্রনায়কদের ক্ষমতার খেলা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী ক্ষেত্রগুলিতে তাই বেশিরভাগ দেখা গিয়েছে দেশের ভিতরেই যুদ্ধবিরোধী প্রতিবাদ প্রতিরোধ। ভিয়েতনাম যুদ্ধ মনে করা যায় এই প্রসঙ্গে আরেকবার। ঘৃণার বীজ সাধারণ মানুষের মধ্যে বুনে দেওয়া হয় প্রতিটি মুহূর্তে। তবু সেই ঘৃণা যখন ফ্যাসিস্ট আক্রমণের সমর্থনে ব্যবহার করার চেষ্টা করা হয়, তখন ইতিহাস চোখে আঙুল দিয়ে আবারও দেখিয়ে দেয় যে সমস্ত জার্মান নাৎসি ছিল না। সাময়িক ঘৃণার উন্মাদনাও চিরস্থায়ী হয় না। দেশে দেশে বিক্ষোভ তৈরি হয় যুদ্ধের বিরুদ্ধে। সাম্প্রতিক রাশিয়ার ইউক্রেন হামলা নিয়ে বিশ্ব সরগরম। সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের নেতারা একের পর এক ধোঁয়া ওঠা ভাষণ দিচ্ছেন। কিন্তু পরিস্থিতির খুব একটা বদল দেখা যাচ্ছে না।

এ অবস্থায় পথে নেমেছেন রাশিয়ার সাধারণ মানুষ। যুদ্ধের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছে তাদের স্বর। “নো টু ওয়র” আর “সেম অন ইউ” হাজার হাজার কণ্ঠে অনুরণিত হতে দেখা যাচ্ছে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নানান ভিডিওতে। স্তব্ধ শহরের ফাঁকা রাস্তায় প্রশাসন টহল দিচ্ছে। সেই টহল উপেক্ষা করে হাজার হাজার প্রতিবাদী মিছিল করে চলেছেন ফুটপাথ বেয়ে। সমবেত প্রদর্শন হচ্ছে। কিন্তু এ সবের কী জবাব দিচ্ছেন পুতিন? ভিডিওতে প্রতিবাদীদের তাড়া করে গ্রেফতার করতে দেখা যাচ্ছে রাশিয়ান মিলিটারিকে। বেলাগাম গ্রেফতার চলছে যারাই যুদ্ধের প্রতিবাদ করছেন। ইয়েকেটারিনবার্গের উরালস শহরে বারো জন গ্রেফতার হওয়ার ভিডিও সামনে এসেছে। একজনকে মাটিতে ফেলে পেটাচ্ছে পুলিশ–এমনটাও দেখা গিয়েছে। রয়টার্স বলছে, গত রবিবার প্রায় ৪,৩০০ প্রতিবাদীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

যদিও সামাজিক মাধ্যমের প্রত্যেকটি ফুটেজ এবং ফোটোগ্রাফ পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখতে পারেনি রয়টার্স। তবে রাশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক কয়েকদিন আগে জানিয়েছিল ৩,৫০০ যুদ্ধবিরোধী মানুষকে আটক করেছে পুলিশ। শুধু মসকৌতেই আটক হয়েছেন ১৭০০ জন। সেন্ট পিটার্সবার্গে ৭৫০ জন। অন্যান্য শহরে ১০৬১ জন। তাঁদের বয়ান অনুযায়ী মোট ৫২০০ জন এই প্রতিবাদে সামিল হয়েছিলেন। যদিও ওভিডি-ইনফো প্রোটেস্ট মনিটরিং গ্রুপের রিপোর্ট অনুযায়ী ৫৬টি শহরে আটক হয়েছেন কমপক্ষে ৪৩৬৬ জন প্রতিবাদী। এ বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে ওভিডি ইনফো-র মুখপাত্র মারিয়া কাজনেৎসোভা, তাবালিসি থেকে ফোনে জানান, “বাঁধন দিনদিন শক্ত হয়ে উঠছে। এখন আমরা সামরিক সেন্সরশিপ দেখছি। দিনদিন বেড়ে চলেছে প্রতিবাদও। সাইবেরিয়ার শহরগুলিতে পর্যন্ত এ ধরনের আটকের ঘটনা কদাচিৎ দেখা যেত–এখন হরদম হচ্ছে।”

এমন প্রতিবাদ শেষ ২০২১-এর জানুয়ারিতে দেখেছিল রাশিয়া। বিরোধী নেতা অ্যালেক্সেই নাভালনি তখন স্নায়ুঘাতক বিষের হামলা থেকে সদ্য সুস্থ হয়েছেন। দীর্ঘদিন জার্মানিতে চিকিৎসা চলছিল তাঁর। সুস্থ হয়ে দেশে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে গ্রেফতার করে পুতিনের সরকার। সেদিনও প্রতিবাদে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমেছিলেন। রাশিয়ার রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যম এই বিপুলাকারে প্রতিবাদ প্রদর্শনের কথা চেপে দেওয়ার চেষ্টা করছে ক্রমাগত। কোথাও কোথাও ছোটখাটো খবর হলেও এ নিয়ে দেশের ভিতরে নিজেদের মিডিয়ায় কোনও বড় রকমের খবর হতে দিচ্ছে না রাশিয়া। আর আই এ নিউজ এজেন্সি-র খবরে বলা হয়েছে, “মসকৌর মানেজানিয়াকে ‘মুক্ত’ করেছে পুলিশ। কিছু ‘বেআইনি’ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত লোকজনকে আটক করা হয়েছে। এরা ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছিল।” সংস্থাটি কয়েকটি ভিডিও ফুটেজও দেখিয়েছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে ক্রেমলিনের সমর্থকরা মসকৌর বাঁধ ধরে মিছিল করে এগোচ্ছেন। তাদের হাতে রাশিয়ার পতাকা। এবং সেখানে “Z” ও “V” চিহ্ন দেখা যাচ্ছে। এই চিহ্ন রাশিয়ান সেনার ট্যাঙ্কের চিহ্ন, যা দিয়ে রাশিয়া ইউক্রেনে যুদ্ধ চালাচ্ছে। এমনকি চার্চ পর্যন্ত রাশিয়ার পক্ষ নিয়েছে যুদ্ধে। রাশিয়ান অর্থোডক্স চার্চের প্রধান প্যাট্রিয়ার্ক কাইরিল বলেছেন পশ্চিম একটু বেশিই স্বাধীনতার কথা বলে। এ একধরনের ইলিউশন মাত্র। আজ রাশিয়ার নিজস্ব মূল্যবোধের পরীক্ষার দিন।” রাশিয়ান স্টেট পোলিং এজেন্সি ভিটিএসআইওএম ২৭ ফেব্রুয়ারি জানিয়েছে পুতিনের গ্রহণযোগ্যতা নাকি ৬ শতাংশ বেড়ে ৭০% হয়েছে এরই মধ্যে। এখন দাবি করা হচ্ছে তা নাকি ৭১%-এর কাছকাছি।

তবে বিশ্বের কাছে পুতিনের ভাবমূর্তি ইতিমধ্যে নষ্ট হয়ে গিয়েছে। নানারকম অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের তরফে। রাশিয়ার অভ্যন্তরেও দিনের পর দিন বেড়ে চলেছে যুদ্ধের প্রতিবাদ। আলম্যাটির বৃহত্তম শহর কাজাকিস্তানের সম্প্রতি ২০০০ জনের একটি যুদ্ধবিরোধী প্রদর্শনী হয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় তার ভিডিও ভাইরাল হয়েছিল। সেখানে পুতিনের প্রভূত সমালোচনা করা হয়। লেনিনের মূর্তির হাতে নীল ও হলুদ বেলুন বাঁধা হয়। গত রবিবার নাভালনি ইউক্রেন আক্রমণের বিরুদ্ধে রাশিয়া ও বিশ্বের শুভাকাঙ্ক্ষী মানুষের কাছে প্রদর্শনের আবেদন করেন। তাতে বিরাট সাড়া পাওয়া যায়। অনেকে রাশিয়ার ভিতরেই গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার সম্ভাবনার কথা ভাবছেন। বিপ্লব হয়ে আচমকা পুতিনের রাজত্বের দিন শেষ হয়ে আসবে–এমন সম্ভাবনাও দেখছেন অনেকে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যে চেহারায় পুতিনকে দেখছে বর্তমান রাশিয়া, তাতে পুতিনের ক্ষমতা যে আর খুব বেশিদিন নেই, আ বলে দেওয়ার অপেক্ষা রাখে না। কী পথে পুতিন-মুক্ত হবে রাশিয়া তা সম্পূর্ণ রাশিয়ার জনগণের উপর নির্ভর করবে। তবে যেভাবে দীর্ঘদিন ধরে একচ্ছত্র ক্ষমতা বজায় রাখার পটভূমি তৈরি করেছে পুতিন, তাতে এই কাজ খুব সহজ হবে না। অন্তত অনায়াসে প্রতিবাদীদের দমন পীড়ন সেইদিকেই ইঙ্গিত করছে।

লিখেছেন
Sindhu Som
Sindhu Som
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

এসআইআর: বিশুদ্ধ ভোটার তালিকা তৈরির নামে যা পেল বাঙালি

Real Effect of SIR in bengal: ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গে ৯১ লক্ষ ভোটার বাদ যান, যারা ছিলেন মোট ভোটারের ১২ শতাংশ। যাদের মধ্যে ৩৪% ছিলেন মুসলিম , নারীরা সংখ্যায় ছিলেন ৬১.৮%, এছাড়াও ছিলেন, মতুয়া ও রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষেরা, যারা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। ফর্ম-৭-এর অপব্যবহার, অ্যালগরিদম-নির্ভর যাচাই, ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনালে ১ লক্ষ মামলা, সব মিলিয়ে ২০২৬-এর ভোটে যোগ্য নাগরিকরাও বাদ পড়েছিলেন।

‘সব নির্বাচনেই কারচুপি’, কেন এমন দাবি রাহুল গান্ধীর?

Rahul Gandhi election rigging claim: রাহুল গান্ধী কেন দাবি করলেন, ভারতের সব নির্বাচনেই কারচুপি হচ্ছে? নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে কী প্রশ্ন তুলেছেন তিনি? সরকারবিরোধী মনোভাব বা অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি কীভাবে ভোটের রাজনীতিতে কাজ করে? তাঁর অভিযোগের পক্ষে কী কী তথ্য ও প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে?

সিজেপির তিন দাবি, জ্ঞানেশ কুমার না সরলে ফের বড় আন্দোলন

Election Commission of India: নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতি এবং ২০২৩ সালের আইনের বৈধতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানিয়েছে সিজেপি। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, নির্বাচন প্রক্রিয়া স্থগিত করা এবং ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত আইন প্রত্যাহার।

থানার গেটেই মারধর প্রাক্তন আইপিএস হুমায়ুন কবীরকে, সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ?

Humayun Kabir: ঘটনার পর এখনও পর্যন্ত তিনি কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেননি বলেও জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তখন অভিযোগ করা সম্ভব হয়নি। সুস্থ হয়ে তিনি লিখিত অভিযোগ করবেন।

দুই কমিশনারের আপত্তিতে ফের আলোচনায় সীমা খান্না, কমিশনে ঠিক কী দায়িত্ব তাঁর?

Seema Khanna and ECINet: ভোটার তালিকা ও ইসিআইনেট (ECINet) নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তিতে সামনে এসেছে আইটি বিভাগের ভূমিকা এবং ডিরেক্টর জেনারেল (IT) সীমা খান্নার নাম। কে এই সীমা খান্না? নির্বাচন কমিশনে তাঁর দায়িত্ব কী? ভোটার তালিকা পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা নিয়েই বা কেন উঠছে প্রশ্ন?

সরকারকে ৪ দিনের সময়সীমা বেধে দিল চা-শ্রমিকরা, ঠিক কী কী দাবি?

Dooars tea workers: ২২ সেপ্টেম্বর বকেয়া মজুরি ও অন্যান্য পাওনা মেটানোর দাবিতে হাঁটাপাড়া, ধুমচিপাড়া ও গারগান্ডার চা-শ্রমিকরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পদযাত্রা শুরু করেন। একই দিনে তোর্সার প্রস্তাবিত ল্যান্ড পোর্ট প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষও জমি ও অধিকার রক্ষার দাবিতে পদযাত্রা করেন। দুই পদযাত্রাই পুলিশ আটকে দেয়।

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।

এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই আপত্তি, ১০ মাসে দুই কমিশনারের ১৪ বার প্রশ্ন

Election Commission SIR: এসআইআর ঘিরে নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই তৈরি হয়েছে মতপার্থক্য। গত ১০ মাসে দুই নির্বাচন কমিশনার ১৪ বার আপত্তি জানিয়েছেন বলে দাবি দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। ফর্ম ৬ বদল, ভোটার তথ্যভান্ডারের কেন্দ্রীয়করণ, পশ্চিমবঙ্গের আপিল এবং প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনা নিয়েও উঠেছে একাধিক প্রশ্ন। ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও আইন মেনে চলার বিষয়টি ফের আলোচনায়।