এবার ফেসবুক-হোয়াটসঅ্যাপ চালাতে টাকা! যা বলছেন বিশেষজ্ঞ
মেটার সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে আসার পর খুব স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন ওঠে, এরপর কী হবে? এই ব্যবস্থা যে শুরু হলো, এরপর কি ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষকেও সাবস্ক্রাইব করেই এই অ্যাপগুলি ব্যবহার করতে হতে পারে?
সোশ্যাল মিডিয়া ছাড়া আমাদের একটা দিনও কাটানোর কথা ভাবতে পারেন? না, নিশ্চয়ই। সকালে ঘুম থেকে উঠে ফেসবুক স্ক্রোল করা, বন্ধুদের সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে চ্যাট করা কিংবা ইনস্টাগ্রামে রিলস দেখা—সবই আমাদের রোজকার অভ্যেস। আর এই সব পরিষেবা আমরা এতদিন সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ব্যবহার করে এসেছি। কিন্তু এবার সেই চেনা নিয়মে বড়সড় বদল আনল মার্ক জাকারবার্গের সংস্থা মেটা (Meta)।
মেটা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছে, এবার থেকে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম এবং হোয়াটসঅ্যাপের সব সুবিধা আর বিনামূল্যে মিলবে না। এই তিন জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মের প্রিমিয়াম বা বিশেষ ফিচারগুলি ব্যবহার করতে গেলে এবার গ্রাহকদের পকেটের কড়ি খরচ করতে হবে। মেটার প্রোডাক্ট হেড নাওমি গ্লাইট (Naomi Gleit) সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ভিডিও পোস্ট করে এই নতুন পেইড সাবস্ক্রিপশন প্ল্যানের কথা জানিয়েছেন।
মেটার এই সিদ্ধান্ত যেমন বিশ্বজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে, তেমনই এর পিছনে লুকিয়ে থাকা প্রযুক্তি ও মানুষের মনস্তত্ত্বের এক গভীর লড়াই সামনে এনেছে।
মেটা মূলত তিনটি নতুন প্রিমিয়াম সংস্করণ বাজারে এনেছে—ফেসবুক প্লাস (Facebook Plus), ইনস্টাগ্রাম প্লাস (Instagram Plus) এবং হোয়াটসঅ্যাপ প্লাস (WhatsApp Plus)। গ্লোবাল রেট অনুযায়ী এর খরচ হবে:
ফেসবুক প্লাস ও ইনস্টাগ্রাম প্লাস: এই দুটি প্ল্যাটফর্মের প্রিমিয়াম ফিচার ব্যবহার করতে মাসে খরচ হবে ৩.৯৯ মার্কিন ডলার। ভারতীয় মুদ্রায় যা প্রায় ৩৩০ থেকে ৩৫০ টাকার কাছাকাছি।
হোয়াটসঅ্যাপ প্লাস: এর মাসিক খরচ রাখা হয়েছে একটু কম, ২.৯৯ মার্কিন ডলার। ভারতীয় মুদ্রায় যা প্রায় ২৫০ থেকে ২৬০ টাকার মতো।
(উল্লেখ্য, বিশ্বজুড়ে এই রোলআউট শুরু হলেও ভারতে এর সুনির্দিষ্ট লোকাল প্রাইস বা আঞ্চলিক দাম পরে ঘোষণা করা হবে। তবে তা এই ডলার রেটের আশেপাশেই থাকবে।)
মূল অ্যাপ কি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে? কী থাকছে ‘ফ্রি’ আর কীসে লাগবে টাকা?
মেটার এই ঘোষণার পর সাধারণ ব্যবহারকারীদের মনে সবচেয়ে বড় যে প্রশ্নটি ঘুরপাক খাচ্ছে তা হলো—তাহলে কি এবার থেকে ফেসবুক-হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করলেই টাকা লাগবে?
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মহাকাশে কি সত্যিই ভিনগ্রহের প্রাণীরা ঘুরে বেড়ায়? এলিয়েনদের তৈরি কোনো অত্যাধুনিক যান কি গোপনে নজর রাখছে পৃথিবীর বুকে? এই রহস্য বহু বছরের পুরনো। তবে সম্প্রতি এই চর্চা আবার নতুন করে তুঙ্গে উঠেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর (Department of Defense, যা বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসনে ‘ডিপার্টমেন্ট অব ওয়ার’ নামে পরিচিত) বেশ কিছু গোপন ফাইল সাধারণ মানুষের জন্য সামনে এনেছে।
উত্তর হলো—না, আপাতত নয়। মেটা কর্তৃপক্ষ পরিষ্কার জানিয়েছে, বর্তমানে আমরা যে সাধারণ বা বেসিক অ্যাপগুলি ব্যবহার করছি, সেগুলি আগের মতোই ১০০% ফ্রি বা বিনামূল্যে থাকবে। সাধারণ চ্যাটিং, ছবি পোস্ট করা বা ভিডিও দেখায় কোনো টাকা লাগবে না। যারা নিজেদের প্রোফাইলকে আরও আকর্ষণীয় করতে চান এবং কিছু বাড়তি অ্যাডভান্সড টুল ব্যবহার করতে চান, কেবল তাদের জন্যই এই ‘প্লাস’ সাবস্ক্রিপশন।
টাকা দিলে কী কী বাড়তি সুবিধা বা ফিচার পাওয়া যাবে?
গ্রাহকরা কেন টাকা দিয়ে এই ‘প্লাস’ সংস্করণগুলি কিনবেন, তার জন্য বেশ কিছু দারুণ ফিচারের কথা জানিয়েছে মেটা।
ফেসবুক প্লাস এবং ইনস্টাগ্রাম প্লাস-এর ফিচার:
অ্যাডভান্সড অ্যানালিটিক্স: আপনার পোস্ট কতজন দেখছেন, কারা দেখছেন—তার বিস্তারিত হিসাব বা ইনসাইটস পাওয়া যাবে। এমনকী আপনার স্টোরি কে কতবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছেন (Rewatch Count), তা-ও জানা যাবে।
অদৃশ্য হয়ে স্টোরি দেখা: আপনি অন্যের স্টোরি বা রিলস দেখে নিতে পারবেন, অথচ তাঁর ভিউয়ার লিস্টে আপনার নাম উঠবে না (Invisible Story Preview)।
লংগার স্টোরি: স্টোরি বা রিলস ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে প্রোফাইলে সাজিয়ে রাখা যাবে।
বেশি মানুষের কাছে পৌঁছনো (Wider Reach): প্লাস ইউজারদের পোস্ট বা রিলস মেটা নিজে থেকেই বেশি সংখ্যক দর্শকের কাছে পৌঁছে দেবে।
প্রোফাইল কাস্টমাইজেশন: প্রোফাইলকে নিজের মতো করে সুন্দর করে সাজানোর জন্য বাড়তি থিম, পিন এবং অ্যানিমেটেড রিয়্যাকশন বা সুপার রিয়্যাকশন পাওয়া যাবে।
হোয়াটসঅ্যাপ প্লাস-এর ফিচার:
হোয়াটসঅ্যাপ প্লাসের ক্ষেত্রে মেটা ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত পছন্দের উপর বেশি জোর দিয়েছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
UPI business model: আমরা সাধারণ গ্রাহকরা যখন একে অপরকে টাকা পাঠাই, সেখানে কোম্পানিগুলোর আয় নামমাত্র। কিন্তু আসল খেলা শুরু হয় যখন আপনি কোনো দোকানদার বা মার্চেন্টকে পেমেন্ট করেন।
প্রিমিয়াম স্টিকার: সাধারণ চ্যাটের বাইরে একগুচ্ছ এক্সক্লুসিভ বা বিশেষ স্টিকার মিলবে।
কাস্টম অ্যাপ থিম: হোয়াটসঅ্যাপের ভিতরের রঙ ও ব্যাকগ্রাউন্ড সম্পূর্ণ নিজের মতো করে বদলে নেওয়া যাবে।
স্পেশাল রিংটোন: পছন্দের চ্যাটের জন্য বিশেষ কিছু রিংটোন ব্যবহারের সুবিধা থাকবে।
বেশি চ্যাট পিন করা: জরুরি চ্যাটগুলি স্ক্রিনের উপরের দিকে পিন (Pin) করে রাখার সংখ্যা আরও বাড়ানো যাবে।
ভবিষ্যতে আসছে ‘মেটা ওয়ান’ (Meta One) এবং এআই সাবস্ক্রিপশন
মেটা এখানেই থেমে থাকছে না। আগামী দিনে তারা সমস্ত পেইড সাবস্ক্রিপশনকে ‘মেটা ওয়ান’ (Meta One) নামক একটি ছাতার নিচে নিয়ে আসতে চলেছে। এর অধীনে আরও কিছু বড় প্ল্যান আসছে:
মেটা এআই (Meta AI) সাবস্ক্রিপশন: ২০২৬ সালের জুন মাস থেকে এর পরীক্ষা শুরু হচ্ছে। এতে দুটি ভাগ থাকবে—মেটা ওয়ান প্লাস (মাসে $৭.৯৯) এবং মেটা ওয়ান প্রিমিয়াম (মাসে $১৯.৯৯)। এর মাধ্যমে অনেক বেশি শক্তিশালী কৃত্রিম মেধা ব্যবহার করে জটিল কাজ করা, বড় কনটেন্ট বা উন্নত মানের ছবি ও ভিডিও তৈরি করা যাবে।
ক্রিয়েটর ও বিজনেসের জন্য স্পেশাল প্ল্যান: ব্যবসায়ী ও বড় কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য ‘মেটা ওয়ান এসেনশিয়াল’ (মাসে প্রায় $১৪.৯৯) এবং ‘মেটা ওয়ান অ্যাডভান্সড’ (মাসে প্রায় $৪৯.৯৯) প্ল্যান আনা হচ্ছে। এর মধ্যে থাকবে ভেরিফাইড ব্যাজ, প্রোফাইল হ্যাকিং বা নকল অ্যাকাউন্ট থেকে সুরক্ষা, সরাসরি কাস্টমার সাপোর্ট এবং সার্চ রেজাল্টে সবার উপরে থাকার সুবিধা। (বাংলাদেশ, থাইল্যান্ড, মরক্কো ও সৌদি আরবে এর পরীক্ষা চলছে)।
কেন হঠাৎ এই পেইড মডেলের পথে হাঁটল মেটা?
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, মেটা এতকাল মূলত বিজ্ঞাপনের উপর নির্ভর করে ব্যবসা চালাত। কিন্তু বর্তমানে মেটা কৃত্রিম মেধা বা AI প্রযুক্তির পরিকাঠামো, যেমন—বিশাল বিশাল ডেটা সেন্টার ও পাওয়ারফুল জিপিইউ (GPU) তৈরিতে বিপুল টাকা বিনিয়োগ করছে। শুধুমাত্র ২০২৬ সালেই মেটার এই খরচের পরিমাণ দাঁড়াবে ১২,৫০০ থেকে ১৪,৫০০ কোটি ডলার। এই বিশাল খরচের বোঝা টানতেই এবং বিজ্ঞাপনের উপর থেকে একক নির্ভরতা কমাতে মেটা এই ‘ফ্রি + প্রিমিয়াম’ ব্যবসার মডেল বেছে নিয়েছে। আর মেটার এই সিদ্ধান্তের পর শেয়ার বাজারে তাদের শেয়ারের দাম প্রায় ৩ থেকে ৪ শতাংশ বেড়ে গিয়েছে।
মেটার এই সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে আসার পর খুব স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন ওঠে, এরপর কী হবে? এই ব্যবস্থা যে শুরু হলো, এরপর কি ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষকেও সাবস্ক্রাইব করেই এই অ্যাপগুলি ব্যবহার করতে হতে পারে?
বিজ্ঞান গবেষক সঙ্গীতা ধাড়া ইনস্ক্রিপ্টকে বলেন,
এই সোশ্যাল মিডিয়া সাইটগুলির ভিতরের অ্যালগরিদম এমনভাবে ডিজাইন বা তৈরি করা হয়, যা নিখুঁতভাবে মানুষের মনস্তত্ত্ব এবং আচরণের ধরন (Behaviour Pattern) পরীক্ষা করে। আমরা কখন হাসছি, কোন পোস্টে বেশি সময় থমকে দাঁড়াচ্ছি, কোন ধরনের রিল আমাদের দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিনে ধরে রাখছে—তার সমস্ত ডেটা এই কৃত্রিম মেধার কাছে থাকে। এই তথ্যের উপর ভিত্তি করেই আমাদের ফিডে একের পর এক কনটেন্ট পাঠানো হয়, যা মানুষকে অবচেতনভাবেই এক গভীর আসক্তির (Addiction) দিকে ঠেলে দেয়।
বিজ্ঞান বলছে, স্ক্রিন স্ক্রোল করার এই নেশা আমাদের মস্তিষ্কে ডোপামিন নামের হরমোন নিঃসরণ বাড়িয়ে দেয়, যা হুবহু কোনো মাদকাসক্তির মতো কাজ করে। এই আসক্তি যেখানে পৌঁছে গিয়েছে, সেখানে মেটার এই নতুন প্রিমিয়াম বা প্লাস ফিচারগুলি এক চরম মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদ।
তিনি বলছেন,
একজন আসক্ত মানুষ যখনই দেখবেন যে টাকা দিলে তিনি আরও বেশি রিল দেখার সুবিধা পাবেন, নিজের অ্যাকাউন্টকে আরও আকর্ষণীয় করতে পারবেন, বা অদৃশ্য থেকে অন্যের স্টোরি দেখতে পাবেন, তখন তিনি স্বতঃস্ফূর্তভাবেই সাবস্ক্রিপশন নেওয়ার দিকে ঝুঁকে পড়বেন। তাঁর মনে অনবরত কাজ করবে যে—টাকা দিলে বোধহয় আমি আরও দারুণ কিছু সুবিধা পাব। একইভাবে, আজকের দিনে বহু মানুষ সোশ্যাল মিডিয়াকে কনটেন্ট তৈরি ও উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছেন। মেটা প্লাস সংস্করণে যে আকর্ষণীয় এআই (AI) টুল এবং বেশি মানুষের কাছে পৌঁছনোর (Wider Reach) সুযোগ দিচ্ছে, তা ক্রিয়েটরদের খুব সহজেই প্রলুব্ধ করবে।
তাঁর আশঙ্কা,
আপাতত মেটা কিছু সাধারণ ফিচার হয়তো বিনামূল্যে বা ফ্রি রেখে দেবে। কিন্তু তারা সাধারণ মানুষকে আসক্তির যে স্তরে নিয়ে গিয়েছে, তাতে মানুষ আর এই ফ্রি বা বেসিক ফিচারের গণ্ডির মধ্যে নিজেকে আটকে রাখতে পারবে না। ভালো রিচ পাওয়ার তাগিদে বা শুধুই অতিরিক্ত ফিচারের আকর্ষণে মানুষ নিজেই নিজের পকেটের টাকা মেটার হাতে তুলে দিতে বাধ্য হবে।
আজ যা শুরু হলো প্রিমিয়াম ফিচার দিয়ে, ভবিষ্যতে তা সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্যও বাধ্যতামূলক হয়ে উঠলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, মেটা পুরোপুরি পেইড হয়ে যাচ্ছে না ঠিকই, তবে তারা আমাদের ডিজিটাল অভ্যেসকে খুব চতুরভাবে ব্যবসার পুঁজিতে রূপান্তর করছে। আপনি যদি সোশ্যাল মিডিয়াকে প্রফেশনাল বা পেশাদার কাজে ব্যবহার করতে চান এবং বাকিদের চেয়ে একধাপ এগিয়ে থাকতে চান, তবে এবার থেকে মেটার দরবারে টাকা দেওয়া ছাড়া আর কোনো সহজ উপায় নেই!






