ভারতীয় শক্তির বিরুদ্ধে অদম্য লড়াই, যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানের স্ফুলিঙ্গ হয়ে উঠলেন সফি

অভাবের সংসারে বাবা-মা চেয়েছিলেন ছেলে ছোটবেলা থেকেই রোজগার করে পরিবারের পাশে থাকুক। দারিদ্র্যের চাপে ১৬ বছর বয়সে ক্রিকেট ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সেলিম। খেলার জন্য প্রয়োজনীয় কিট কেনার ক্ষমতা ছিল না, অনুশীলনে যাওয়ার জন্য পকেটে থাকত না সামান্য গাড়ি ভাড়াও।

Rudra Ghosh
৩ মিনিট
ভারতীয় শক্তির বিরুদ্ধে অদম্য লড়াই, যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানের স্ফুলিঙ্গ হয়ে উঠলেন সফি

সাদা বলের ক্রিকেটে বিশ্বমঞ্চে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ভারতীয় দল। রোহিত-বিরাটের দেশের ক্রিকেটের জৌলুস বাড়াচ্ছে আইপিএলও। তবে প্রদীপের নিচে অন্ধকার হিসেবে ভারতের চিন্তায় কাঁটার মতো বিঁধছে টেস্ট ক্রিকেট। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জয় করে টলমল করা আসনটা সামলাতে সক্ষম হয়েছেন প্রধান কোচ গৌতম গম্ভীর। কিন্তু ঘরের মাঠে দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে লাল বলের ক্রিকেটে হোয়াইটওয়াশ হওয়া এখনও ভারতীয় ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে বড় ক্ষত। এই পরিস্থিতিতে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে ঘুরে দাঁড়াতে মরিয়া দল যখন আফগানিস্তানের মুখোমুখি, ঠিক তখনই মুল্লানপুরের ৪০ ডিগ্রি গরমে ভারতীয় ব্যাটিং লাইন আপকে কাঁপিয়ে দিলেন এক ২৩ বছরের আফগান তরুণ—মোহাম্মদ সেলিম সফি। ক্রিকেটের কোনো চেনা ব্যাকরণ বা চটকদার মঞ্চ থেকে নয়, তিনি উঠে এসেছেন যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানের চরম দারিদ্র্য আর রক্তক্ষয়ী ইতিহাসের অলিগলি থেকে।

এই বছর আইপিএল শেষ হয়েছে ৩১ মে। গুজরাট টাইটান্সকে হারিয়ে আবারও ট্রফি করে নতুন ইতিহাস রচনা করেছে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু। টুর্নামেন্টের ফাইনালের হার এখনও শুভমান গিলের চোখে-মুখে লেগে রয়েছে। তার মধ্যেই জাতীয় টেস্ট দলকে নেতৃত্ব দিয়ে আফগানদের বিপক্ষে মাঠে নেমেছেন তিনি। আফগানিস্তান ২০১৭ সালে ২২ জুন আইসিসির পূর্ণ সদস্যপদ এবং টেস্ট দলের স্বীকৃতি পেয়েছিল। তবে, এখনও পর্যন্ত সেইভাবে লাল বলের ক্রিকেটে প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি।

মুল্লানপুরের ৪০ ডিগ্ৰি গরমে শুরুটা ভালোই করেছে ব্লু ব্রিগেড। প্রথম ইনিংসে রানের বন্যা বইয়ে ভারতীয় দল যখন আফগান বোলারদের নাস্তানাবুদ করছে, ঠিক তখনই ম্লান হয়ে আসা বোলিং লাইনে স্ফুলিঙ্গের মতো জ্বলে উঠলেন সেলিম সফি। ২০১৭ সালে টেস্ট মর্যাদা পাওয়া আফগানিস্তান এখনও লাল বলের ক্রিকেটে পায়ের তলায় মাটি খুঁজছে। ভারতের বিপক্ষে নামার আগে মোহাম্মদ সেলিম সফি খেলেছিলেন মাত্র ৪টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ, যাতে কোনো উইকেটই ছিল না তাঁর পকেটে।

কিন্তু ভারতের শক্তিশালী ব্যাটিংয়ের সামনে নিজেকে প্রমাণ করার খিদেটা সেদিন তাতিয়ে দিয়েছিল এই তরুণকে। প্রথমে যশস্বী জয়সওয়ালকে ড্রেসিংরুমে ফেরালেন। এরপর সাই সুদর্শন ও শুভমান গিলের বিপজ্জনক জুটি ভাঙলেন। সেখানেই শেষ নয়; ধ্রুব জুরেল, মানব সুতার এবং মোহাম্মদ সিরাজের উইকেট শিকার করে এক অনন্য নজির গড়লেন তিনি। ভারতের বিপক্ষে প্রথম টেস্ট খেলতে নেমেই ৫ উইকেট পাওয়ার কীর্তি গড়লেন মোহাম্মদ সেলিম সফি। প্রথম ইনিংসে ২৭ ওভারে ৩টি মেডেনসহ ১৪০ রান দিয়ে ছিনিয়ে নিলেন ৬টি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট। বিশ্ব ক্রিকেটে রাতারাতি শোরগোল ফেলে দিলেন এই আফগান পেসার।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ব্যাটের পর গলফ ক্লাব: কপিল দেবের আর এক মাঠ

Kapil Dev: গলফ কপিলকে টেনেছিল নিঃসঙ্গতার কারণেই। এখানে ব্যর্থ হলে কারও দিকে আঙুল তোলা যায় না। সিদ্ধান্ত নিতে হয় নিজেকেই। সেই দায়িত্ববোধই তাঁকে ধীরে ধীরে খেলাটার ভিতরে নিয়ে যায়।

মোহাম্মদ সেলিম সফির এই যাত্রাটা মোটেও সহজ ছিল না। আফগানিস্তানের অন্যতম যুদ্ধবিধ্বস্ত প্রদেশ বাঘলান থেকে নিজেকে তৈরি করেছেন তিনি। মুল্লানপুরের ৪০ ডিগ্ৰি গরমে মাঠে নামার অনেক আগে থেকেই চরম দারিদ্র্যতার সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন দিনের পর দিন। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বারবার যুদ্ধের আঁচ এসে পড়েছে বাঘলানে। এই প্রদেশের উপর দিয়েই গিয়েছে রাজধানী কাবুল থেকে মধ্য এশিয়ায় যাওয়ার প্রধান মহাসড়ক। ১৯৭৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের আক্রমণের সময় বাঘলানের কিলাইগাই ছিল সোভিয়েতের অন্যতম বৃহত্তম সামরিক ঘাঁটি ও অস্ত্রাগার। সোভিয়েত চলে যাওয়ার পর মুজাহিদীন গোষ্ঠীগুলির গৃহযুদ্ধ, মার্কিন সেনার পদচারণ থেকে শুরু করে তালিবানদের পুনরুত্থান—সব কিছুর সাক্ষী থেকেছে এই এলাকা। ফলে অর্থনৈতিকভাবে দেউলিয়া হয়ে যাওয়া এই প্রদেশে তীব্র বেকারত্ব আর নির্মম দারিদ্র্যই মানুষের নিত্যসঙ্গী।

ফলে সেখানে ক্রিকেট খেলা রূপকথা ছাড়া আর কিছুই নয়। এমন এক দিন-আনা দিন-খাওয়া পরিবারে জন্ম সেলিমের। অভাবের সংসারে বাবা-মা চেয়েছিলেন ছেলে ছোটবেলা থেকেই রোজগার করে পরিবারের পাশে থাকুক। দারিদ্র্যের চাপে ১৬ বছর বয়সে ক্রিকেট ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সেলিম। খেলার জন্য প্রয়োজনীয় কিট কেনার ক্ষমতা ছিল না, অনুশীলনে যাওয়ার জন্য পকেটে থাকত না সামান্য গাড়ি ভাড়াও। কিন্তু সেলিমের সহজাত প্রতিভা আর দুরন্ত গতি তাঁর পিছু ছাড়েনি।

ঠিক সেই সময় পাকিস্তানের প্রাক্তন পেসার রানা নাভেদ-উল-হাসান আফগানিস্তানে একটি 'ট্যালেন্ট হান্ট ক্যাম্প'-এর আয়োজন করেছিলেন। তীব্র গরমের মধ্যে সেই ক্যাম্পে নিজের সবটুকু উজাড় করে দেন সেলিম। তাঁর দুরন্ত গতি আর বোলিং অ্যাকশন দেখে চমকে যান নাভেদ। তিনি নিজেই সেলিমের দায়িত্ব নেন, শুরু হয় বিশেষ ট্রেনিং। এরপরই ঘরোয়া ক্রিকেটে সুযোগ পান সেলিম।

সম্প্রতি টাইমস অফ ইন্ডিয়াকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে রানা নাভেদ বলেন:

আমি যখন ওকে প্রথম দেখেছিলাম, ও প্রতি ঘণ্টায় ১৪৬ কিলোমিটার বেগে বল করছিল। এটা আমাকে রীতিমতো চমকে দিয়েছিল। আফগানিস্তানে মিডিয়াম পেসার পাওয়া গেলেও এইরকম খাঁটি ও কুইক এক্সপ্রেস ফাস্ট বোলার পাওয়া খুবই বিরল। ভারতের বিপক্ষে ও অসাধারণ বোলিং করেছে। হার্ড লেন্থে প্রতি ঘণ্টায় ১৩০ কিলোমিটার গতিতে বল করতে দেখে আমার খুবই ভালো লেগেছে।

২০২০ সালে এসিবি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মোহাম্মদ সেলিম সফি নিজের লড়াইয়ের কথা মনে করে বলেছিলেন,

তীব্র আর্থিক সমস্যার কারণে আমার পক্ষে ক্রিকেট খেলা কঠিন হয়ে পড়েছিল। এর মধ্যেও আমি ক্রিকেটে সফল হওয়ার জন্য প্রচুর পরিশ্রম করছি। এই খেলাটা আমার জীবনে খুব গুরুত্বপূর্ণ।

লিখেছেন
Rudra Ghosh
Rudra Ghosh
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

নারী টেস্টে এত অনীহা কেন, লর্ডসের ইতিহাসও বদলাবে না সেই ছবি?

Women’s Test Cricket: লর্ডসে ভারতের নারী ক্রিকেট দলের ঐতিহাসিক জয় নারী টেস্ট ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ বদলানোর সুযোগ এনে দিয়েছে? এত সাফল্য ও জনপ্রিয়তার পরও কেন এই ফরম্যাটে নিয়মিত ম্যাচ নেই?

শিব-পরশুরামের যুদ্ধবিদ্যা কালারিপায়াট্টু থেকেই জন্ম কুংফুর!

Kalaripayattu Indian Martial Art: ভারতীয় পৌরাণিক ঐতিহ্যে কালারিপায়াট্টুকে স্রেফ যুদ্ধের কৌশল হিসেবে দেখা হয়নি, বরং এটিকে মানব শরীরের অভ্যন্তরীণ প্রাণশক্তিকে জাগিয়ে তোলার এক মহান সাধনা বলে মনে করা হয়।

দু'হাজার বছর পুরনো ‘আত্য পাত্যা’: এই খেলাই শিখিয়েছিল যুদ্ধের কৌশল!

Atya Patya Traditional Indian Game: আনুমানিক ১০০ থেকে ৩০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রচিত প্রাচীন তামিল সাঙ্গম সাহিত্য ‘নাটতৃণৈ’-তে এই খেলার প্রথম লিখিত প্রমাণ পাওয়া যায়। অতএব, এই খেলার বয়স প্রায় দুই হাজার বছরেরও বেশি। সেখানে বলা আছে, প্রাচীন চোল রাজবংশের সেনারা যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার আগে নিজেদের ক্ষিপ্রতা, দ্রুত দৌড়ানোর ক্ষমতা আর শরীরকে এক নিমেষে বাঁকানোর চপলতা বাড়াতে এই খেলায় মেতে উঠত।

১৬ বছর পর ফের ভারতের পথে ললিত মোদী

Lalit Modi return to India: দীর্ঘ সময় পর দিল্লির আপিল ট্রাইব্যুনাল তাঁর বিরুদ্ধে থাকা আর্থিক অনিয়মের বড় অভিযোগ ও জরিমানা বাতিল করে দেওয়ার পরেই এই আলোচনার সূত্রপাত। সোশ্যাল মিডিয়ায় ললিত মোদী নিজেই স্পষ্ট করেছেন, সমস্ত বড়সড় আইনি জটিলতা কাটার পর ২০২৬ সালের শেষ দিকে অথবা ২০২৭-এর শুরুতেই ফের তিনি ভারতে পা রাখতে চলেছেন।

গোলের আড়ালে ঘৃণার খেলা: ২০২৬ বিশ্বকাপে ট্রাম্প, ফিফা আর ফুটবলের পরাজয়

Trump FIFA World Cup: এই বিশ্বকাপ শুধুই একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়; মাঠের লড়াই ছাপিয়ে তা হয়ে উঠেছে ভূ-রাজনীতি, বর্ণবিদ্বেষ এবং বাণিজ্যিক আধিপত্যের এক জটিল ময়দান।

একটা রাজপুত্তুর যার মুকুট হারিয়ে গিয়েছে

Lionel Messi Retirement: তিনটে ফাইনালের বোঝা। একে একে ছেড়ে যায় সহযোদ্ধারা। রক্তাক্ত মাসচেরানো চলে যান, কুন আগুয়েরোর অসুখ... তবু লিও পড়ে থাকে, আমরা পড়ে থাকি আর কিছুদিন। বৃত্ত সম্পূর্ণ করতে প্রয়োজন ছিল একজন স্ক্যালোনির, তিনি সেটুকু সেতু নির্মাণের দায়িত্ব নিলেন। আমরা অপেক্ষা করলাম লুসাইলে। আমরা তো কবেই হেরে গিয়েছিলাম, সৌদি আরব শুধু চিনিয়ে দিয়েছিল আশপাশটা।

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬: যেভাবে ১৫ বিলিয়ন ডলারের ব্যবসায় পরিণত হল ফুটবল

FIFA Revenue 2026: 'কুইন্টেট প্রাইভেট ব্যাংক'-এর সাম্প্রতিক একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, শেয়ারবাজারের দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের অনুঘটক হওয়ার চেয়ে বিশ্বকাপ আসলে একটি শক্তিশালী স্বল্পমেয়াদি বাণিজ্যিক উদ্দীপক হিসেবেই বেশি কাজ করে। ফিফা, সম্প্রচারকারী সংস্থা, স্পোর্টসওয়্যার ব্র্যান্ড এবং আতিথেয়তা (হসপিটালিটি) ক্ষেত্রগুলি বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আয় করলেও, কোম্পানির শেয়ারের দামে সেই ইতিবাচক প্রভাব দীর্ঘ সময় ধরে রাখা বেশ কঠিন।

যখন ইউরোপে নারীরা গৃহবন্দি, তখন অসমে মেয়েরা খেলছিলেন ধোপখেল

Dhop Khel Assam: আহোম রাজাদের রাজপ্রাসাদ থেকে বিহুর মেঠো মাঠ—অসমের মাটিতে একসময় গমগম করত ধোপখেলের আওয়াজ। ফুটবল, কাবাডি আর দূরন্ত নিশানার এই অদ্ভুত রোমাঞ্চকর খেলাটি শুধু পুরুষদের বীরত্ব প্রমাণের লড়াই ছিল না; যখন ইউরোপে নারীদের জীবন ছিল চার দেওয়ালে বন্দি, তখন অসমে মেয়েরাও মাঠে নেমে মেতে উঠতেন ধোপখেলে।