ব্যাটের পর গলফ ক্লাব: কপিল দেবের আর এক মাঠ

Kapil Dev: গলফ কপিলকে টেনেছিল নিঃসঙ্গতার কারণেই। এখানে ব্যর্থ হলে কারও দিকে আঙুল তোলা যায় না। সিদ্ধান্ত নিতে হয় নিজেকেই। সেই দায়িত্ববোধই তাঁকে ধীরে ধীরে খেলাটার ভিতরে নিয়ে যায়।

Manisha Ghosh
৩ মিনিট
ব্যাটের পর গলফ ক্লাব: কপিল দেবের আর এক মাঠ

১৯৮৩-র লর্ডস মানেই কপিল দেব। এই সমীকরণ এতটাই পাকা যে তার বাইরে কপিলকে ভাবতেই অনেকের অসুবিধে হয়। অথচ ক্রিকেট ছাড়ার পর, প্রায় নিঃশব্দে, তিনি প্রবেশ করেছিলেন আর এক খেলায়। সেখানে গ্যালারির চিৎকার নেই, সতীর্থের দিকে তাকিয়ে থাকার সুযোগও নেই। আছে শুধু নিজের সিদ্ধান্ত, নিজের ভুল আর সেগুলো সামলে নেওয়ার দায়। গলফের সঙ্গে কপিল দেবের প্রথম পরিচয়টা খানিকটা কাকতালীয় ছিল। নব্বইয়ের দশকের গোড়ায় ভারতে এসে ওয়েস্ট ইন্ডিজের কিংবদন্তি গ্যারি সোবার্স গলফ খেলার ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন। কপিল তখনও ঠিক জানতেন না, গলফ বলতে কী বোঝায়। ডেলি গলফ ক্লাবে সোবার্স যখন ডান ও বাঁ-হাতে আলাদা হ্যান্ডিক্যাপের কথা বললেন, অর্থাৎ ডান হাতে খেললে তাঁর দক্ষতার মান দুই, আর বাঁ হাতে খেললে এক। তখন উপস্থিত অনেকেই অবাক হয়ে যান। কপিলও। কিন্তু সেদিন মাঠে দাঁড়িয়ে সোবার্সের খেলা দেখার অভিজ্ঞতাটা কপিলের মনে থেকে গিয়েছিল।

আসল গল্পটা ক্রিকেট ছাড়ার পরে শুরু হয়েছিল। ১৯৯৪ সালে অবসর নেওয়ার পর কপিল গলফে বিশেষ আগ্রহী ছিলেন না। তাঁর মনে হত এটা ‘বয়স্কদের খেলা’। তবু বন্ধুর জোরাজুরিতে একদিন মাঠে নেমেছিলেন। প্রথমদিকে ভালো লাগেনি, অস্বস্তিও ছিল। কিন্তু বল মারার সময় মাসল মেমরি ফিরে এল। দূরে বল পাঠানোর জোর যেন ক্রিকেট থেকেই এসেছিল। গলফ কপিলকে টেনেছিল নিঃসঙ্গতার কারণেই। এখানে ব্যর্থ হলে কারও দিকে আঙুল তোলা যায় না। সিদ্ধান্ত নিতে হয় নিজেকেই। সেই দায়িত্ববোধই তাঁকে ধীরে ধীরে খেলাটার ভিতরে নিয়ে যায়। প্রশিক্ষক বিক্রমজিৎ সিংহ আর অমিত লুথরার কাছ থেকে প্রাথমিক দীক্ষা নিয়ে, খুব দ্রুতই শিখতে থাকেন তিনি। কয়েক বছরের মধ্যেই যাঁরা তাঁকে শিখিয়েছিলেন, তাঁদের সঙ্গেই সমানে সমানে খেলতে শুরু করেন।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বিশ্বকাপ ফাইনালে গ্যালারিতে ডাক পেলেন না ৮৩-র নায়ক কপিল দেব

ICC World Cup Final, Kapil Dev: এত তারার ভিড়ে নেই সেই মানুষটিই, যার হাত ধরে একদিন বিশ্বকাপের দুনিয়ায় উত্থান হয়েছিল ভারতের, সেই কপিল দেবই উপেক্ষিত ২০২৩-এর ফাইনাল ম্যাচে।

সব দিন যে খেলাটা সহজ লেগেছে, তা নয়। খারাপ শট, খারাপ রাউন্ড, এসবও ছিল। কিন্তু সেখান থেকেই তিনি বুঝেছিলেন গলফ ক্রিকেটের তুলনায় অনেক বেশি মনোযোগ দাবি করে। আজও তিনি বলেন, খেলোয়াড় জীবনে যদি গলফের অভ্যাস থাকত, তাহলে হয়তো নিজের ক্রিকেট কেরিয়ারটাই অন্যরকম হতে পারত। এই ভাবনাগুলোই পরে গিয়ে প্রভাব ফেলেছে তাঁর প্রশাসনিক ভূমিকায়।

পেশাদার গলফ সংস্থার সভাপতি হিসেবে কপিল দেব কখনও নিজেকে আলাদা করে সামনে আনতে চাননি। তবু তাঁর আমলে প্রতিযোগিতার মোট পুরস্কারমূল্য বেড়ে প্রায় ষাট কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। আগামী দিনে লক্ষ্য আরও বড়। একশো কোটি টাকা। যদিও তিনি নিজেই মানেন, কাজটা সহজ নয়। তবে শুধু পুরস্কারের অঙ্ক বাড়ানো নয়, খেলোয়াড়দের দৈনন্দিন সমস্যাতেও নজর দিয়েছেন তিনি। প্রতিযোগিতার সময় বিনামূল্যে খাবারের ব্যবস্থা চালু হয়েছে। যাতায়াত খরচ কমানো, খাবারের মান উন্নত করা, এসব নিয়েও ভাবনাচিন্তা চলছে। সব পরিকল্পনা যে এখনই বাস্তবায়িত হবে, এমন নয়। কিন্তু লক্ষ্য স্পষ্ট। একটি বিষয়ে কপিল দেব বরাবরের মতোই স্পষ্টভাষী। প্রশাসনে বেশি দিন আটকে থাকার পক্ষপাতী নন তিনি। দু’টি মেয়াদের বেশি দায়িত্বে থাকার ইচ্ছা নেই। যদিও ভারতীয় ক্রীড়াক্ষেত্রে এই মানসিকতার অভাব নিয়ে তাঁর আক্ষেপ নতুন নয়।

ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠলে কপিল দেব আকাশে ভেসে বেড়ান না। বিশ্বসেরার স্বপ্ন দেখানো তাঁর ধাতে নেই। তবে অলিম্পিক পদক; সেটাকে তিনি বাস্তবসম্মত লক্ষ্য বলেই মনে করেন। ব্যাটের পরে গলফ ক্লাব হাতে নিয়েও কপিল দেব আসলে একই রয়ে গিয়েছেন। নিজের সঙ্গে লড়াই করছেন এখনও। পার ছুঁয়ে থেমে যাওয়ার লোক তিনি নন। প্রশ্ন শুধু একটাই, ভারতীয় গলফ তাঁর দেখানো পথে কতটা দূর এগোতে পারে।

লিখেছেন
Manisha Ghosh
Manisha Ghosh
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

নারী টেস্টে এত অনীহা কেন, লর্ডসের ইতিহাসও বদলাবে না সেই ছবি?

Women’s Test Cricket: লর্ডসে ভারতের নারী ক্রিকেট দলের ঐতিহাসিক জয় নারী টেস্ট ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ বদলানোর সুযোগ এনে দিয়েছে? এত সাফল্য ও জনপ্রিয়তার পরও কেন এই ফরম্যাটে নিয়মিত ম্যাচ নেই?

শিব-পরশুরামের যুদ্ধবিদ্যা কালারিপায়াট্টু থেকেই জন্ম কুংফুর!

Kalaripayattu Indian Martial Art: ভারতীয় পৌরাণিক ঐতিহ্যে কালারিপায়াট্টুকে স্রেফ যুদ্ধের কৌশল হিসেবে দেখা হয়নি, বরং এটিকে মানব শরীরের অভ্যন্তরীণ প্রাণশক্তিকে জাগিয়ে তোলার এক মহান সাধনা বলে মনে করা হয়।

দু'হাজার বছর পুরনো ‘আত্য পাত্যা’: এই খেলাই শিখিয়েছিল যুদ্ধের কৌশল!

Atya Patya Traditional Indian Game: আনুমানিক ১০০ থেকে ৩০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রচিত প্রাচীন তামিল সাঙ্গম সাহিত্য ‘নাটতৃণৈ’-তে এই খেলার প্রথম লিখিত প্রমাণ পাওয়া যায়। অতএব, এই খেলার বয়স প্রায় দুই হাজার বছরেরও বেশি। সেখানে বলা আছে, প্রাচীন চোল রাজবংশের সেনারা যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার আগে নিজেদের ক্ষিপ্রতা, দ্রুত দৌড়ানোর ক্ষমতা আর শরীরকে এক নিমেষে বাঁকানোর চপলতা বাড়াতে এই খেলায় মেতে উঠত।

১৬ বছর পর ফের ভারতের পথে ললিত মোদী

Lalit Modi return to India: দীর্ঘ সময় পর দিল্লির আপিল ট্রাইব্যুনাল তাঁর বিরুদ্ধে থাকা আর্থিক অনিয়মের বড় অভিযোগ ও জরিমানা বাতিল করে দেওয়ার পরেই এই আলোচনার সূত্রপাত। সোশ্যাল মিডিয়ায় ললিত মোদী নিজেই স্পষ্ট করেছেন, সমস্ত বড়সড় আইনি জটিলতা কাটার পর ২০২৬ সালের শেষ দিকে অথবা ২০২৭-এর শুরুতেই ফের তিনি ভারতে পা রাখতে চলেছেন।

গোলের আড়ালে ঘৃণার খেলা: ২০২৬ বিশ্বকাপে ট্রাম্প, ফিফা আর ফুটবলের পরাজয়

Trump FIFA World Cup: এই বিশ্বকাপ শুধুই একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়; মাঠের লড়াই ছাপিয়ে তা হয়ে উঠেছে ভূ-রাজনীতি, বর্ণবিদ্বেষ এবং বাণিজ্যিক আধিপত্যের এক জটিল ময়দান।

একটা রাজপুত্তুর যার মুকুট হারিয়ে গিয়েছে

Lionel Messi Retirement: তিনটে ফাইনালের বোঝা। একে একে ছেড়ে যায় সহযোদ্ধারা। রক্তাক্ত মাসচেরানো চলে যান, কুন আগুয়েরোর অসুখ... তবু লিও পড়ে থাকে, আমরা পড়ে থাকি আর কিছুদিন। বৃত্ত সম্পূর্ণ করতে প্রয়োজন ছিল একজন স্ক্যালোনির, তিনি সেটুকু সেতু নির্মাণের দায়িত্ব নিলেন। আমরা অপেক্ষা করলাম লুসাইলে। আমরা তো কবেই হেরে গিয়েছিলাম, সৌদি আরব শুধু চিনিয়ে দিয়েছিল আশপাশটা।

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬: যেভাবে ১৫ বিলিয়ন ডলারের ব্যবসায় পরিণত হল ফুটবল

FIFA Revenue 2026: 'কুইন্টেট প্রাইভেট ব্যাংক'-এর সাম্প্রতিক একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, শেয়ারবাজারের দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের অনুঘটক হওয়ার চেয়ে বিশ্বকাপ আসলে একটি শক্তিশালী স্বল্পমেয়াদি বাণিজ্যিক উদ্দীপক হিসেবেই বেশি কাজ করে। ফিফা, সম্প্রচারকারী সংস্থা, স্পোর্টসওয়্যার ব্র্যান্ড এবং আতিথেয়তা (হসপিটালিটি) ক্ষেত্রগুলি বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আয় করলেও, কোম্পানির শেয়ারের দামে সেই ইতিবাচক প্রভাব দীর্ঘ সময় ধরে রাখা বেশ কঠিন।

যখন ইউরোপে নারীরা গৃহবন্দি, তখন অসমে মেয়েরা খেলছিলেন ধোপখেল

Dhop Khel Assam: আহোম রাজাদের রাজপ্রাসাদ থেকে বিহুর মেঠো মাঠ—অসমের মাটিতে একসময় গমগম করত ধোপখেলের আওয়াজ। ফুটবল, কাবাডি আর দূরন্ত নিশানার এই অদ্ভুত রোমাঞ্চকর খেলাটি শুধু পুরুষদের বীরত্ব প্রমাণের লড়াই ছিল না; যখন ইউরোপে নারীদের জীবন ছিল চার দেওয়ালে বন্দি, তখন অসমে মেয়েরাও মাঠে নেমে মেতে উঠতেন ধোপখেলে।