গান্ধী পরিবারের স্বজনপোষণই কি কংগ্রেসের চূড়ান্ত পতন ডেকে আনছে?

বিজেপি-র 'কংগ্রেস-মুক্ত ভারত' স্লোগান কার্যকর করতে যেন আদাজল খেয়ে নেমেছে গান্ধী পরিবার। ঠান্ডা মাথায় ছক কষে ঠিক যে কায়দায় রাজ্যসভা নির্বাচনে প্রার্থী বাছাই করেছে কংগ্রেস, রাজনৈতিক মহলের ধারণা, আগামী বছরের বিধানসভা নির্বাচনেই কংগ্রেস-শাসিত শেষ দুই রাজ্য, রাজস্থান এবং ছত্তিশগড়ে দলের পতন অনিবার্য। দেশের ছোট-বড় কোনও রাজ্যেই আর কংগ্রেসের শাসন সেক্ষেত্রে থাকবে না। ঠিক এই সলতেই পাকিয়েছে গান্ধী পরিবার।

 

আসন্ন রাজ্যসভার নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় কংগ্রেসের গান্ধী পরিবার ফের বুঝিয়ে দিয়েছে, এত বছর ধরে দল যেভাবে চলে আসছে, তা থেকে তারা বিচ্যুত হচ্ছে না। ওই পরিবারের আঁচলের তলায় না থাকলে কংগ্রেস নেতাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার৷ এবারও দলের প্রার্থী হিসেবে গান্ধীরা তাঁদেরই বেছে নিলেন, যাঁরা ওই পরিবারের প্রতি আনুগত্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ। মনোনীতদের অধিকাংশই পুরনো মুখ, যাঁরা দীর্ঘদিন ক্ষমতাভোগ সত্ত্বেও দলকে ভরাডুবির হাত থেকে বাঁচাতে ব্যর্থ। রাজ্যসভার এই মনোনয়ন কংগ্রেসের সর্বস্তরে ক্ষোভ ও হতাশার সৃষ্টি করেছে। সেই সঙ্গে বিস্ময়ও। বিস্ময় এই কারণেই, যে ১০ জনকে বাছা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে সাত জনই ‘বহিরাগত’ বা রাজ্যের বাইরের প্রার্থী। এর অর্থ এমন নয় যে, ওইসব রাজ্যে যোগ্য প্রার্থীর অভাব ছিল‌। আসলে গান্ধী পরিবারের ইচ্ছে ছিল, তাঁদের 'ঘরের লোক' এই সাত জন ‘বহিরাগত’-কে অন্য রাজ্য থেকে রাজ্যসভায় আনা হবে। এই ৭ প্রার্থীই জয়ী হবেন কি'না তা জানা যাবে ১০ জুন, কিন্তু গান্ধী পরিবারের বার্তা তো ইতিমধ্যেই স্পষ্ট হয়েছে।

 

ওদিকে রাজনৈতিক মহলের আলোচনায় উঠে এসেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মাত্র ক'দিন আগেই শেষ হয়েছে রাজস্থানের উদয়পুরে দলের চিন্তন শিবির। ওই শিবিরে বেশ কিছু প্রস্তাব গৃহীত হয়। প্রার্থী বাছাইয়ে পরিকল্পিতভাবেই ওই চিন্তন শিবিরে গৃহীত সিদ্ধান্ত উড়িয়ে দিয়েছে গান্ধী পরিবার। সোনিয়া গান্ধীর উপস্থিতিতেই শিবিরে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, যে কোনও নির্বাচনই হোক, সেখানে মোট প্রার্থীর অর্ধেক বা ৫০ শতাংশকে হতে হবে ৫০ বছরের কম বয়সি। গান্ধী পরিবার রাজ্যসভার ভোটের জন্য এবার যে ১০ জন প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে, তার মধ্যে সেই শর্ত পূরণ করেছেন মাত্র দু'জন, উত্তরপ্রদেশের ইমরান প্রতাপগড়ি, বয়স ৩৪ এবং একমাত্র মহিলা প্রার্থী, বিহারের 'বাহুবলী' পাপ্পু যাদবের স্ত্রী রঞ্জিত রঞ্জন৷ তাঁর বয়স ৪৮ বছর। অথচ চিন্তন শিবিরের সিদ্ধান্ত অনুসারে ৫০ বছরের কম বয়সি প্রার্থী হওয়া উচিত ছিল মোট ৫ জন৷ নিজেদের স্তাবকদের রাজনৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে গান্ধী পরিবার তোয়াক্কাই করেনি চিন্তন শিবিরে গৃহীত সিদ্ধান্তর।

 

আরও পড়ুন: বিজেপিতে হার্দিক, গুজরাতের ভোটে কতটা লাভ হবে শাসক দলের?

 

এখানেই শেষ নয়। প্রত্যাশামাফিকই পিন ফোটানো হয়েছে ‘এক পরিবার এক প্রার্থী' নামক চমক দেখানো বেলুনটিতে। চিন্তন শিবিরে ঢাকঢোল পিটিয়ে হরেক ছিদ্রযুক্ত এই বিধি পাশ করানো হয়েছিল। রাজ্যসভার প্রার্থী বাছার সময়ে গান্ধী পরিবার সেই বিধিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়েছে। লঙ্ঘন করেছে সেই নীতি। প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর ইচ্ছায় উত্তরপ্রদেশের প্রবীণ নেতা প্রমোদ তিওয়ারিকে প্রার্থী করা হয়েছে রাজস্থান থেকে। এই প্রমোদ তিওয়ারির মেয়ে আরাধনা উত্তরপ্রদেশের রামপুরের বিধায়ক। গত বিধানসভা ভোটে ওই রাজ্যে মাত্র দু'টি আসন কংগ্রেস জিতেছিল। তার একটিতে জেতেন আরাধনা। তা সত্ত্বেও ওই বিধির ফাঁক গলে প্রার্থী করা হয়েছে তিওয়ারিকে। ওই বিধিতেই বলা আছে, নিয়মের ব্যতিক্রম তখনই হবে, যখন সংশ্লিষ্ট প্রার্থী ৫ বছর বা তার বেশি সময় দলের সঙ্গে যুক্ত থাকবেন। এই ফাঁক রাখা হয়েছে দলে পরিবারতন্ত্রকে জিইয়ে রাখার জন্য। আর সেই সুযোগই নিয়েছে গান্ধী পরিবার।

 

পরিবার-ঘনিষ্ঠদের রাজ্যসভায় প্রার্থী করার জন্য গান্ধীরা বিস্ময়করভাবে উপেক্ষা করেছেন দলের ‘এক ব্যক্তি এক পদ’ নীতিও। এবার প্রার্থী হওয়া মুকুল ওয়াসনিক, রণদীপ সুরজেওয়ালা, রাজীব শুক্ল, রঞ্জিত রঞ্জন, বিবেক তনখা, অজয় মাকেন, এঁরা সবাই এআইসিসির কোনও না কোন পদে আছেন৷ ‘এক ব্যক্তি এক পদ’ নীতি'- কে ঠান্ডা মাথায় ভুলে গিয়ে গান্ধী পরিবার এই ছ'জনকে হাসতে হাসতেই প্রার্থী করেছে। এঁরা যদি জয়ী হন, তাহলে ওই ‘এক ব্যক্তি এক পদ’ বিধিকে কবরে পাঠানো সম্পূর্ণ হবে। এআইসিসি এইসব দলীয় সিদ্ধান্ত লঙ্ঘন করে গোটা দেশের কর্মী ও নেতাদের বার্তা দিয়েছে, "এসব বিধি নিচুতলার নেতাদের জন্য। আমরা দলের শীর্ষ নেতা-নেত্রী, আমরা দলের সম্পদ, আমাদের জন্য এসব নয়।"

 

গান্ধী পরিবার নিজেদের পছন্দের লোকজনকে সংসদে পাঠাতে গিয়ে দলের অন্দরের পরিস্থিতিও ভয়ংকর করেছে। কংগ্রেসের শাসনে থাকা দুই রাজ্য, রাজস্থান ও ছত্তিশগড়ে আগামী বছরেই হবে বিধানসভা ভোট৷ মনোনয়ন-কেলেঙ্কারির পর ওই দুই রাজ্য ধরে রাখা সম্ভবপর হবে কি না, সেই প্রশ্নই এখন জোরালো হয়ে উঠেছে। রাজস্থানে ৪টি রাজ্যসভা আসনে ভোট হবে। পরিষদীয় অঙ্কের হিসেবে কংগ্রেসের দু’টি এবং বিজেপির একটিতে সরাসরি জেতার কথা। চতুর্থ আসনটিতে দ্বিতীয় পছন্দের ভোটে ফলাফল নির্ধারিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কংগ্রেসের দ্বিতীয় পছন্দের সব ভোট দলীয় প্রার্থী পাবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। তবে ক্রস ভোটিং না হলে, রাজস্থান থেকে কংগ্রেসের জেতার কথা তিনটি আসন ও ছত্তিশগড় থেকে দু'টি। এই দুই রাজ্যে যাঁদের প্রার্থী করা হয়েছে, তাঁরা প্রত্যেকেই অন্য রাজ্যের বাসিন্দা। কংগ্রেস মুখপাত্র রণদীপ সিং সুরজেওয়ালা হরিয়ানার, মুকুল ওয়াসনিক মহারাষ্ট্রের ও প্রমোদ তিওয়ারি উত্তরপ্রদেশের রাজনীতিক। এই তিনজনকে মনোনীত করা হয়েছে রাজস্থান থেকে। একটি আসনেও রাজস্থানের কাউকে টিকিট দেওয়া হয়নি। প্রসঙ্গত, ঠিক এর আগের রাজ্যসভা নির্বাচনেও রাজস্থান থেকে জেতানো হয়েছিল কেরালার কংগ্রেস নেতা কেসি বেণুগোপালকে।

 

ওদিকে রাজীব শুক্ল দিল্লির বাসিন্দা। এর আগে উত্তরপ্রদেশ থেকে রাজ্যসভায় গিয়েছিলেন। এবার মনোনীত হয়েছেন ছত্তিশগড় থেকে। একইরকমভাবে বিহারের ‘বাহুবলী’ কংগ্রেস নেতা পাপ্পু যাদবের স্ত্রী রঞ্জিত রঞ্জনকে দেওয়া হয়েছে ছত্তিশগড়ের দ্বিতীয় আসন। বিবেচনাই করা হয়নি ছত্তিশগড়ের কোনও রাজনীতিকের নাম। এই দুই রাজ্যের কংগ্রেস নেতৃত্ব ফুঁসছে এআইসিসি তথা গান্ধী পরিবারের এই তুঘলকি কার্যক্রম দেখে৷ আর এই সুযোগ নিতেই আসরে নেমে পড়েছে বিজেপি। একদিকে অতিরিক্ত প্রার্থী দিয়ে কংগ্রেস বিধায়কদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করেছে, অন্যদিকে ওই দুই রাজ্যে কংগ্রেসের বিক্ষুব্ধ নেতাদের হাতে পদ্ম-পতাকা তুলে দেওয়ার সলতে পাকানোর পর্বও চালু করে দিয়েছে। বিধানসভা ভোটের আগেই এই দুই রাজ্যে বিজেপি চমক দেখাতে পারলে, নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, কংগ্রেস-মুক্ত ভারত স্রেফ সময়ের অপেক্ষা। 

 

রাজ্যসভা নির্বাচনে দলের ১০ প্রার্থীর মধ্যে সোনিয়া, রাহুল এবং প্রিয়াঙ্কা গান্ধী এমন ৮ জনকে বেছে নিয়েছেন, যাঁরা গান্ধী পরিবারের আনুগত্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ। বাকি দু'জন জি-২৩ গোষ্ঠীর নেতা, মুকুল ওয়াসনিক এবং বিবেক তনখা। এই দু'জনকে প্রার্থী করে ওই গোষ্ঠীর মধ্যে ভাঙন লাগানোর একটা চেষ্টা হয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে। অনেকেরই মনে থাকবে, সোনিয়া-রাহুল গান্ধীকে সরিয়ে এই ওয়াসনিককেই কংগ্রেস সভাপতি করার জন্য সুপারিশ করেছিলেন জি-২৩ গোষ্ঠীর আনন্দ শর্মা, গুলাম নবি আজাদরা। এই মনোনীত নেতাদের হাতযশেই জাতীয় কংগ্রেস ক্রমশ মিউজিয়ামে চলে যাচ্ছে৷ মনোনীত ১০ জনের মধ্যে একমাত্র নতুন মুখ মহম্মদ ইমরান প্রতাপগড়ি। ৩৪ বছর বয়সি এই উর্দু কবি উত্তরপ্রদেশের গত নির্বাচনের সময়ই প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর নজর কেড়েছিলেন। প্রিয়াঙ্কার ইচ্ছেতেই প্রতাপগড়িকে প্রার্থী করা হয়েছে মহারাষ্ট্র থেকে। তালিকা দেখে রাজনৈতিক মহলের অভিমত, গান্ধীদের ঘনিষ্ঠতম স্তাবকরা এবারও গান্ধী পরিবারে ঢুকে পড়েছে। এদের নিয়েই সম্ভবত 'বৃহত্তর' গান্ধী-পরিবার। ফের প্রমাণ হয়েছে, দলের রাশ ওই পরিবারের হাতেই। ওই পরিবার যা করবে, সেটাই দলের নীতি, দলের কৌশল। ওই পরিবার যে মুখগুলোকে বেছে নেবে, তারাই দলের সম্পদ।

 

একের পর এক রাজ্যে মুখ থুবড়ে পড়ার পরেও শতাব্দীপ্রাচীন এই দলটির কোনও পরিবর্তন ঘটেনি। দলের নড়াচড়ার রীতি-পদ্ধতি সংশোধনের 'স্ক্রিপ্টেড শিবির' বসলেও,গান্ধী-বৃত্তের বাইরের নেতাদের হাতে সেই পেনসিলই রয়ে গেল। ওয়াসনিক বা তনখাকে বাদ দিয়ে যে ৮টি নাম গান্ধী-পরিবার চূড়ান্ত করেছে, তাতে শুধুই দেখা হয়েছে, কে কতখানি গান্ধী পরিবার-ঘনিষ্ঠ৷ একটু লঘু ভাষা ব্যবহার করলে বলা যায়, কে কতখানি গান্ধী পরিবারের স্তাবকতায় পটু, সেটাই ছিল বিবেচনার একমাত্র মাপকাঠি। ফলে এতদিন যাঁরা দলের সর্বোচ্চ অলিন্দে ঘোরাফেরা করেও দলের পতন রোধ করার কোনও উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ হয়েছে, যাঁরা সাধারণ মানুষের পাশে থাকার চেয়ে মিডিয়া, সোশ্যাল মিডিয়ায় স্বচ্ছন্দ, যাঁদের ডাকে দেশের কোনও প্রান্তেই শ'দুয়েক লোকজনও সাড়া দেবে না, নানা কৌশল এবং চালাকি করে ফের তাঁরাই রাজ্যসভার পা রাখার ছাড়পত্র আদায় করে নিয়েছেন গান্ধী পরিবারের সৌজন্যে।

 

তালিকা প্রকাশ হতেই কংগ্রেসের অন্দরে শুরু হয়েছে কোন্দল। ক্রোধ আর ক্ষোভের ঢল নেমেছে সোশ্যাল মাধ্যমে। শোনা যাচ্ছে, বেশ কয়েকজনের দলত্যাগও না কি স্রেফ সময়ের অপেক্ষা। জি-২৩-এর দুই বিশিষ্ট নেতা গুলাম নবি আজাদ ও আনন্দ শর্মার এবার প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে কথা চললেও তালিকা প্রকাশের পর দেখা গিয়েছে তাঁদের ভাগ্যও অনিশ্চিত। শোনা যাচ্ছে, এই দুই নেতাকে নাকি বিজেপির স্টাইলেই এবার কংগ্রেস 'মার্গদর্শক' বানাতে চলেছে৷ দুই নেতা কীভাবে দল চালাতে হবে, সেই 'পরামর্শ' সোনিয়া গান্ধীকে দেবেন এবং সোনিয়াও নাকি সেই পরামর্শ মানবেন! ‘জি-২৩’-এর আর এক নেতা কপিল সিবাল তো মনোনয়ন পাবেন না এমন আভাস পেয়েই সমাজবাদী পার্টির সঙ্গে বোঝাপড়া করে নিয়েছেন। ওই দলের সমর্থনে তিনি এবার রাজ্যসভায় প্রার্থী। প্রসঙ্গত, আগামী ১০ জুন দেশের ১৫ রাজ্য থেকে ৫৭ জন নির্বাচিত হবেন রাজ্যসভায়। কংগ্রেস শিবিরের বক্তব্য, বিভিন্ন রাজ্য বিধানসভায় দলগত শক্তির নিরিখে এই আসনগুলো থেকে ১০টিতে কংগ্রেসের জয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।

More Articles

;