আজাদ হিন্দ ফৌজের ১০০ কোটি টাকার সম্পদ গেল কোথায়?
Azad Hind Fauj Treasure: গবেষক এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষিকা ড. পুরবী রায় ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে একটি ভারতীয় গবেষক দলের প্রধান হিসেবে রাশিয়া ও ব্রিটেনের আর্কাইভের গোপন নথি ঘেঁটে গবেষণা শুরু করেন। নিজের এই গবেষণার কাজে ১৯৯৬ সালে তিনি সাক্ষাৎ করেন ব্রিটিশ মিলিটারি ইন্টেলিজেন্সের প্রাক্তন অফিসার কর্নেল হিউ টয়ের সঙ্গে। হিউ টয় নাকি মুখোমুখি কথোপকথনে পুরবী দেবীকে এক বিস্ফোরক কথা বলেন। টয় দাবি করেন যে তিনি নিজ হাতে আজাদ হিন্দ ফৌজের প্রায় ৭২,০০০ কোটি টাকা তৎকালীন ব্রিটিশ গভর্নর, জওহরলাল নেহরু এবং লর্ড মাউন্টব্যাটেনের কাছে হস্তান্তর করেছিলেন, আর তারপর থেকে সেই টাকার আর কোনো হদিস পাওয়া যায়নি।
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু—এই নামটি শোনামাত্রই প্রতিটা বাঙালির মনে ভেসে ওঠে এক অদ্ভুত দেশপ্রেমের আবেগ। তারপরই জায়গা নেয় আরেক অদ্ভুত আবেগ, এরকম একজন বীরের মৃত্যু নিয়ে এত শত শত ধোঁয়াশা থাকার আবেগ, আমাদের অপারগতার আবেগ। কিন্তু তাঁর অন্তর্ধানের ধোঁয়াশার সঙ্গে সঙ্গে আরেকটা রহস্য গত সাত দশক ধরে ভারতের ইতিহাসে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আজাদ হিন্দ ফৌজ বা আইএনএ-র (INA) সংগৃহীত সেই বিপুল ধনসম্পদ আসলে গেল কোথায়? আজকের বাজারে হিসাব করলে সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ কোটি টাকা।
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু বিশ্বাস করতেন, ভারতের স্বাধীনতার লড়াই কখনো বিদেশি শক্তির উপর পুরোপুরি ভরসা করে লড়া যায় না। জার্মানি বা জাপানের সহায়তায় যুদ্ধ চললেও আজাদ হিন্দ সরকারের নিজস্ব একটা আর্থিক স্বাবলম্বিতা থাকা জরুরি। আর তাই তিনি সিদ্ধান্ত নেন, তহবিলের জন্য তিনি হাত বাড়াবেন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বসবাসকারী সাধারণ ও প্রবাসী ভারতীয়দের দিকে। নেতাজির এক ডাকে দরিদ্র থেকে ধনী, সবাই নিজেদের সর্বস্ব উজাড় করে দিতে শুরু করেন। ১৯৪৪ সালের এক রিপোর্টে দেখা যায়, হাবিব নামের এক ধনী ব্যবসায়ী একাই তৎকালীন সময়ে ১ কোটি টাকা তুলে দেন নেতাজির হাতে। রেঙ্গুনের আরেক ব্যবসায়ী বি. কে. নাদার আজাদ হিন্দ ব্যাংকে নগদ ও সোনা মিলিয়ে জমা করেন প্রায় ৪০ কোটি টাকা। সাধারণ দরিদ্র মানুষ যেমন তাঁদের জীবনের সঞ্চয় তুলে দিয়েছিলেন, তেমনই মহিলারা নিজেদের গায়ের সমস্ত গহনা খুলে দিয়েছিলেন আজাদ হিন্দ ফৌজের তহবিলে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Netaji INA Treasure: বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী আইএনএ-র চুরি যাওয়া সম্পত্তির মোট পরিমাণ ছিল প্রায় ২৫০ কোটি টাকা! এই এত বিপুল পরিমাণ ধন-সম্পত্তি কোথায় গেল?
১৯৪৫ সালের জানুয়ারি মাসে নেতাজির ৪৮তম জন্মদিনে রেঙ্গুনে সপ্তাহব্যাপী এক উৎসবের আয়োজন করা হয়। সেখানে নেতাজিকে সোনার সঙ্গে ওজন করা হয়েছিল। সেই এক সপ্তাহেই উঠে এসেছিল প্রায় ৮০ কেজি সোনা এবং তৎকালীন মূল্যে প্রায় ২ কোটি টাকা নগদ। কেবল টাকা আর গয়নাই নয়; বার্মায় সম্পূর্ণ একটি সুগার এস্টেটসহ বিপুল পরিমাণ কৃষিজমিও আজাদ হিন্দ ফৌজের নামে দান করা হয়েছিল। সাধারণ মানুষের বিশ্বাস ছিল, নিজের রক্ত ও ঘামে অর্জিত দেশপ্রেমের এই লড়াই কোনো সরকারের দয়ায় চলতে পারে না।
কিন্তু ১৯৪৫ সালের ১৫ অগাস্ট ছবিটা পুরোপুরি বদলে যায়। হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে আণবিক বোমা ফেলার পর বাধ্য হয়ে আত্মসমর্পণ করেন জাপানের সম্রাট হিরোহিতো। সিঙ্গাপুরে বসে এই খবর পাওয়া মাত্রই নেতাজির দূরদর্শী মন বুঝে গিয়েছিল, কয়েক দিনের মধ্যেই ব্রিটিশ সেনারা সিঙ্গাপুরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেবে। তাই ১৬ অগাস্ট নেতাজি আদেশ দেন সিঙ্গাপুরে থাকা আইএনএ-র সমস্ত তহবিল অবিলম্বে ব্যাংককে সরিয়ে নিয়ে যেতে হবে। ওই দিনই বিকেলে সিঙ্গাপুরে পৌঁছে তিনি বাহিনীর সমস্ত সৈন্য ও কর্মীদের টানা তিন মাসের অগ্রিম বেতন মিটিয়ে দেন। আর পরিষ্কার জানিয়ে দেন যে জাপান আত্মসমর্পণ করেছে ঠিকই, কিন্তু আজাদ হিন্দ ফৌজ হার মানেনি।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Netaji Subhas Chandra Bose : ১৯৪৩ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি, নেতাজির সেবারের গন্তব্য দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া। তবে বিমানে নয়, সাবমেরিনে
হিসাব-নিকাশ শেষে দেখা গেল, সব মিটিয়ে দেওয়ার পরেও বাহিনীর কাছে অবশিষ্ট রয়েছে বিপুল পরিমাণ সোনা ও নগদ। নেতাজির ব্যক্তিগত সচিব কুন্দন সিংয়ের বিবরণ অনুযায়ী, সমস্ত সোনা ও টাকা চারটি বড় বড় বাক্সে বন্দি করা হয়। ওই সোনাগুলির মধ্যে হিটলারের নেতাজিকে উপহার দেওয়া একটি মূল্যবান সোনার সিগারেট কেসও ছিল। এই চার বাক্স ভর্তি সম্পদের মোট ওজন ছিল প্রায় আড়াই মণ। পরদিন, ১৭ অগাস্ট ভোরে এই চারটি বাক্স নিয়ে নেতাজি ব্যাংকক থেকে সাইগনের উদ্দেশ্যে রওনা হন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন দেবনাথ দাস, এস এ আইয়ার, হাবিবুর রহমান এবং আবিদ হাসানের মতো বিশ্বস্ত সহযোগীরা। সাইগন থেকে মাঞ্চুরিয়া যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও বিমানের অভাবে তা আটকে যায়। অবশেষে ১৮ অগাস্ট বহু কষ্টে জাপানিদের একটি মিৎসুবিশি বিমানে দুটি মাত্র সিটের ব্যবস্থা হয়। কিন্তু অতিরিক্ত ওজনের কারণে বিমানচালক স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে হয় কর্নেল হাবিবুর রহমানকে নেওয়া যাবে, না হয় সেই চারটি বাক্স নেওয়া যাবে। শেষ পর্যন্ত হাবিবুর রহমান এবং সেই চারটি বাক্স নিয়েই বিমানটি ওড়ে। এরপর ফরমোসা অর্থাৎ বর্তমান তাইওয়ানের তাইহোকু বিমানবন্দরে বিমানটি ভেঙে পড়ে। আর সেখান থেকেই শুরু হয় আসল রহস্য।
দুর্ঘটনার পর উদ্ধার পাওয়া বাক্সগুলি নিয়ে আসা হয় এবং সিল করে টোকিওতে পাঠানো হয়। ১৯৫২ সালে জাপান থেকে সেই উদ্ধার হওয়া সম্পদ যখন ভারতে এনে ন্যাশনাল মিউজিয়ামে রাখা হয়, তখন দেখা যায় এক চরম অসংগতি। নেতাজির সচিব কুন্দন সিং পরবর্তীতে তদন্ত কমিটির সামনে লিখিতভাবে জানান যে সাইগন যাওয়ার পথে বিমানে অন্তত ৮০ কেজি সোনা তোলা হয়েছিল। কিন্তু ভারত সরকার জাপান থেকে যা ফেরত পেল, তার ওজন ছিল মাত্র ১১ কেজি, তা-ও অধিকাংশই আগুনে পোড়া ও গলে যাওয়া গহনার টুকরো। তাহলে বাকি সোনা এবং কোটি কোটি নগদ টাকা কোথায় গেল, সেই প্রশ্নের উত্তর আজও অধরা।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Netaji Subhash Chandra Bose : “স্বদেশের চিত্তে নূতন প্রাণ সঞ্চার করবার পূণ্যব্রত তুমি গ্রহণ করেছ...” রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর উৎসর্গ করেছিলেন নেতাজির উদ্দেশ্যে।
ঘটনার জল আরও ঘোলা হয় যখন দেখা যায় স্বাধীনতার পর ভারত সরকার এই অদ্ভুত অমিল জেনেও রহস্যজনকভাবে চুপ ছিল। পরবর্তীকালে বেশ কয়েকটি তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়। ১৯৪৭ সালে ভারতে আসা রামারাও বেনেগাল তাঁর রিপোর্টে স্পষ্টভাবে লিখেছিলেন যে আজাদ হিন্দ ফৌজের সম্পত্তি যথেচ্ছভাবে তছরুপ করা হচ্ছে এবং এর পিছনে হাত রয়েছে টোকিওতে থাকা আইআইএল (IIL)-এর প্রধান এস. রামামূর্তির। এরপর ১৯৫১ সালে চিত্তুর কমিশন জানায়, নেতাজির অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং প্রচার বিভাগের দায়িত্বে থাকা এস. এ. আইয়ার এবং রামামূর্তি মিলে যুদ্ধবিধ্বস্ত জাপানে চরম বিলাসী জীবনযাপন করছেন। দুজন মিলে আজাদ হিন্দ ফৌজের বাকি সোনা ও টাকা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়ে আত্মসাৎ করেছেন। ১৯৫৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীকে লেখা এক চিঠিতে স্বীকার করে নেন যে আইএনএ-র তহবিলের টাকা তছরুপ বা চুরি হয়েছে, কিন্তু এই মুহূর্তে আর কোনো নতুন তদন্ত চালানো সম্ভব নয়। নেহরুর এই অনীহা আজও বহু গবেষকের মনে বড়সড় প্রশ্নের জন্ম দেয়। গবেষক অনুজ ধরের মতো অনেকেই দাবি করেন, এটি স্বাধীন ভারতের ইতিহাসের প্রথম বড় কেলেঙ্কারি। এত বড় অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও এস. এ. আইয়ারকে পরবর্তীতে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়েছিল।
এই রহস্যে নতুন মাত্রা যোগ করেন গবেষক এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষিকা ড. পুরবী রায়। ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে তিনি একটি ভারতীয় গবেষক দলের প্রধান হিসেবে রাশিয়া ও ব্রিটেনের আর্কাইভের গোপন নথি ঘেঁটে গবেষণা শুরু করেন। অনর্গল রুশ ভাষা বলতে পারা পুরবী দেবী একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য আবিষ্কার করতে থাকেন। নিজের এই গবেষণার কাজে ১৯৯৬ সালে তিনি সাক্ষাৎ করেন ব্রিটিশ মিলিটারি ইন্টেলিজেন্সের প্রাক্তন অফিসার কর্নেল হিউ টয়ের সঙ্গে। হিউ টয় নাকি মুখোমুখি কথোপকথনে পুরবী দেবীকে এক বিস্ফোরক কথা বলেন। টয় দাবি করেন যে তিনি নিজ হাতে আজাদ হিন্দ ফৌজের প্রায় ৭২,০০০ কোটি টাকা তৎকালীন ব্রিটিশ গভর্নর, জওহরলাল নেহরু এবং লর্ড মাউন্টব্যাটেনের কাছে হস্তান্তর করেছিলেন, আর তারপর থেকে সেই টাকার আর কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে মুখার্জি কমিশনের জেরার মুখে পড়ে হিউ টয় হেসে পুরবী রায়কে "ঝুড়ির মধ্যে থাকা একটা সাপ" বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। যদিও টয়ের এই ৭২,০০০ কোটি টাকার দাবিটি অত্যন্ত অতিরঞ্জিত এবং এর কোনো মজবুত প্রমাণ আজও মেলেনি, তবে পুরবী রায়ের মূল প্রশ্নটি আজও অমীমাংসিত—কেন সংসদে এই নিখোঁজ বিপুল অর্থের বিষয়ে নিরপেক্ষ কোনো তদন্ত হলো না?
আজাদ হিন্দ ফৌজের সেই বিপুল ধনসম্পদ নিয়ে অনেক বিশ্বাস আর অনেক গল্পকথা প্রচলিত আছে। কেউ বলেন সেই টাকা সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকে লুকিয়ে রাখা আছে, কেউ বলেন তা দিয়ে যুদ্ধ-পরবর্তী নানা হিসাব মিটিয়ে ফেলা হয়েছে, আবার অনেকের মতে নেতাজির দুই বিশ্বস্ত সহযোগী আর ব্রিটিশ আধিকারিকদের পকেটেই তা গলে জল হয়ে গিয়েছে। ১৯৭৮ সালে দিল্লির ন্যাশনাল মিউজিয়ামের টাইম ক্যাপসুল থেকে পাওয়া কিছু পোড়া সোনা আর ১১ কেজি গলে যাওয়া অলঙ্কার ছাড়া ভারতবাসী আজ পর্যন্ত আর কিছুই ফেরত পায়নি। বছরের পর বছর ধরে মানুষের আবেগ, সুভাষচন্দ্র বসুর বীরত্ব এবং তাঁর অন্তর্ধানের রূপকথা এত গভীরভাবে মিলেমিশে গিয়েছে যে আসল সত্যকে আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। কিন্তু আজও বহু গবেষক বিশ্বাস করেন যে গোপন ফাইলগুলির সমস্ত ধোঁয়াশা যদি কোনোদিন কাটে, তবে হয়তো নেতাজির নিখোঁজ হওয়ার সংবাদের পাশাপাশি আজাদ হিন্দ ফৌজের এই 'নিখোঁজ ধন'-এর আসল রহস্যও পৃথিবীর সামনে উন্মোচিত হবে।









