অর্ধেক দেশ জলের তলায়, লক্ষ লক্ষ মানুষ ঘরছাড়া! কেন এই অবস্থা পাকিস্তানের

বিজ্ঞানীরা অনেকদিন ধরেই সতর্ক করে বলছেন যে, পাকিস্তানের কাছে সবথেকে বড় বিপদ সন্ত্রাসবাদ নয়, বরং জলবায়ু পরিবর্তন।

Satyaki Tat
৩ মিনিট
অর্ধেক দেশ জলের তলায়, লক্ষ লক্ষ মানুষ ঘরছাড়া! কেন এই অবস্থা পাকিস্তানের

চিন এবং পাকিস্তান। ভারতের দুই প্রতিবেশী। দুই ভূখণ্ডর মধ্যে দূরত্বও খুব বেশি নয়। কিন্তু এই মুহূর্তে প্রকৃতির মেজাজ দু'টি ভূখণ্ডে সম্পূর্ণ বিপরীত। একদিকে খরার কবলে পরে সমস্ত নদী, হ্রদ শুকিয়ে হাঁসফাঁস করা চিন, অন্যদিকে অতি বৃষ্টিতে নদী ফুলেফেঁপে উঠে অর্ধেক দেশ জলের তলায় চলে যাওয়া পাকিস্তান। পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বিপরীত, কিন্তু কারণ একটাই। জলবায়ু পরিবর্তন।

শেষ পাওয়া খবর অনুযায়ী, এই মুহূর্তে পাকিস্তানের প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ বন্যা-আক্রান্ত। প্রাণ হারিয়েছেন এক হাজারেরও বেশি মানুষ। লক্ষ লক্ষ মানুষ তাদের শেষ সম্বলটুকু আঁকড়ে ধরে রাস্তায় জীবন কাটাচ্ছেন, অপেক্ষা করছেন সাহায্যের। পাকিস্তানের জলবায়ু মন্ত্রী একে ঐতিহাসিক বিপর্যয় ঘোষণা করেছেন এবং তিনি স্পষ্টভাবেই জানাচ্ছেন যে, এই বিপর্যয়ের পিছনে সরাসরি দায়ী জলবায়ু পরিবর্তন এবং তার ফলে আবহাওয়ার স্থিতিশীলতা ধ্বংস হয়ে যাওয়া। তার এই দাবিকে সম্পূর্ণভাবে মান্যতা দিচ্ছে নথি। স্বাধীনতার পর প্রকৃতির এই রূপ তারা দেখেনি। পাকিস্তানে বর্ষাকালে মুলত চারটি চক্রে বৃষ্টিপাত হয়। এই বছর অগাস্ট শেষ হওয়ার আগেই আটটি চক্র ছাড়িয়েছে। ১৪ জুন থেকে লাগাতার বৃষ্টি হচ্ছে পাকিস্তানের কিছু জায়গায়। আরও চিন্তার বিষয় হচ্ছে, পাকিস্তানের অন্যান্য জায়গায় কিন্তু কয়েক সপ্তাহ আগেই তীব্র তাপপ্রবাহ হয়েছে। কিছু জায়গাতে তাপমাত্রা ছিল প্রায় ৫০ ছুঁই ছুঁই।

কিন্তু তার কিছুদিন পরেই প্রায় গোটা দেশে বৃষ্টি শুরু হয়। শুধুমাত্র আগষ্ট মাসেই এখনও পর্যন্ত ১৬৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। যা স্বাভাবিকের থেকে প্রায় ২৪১ শতাংশ বেশি।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
শুকিয়ে কাঠ পৃথিবীর বহু নদী, গঙ্গার বিপদ ঠিক কতটা

গত ৫০০ বছরে এমন খরা দেখেননি আমেরিকা, চিন থেকে শুরু করে ইউরোপের মানুষ। তাঁরা সবাই একবাক্যে মানতে বাধ্য হচ্ছেন যে, জলবায়ু পরিবর্তন হওয়া শুরু হয়ে গেছে।

দেশের প্রায় ১৩০টি সেতু ধ্বংস হয়ে গিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩০০০ কিলোমিটারেরও বেশি রাস্তা। সবথেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সিন্ধ প্রদেশ। সেই রাজ্যের ২৩টি জেলা পরিণত হয়েছে ধ্বংসস্তূপে। মৃত্যু হয়েছে তিনশোর বেশি মানুষের। বেলুচিস্তানে মৃত্যু হয়েছে ২৩৪ জনের।

অন্যদিকে পাঞ্জাব প্রদেশ এবং খাইবার পাখতুনওয়া প্রদেশে বন্যায় এখনও পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ১৬৫ জন এবং ১৮৫ জনের। পাক অধিকৃত কাশ্মীরেও ৩৭ জনের প্রাণহানি হয়েছে।

কত বাড়িঘর ভেসে গিয়েছে, কত গবাদি পশুর মৃত্যু হয়েছে, কত জমি জলের তলায় গেছে বা কত ফসল নষ্ট হয়েছে, তা হিসেব করার মতো পরিস্থিতিতে একেবারেই নেই প্রশাসন। ক্ষয়ক্ষতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা অনুমান করাও এই মুহূর্তে অসম্ভব। বলে রাখা দরকার, ইতিমধ্যেই যথেষ্ট আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে পাকিস্তান। তার ওপর বন্যার কারণে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছুঁতে পারে প্রায় ছয় বিলিয়ন ডলার।

বিগত কয়েক বছর ধরেই জলবায়ু পরিবর্তনের ফলাফল প্রত্যক্ষ করছে পাকিস্তান। বিভিন্ন রূপে। সম্প্রতি একটি রিপোর্টে জানা গিয়েছে যে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সর্বাধিক আক্রান্ত প্রথম দশটি দেশের মধ্যে পাকিস্তান একটি। তার ওপর পাকিস্তানের ভৌগোলিক অবস্থানও একটি বড় কারণ। একদিকে হিমালয়, কারাকোরাম, হিন্দুকুস, একদিকে সমুদ্র এবং আর একদিকে রুক্ষ একটি অঞ্চল। বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে পাকিস্তান সংলগ্ন তিন পর্বতশ্রেণির সমস্ত হিমবাহই খুব দ্রুত গলছে এবং মৌসুমী বায়ুর অতি-সক্রিয়তা বর্ষাকালকে আরও বিপজ্জনক করে তুলছে। সেই সঙ্গে ব্যাপক হারে বনভূমির ধ্বংস হওয়া, অপরিকল্পিত এবং অবৈজ্ঞানিক শহর পরিকল্পনা, হিমালয় অঞ্চলে অনিয়ন্ত্রিত পরিকাঠামো নির্মাণ এবং তার ফলে হওয়া ভূমিক্ষয় আরও বেশি করে রুক্ষ করে তুলছে প্রকৃতিকে। একের পর এক হিমবাহ গলে যাচ্ছে, ধস নামছে। বর্ষার মরসুমে হিন্দুকুশ, কারাকোরাম, হিমালয় হয়ে উঠছে চূড়ান্ত অ-স্থিতিশীল। এই মুহূর্তে সেখানে উপত্যকা পুরোপুরি জলের তলায়। বাসিন্দারা জানাচ্ছেন, তারা কোনওদিনও এই রূপ দেখেননি নদীর।

অথচ বিজ্ঞানীরা অনেকদিন ধরেই সতর্ক করে বলছেন যে, পাকিস্তানের কাছে সবথেকে বড় বিপদ সন্ত্রাসবাদ নয়, বরং জলবায়ু পরিবর্তন। কিন্তু সেই দেশের কোনও সরকারই এই বিপদকে খুব গুরুত্ব দেননি। ২০১৩ সালে তারা তৈরি করে National Climate Change Policy। সেই সঙ্গে পরবর্তী কিছু বছরে তারা অনেক আইন আনে, অনেক নীতি গ্রহণ করে পরিবেশ রক্ষার জন্য। কিন্তু সেগুলি কার্যকর করতে সব সরকার ব্যর্থ হয়েছে। সেই সঙ্গে এই অতি জনঘনত্বপূর্ণ দেশে ব্যাপক হারে শিল্পায়ন, নগরায়ন ভয়াবহ ক্ষতি করেছে পরিবেশের।

সময় থাকতে থাকতে বাকি দেশ, বিশেষ করে পাকিস্তানের প্রতিবেশী, আমাদের দেশ ভারতের সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। প্রয়োজন পড়শির এই বিপদ থেকে শিক্ষা নিয়ে এখন থেকেই প্রস্তুত নেওয়া এবং পরিবেশ রক্ষার কাজে অনেক বেশি নজর দেওয়া। কিন্তু শাসক ও মানুষ- সকলেই পরিবেশের এত বিপর্যয় সত্ত্বেও উদাসীন। আশা করা যায়, পাকিস্তানের এই ভয়াবহ পরিণতি দেখে বাকিরা নিজেদের প্রস্তুত করবে। বেঁচে যাবে কোটি কোটি জীবন।

লিখেছেন
Satyaki Tat
Satyaki Tat
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।

সিভিল সার্ভিস ছেড়ে বাঘের টানে রণথম্ভোরে, ৩৫ একর জমিতে তৈরি করলেন বন

Ranthambore tiger conservation: তাঁরা কেবল চেয়েছিলেন সংরক্ষিত বনের বাইরে বাঘেদের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয় গড়ে তুলতে। তারপর কুড়ি বছর পর্যটন লজ থেকে যেটুকু আয় হতো, তার প্রায় সবটাই তাঁরা সঞ্চয় করতেন ভাদলাভে কৃষকদের কাছ থেকে এক এক করে জমি কেনার জন্য। প্রায় দুই দশক ধরে একটু একটু করে ৩৫ একরেরও বেশি জমি তাঁরা কিনে নেন, যার মোট খরচ ছিল সে সময়ের হিসাবে এক কোটি টাকারও বেশি।

জলবায়ু বদল শুধু প্রকৃতির বিপদ নয়, ভারতের অর্থনীতির ভিতও নড়বড়ে করে দিচ্ছে

climate change and economy: ১৯৯০ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে ২১টি উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতি খতিয়ে দেখে একটি সমীক্ষায় উঠে এসেছে এক চমকে দেওয়ার মতো তথ্য। দেখা যাচ্ছে, বার্ষিক গড় তাপমাত্রা যদি মাত্র ১ ডিগ্রি সেলসিয়াসও বাড়ে, তবে দীর্ঘমেয়াদে সামগ্রিক উৎপাদন দক্ষতা কমে যায় প্রায় ৩.২২ শতাংশ।

নেপাল বিপর্যয়ের ক্ষতিপূরণ দেবে কে?

Climate Justice for nepal: ২৬ অগাস্ট লাংটাং লিরুং-এর হিমবাহ ধসে নেপালের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়—নিহত ১,৩৪৪, নিখোঁজ ৪,৮৮৭। পুনর্গঠনে প্রয়োজন ৪-৫ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ডে আছে মাত্র ৮২২ মিলিয়ন ডলার।নেপালের দাবি, চিন-ভারত-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক দায় আছে। জলবায়ু ন্যায়বিচারের প্রশ্ন এখন আন্তর্জাতিক কাঠগড়ায়।

নেপালের হড়পা বান থেকে বেঁচে ফিরলেন যাঁরা, তাঁদের চোখে ২৬ অগাস্ট

Nepal flash floods 2026: ২৬ অগাস্ট, ২০২৬-এ নেপালের হড়পা বানে ধ্বংসস্তূপের মাঝেও কিছু মানুষ বেঁচে ফিরেছেন। কেউ এক কাপ চায়ের বিরতির জন্য, কেউ গাড়ির একটা রিভার্স গিয়ারের কারণে, কেউ ডালপালা ছড়ানো একটা আমগাছ আঁকড়ে ধরে, আবার কেউ কেবল ১৫ সেকেন্ডের দৌড়ে ছিনিয়ে এনেছেন নিজের শ্বাস। মৃত্যু খুব কাছ থেকে অনুভব করে ফেরা সেই মানুষগুলির অভিজ্ঞতায় রইল রাসুয়া আর নুয়াকোটের সেই সকালের কথা।

হিমালয়ের বরফ গলছে দ্বিগুণ হারে, নেপালের বিপর্যয়ের বিজ্ঞান কী বলছে?

Nepal Flood 2026: বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে দিয়েছিলেন, ৪৫০০ থেকে ৬০০০ মিটার উচ্চতার মধ্যে থাকা হিমবাহ অঞ্চলের অন্তত ৭৮ শতাংশ উচ্চতা-নির্ভর উষ্ণায়নের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। পাঁচ মাস পর সেই সতর্কবাণীই যেন সত্যি হয়ে উঠল নেপালের উপত্যকায়।

ছয় দশকে কতটা সফল ভারত-নেপাল গান্ডাকচুক্তি?

Gandak dam history: নেপালের হিমবাহ থেকে পাথর ধসের পর জল নেমেছে ত্রিশূলী-কালীগণ্ডক হয়ে বিহারে। বাল্মীকিনগর বাঁধের ৩৬টি গেট খুলে প্রাণ বাঁচল বহু মানুষের। কিন্তু, ১৯৫৯ সালের গান্ডাক চুক্তি কি সত্যিই নেপাল ভারত দুই দেশের ‘সমন্বিত স্বার্থ’ রক্ষা করল? নেপালের তরাইয়ে জল মেলে না, ক্ষতিপূরণ মেলে না কৃষকদের। ৬০ বছরের পুরনো বাঁধ প্রকল্পকে নিয়েও নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।

নেপালের বন্যায় সবচেয়ে বেশি বিপন্ন মহিলারাই, ঝুঁকিতে ১.৬ লক্ষ নারীর জীবন

Nepal Flash Floods: নেপালের ভয়াবহ হড়পা বানে প্রায় ১.৬ লক্ষ নারীর জীবন ঝুঁকিতে। বন্যার পর তাঁদের সামনে কী কী স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, খাদ্য ও জীবিকার সংকট তৈরি হয়েছে? রাষ্ট্রপুঞ্জের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, নারীদের সুরক্ষায় কী পদক্ষেপ জরুরি?