শুকিয়ে কাঠ পৃথিবীর বহু নদী, গঙ্গার বিপদ ঠিক কতটা
গত ৫০০ বছরে এমন খরা দেখেননি আমেরিকা, চিন থেকে শুরু করে ইউরোপের মানুষ। তাঁরা সবাই একবাক্যে মানতে বাধ্য হচ্ছেন যে, জলবায়ু পরিবর্তন হওয়া শুরু হয়ে গেছে।

মে মাস। রবিবারের দুপুর। বাইরে কাঠফাটা রোদ। আপনি ভাবলেন, বিকেলে একটু বাবুঘাট থেকে ঘুরে আসবেন। গঙ্গার হাওয়া খাবেন, নৌকোবিহারও করতে পারেন। গঙ্গা তো কখনও নিরাশ করে না। তাই এই ক্ষমাহীন গ্রীষ্মের দিনে তার দ্বারস্থ হওয়ার জন্য আপনি তৈরি হলেন। সঙ্গী হলেন আপনার বান্ধবীও। কিন্তু পৌঁছে আপনি যে দৃশ্য দেখলেন, তাতে তার প্রায় হৃদযন্ত্র বিকল হওয়ার উপক্রম হল, দুঃখে-কষ্টে আপনি এবং আপনার বান্ধবী ভেঙে পড়লেন। নিজেদের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না আপনারা। আপনারা দেখলেন, গঙ্গাবক্ষে জল প্রায় নেই বললেই চলে। বাবুঘাটের সব নৌকো প্রায় শুকিয়ে যাওয়া চরের ওপর বসে যেন। মৃত মাছ, আবর্জনা, পশুপাখি এবং মানুষের মৃতদেহ, সব পড়ে আছে নদীবক্ষে। কিছু সাংবাদিক নদীর প্রায় মাঝখানে গিয়ে রিপোর্টিং করছেন, যেখানে জল নেই আর একফোঁটা।
আঁতকে উঠলেন? নিশ্চয়ই মনে হচ্ছে, কী যত রাজ্যের গাঁজাখুরি গল্প ফাঁদা হচ্ছে। এ কি কখনও সম্ভব? আমাদের গঙ্গাতে জল তলানিতে গিয়ে ঠেকবে?
এই একই কথা জার্মানির রাইন নদী, বা ফ্রান্সের লুয়ার, বা ইতালির লেক গারদা বা পো নদী, বা চিনের ইয়াংজে নদী, বা আমেরিকার কলোরাডো নদী, বা পশ্চিম ইউরোপের দানিয়ুব নদীর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের মানুষ ভাবতে পারেননি। বেশ লম্বা একটা তালিকা দিলাম। তালিকাতে থাকা সবকটি নদীই সেইসব অঞ্চলের 'Lifeline'। গঙ্গা নিয়ে যে গল্প বলা হলো, আসলে তা এই মুহূর্তে এই নদীগুলির তীরবর্তী কয়েক কোটি মানুষের কাছে নিষ্ঠুরতম বাস্তব। তাঁদের আশ্রয় যে নদী, তা শুকিয়ে গেছে। লেকে জল নেই। গত ৫০০ বছরে এমন খরা দেখেননি আমেরিকা, চিন থেকে শুরু করে ইউরোপের মানুষ। তাঁরা সবাই একবাক্যে মানতে বাধ্য হচ্ছেন যে, জলবায়ু পরিবর্তন হওয়া শুরু হয়ে গেছে। বিপদ এখন আর ভবিষ্যৎবাণী নয়, বর্তমান এবং রূঢ় বাস্তব।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
উৎসাহ এবং ভালো কাজ করার তাগিদের চূড়ান্ত অভাব এই জলাভূমিগুলিকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
পরিস্থিতি কতটা উদ্বেগজনক, তা একটা ছোট্ট উদাহরণ দিলেই বুঝতে পারা যাবে। চিনের ইয়াংজে নদীর জল এতটাই নেমে গেছে যে, ৬০০ বছরের পুরনো একটি বুদ্ধের মূর্তি এখন দৃশ্যমান। বিগত কয়েক শতক তা ছিল জলের তলায়। আরও একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। আমেরিকার টেক্সাসের একটি নদী এতটাই শুকিয়ে গেছে যে ১১৩ মিলিয়ন বছর পুরনো ডাইনোসরের পায়ের ছাপ স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। উদাহরণ এখনও শেষ হয়নি। বাকি আছে। পূর্ব সার্বিয়াতে দানিয়ুব নদী শুকিয়ে এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের নাৎসি যুদ্ধজাহাজ এখন সেখানে দৃশ্যমান।
২০২২ সালের এই খরা ভেঙে দিচ্ছে বিগত কয়েক শতকের রেকর্ড। তীব্র তাপপ্রবাহ, বৃষ্টির অভাব এই হাল করেছে এত গুরুত্বপূর্ণ সব জলের উৎসর। নদীগর্ভ শুকিয়ে এমন অবস্থা হচ্ছে যে, নদীর তলার দ্বীপ, চড়া সব ভেসে উঠছে। পাওয়া যাচ্ছে মৃত মাছ, মানুষের ধ্বংসাবশেষ। ব্যবসা-বাণিজ্য সব শিকেয় উঠেছে। সবথেকে বড় প্রকৃতির পরিহাস মনে হয় জার্মানির মানুষ উপলব্ধি করেছেন। রাইন জার্মানির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নদী, শুধু মিষ্টি পানীয় জলের জন্য নয়, বাণিজ্যের জন্যও। বেশ কিছু পণ্যের পরিবহণ ব্যবস্থা কার্যত দাঁড়িয়ে আছে রাইনের ওপর। জানেন, সবথেকে বেশি কোন পণ্য যায় রাইনের ওপর দিয়ে? কয়লা, গ্যাস, তেল। যে বস্তুগুলির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার আজ রাইন নদীকে শুকিয়ে দিয়েছে।
বিজ্ঞানীরা বিগত বেশ কিছু বছর ধরেই আমাদের সতর্ক করছেন। জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো বন্ধ না হলে কার্বন নিঃসরণ কমবে না, এবং স্বাভাবিকভাবেই জলবায়ু পরিবর্তন আরও ত্বরান্বিত হবে। আবহাওয়া আরও বেশি করে অনিশ্চিত হবে, চরম আকার ধারণ করবে। পৃথিবীর কোনও অংশে বৃষ্টিপাতের হার কমে তলানিতে ঠেকবে, নদী, হৃদ শুকিয়ে যাবে। কোথাও আবার মেঘ ভাঙা বৃষ্টিতে সব ভেসে যাবে। বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, আগামী কিছু দশকের মধ্যে পানীয় জলের সমস্যা উঠবে চরমে, কারণ হিমালয় পর্বতের হিমবাহও খুব দ্রুতগতিতে গলে যাচ্ছে। লেখার শুরুতে যে কাল্পনিক পরিস্থিতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে, তা হয়েতো আর কাল্পনিক থাকবে না কিছু দশক পর।
তখন কী হবে পৃথিবীর?







