শুকিয়ে কাঠ পৃথিবীর বহু নদী, গঙ্গার বিপদ ঠিক কতটা

গত ৫০০ বছরে এমন খরা দেখেননি আমেরিকা, চিন থেকে শুরু করে ইউরোপের মানুষ। তাঁরা সবাই একবাক্যে মানতে বাধ্য হচ্ছেন যে, জলবায়ু পরিবর্তন হওয়া শুরু হয়ে গেছে।

Satyaki Tat
৩ মিনিট
শুকিয়ে কাঠ পৃথিবীর বহু নদী, গঙ্গার বিপদ ঠিক কতটা

মে মাস। রবিবারের দুপুর। বাইরে কাঠফাটা রোদ। আপনি ভাবলেন, বিকেলে একটু বাবুঘাট থেকে ঘুরে আসবেন। গঙ্গার হাওয়া খাবেন, নৌকোবিহারও করতে পারেন। গঙ্গা তো কখনও নিরাশ করে না। তাই এই ক্ষমাহীন গ্রীষ্মের দিনে তার দ্বারস্থ হওয়ার জন্য আপনি তৈরি হলেন। সঙ্গী হলেন আপনার বান্ধবীও। কিন্তু পৌঁছে আপনি যে দৃশ্য দেখলেন, তাতে তার প্রায় হৃদযন্ত্র বিকল হওয়ার উপক্রম হল, দুঃখে-কষ্টে আপনি এবং আপনার বান্ধবী ভেঙে পড়লেন। নিজেদের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না আপনারা। আপনারা দেখলেন, গঙ্গাবক্ষে জল প্রায় নেই বললেই চলে। বাবুঘাটের সব নৌকো প্রায় শুকিয়ে যাওয়া চরের ওপর বসে যেন। মৃত মাছ, আবর্জনা, পশুপাখি এবং মানুষের মৃতদেহ, সব পড়ে আছে নদীবক্ষে। কিছু সাংবাদিক নদীর প্রায় মাঝখানে গিয়ে রিপোর্টিং করছেন, যেখানে জল নেই আর একফোঁটা।

আঁতকে উঠলেন? নিশ্চয়ই মনে হচ্ছে, কী যত রাজ্যের গাঁজাখুরি গল্প ফাঁদা হচ্ছে। এ কি কখনও সম্ভব? আমাদের গঙ্গাতে জল তলানিতে গিয়ে ঠেকবে?

এই একই কথা জার্মানির রাইন নদী, বা ফ্রান্সের লুয়ার, বা ইতালির লেক গারদা বা পো নদী, বা চিনের ইয়াংজে নদী, বা আমেরিকার কলোরাডো নদী, বা পশ্চিম ইউরোপের দানিয়ুব নদীর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের মানুষ ভাবতে পারেননি। বেশ লম্বা একটা তালিকা দিলাম। তালিকাতে থাকা সবকটি নদীই সেইসব অঞ্চলের 'Lifeline'। গঙ্গা নিয়ে যে গল্প বলা হলো, আসলে তা এই মুহূর্তে এই নদীগুলির তীরবর্তী কয়েক কোটি মানুষের কাছে নিষ্ঠুরতম বাস্তব। তাঁদের আশ্রয় যে নদী, তা শুকিয়ে গেছে। লেকে জল নেই। গত ৫০০ বছরে এমন খরা দেখেননি আমেরিকা, চিন থেকে শুরু করে ইউরোপের মানুষ। তাঁরা সবাই একবাক্যে মানতে বাধ্য হচ্ছেন যে, জলবায়ু পরিবর্তন হওয়া শুরু হয়ে গেছে। বিপদ এখন আর ভবিষ্যৎবাণী নয়, বর্তমান এবং রূঢ় বাস্তব।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ভূস্বর্গ হয়ে উঠছে নরক! পরিবেশ ধ্বংস যে সর্বনাশ করছে কাশ্মীরের

উৎসাহ এবং ভালো কাজ করার তাগিদের চূড়ান্ত অভাব এই জলাভূমিগুলিকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

পরিস্থিতি কতটা উদ্বেগজনক, তা একটা ছোট্ট উদাহরণ দিলেই বুঝতে পারা যাবে। চিনের ইয়াংজে নদীর জল এতটাই নেমে গেছে যে, ৬০০ বছরের পুরনো একটি বুদ্ধের মূর্তি এখন দৃশ্যমান। বিগত কয়েক শতক তা ছিল জলের তলায়। আরও একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। আমেরিকার টেক্সাসের একটি নদী এতটাই শুকিয়ে গেছে যে ১১৩ মিলিয়ন বছর পুরনো ডাইনোসরের পায়ের ছাপ স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। উদাহরণ এখনও শেষ হয়নি। বাকি আছে। পূর্ব সার্বিয়াতে দানিয়ুব নদী শুকিয়ে এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের নাৎসি যুদ্ধজাহাজ এখন সেখানে দৃশ্যমান।

২০২২ সালের এই খরা ভেঙে দিচ্ছে বিগত কয়েক শতকের রেকর্ড। তীব্র তাপপ্রবাহ, বৃষ্টির অভাব এই হাল করেছে এত গুরুত্বপূর্ণ সব জলের উৎসর। নদীগর্ভ শুকিয়ে এমন অবস্থা হচ্ছে যে, নদীর তলার দ্বীপ, চড়া সব ভেসে উঠছে। পাওয়া যাচ্ছে মৃত মাছ, মানুষের ধ্বংসাবশেষ। ব্যবসা-বাণিজ্য সব শিকেয় উঠেছে। সবথেকে বড় প্রকৃতির পরিহাস মনে হয় জার্মানির মানুষ উপলব্ধি করেছেন। রাইন জার্মানির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নদী, শুধু মিষ্টি পানীয় জলের জন্য নয়, বাণিজ্যের জন্যও। বেশ কিছু পণ্যের পরিবহণ ব্যবস্থা কার্যত দাঁড়িয়ে আছে রাইনের ওপর। জানেন, সবথেকে বেশি কোন পণ্য যায় রাইনের ওপর দিয়ে? কয়লা, গ্যাস, তেল। যে বস্তুগুলির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার আজ রাইন নদীকে শুকিয়ে দিয়েছে।

বিজ্ঞানীরা বিগত বেশ কিছু বছর ধরেই আমাদের সতর্ক করছেন। জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো বন্ধ না হলে কার্বন নিঃসরণ কমবে না, এবং স্বাভাবিকভাবেই জলবায়ু পরিবর্তন আরও ত্বরান্বিত হবে। আবহাওয়া আরও বেশি করে অনিশ্চিত হবে, চরম আকার ধারণ করবে। পৃথিবীর কোনও অংশে বৃষ্টিপাতের হার কমে তলানিতে ঠেকবে, নদী, হৃদ শুকিয়ে যাবে। কোথাও আবার মেঘ ভাঙা বৃষ্টিতে সব ভেসে যাবে। বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, আগামী কিছু দশকের মধ্যে পানীয় জলের সমস্যা উঠবে চরমে, কারণ হিমালয় পর্বতের হিমবাহও খুব দ্রুতগতিতে গলে যাচ্ছে। লেখার শুরুতে যে কাল্পনিক পরিস্থিতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে, তা হয়েতো আর কাল্পনিক থাকবে না কিছু দশক পর।

তখন কী হবে পৃথিবীর?

লিখেছেন
Satyaki Tat
Satyaki Tat
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।

সিভিল সার্ভিস ছেড়ে বাঘের টানে রণথম্ভোরে, ৩৫ একর জমিতে তৈরি করলেন বন

Ranthambore tiger conservation: তাঁরা কেবল চেয়েছিলেন সংরক্ষিত বনের বাইরে বাঘেদের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয় গড়ে তুলতে। তারপর কুড়ি বছর পর্যটন লজ থেকে যেটুকু আয় হতো, তার প্রায় সবটাই তাঁরা সঞ্চয় করতেন ভাদলাভে কৃষকদের কাছ থেকে এক এক করে জমি কেনার জন্য। প্রায় দুই দশক ধরে একটু একটু করে ৩৫ একরেরও বেশি জমি তাঁরা কিনে নেন, যার মোট খরচ ছিল সে সময়ের হিসাবে এক কোটি টাকারও বেশি।

জলবায়ু বদল শুধু প্রকৃতির বিপদ নয়, ভারতের অর্থনীতির ভিতও নড়বড়ে করে দিচ্ছে

climate change and economy: ১৯৯০ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে ২১টি উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতি খতিয়ে দেখে একটি সমীক্ষায় উঠে এসেছে এক চমকে দেওয়ার মতো তথ্য। দেখা যাচ্ছে, বার্ষিক গড় তাপমাত্রা যদি মাত্র ১ ডিগ্রি সেলসিয়াসও বাড়ে, তবে দীর্ঘমেয়াদে সামগ্রিক উৎপাদন দক্ষতা কমে যায় প্রায় ৩.২২ শতাংশ।

নেপাল বিপর্যয়ের ক্ষতিপূরণ দেবে কে?

Climate Justice for nepal: ২৬ অগাস্ট লাংটাং লিরুং-এর হিমবাহ ধসে নেপালের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়—নিহত ১,৩৪৪, নিখোঁজ ৪,৮৮৭। পুনর্গঠনে প্রয়োজন ৪-৫ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ডে আছে মাত্র ৮২২ মিলিয়ন ডলার।নেপালের দাবি, চিন-ভারত-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক দায় আছে। জলবায়ু ন্যায়বিচারের প্রশ্ন এখন আন্তর্জাতিক কাঠগড়ায়।

নেপালের হড়পা বান থেকে বেঁচে ফিরলেন যাঁরা, তাঁদের চোখে ২৬ অগাস্ট

Nepal flash floods 2026: ২৬ অগাস্ট, ২০২৬-এ নেপালের হড়পা বানে ধ্বংসস্তূপের মাঝেও কিছু মানুষ বেঁচে ফিরেছেন। কেউ এক কাপ চায়ের বিরতির জন্য, কেউ গাড়ির একটা রিভার্স গিয়ারের কারণে, কেউ ডালপালা ছড়ানো একটা আমগাছ আঁকড়ে ধরে, আবার কেউ কেবল ১৫ সেকেন্ডের দৌড়ে ছিনিয়ে এনেছেন নিজের শ্বাস। মৃত্যু খুব কাছ থেকে অনুভব করে ফেরা সেই মানুষগুলির অভিজ্ঞতায় রইল রাসুয়া আর নুয়াকোটের সেই সকালের কথা।

হিমালয়ের বরফ গলছে দ্বিগুণ হারে, নেপালের বিপর্যয়ের বিজ্ঞান কী বলছে?

Nepal Flood 2026: বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে দিয়েছিলেন, ৪৫০০ থেকে ৬০০০ মিটার উচ্চতার মধ্যে থাকা হিমবাহ অঞ্চলের অন্তত ৭৮ শতাংশ উচ্চতা-নির্ভর উষ্ণায়নের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। পাঁচ মাস পর সেই সতর্কবাণীই যেন সত্যি হয়ে উঠল নেপালের উপত্যকায়।

ছয় দশকে কতটা সফল ভারত-নেপাল গান্ডাকচুক্তি?

Gandak dam history: নেপালের হিমবাহ থেকে পাথর ধসের পর জল নেমেছে ত্রিশূলী-কালীগণ্ডক হয়ে বিহারে। বাল্মীকিনগর বাঁধের ৩৬টি গেট খুলে প্রাণ বাঁচল বহু মানুষের। কিন্তু, ১৯৫৯ সালের গান্ডাক চুক্তি কি সত্যিই নেপাল ভারত দুই দেশের ‘সমন্বিত স্বার্থ’ রক্ষা করল? নেপালের তরাইয়ে জল মেলে না, ক্ষতিপূরণ মেলে না কৃষকদের। ৬০ বছরের পুরনো বাঁধ প্রকল্পকে নিয়েও নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।

নেপালের বন্যায় সবচেয়ে বেশি বিপন্ন মহিলারাই, ঝুঁকিতে ১.৬ লক্ষ নারীর জীবন

Nepal Flash Floods: নেপালের ভয়াবহ হড়পা বানে প্রায় ১.৬ লক্ষ নারীর জীবন ঝুঁকিতে। বন্যার পর তাঁদের সামনে কী কী স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, খাদ্য ও জীবিকার সংকট তৈরি হয়েছে? রাষ্ট্রপুঞ্জের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, নারীদের সুরক্ষায় কী পদক্ষেপ জরুরি?