লক্ষ্মীরা আছে, তাদের হৃদয়ে ধরার পদ্মটি নাই
Women and Lakshmi Concept : কর্মক্ষেত্রে উচ্চাশী মেয়েদের জন্য এমন কিছু প্যাটার্নের উদাহরণ থাকা উচিত যেখানে তার পুরুষ সঙ্গীটি তার থেকে কর্মজীবনে কম সফল।

‘লক্ষ্মীটি নাই’! বড় সুন্দর এবং দ্যোতনাময় শীর্ষনাম ইনস্ক্রিপ্টের এই বিশেষ সংখ্যাটির। আমাকে ইনস্ক্রিপ্টের মধুরিমা আর অর্ক বললেন এই বিশেষ সংখ্যায়, লক্ষ্মীপুজোর ঠিক পরে, তাঁরা অলক্ষ্মী হয়ে ওঠার কাহিনি চান। আমাদের মতো কিছু মেয়েদের বা মহিলাদের, নিজের মত করে বাঁচা আর বাঁচার জন্য লড়ার কাহিনি, সমাজের 'লক্ষ্মী', 'শ্রী', ইত্যাদি তৈরি করা খোপে না পড়া মেয়েদের কথা, অভিজ্ঞতা তাঁরা ধরে রাখতে চান। প্রস্তাবটি খুব ভালো লাগল। ২৭ অক্টোবর, ২০২৩। আমি লিখছি রাজস্থানের উদয়পুর নামক শহরের একটি ঘর থেকে। মেক মাই ট্রিপ আয়োজিত একটি মোটামুটি বিলাসবহুল রাজস্থান ভ্রমণের প্যাকেজ স্বোপার্জিত অর্থে নিজের আর নিজের কিশোর সন্তানের জন্য কিনে, গত এগারো দিন ধরে হইহই কাণ্ড করে বেড়াচ্ছি। গ্রুপ ট্যুরে বাকিরা সবাই মা-বাবা-সন্তানের চতুর্ভুজ বা ত্রিভুজ পরিবার নিয়ে এসেছেন। আমিই কেবল স্বামী-টামি ছাড়া শুধু সন্তান নিয়ে এসেছি। আজকাল অনেক মানুষই বেশ আধুনিক এবং অন্যদের প্রাইভেসি সম্পর্কে কিছুটা সচেতন। ফলত খুব একটা উটকো কৌতূহলের মুখে পড়তে হয়নি। কেউ কেউ জিগ্যেস করেছেন। যেহেতু বিবাহিত হওয়া বা না হওয়া একটি সামাজিক স্টেটাস, যা নানান আইনি ফর্মেও লিখতে হয়, আমি স্বাভাবিকভাবেই উত্তর দিই যে আমি বিবাহবিচ্ছিন্না। ওখানেই সেই বিষয় নিয়ে সরাসরি আলোচনা বন্ধ হয়ে গেছে। সহযাত্রীরা বেশিরভাগই আপাত সহৃদয় মানুষ। সুন্দর মিলেমিশে ঘুরছি। এই ভ্রমণে অন্তত কোনও লড়াই নেই। কিন্তু জীবনে লড়াই ছিল, আছে, থাকে। তাই নিয়ে কিছু লিখবও। তবে তার আগে আবারও এই লেখার শীর্ষনামে ফিরে আসি।
কোজাগরী পূর্ণিমা। চপলা লক্ষ্মী বাংলার ঘরে ঘরে হয়তো এসে বসবেন। জ্যোৎস্না ধোওয়া চরাচরে কোথাও কোথাও তাঁর সাদা পেঁচার পিচ্ছিল পালক অন্ধকারে ঝিলকিয়ে উঠবে। ঘরে ঘরে আলপনা দেওয়া হবে। তাঁর পা-দু’টি ঘরের চৌকাঠে ঘরমুখো করে আঁকা হবে। স্ত্রী পুরুষকে রাত জেগে পাশা খেলতে হতো এককালে। সে হয়তো এখন আর হয় না। তবু ধানের ছড়াটি আঁকা হবে, রাখা হবে। পূর্ণিমা রাতে, শান্ত চরাচরে, বেশি আওয়াজ আর বেশি আলোর ঝলকানি না রেখে শান্ত হয়ে তাঁর জন্য অপেক্ষা করতে হবে। আমি ঘোর নাস্তিক। নিজের মতো করে নারীবাদীও। মেয়েদের দেবী রূপে পুজো করা আমি পছন্দও করি না। তবে তুলনাই যদি করতে হয়, তবে আমি শুধুমুধু অলক্ষ্মী হতে যাব কেন?
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Women of Manipur: সনাতনী হিন্দু ধর্মের ফোড়ন দিয়ে যদি সঞ্চিত সম্পদসহ জমি দখল করা যায়, আগ্রাসনের খাতায় জমার অঙ্কটা বাড়বে বৈ কমবে না।
আজকাল একটা প্রবণতা চলছে নারীবাদী আধুনিক মেয়েদের মধ্যে। আমার সমবয়সী এবং ছোট বন্ধুনিদের মধ্যে। নিজেকে অলক্ষ্মী আর ডাইনি বলার প্রবণতা। তার নানান সামাজিক কারণও আছে। একটা ছকে যখন মানুষ কাউকে বা কিছুকে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলে, তখন সেই ছক ভাঙার প্রয়োজনে ছকের একেবারে উলটো কিছু করাও দরকার হয়ে পড়ে। তাই নারীবাদী মেয়েদের অনেক ক্ষেত্রে খুব নিয়মিত, খানিক প্রোভোকেশন ছাড়াই, খুব তেড়ে গালাগালি দেওয়ার দরকার হয়ে পড়ে। সর্বজন সমক্ষে খুব ভালো না লাগলেও, সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়ার, মদ খাওয়ার, গাঁজা খাওয়ার দরকার হয়ে পড়ে। তাই অফিসের পার্টিগুলোয় আমারও ব্রিজারের বোতল হাতে নিজেকে কেমন ছেলেমানুষের মতো মুক্ত মনে হয়, এই পৃথিবীতে কাটানো এতগুলো বছর পরেও। এগুলো সবই হয়তো সাময়িকভাবে দরকারি এবং অমোঘভাবে তৈরি হওয়া অযৌক্তিক কিছু প্যাটার্নের অ্যান্টি-প্যাটার্ন। যা করতে এতদিন ধরে একতরফা নিষেধ করেছ, তাই করব, এই মর্মে প্রয়োজনীয় প্রতিবাদ। ধান কাটার শেষে যথাযথ পুজো না পাওয়া, অনার্য বুড়ি দেবীদের আস্কে পিঠে আর ঝাড়ুর মারের বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়ানো প্রতিবাদ। তা নইলে, যে মেয়েটির নেশা করতে ভালো লাগে সে নেশা করত, আর যার ভালো লাগে না সে করত না। যার গালাগালি দিতে ভালো লাগে সে দিত। যার লাগে না সে দিত না। আলাদা করে সারাদিন তাদের নিজেদের স্বাভাবিক স্বাধীনতাকে প্রমাণ করতে হতো না। ঝগড়া করতে করতে ভাঙা গলা, কষে থুতু, চোখে রাগ, হৃদয়ে পোড়া দাগ নিয়ে, তাদের শণের নুড়ির মতো চুল বিছিয়ে বাড়ির বাইরে বসে থাকতে হত না পার্বণের দিনে। তারাও তো আলপনা ভালোবাসত। ভালোবাসেও। তাদেরও তো ভিতরে বাইরে শ্রী রয়েছে কানায় কানায়। তারাও তো লক্ষ্মী। সম্পদের আর শ্রী-এর অধিকারিণী। শুধু তাদের দেখার চোখটা এখনও সমাজের তৈরি হয়নি। লক্ষ্মী বোধ করি অনেকই আছে। সে মধ্যযুগীয় অন্ধকারের লক্ষ্মীর পাঁচালির ঘরের লক্ষ্মী ঠিক নয়। পোস্ট মেনোপজাল বুড়িও কখনও সে, যে গ্রামীণ মনের পুজো নির্দ্বিধায় পেত। আজ আর পায় না। লক্ষ্মীরা আছে নানান রূপে। তাদের হৃদয়ে ধরার পদ্মটি নাই।
আমার বিবাহ বিচ্ছেদের পরে নেওয়া ভাড়া বাড়িটি খুব মন দিয়ে মিনিমালিস্ট ধরনে সাজানো। তাতে কোনও তথাকথিত ‘অলক্ষ্মী ভাব’ নেই। তার পরিচ্ছন্ন রূপ দেখে নিয়ম করে বাড়িওয়ালা উল্লসিত হন, উল্লাস প্রকাশ করেন। মানুষ তার নিজের নিজের মতো করে লড়ে। আমার লড়াইয়ের ধরনটি অধিকাংশ ক্ষেত্রে লক্ষ্মীর পাঁচালি মার্কা ভালোমানুষ প্রতিমাটির ছদ্মবেশ। ক্যামোফ্লেজ। গাছের ডালের আর পাতার রঙের সঙ্গে রঙ মিশিয়ে থাকা, আর কেবল কিছু খুব বিরল লড়াইয়ের ক্ষেত্রে একদম সামনাসামনি পেট চিরে হুল ফুটিয়ে লড়া। যারা যৌবনে খুব একরোখা হয়, বয়সকালে ব্যবসাপত্র করতে হলে আস্তে আস্তে তাদের যখন তখন পা দাপানো খানিক বন্ধ হয়ে যায়। তখন তাদের অস্ত্রগুলো অন্তরালে খুব নিপুণ হাতে শাণ পেতে থাকে। আর চারদিকের জল-হাওয়ার সঙ্গে মিশিয়ে মিলিয়ে তারা তাদের সংস্থান বা প্রতিষ্ঠানটি খুব মন দিয়ে গড়ে তোলে, সন্তানের মতো তাকে বড় করে। এদিক সেদিক লড়ে বেড়ায় না। অত প্রাণশক্তির অপচয় তাদের সহ্য হয় না। সেই উপেন্দ্রকিশোরের লেখা টুনটুনি মায়ের মতোন। যতক্ষণ না বাচ্চাদের ডানা শক্ত হয়, ততক্ষণ তারা সমস্ত সমাজের মার্জার মার্কা ‘কী করছিস লা টুনটুনির’ গা জ্বালানো প্রশ্নের উত্তরে ‘প্রণাম হই মহারাণী’ বলতে থাকে। সবাই এমন হয়তো নয়। কেউ কেউ এরকম। আমি এরকম। আমার চাকরি, সিন্ধুলিপির গবেষণা, বাংলা ভাষায় কবিতা ইত্যাদির চর্চা, আর সন্তানপালন, এইসবের মধ্যে এবং তারই সঙ্গে সঙ্গে একটি মনের মতো সঙ্গী, বা কম মনের মতো হলে একাধিক সঙ্গী খোঁজার প্রক্রিয়ায়, আমি আমার লড়াইয়ের থাবাটি মার্জারির মতো লুকিয়ে রাখি। আমি লাফালে সহজে শব্দ হয় না। তাই আমার লড়াইগুলোর এর চেয়ে বেশি বর্ণনা এখুনি দেওয়া হয়তো সমীচীন নয়। তবে আমার দেখে না শিখে ঠেকে শেখার দিনগুলো আমাকে যেটুকু জ্ঞানগম্যি দিয়ে গেছে, সেটুকুর একটুখানি আজ ভাগ করে নেব।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ধন-দৌলত, ঐশ্বর্যের দেবীভক্তিতে বিধবার প্রবেশ নিষেধ! সমকালে কিছু ব্যতিক্রম থাকলেও তা নেহাতই এক্ষেত্রে যেন সংখ্যালঘুর মতো!
এই লেখাটি লেখার আগে আমি বেশ কিছুক্ষণ সিমি গারওয়েলের নেওয়া অভিনেত্রী জিনাত আমনের প্রৌঢ় বয়সের একটি ইন্টারভিউ আবার বসে বসে দেখছিলাম। সম্ভবত ১৯৯৯ সালের সাক্ষাৎকার। দেখছিলাম কারণ ওই সাক্ষাৎকারে জিনাত তাঁর কানা চোখ নিয়ে প্রগাঢ় জীবনবোধ থেকে অনেকগুলো দারুণ সত্যি বলেছিলেন। সিমি গারওয়েলের বিরক্তিকর ও নিষ্ঠুর রকমের খুঁচিয়ে বার করা প্রশ্নগুলোকে আমি মাফ করে দিতে পারি এই সব জীবন থেকে উঠে আসা মণিমাণিক্যের রেকর্ডেড থেকে যাওয়ার সুবাদে। সিমির প্রশ্নের উত্তরে জিনাত তাঁর বিবাহিত জীবন নিয়ে খুব পরিশীলিত ভাবে কিছু কথা বলেছিলেন। তার মধ্যে একটি কথা ছিল এই যে, অনেক সাধারণ মেয়েও যে ধরনের শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার সহ্য করবে না, তা তিনি দিনের পর দিন সহ্য করেছিলেন। খানিকটা এই কারণে সহ্য করেছিলেন যে, সফল অভিনেত্রীরা সংসার সহজে ভাঙেন, এই প্রচলিত অপবাদের বিরুদ্ধে গিয়ে নিজের নারীসত্তাকে প্রমাণ করার একটা তাড়না তৈরি হয়েছিল তাঁর মধ্যে। অর্থাৎ পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, লক্ষ্মী বউ হয়ে উঠতেই হবে, এই চিরাচরিত ধারণাটির বিরুদ্ধে নব্বই দশকের এই অত্যন্ত সফল নায়িকা, মডেল, এবং সেক্স সিম্বলও উঠে দাঁড়াতে পারেননি।
আমিও যখন নিজের জীবনের দিকে ফিরে তাকাই, দেখতে পাই কীভাবে অত্যন্ত প্রগতিশীল মা বাবার স্নেহচ্ছায়ায় থেকেও এই লক্ষ্মী বউয়ের ভবিষ্যৎ রূপটি আমার ও আমাদের মনে দিনের পর দিন ঢুকে গেছে। কীভাবে টলিউড ও বলিউডের প্রায় প্রত্যেকটি সিনেমাই নায়িকাদের আর খলনায়িকাদের একই ধরাবাঁধা প্যাটার্নে বেঁধে দিয়েছে। কীভাবে সুচিত্রা সেন বেশিরভাগ ছবিতেই সুশিক্ষিতা এবং লব্ধপ্রতিষ্ঠ চরিত্র হয়েও শেষমেশ সেবিকার অথবা বুক-ফাটে-তবু-মুখ-ফোটেনা-মেয়ের ভূমিকাতেই অভিনয় করেছেন। সেই শর্তেই শেষ দৃশ্যে আলিঙ্গন ঘটেছে। কীভাবে হিন্দি সিনেমায় নায়িকা প্রেমের বা ‘নায়ক পটানোর’ সময় মিনিস্কার্ট পরেছে আর বিয়ের কথা ঠিক হতেই পারিবারিক পুজোর ঘরে সবার সামনে, মাথার উপর ওড়না তুলে, ফুলের থালা নিয়ে ‘জয় জগদীশ হরে’ গেয়ে উঠেছে। কীভাবে এসব গল্পে একজন মেয়েও বিয়ে ছাড়া, প্রেম ছাড়া, কোনও কাজের স্বপ্ন দেখেনি। কীভাবে তারা কখনই স্বার্থপর হয়নি, স্বার্থকেন্দ্রিক হয়নি, একটুও বেচাল চলেনি। কীভাবে সমস্ত সিনেমাতেই নায়িকার দৈহিক সৌন্দর্য প্রধান হয়ে দাঁড়ায়, আর অন্যান্য গুণ উপরি, হলেও হয় না হলেও হয় হিসেবে থেকে যায়। দিনের পর দিন, সব রূপকথায় মেয়েরা উদ্ধার পাওয়ার জন্য রাজপুত্রের অপেক্ষা করেছে। আর তাদের জীবনের পরম প্রাপ্তি ঘটেছে রাজপুত্রের সঙ্গে বিবাহে। এই বিয়ে কেন্দ্রিক সংস্কৃতিতে বড় হয়ে, আমিও মনে মনে মেয়েদের কেরিয়ারের জায়গাটার শেষে একটা গ্লাস সিলিং খাড়া করে নিয়েছিলাম। আমাদের মনের মধ্যে অনুলোম আর প্রতিলোম বিয়ের ধারণাটা নানান আর্থসামাজিক দিক দিয়ে গেঁথে দেওয়া হয়েছিল। সবচেয়ে সুন্দরী বোনটি আরব্য রজনীতে বা বাংলার উপকথায়, সবসময় রাজকুমারের বউ হতো। বাকিরা কোটালপুত্র, হালুইকর পুত্র, ইত্যাদিদের পেত। গল্পের নায়িকার নিজে কোনও রাজ্য জয় করার কোনও গল্পই আমি কখনও ছোটবেলায় শুনিনি।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
International woman's Day 2023: প্রতি নারীদিবসে ‘আমি নারী আমি পারি’ গোছের শব্দ তির এসে সোশ্যাল মিডিয়া ছ্যাঁদা করে দেবে। ‘আমি পারি’ তাঁদেরই ফলাও করে বলতে হয় যাঁদের ‘পারা’টা স্বীকৃতই নয়।
আমাদের মধ্যে যারা লিঙ্গসাম্যে বিশ্বাসী তারাও হয়তো এই ধরনের কিছু স্টিরিওটাইপের থেকে কখনও বেরোতে পারেনি। ক্রিস্টোফার নোলানের ইনসেপশন সিনেমায় যেমন দেখানো হয়েছে, কীভাবে একটা ছোট্ট ধারণার বীজ মানুষের জীবনে মহীরূহের আকার নিতে পারে, আমাদের অনেকের জীবনেও ওই ধারণাগুলো আত্মবিধ্বংসী অনেক সিদ্ধান্তের রূপ নিয়েছে বারবার। যেসব মানুষ প্রকৃতির নিয়মে স্বভাব-স্বার্থপর, তাদের মনে এইসবের প্রভাব পড়ে কিছু কম। যে কোনও অঙ্ক তারা প্রথমেই নিজের লাভক্ষতির আঙ্গিকে কষে নেয় বলে, সমাজের এইসব ধারণা ও শিক্ষা তাদের অতটা কাবু করে না। আমি আমার প্রজন্মের অনেক অত্যন্ত উচ্চশিক্ষিতা মেয়েকে দেখেছি, যারা ভুগেছে আর ভুগেই চলেছে, কারণ তারা বাধ্য, তারা ভালোমানুষ ছিল। তাই তারা তাত্ত্বিক দিক থেকে লিঙ্গসাম্যে বিশ্বাসী হয়েও এইসব অলিখিত নিয়মগুলোর নিগড়ে জীবন কাটিয়ে ফেলেছে। আমার মতে, ছোটবেলা থেকে এই আপাত অদৃশ্য ধারণাগুলোর বিরুদ্ধে লড়া খুব জরুরি। নইলে অত্যন্ত প্রতিভাশালী মেয়েরাও সব সুযোগ পাওয়া সত্ত্বেও অনেকসময়েই কর্মজীবনে সেই উচ্চতায় উঠতে পারবে না যা তাদের পক্ষে সহজলভ্য ছিল।
কর্মক্ষেত্রে উচ্চাশী মেয়েদের জন্য এমন কিছু প্যাটার্নের উদাহরণ থাকা উচিত যেখানে তার পুরুষ সঙ্গীটি তার থেকে কর্মজীবনে কম সফল। খুব পড়াশোনোয় ভালো মেয়েরও এমন ছেলের প্রেমে পড়তে পারা উচিত যে দেখতে খুব সুন্দর কিন্তু আর কোনও গুণ তেমন নেই। অর্থাৎ মেয়েটি সেই পুরুষকে মূলত তার দৈহিক সৌন্দর্যের জন্য চায়। এরকম সব সম্পর্কে মেইনস্ট্রিম গল্প, উপন্যাস, সিনেমায় সদর্থক ভাবে দেখাতে পারা উচিত। বহুগামী পুরুষ যেমন অন্য অনেক ক্ষেত্রে খুব চরিত্রবান হতে পারেন, মেয়েদের চরিত্রেরও সেই দিকটা তুলে ধরা উচিত। সেবিকা নয় কিন্তু সমাজের সংস্কারমূলক কাজে দক্ষ মহিলা চরিত্রকে রাখা উচিত গল্পে, উপন্যাসে, সিনেমায়, জীবনে। এখন এরকম চরিত্র দেখানো হলেও তাদের সাধারণত সঙ্গীহীন হিসেবে দেখানো হয়। আমার অদীক্ষিত নারীবাদের অবস্থান থেকে আমি বিশ্বাস করি, মেয়েরা এখন অনেক ক্ষেত্রে সমানাধিকার পাচ্ছে এই কারণে নয় যে সমাজটা ভালো হয়ে গেছে। আমি মনে করি না নারীবাদী সমাজের জন্য অপুঁজিবাদী সমাজ প্রয়োজন। কেন মনে করি না তা এই স্বল্প পরিসরে বুঝিয়ে বলা কিছুটা মুশকিল। তবে এইটুকু বলা যেতেই পারে যে, প্রাণীজগতের দিকে তাকালেই বোঝা যায় বিপরীত লিঙ্গের মাধ্যমে প্রজনন করা প্রাণীদের মধ্যে কিছু ক্ষেত্রে নারী পুরুষের শারীরিক ক্ষমতা সমান হলেও, অনেক ক্ষেত্রেই হয় পুরুষ বড়, নয় নারী। যেখানে নারী শরীরে বড় সেখানে মাঝেমাঝেই পুরুষ প্রাণীটি সঙ্গমের পরে তার প্রেমিকার খাদ্য হয়ে যায়। এই প্রাকৃতিক বৈষম্যমূলক গঠনের কিছু গভীর কারণ আছে বলে আমার বিশ্বাস। সেই কারণগুলি নিয়ে এখানে কথা বললে চরম সমালোচনা হবে। তবে, আমার মতে পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে মানুষের সভ্যতার সঙ্গে সঙ্গে গড়ে ওঠা পিতৃতন্ত্র এইসব প্রাকৃতিক গঠনের অপ্রাকৃতিক কিন্তু অমোঘ ‘সাইড এফেক্ট’ ছিল।
এখন যখন প্রযুক্তি আর বিজ্ঞান মানুষের শারীরিক শক্তিকে প্রায় অপ্রাসঙ্গিক ও অপ্রয়োজনীয় করে দিয়েছে, তখন শারীরিক শক্তি আর সামাজিক ক্ষমতার নির্ণায়ক হয়ে থাকেনি। ফলে স্বাভাবিক নিয়মেই মেয়েরা খুব শিগগিরই বহুলাংশে আর্থসামাজিক ক্ষমতার সমান অংশ পাবে। এই বদলের ট্রান্সিশন পর্বে অনেক বহিরঙ্গের বদল ঘটবে। কিন্তু অন্তরঙ্গে এই লিঙ্গসাম্যের বিশ্বাস যতক্ষণ মেয়েদের মধ্যেই না আসবে, ততক্ষণ লড়াই তারা সহজে জিতবে না। তবে যখন সেই সমান জায়গা আসবে, তখন আর এই অ্যান্টি প্যাটার্নেরও দরকার পড়বে না। যখন হৃদয়ে পদ্মটি ফুটবে, তখন লক্ষ্মী আপনিই নিজ নিজ রূপে এসে বসবেন। অলক্ষ্মীর ডাক পড়বে না।








