আভিজাত্য ছেড়ে রাজকুমারী অমৃত কৌর কেন বেছে নিয়েছিলেন গান্ধীর আশ্রমের সাদামাটা জীবন?
Princess Amrit Kaur: ১৯০৮ সালে ভারতে ফেরার পর শিমলার ভাইসরয় লজে এক জমকালো পার্টিতে এক ইংরেজ অফিসার রাজকুমারীকে নাচের প্রস্তাব দেন। আত্মমর্যাদায় আঘাত লাগায় রাজকুমারী সোজা তা প্রত্যাখ্যান করেন। তাতে অপমানিত হয়ে সেই সাহেব অফিসার কটাক্ষ করে বলে বসেন যে ভারতীয়দের স্বাধীনতা দেওয়া একেবারেই উচিত নয়, কারণ তারা নাকি বিগড়ে গিয়েছে। এই একটি ঘটনা অমৃত কৌরের জাতীয়তাবাদী চেতনাকে চরমভাবে উসকে দেয়।
১৮৮৯ সালের এক কনকনে শীতের সকালে লখনউয়ের বিখ্যাত বাদশাহ বাগে জন্ম হয় এক রাজকন্যার। পঞ্জাবের কাপুরথলা রাজপরিবারের কনিষ্ঠতম এবং একমাত্র কন্যা। বাবা স্যার হরনাম সিং যুবক বয়সে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করায় রাজসিংহাসন হাতছাড়া হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু ওউধ এস্টেটের দায়িত্বে থাকায় আভিজাত্য কিংবা সম্পদের কোনো ঘাটতি ছিল না। মা রানি প্রিসিলা ছিলেন এক বাঙালি খ্রিস্টান পরিবারের সন্তান। এই পরিবারে একদিকে যেমন ছিল পাশ্চাত্য শিক্ষার আলো, অন্যদিকে ছিল গোপাল কৃষ্ণ গোখলের মতো জাতীয়তাবাদী নেতাদের নিয়মিত যাতায়াত। ফলে ছোটবেলা থেকেই রাজকন্যার মনটা আর পাঁচটা সাধারণ রাজপরিবারের সন্তানদের চেয়ে একদম আলাদাভাবে গড়ে উঠতে শুরু করে।
সে যুগে রাজকন্যাদের ঘরবন্দি করে রাখার রীতি ছিল। তবে, অমৃত কৌরের পরিবার হেঁটেছিল ঠিক উল্টো পথে। ১৯০২ সালে মাত্র ১১ বছর বয়সে বাবার সঙ্গে এডওয়ার্ড সপ্তমের অভিষেক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ব্রিটেনে যান তিনি। সেখানেই বিখ্যাত 'শেরবোর্ন স্কুল ফর গার্লস'-এ ভর্তি করানো হয় তাঁকে। স্কুলের পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলাও করতেন তিনি। টেনিস থেকে শুরু করে ক্রিকেট, হকি আর ল্যাক্রোস—প্রতিটি খেলাতেই তিনি ছিলেন দুর্দান্ত। পরবর্তীতে অক্সফোর্ড ও রয়্যাল হলোওয়ে কলেজে পড়াশোনা করেন তিনি। পিয়ানো ও বেহালা বাজানোও শিখলেন। সাবলীল হয়ে উঠলেন ফরাসি আর ইতালিয়ান ভাষাতেও।
কিন্তু এই বিলাসবহুল জীবন তাঁর চিন্তাভাবনাকে বাঁধতে পারেনি। ১৯০৮ সালে ভারতে ফেরার পর শিমলার ভাইসরয় লজে এক জমকালো পার্টিতে এক ইংরেজ অফিসার রাজকুমারীকে নাচের প্রস্তাব দেন। আত্মমর্যাদায় আঘাত লাগায় রাজকুমারী সোজা তা প্রত্যাখ্যান করেন। তাতে অপমানিত হয়ে সেই সাহেব অফিসার কটাক্ষ করে বলে বসেন যে ভারতীয়দের স্বাধীনতা দেওয়া একেবারেই উচিত নয়, কারণ তারা নাকি বিগড়ে গিয়েছে। এই একটি ঘটনা অমৃত কৌরের জাতীয়তাবাদী চেতনাকে উসকে দেয়। তিনি প্রথমে ডাক্তারি পড়তে চেয়েছিলেন, কিন্তু পরিবার অনুমতি দেয়নি। তবে দেশের সেবা করার যে তীব্র তাগিদ তাঁর মনে জেগেছিল, তা দমানো সহজ ছিল না। ১৯১৯ সালের জালিয়ানওয়ালাবাগের নির্মম হত্যাযজ্ঞ তাঁর তাগিদ আরও বাড়িয়ে দেয়। রাজকন্যা সিদ্ধান্ত নেন, রাজপ্রাসাদের সুখে ডুবে থাকা আর নয়, এবার সরাসরি ময়দানে নামতে হবে।
রাজকুমারী অমৃত কৌর
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Azad Hind Fauj Treasure: গবেষক এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষিকা ড. পুরবী রায় ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে একটি ভারতীয় গবেষক দলের প্রধান হিসেবে রাশিয়া ও ব্রিটেনের আর্কাইভের গোপন নথি ঘেঁটে গবেষণা শুরু করেন। নিজের এই গবেষণার কাজে ১৯৯৬ সালে তিনি সাক্ষাৎ করেন ব্রিটিশ মিলিটারি ইন্টেলিজেন্সের প্রাক্তন অফিসার কর্নেল হিউ টয়ের সঙ্গে। হিউ টয় নাকি মুখোমুখি কথোপকথনে পুরবী দেবীকে এক বিস্ফোরক কথা বলেন। টয় দাবি করেন যে তিনি নিজ হাতে আজাদ হিন্দ ফৌজের প্রায় ৭২,০০০ কোটি টাকা তৎকালীন ব্রিটিশ গভর্নর, জওহরলাল নেহরু এবং লর্ড মাউন্টব্যাটেনের কাছে হস্তান্তর করেছিলেন, আর তারপর থেকে সেই টাকার আর কোনো হদিস পাওয়া যায়নি।
ঠিক এই সময়েই তাঁর জীবনে এলেন মহাত্মা গান্ধী। বোম্বেতে গান্ধীজির সঙ্গে প্রথম দেখা হতেই রাজকুমারী বুঝে যান, এটিই তাঁর জীবনের আসল পথ। পিতামাতার প্রতি গভীর শ্রদ্ধার কারণে তাঁদের জীবদ্দশায় তিনি পুরোপুরি সংসার ছাড়েননি। তবে ১৯৩০ সালে বাবার মৃত্যুর পর তিনি নিজের অতীত জীবনের সব সুযোগ-সুবিধা পিছনে ফেলে চলে যান গান্ধীজির সাবরমতী আশ্রমে। রাজপ্রাসাদের রেশমি শাড়ি ছেড়ে গায়ে জড়িয়ে নেন খসখসে সাদা খাদির বসন। দীর্ঘ ১৬-১৭ বছর তিনি গান্ধীজির সচিবের দায়িত্ব সামলান। প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা চরকা কাটা, আশ্রমে সবার সঙ্গে বসে সাধারণ ডাল-ভাত খাওয়া আর দেশগঠনের চিঠি লেখা—এই ছিল তাঁর দিনপঞ্জি। গান্ধীজি তাঁকে খুব ভালোবাসতেন। চিঠিতে কখনো মিষ্টি করে ডাকতেন 'ইডিয়ট', কখনো বা 'রেবেল'। আর রাজকন্যাও গান্ধীজির সঙ্গে এক দারুণ চুক্তি করে নিয়েছিলেন—প্রতিদিন এক ঘণ্টা নিয়ম করে চরকা কাটবেন, তার বদলে বিকেলে এক ঘণ্টা টেনিস খেলতে দিতে হবে।
স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর ভূমিকা শুধু আশ্রমে বসে চিঠি লেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ১৯৩০ সালের লবণ সত্যাগ্রহে অংশ নিয়ে তিনি গ্রেপ্তার হন। জেলে বন্দিজীবন কাটান। জেলের দিনগুলিতে তাঁর সঙ্গে থাকত চরকা, ভাগবদ্গীতা আর বাইবেল। ১৯৪২ সালে ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় শিমলার রাজপথে মিছিল করার সময় তিনি মারাত্মক লাঠিচার্জের শিকার হন। তাঁকে গৃহবন্দি করেও রাখা হয়েছিল বহুদিন। তিনি গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন, দেশের নারীদের পরাধীন রেখে স্বাধীনতার অর্থ অসম্পূর্ণ। তাই 'অল ইন্ডিয়া উইমেনস কনফারেন্স' গড়ে তুলে তিনি বাল্যবিবাহ, পর্দা প্রথা আর দেবদাসী প্রথার বিরুদ্ধে কার্যত যুদ্ধ ঘোষণা করেন। পরবর্তীতে সংবিধান সভায় যখন আলোচনা ওঠে, তিনি স্পষ্ট জানান যে নারীদের আলাদা 'সংরক্ষণ' নয়, সর্বজনীন ভোটাধিকার পেলেই তারা নিজেদের যোগ্যতায় জায়গা করে নেবে।

রাজপ্রাসাদের রেশমি শাড়ি ছেড়ে গায়ে জড়িয়ে নেন খসখসে সাদা খাদির বসন
১৯৪৭ সালে দেশ যখন স্বাধীন হলো, প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু তাঁর মন্ত্রিসভায় এমন একজনকে চাইলেন যাঁর সততা ও নিষ্ঠা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। গান্ধীজির পরামর্শে রাজকুমারী অমৃত কৌর হলেন স্বাধীন ভারতের প্রথম স্বাস্থ্যমন্ত্রী—আর নেহরুর পুরো মন্ত্রিসভায় তিনি ছিলেন একমাত্র নারী সদস্য।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Ishwar Chandra Vidyasagar: ইহজাগতিকতা, কাণ্ডজ্ঞান ধুতি-চাদরের বিদ্যাসাগরকে ভদ্রলোকের সীমা থেকে বিমুক্ত করেছিল। স্বাভাবিক সহজ দেহবোধের অধিকারী বিদ্যাসাগর শেষ জীবনে অনায়াসে সাঁওতাল-সমাজের অন্তর্গত হয়েছিলেন।
দায়িত্ব নিয়ে তিনি দেখলেন দেশজুড়ে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কঙ্কালসার চেহারা। চারিদিকে ম্যালেরিয়া, যক্ষ্মা আর কুষ্ঠরোগের হাহাকার; হাসপাতালে বেড নেই, পর্যাপ্ত ডাক্তার নেই। কিন্তু অমৃত কৌর দমে যাওয়ার পাত্রী ছিলেন না। তিনি একাই নেমে পড়লেন লড়াইয়ে। দেশজুড়ে ম্যালেরিয়া ও যক্ষ্মা নির্মূল অভিযান শুরু করলেন, চালু করলেন বিশ্বের সর্ববৃহৎ বিসিজি টিকাদান কর্মসূচি। সে যুগে কুষ্ঠ রোগীদের ছোঁয়াচে ভেবে সমাজ থেকে বের করে দেওয়া হতো। রাজকুমারী নিজে কুষ্ঠ কলোনিতে গিয়ে রোগীদের জড়িয়ে ধরতেন, তাঁদের হাত থেকে চা খেতেন—যাতে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলায়।
তবে তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় কীর্তি ছিল 'এমস' (AIIMS) প্রতিষ্ঠা করা। ভারতে এমন এক আধুনিক চিকিৎসাকেন্দ্র গড়ে তোলার স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, যেখানে আন্তর্জাতিক মানের পড়াশোনা ও গবেষণা হবে। কিন্তু সদ্য স্বাধীন হওয়া দরিদ্র দেশের সরকারের কাছে পর্যাপ্ত তহবিল ছিল না। অমৃত কৌর বিশ্বজুড়ে অনুদান সংগ্রহের কাজে লেগে পড়েন। নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, পশ্চিম জার্মানি থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক ফাউন্ডেশনগুলির দরজায় কড়া নেড়ে সাহায্য নিয়ে আসেন। শুধু অন্যের কাছে চাইলেন তা নয়, শিমলায় তাঁর পৈতৃক রাজপ্রাসাদ 'ম্যানরভিল'—যেখানে একসময় মহাত্মা গান্ধী এসে থাকতেন—তা রাজকুমারী দান করেন হাসপাতালের ডাক্তার ও নার্সদের বিশ্রামের জন্য। ১৯৫৬ সালে সংসদে দাঁড়িয়ে কোনো লিখিত কাগজ ছাড়াই, স্রেফ মনের জোর আর আবেগ দিয়ে বক্তব্য রেখে তিনি 'AIIMS বিল' পাস করিয়ে নেন।

দীর্ঘ ১৬-১৭ বছর তিনি গান্ধীজির সচিবের দায়িত্ব সামলান রাজকুমারী
এরপর একে একে গড়ে তোলেন রাজকুমারী অমৃত কৌর কলেজ অব নার্সিং, চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল, পাটিয়ালা স্পোর্টস ইনস্টিটিউট। ১৯৫০ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় (WHO) প্রথম নারী ও প্রথম এশীয় হিসেবে তিনি সভাপতি নির্বাচিত হন। এছাড়া দীর্ঘ ১৪ বছর ইন্ডিয়ান রেড ক্রস সোসাইটির চেয়ারপারসন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
জীবনভর বিয়ে না করে, কোনো ব্যক্তিগত ধন-সম্পদের আশা না রেখে সম্পূর্ণ জীবনটা তিনি দেশের সেবায় বিলিয়ে দিয়েছিলেন। ১৯৬৪ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি নয়াদিল্লিতে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন রাজকুমারী অমৃত কৌর। তিনি খ্রিস্টান হিসেবে বড় হলেও পরিবারের দীর্ঘদিনের রীতি মেনে যমুনার তীরে শিখ মতে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।
২০২০ সালে বিখ্যাত 'টাইম' (TIME) ম্যাগাজিন ১৯৪৭ সালের জন্য রাজকুমারী অমৃত কৌরকে মরণোত্তর 'উইম্যান অব দ্য ইয়ার' হিসেবে ভূষিত করে। রাজকুমারী অমৃত কৌর আজ কেবল ইতিহাস বইয়ের একটি নাম নন; তিনি সেই দূরদর্শী নারী, যিনি রাজকীয় আভিজাত্য ছেড়ে সাধারণ মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন এবং একটি স্বাধীন ভারতের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার শক্ত ভিত্তি গড়ে দিয়ে গিয়েছেন।







