প্যাকেজিংই আসল! ভারতে কাবাডিকে কীভাবে পুনর্জীবন দিল প্রো কাবাডি লিগ?
Pro Kabaddi League: ভারত এশিয়ান গেমস-সহ বিভিন্ন টুর্নামেন্টে কাবাডিতে এর আগেও অনেক পদক এনেছে। কিন্তু সেই দলের খেলোয়াড়দের নিয়ে কোনদিনও চর্চা হয়নি। চর্চা প্রথম হয় ২০১৪ সালে, প্রো কাবাডি লিগ শুরু হওয়ার পর।

এ কথা অস্বীকার করার জো নেই যে ভারতে সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা হল ক্রিকেট। ভারতবর্ষে ক্রিকেটের যতটা প্রসার হয়েছে ততটা প্রসার অন্য কোনও খেলার হয়েছে বলে মনে হয় না। এক নিঃশ্বাসে দেশের দশ জন প্রথম সারির ক্রিকেটারের নাম বলতে পারা কোনও ব্যাপারই না। কিন্তু যদি দশ জন ফুটবলার বা হকি প্লেয়ারের নাম জিজ্ঞেস করা হয়, বেগ পেতে হতে পারে। কয়েক বছর আগে পর্যন্ত কাবাডির অবস্থাও ছিল খানিকটা এইরকম। তবে বর্তমানে পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন হয়েছে। সঠিকভাবে বলতে গেলে ২০১৪ সালের পর থেকে ভারতবর্ষের নতুন মাত্রা পেয়েছে কাবাডি। এর নেপথ্যে রয়েছে প্রো কাবাডি লিগ। এক কথায় বলতে গেলে, কাবাডির আইপিএল। এদেশে কাবাডির জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির অন্যতম, মূল কারিগর কাবাডির এই কর্পোরেট ভার্সন। অনেকে বলেন, এই খেলা মূলত উত্তর ভারতে বেশি জনপ্রিয়। তবে প্রো কাবাডি লিগ বা পিকেএল প্রমাণ করেছে, এমন দাবি সত্যি নয়। প্রো কাবাডি লিগ সারা ভারতে সমান জনপ্রিয়তা লাভ করেছে।

প্রো কাবাডি লিগের বারোটি টিম
গ্যালারিভর্তি দর্শক। চারদিকে রঙিন আলোর রোশনাই। ড্রেসিংরুম থেকে দৌড়াতে দৌড়াতে ম্যাটে ঢুকলেন খেলোয়াড়েরা। পর্দায় ততক্ষণে ভেসে উঠেছে ওই দেশের জাতীয় পতাকা। ধারাভাষ্যকারের কণ্ঠে টইটম্বুর উচ্ছ্বাস। ম্যাচ শুরুর আগে জায়ান্ট স্ক্রিনে চলে খেলোয়াড়দের ব্যাক কাউন্টিং দশ কাবাডি, নয় কাবাডি... এক কাবাডি, খেল কাবাডি! এবং শুরু হয়ে যায় ৪০ মিনিটের টানটান উত্তেজনাপূর্ণ খেলা। কখনও রেইডার টো টাচ, রানিং হ্যান্ড টাচ বা ডুবকি মেরে বেরিয়ে যাচ্ছেন, তো কখনও আবার ডিফেন্ডার প্রবল বাহুবলে ডবল থাই হোল্ড, ব্যাক হোল্ড কিংবা অ্যাঙ্কেল হোল্ড দিয়ে কুপোকাত করে দিচ্ছেন রেইডারকে। দারুণ ধারাভাষ্য, অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে কাবাডি খেলাকেও যে কত দারুণভাবে উপস্থাপন করা যায়, প্রো কাবাডি লিগ তার জলজ্যান্ত উদাহরণ। যাঁরা কাবাডি কীভাবে খেলা হয় তা ঠিক করে জানতেনই না তাঁরাও এখন ডু অর ডাই রেড, বোনাস পয়েন্ট, সুপার-ট্যাকল, লবি, অলআউটের সুবিধা কী- এইসব নিয়ে আলোচনা করছেন।
প্রো কাবাডি লিগ আসার আগে ভারতের অন্যতম প্রাচীন খেলা কাবাডি প্রায় ক্ষয়িষ্ণু অবস্থায় পৌঁছে গিয়েছিল। ভারত এশিয়ান গেমস-সহ বিভিন্ন টুর্নামেন্টে কাবাডিতে এর আগেও অনেক পদক এনেছে। কিন্তু সেই দলের খেলোয়াড়দের নিয়ে কোনদিনও চর্চা হয়নি। চর্চা প্রথম হয় ২০১৪ সালে, প্রো কাবাডি লিগ শুরু হওয়ার পর। টুর্নামেন্টটি প্রথম বছর ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে দর্শকদের মধ্যে। পিকেএলের প্রথম সিজনে প্রায় ৪৩৫ মিলিয়ন দর্শক দেখেছিলেন এই টুর্নামেন্ট। ২০১৫ সালে সেই সংখ্যা প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ছাড়িয়ে যায়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Nobel Prize in Economics 2022: ব্যাঙ্ক মূলত সঞ্চয়কারী এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে থাকে। অর্থাৎ তারা সঞ্চয়কারীদের যেমন তাৎক্ষণিকভাবে সঞ্চয় ভাঙার সুযোগ দেয়, তেমনই ঋণ গ্রহণকারীদের দীর্ঘমেয়াদি ঋণও দেয়।

২০১৬ কাবাডি বিশ্বকাপ ঘরে তোলে ভারত
ফলস্বরূপ পরের বছর কাবাডি বিশ্বকাপ আয়োজন করে ভারত। সেবার সকলকে হারিয়ে কাবাডি বিশ্বকাপ ঘরে তোলে ভারত। বর্তমানে ক্রিকেট এবং ফুটবলের পর ভারতের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা কাবাডিই। প্রথম সিজনে আটটি দল- ইউ মুম্বা, পটনা পাইরেটস, বেঙ্গল ওয়ারিয়রস, পুনেরি পল্টন, দাবাং দিল্লি কেসি, জয়পুর পিঙ্ক প্যান্থারস, বেঙ্গালুরু বুলস, তেলুগু টাইটানস অংশগ্রহণ করে এই টুর্নামেন্টে। তারপর পঞ্চম সিজনে, পিকেএলে আরও চারটি নতুন দল যোগদান করে। সেগুলি হল- গুজরাট জায়ান্টস, হরিয়ানা স্টিলার্স, তামিল থালাইভাস এবং ইউপি যোদ্ধাস।

অজয় ঠাকুর, অনুপ কুমার, রাহুল চৌধুরী
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
India Post: আজকের ভারতীয় ডাক ব্যবস্থার সূচনা কীভাবে হয়েছিল?
অনুপ কুমার, রাকেশ কুমার, অজয় ঠাকুর, রাহুল চৌধুরী, মঞ্জিত চিল্লার, সন্দীপ নারওয়াল, ধর্মরাজ চেরালাথান, দীপক নিবাস হুড্ডা, প্রদীপ নারওয়ালদের মতো আন্তর্জাতিক মানের খেলোয়াড় যে আছেন আমাদের দেশে, তা জানতেই পারতাম না যদি না এই টুর্নামেন্টটি থাকত। প্রথম কয়েকটি সিজনের পর এই খেলোয়াড়রা রীতিমতো সেলিব্রেটি স্টেটাস পেয়েছেন ভারতে। এছাড়াও তরুণ ভারতীয় প্রতিভাদের বিকাশ এবং আত্মপ্রকাশের জন্যও দুরন্ত একটি প্ল্যাটফর্ম এটি। এর মাধ্যমে নিজের জীবন বদলেছেন অসংখ্য তরুণ ভারতীয় খেলোয়াড়। তাঁরা নিজেদের অজান্তেই অসংখ্য ভারতীয় হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন। পিকেএলের পাশাপাশি ফিউচার কাবাডি হিরোস প্রোগ্রামের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানের স্কাউটরা আগামীর তারকাদের খুঁজে পাচ্ছেন। অনূর্ধ্ব-২২ দলের খেলোয়াড়রা বিভিন্ন বয়সভিত্তিক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন কাবাডির জগতে।

অর্জুন দেশওয়াল, মণিন্দর সিং, নবীন কুমার, প্রদীপ নারওয়াল
এই ইউথ প্রোগ্রামের মাধ্যমেই নবীন কুমার, পবন কুমার শেরাওয়াত, অর্জুন দেশওয়াল, মণিন্দর সিং, শ্রীকান্ত যাদব, সুনীল কুমার, গুমন সিংদের মত বর্তমান প্রজন্মের কাবাডি সুপারস্টাররা উঠে এসেছেন। বলাই বাহুল্য, এই জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি এই খেলোয়াড়দের আর্থিকভাবেও স্বছল করেছে। বর্তমানে তরুণ খেলোয়াড়দের কাছে ক্রিকেটার এবং ফুটবলার হওয়ার পাশাপাশি কাবাডি প্লেয়ার হওয়াও অন্যতম বিকল্প।
পিকেএলের প্রসার বাড়ানোর জন্য স্টার নেটওয়ার্ক ইন্ডিয়াকে কৃতিত্ব দেওয়া দরকার। স্টারের দুর্দান্ত মার্কেটিং স্ট্রাটেজি এবং বিজ্ঞাপনভিত্তিক আয়ের জন্য ব্যাবসায়িক ভাবে প্রো কাবাডি লিগ অত্যন্ত লাভদায়ক একটি টুর্নামেন্ট। কয়েক বছর আগে এই একই মডেলে ভারতে ফুটবল টুর্নামেন্ট, হকি টুর্নামেন্ট এবং বক্সিং টুর্নামেন্টের আয়োজন করা হয়েছিল। যদিও সঠিক মার্কেটিং স্ট্রাটেজি এবং বিজ্ঞাপনের অভাবে বন্ধ হয়ে যায় টুর্নামেন্টগুলি। তবে কাবাডির ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম দেখা গেছে। এর অন্যতম কৃতিত্ব ভারতের ফিল্মস্টারদের। যশ, রানা ডগ্গুভাতি, বিজয় সেতুপতি, কিচ্চা সুদীপ-প্রমুখ দক্ষিণী সুপারস্টারের পাশাপাশি সলমান খান, হৃত্বিক রোশন, আমির খানদের মতো বলিউড তারকাদের দেখা যায় এই টুর্নামেন্টের প্রচারে। নিঃসন্দেহে তাঁদের স্টারডম এই টুর্নামেন্টকে অন্য মাত্রা দিয়েছে। শুধু প্রচারই নয়, ভারতের অনেক প্রথম সারির ফিল্মস্টার কাবাডির এই টিমগুলি কিনেছেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, অভিষেক বচ্চন জয়পুর পিঙ্ক প্যান্থার্সের মালিক, অক্ষয় কুমারের বেঙ্গল ওয়ারিয়র্সে কিছু অংশীদারিত্ব আছে। কয়েক সিজন আগে পর্যন্ত আল্লু অর্জুন, সচিন তেন্ডুলকার এবং রাম চরণ তামিল থালাইভাসের একটি অংশের মালিক ছিলেন এবং বলিউড প্রযোজক রনি স্ক্রিউওয়ালা ইউ মুম্বার মালিক ছিলেন। সম্প্রতি জয়পুর পিঙ্ক প্যান্থার্স একটি ডকুমেন্টারি সিরিজ করেছে অ্যামাজন প্রাইমে।

সব দলের অধিনায়ক
সব মিলিয়ে বলা যায়, প্রো কাবাডি লিগের সাফল্য অনেকগুলি বিষয়ের সংমিশ্রণের ফল। বলার অপেক্ষা রাখে না, উত্তরোত্তর এই টুর্নামেন্টের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাচ্ছে দর্শকদের মধ্যে। আট থেকে আশি সকলে মজে এই খেলায়। একইসঙ্গে এই টুর্নামেন্টে ভবিষ্যতে অনেক তারকাও তৈরি করছে যাঁরা নিজেদের আন্তর্জাতিক স্তরে প্রতিষ্ঠা করার ক্ষমতা রাখেন। আইপিএল ভারতে যেভাবে ক্রিকেটের বিপ্লব ঘটিয়েছিল ঠিক সেইভাবেই ভারতে কাবাডির বিপ্লব ঘটিয়েছে পিকেএল। বর্তমানে পিকেএল-এর জনপ্রিয়তা দেখে আশা করাই যায় যে অদূর ভবিষ্যতেই ভারতবর্ষে ক্রিকেটের সমান জনপ্রিয় হয়ে উঠবে কাবাডি।







