পায়রা, ঘোড়া থেকে পোস্ট অফিস! ভারতের ডাকব‍্যবস্থা যে দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এল

India Post: আজকের ভারতীয় ডাক ব্যবস্থার সূচনা কীভাবে হয়েছিল?

Raktim Dey
৩ মিনিট
পায়রা, ঘোড়া থেকে পোস্ট অফিস! ভারতের ডাকব‍্যবস্থা যে দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এল

নিউ দিল্লির জাতীয় রেল জাদুঘরে একটি চিঠি দেখা যায়। পরাধীন ভারতের রেল আধিকারিকদের উদ্দেশ্যে এক বাঙালির লেখা সেই চিঠির শুরুটা ছিল এইরকম-

ডিয়ার স্যার,

আই অ্যাম এরাইভ বাই প্যাসেঞ্জার ট্রেন আহমেদপুর অ্যান্ড মাই বেলি ইজ টু মাচ সোয়েলিং উইথ জ্যাকফ্রুট।

বিপদে পড়ে লেখা সেই চিঠির ভাঙা ভাঙা ইংরেজি ভাষা পড়লে অনেকেই মুচকি হেসে ফেলে। বহু মানুষ ছাপা অক্ষরে এবং তার থেকেও অনেক বেশি মানুষ নেটমাধ্যমে এই চিঠি পড়েছেন। অখিলচন্দ্র সেনের লেখা এই চিঠি আপাতদৃষ্টিতে হাস্যকর মনে হয়। যদিও আসলে এই চিঠি এক বিশাল পরিবর্তন এনেছিল। এই চিঠির ফলেই ট্রেনের মধ্যে সব শ্রেণির যাত্রীদের জন্য শৌচাগার নির্মাণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। নিজের অসুবিধা এবং অভিমান একটা কাগজের টুকরোতে লিখে অখিলচন্দ্র সেন যাত্রী স্বাচ্ছন্দ্যর একটা নতুন দিক খুলে দিয়েছিলেন।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
স্টিম ইঞ্জিন নয়, বরং বলদ দিয়েই শুরু হয়েছিল বাংলায় ট্রেন চলাচল

Darjeeling Mail: পরাধীন ভারতে কিন্তু দার্জিলিং মেলের আগেও কলকাতা থেকে দার্জিলিং পর্যন্ত চালানো হতো একটি ট্রেন। আর সবথেকে আশ্চর্যের বিষয়টি হলো, ট্রেনটি চলতো স্টিম ইঞ্জিন দিয়ে না বরং বলদ ও হাতি দিয়ে।

অখিলচন্দ্রর সেই চিঠি

প্রাচীন ভারতে সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যর সময় প্রথম সংগঠিত ডাক ব্যবস্থার নিদর্শন পাওয়া যায়। সেই সময়ে পায়রার পায়ে ছোট কাগজের টুকরোতে দরকারি তথ্য বিভিন্ন এলাকায় আদানপ্রদান করা হতো। সম্রাট অশোকের শাসনকালেও এই পদ্ধতিতে তথ্য আদানপ্রদান করা হতো। পরবর্তীকালে বিভিন্ন শাসকের আমলে ঘোড়ার পিঠে অথবা পায়ে হেঁটে চিঠি পৌঁছনো ডাকবাহকদের কথা জানা যায়। সেই সময়ে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ডাকবাহকরা দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে চিঠি পৌঁছে দিত।

১৫৪১ সালে শের শাহ বাংলা থেকে সিন্ধু প্রদেশ অবধি প্রায় দু'হাজার মাইল দূরত্বের মধ্যে ঘোড়ার পিঠে ডাক পরিবহণের সূচনা করেছিলেন। এই সময়ের ডাকব্যবস্থার একটি নেতিবাচক দিক ছিল পোস্ট অফিসের অভাব। ১৭৭৪ সালে ওয়ারেন হেস্টিংস ভারতীয় ডাক ব্যবস্থা সংগঠিত করার উদ্দেশ্যে সেই সময়ের বড় শহরগুলিতে পোস্ট অফিস তৈরির নির্দেশ দিয়েছিলেন। তাঁর নির্দেশ অনুসারে, ১৭৭৪ সালের মার্চ মাসের ৩১ তারিখ কলকাতায় প্রথম পোস্ট অফিস তৈরি হয়েছিল। কলকাতার মতোই ১৭৮৬ সালে মাদ্রাজ (বর্তমানে চেন্নাই) এবং ১৭৯৪ সালে বোম্বাই (বর্তমানে মুম্বই) শহরে পোস্ট অফিস স্থাপিত হয়। এইভাবেই আজকের ভারতীয় ডাক ব্যবস্থার সূচনা হয়েছিল। ক্রমে ১৮৭৯-'৮০ সালে পোস্টকার্ড এবং মানি অর্ডারের প্রচলন শুরু হয়।

ডাকব্যবস্থার উন্নতির সঙ্গে চিঠি মানুষের জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হয়ে উঠেছিল। গুরুত্বপূর্ণ কাজ থেকে কুশল বিনিময়, পরিবারের কাছে টাকা পাঠানো থেকে লুকিয়ে প্রেম, সর্বত্রই চিঠির আনাগোনা শুরু হয়েছিল। ১৮৮৬ সাল নাগাদ স্ট্যাম্প বিক্রি শুরু হয়েছিল এবং একই সঙ্গে বহু মানুষ এক নতুন শখ খুঁজে পেয়েছিল। বিভিন্ন রকমের, বিশেষত দুষ্প্রাপ্য স্ট্যাম্প জোগাড় করা এবং জমানোর শখ। এই স্ট্যাম্প জমানোর শখ মানুষের রোজকার জীবন থেকে এগিয়ে গিয়ে সাহিত্যের পাতায় জায়গা করে নিয়েছিল। বহু বাংলা গল্প বিশেষত, গোয়েন্দা গল্পে স্ট্যাম্প খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বিভিন্ন এলাকায় চিঠি পাঠানোর জন্য রেলপথ ব্যবহার করার ফলে ডাকব্যবস্থা উন্নততর হয়ে উঠেছিল। স্বাধীনতার পরে দেশের সঙ্গে ডাকব্যবস্থা এবং পোস্ট অফিসের বিভিন্ন পরিবর্তন শুরু হয়েছিল। ১৯৮৬ সালে স্পিড পোস্টের প্রচলন শুরু হয়েছিল। বর্তমানে পোস্ট অফিসের যে গুটিকয়েক পরিষেবা সাধারণ মানুষ গ্রহণ করে, তার মধ্যে স্পিড পোস্ট অন্যতম।

বর্তমান সময় বহু ক্ষেত্রে ডাকব্যবস্থা এবং পোস্ট অফিসের বেহাল দশার কথা বিভিন্ন মাধ্যমে শুনতে পাওয়া যায়। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে চেষ্টা করলেও ডাক ব্যবস্থা কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে। কাগজের চিঠির জায়গা নিয়েছে ইমেইল। তার গতির সঙ্গে আমাদের কাগজের চিঠি এঁটে উঠতে পারেনি। কুশল বিনিময় করার জন্য রয়েছে মুঠোফোন। কয়েকটা বোতাম টিপে মন খুলে কথা বলা সম্ভব, তাই পোস্টকার্ডের সীমাবদ্ধ জায়গায় লিখতে মানুষ নারাজ। প্রেম-আলাপের জন্য আজ হাতে লেখা চিঠি একপ্রকার বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে। চিঠি পাঠানোর ঝামেলা সহ্য না করে, ধরা পড়ার ভয় না করে মুঠোফোনের মাধ্যমে নিশ্চিন্তে মনের কথা বলে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। কিছু হাতে গোনা মানুষ ছাড়া বেশিরভাগ মানুষের শখ করে জমানো ডাক টিকিটের অ্যালবামে ধুলো জমেছে। রাস্তার ধারের ডাকবাক্স সময়ের সঙ্গে বিদায় নিয়েছে। তার মধ্যে কখনও নতুন পরিকল্পনা এনে, আবার কখনও গঙ্গাজল বেচে পোস্ট অফিস বেঁচে থাকার চেষ্টা করছে। তারই মাঝে প্রতি বছর চুপিসারে প্রায় লোকচক্ষুর আড়ালে ৯ অক্টোবর 'বিশ্ব ডাক দিবস' এবং সেই উপলক্ষে ১০ অক্টোবর জাতীয় ডাক দিবস পালিত হয়।

লিখেছেন
Raktim Dey
Raktim Dey
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

এসআইআর বির্তক: যে খবর স্বাভাবিক হওয়ার কথা, সেটাই আজ বিস্ময়

Gyanesh Kumar, SIR and Election Commission: এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে আপত্তি থাকা সত্ত্বেও কেন প্রক্রিয়া চালানো হল? জ্ঞানেশ কুমার কীভাবে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হলেন? ২০২৩ সালে আইন বদলে প্রধান বিচারপতিকে নির্বাচন কমিশনার বাছাইয়ের কমিটি থেকে সরানো হল কেন? এতদিন এই প্রশ্নগুলি গণমাধ্যম তুলল না কেন?

এসআইআর: বিশুদ্ধ ভোটার তালিকা তৈরির নামে যা পেল বাঙালি

Real Effect of SIR in bengal: ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গে ৯১ লক্ষ ভোটার বাদ যান, যারা ছিলেন মোট ভোটারের ১২ শতাংশ। যাদের মধ্যে ৩৪% ছিলেন মুসলিম , নারীরা সংখ্যায় ছিলেন ৬১.৮%, এছাড়াও ছিলেন, মতুয়া ও রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষেরা, যারা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। ফর্ম-৭-এর অপব্যবহার, অ্যালগরিদম-নির্ভর যাচাই, ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনালে ১ লক্ষ মামলা, সব মিলিয়ে ২০২৬-এর ভোটে যোগ্য নাগরিকরাও বাদ পড়েছিলেন।

‘সব নির্বাচনেই কারচুপি’, কেন এমন দাবি রাহুল গান্ধীর?

Rahul Gandhi election rigging claim: রাহুল গান্ধী কেন দাবি করলেন, ভারতের সব নির্বাচনেই কারচুপি হচ্ছে? নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে কী প্রশ্ন তুলেছেন তিনি? সরকারবিরোধী মনোভাব বা অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি কীভাবে ভোটের রাজনীতিতে কাজ করে? তাঁর অভিযোগের পক্ষে কী কী তথ্য ও প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে?

সিজেপির তিন দাবি, জ্ঞানেশ কুমার না সরলে ফের বড় আন্দোলন

Election Commission of India: নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতি এবং ২০২৩ সালের আইনের বৈধতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানিয়েছে সিজেপি। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, নির্বাচন প্রক্রিয়া স্থগিত করা এবং ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত আইন প্রত্যাহার।

থানার গেটেই মারধর প্রাক্তন আইপিএস হুমায়ুন কবীরকে, সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ?

Humayun Kabir: ঘটনার পর এখনও পর্যন্ত তিনি কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেননি বলেও জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তখন অভিযোগ করা সম্ভব হয়নি। সুস্থ হয়ে তিনি লিখিত অভিযোগ করবেন।

দুই কমিশনারের আপত্তিতে ফের আলোচনায় সীমা খান্না, কমিশনে ঠিক কী দায়িত্ব তাঁর?

Seema Khanna and ECINet: ভোটার তালিকা ও ইসিআইনেট (ECINet) নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তিতে সামনে এসেছে আইটি বিভাগের ভূমিকা এবং ডিরেক্টর জেনারেল (IT) সীমা খান্নার নাম। কে এই সীমা খান্না? নির্বাচন কমিশনে তাঁর দায়িত্ব কী? ভোটার তালিকা পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা নিয়েই বা কেন উঠছে প্রশ্ন?

সরকারকে ৪ দিনের সময়সীমা বেধে দিল চা-শ্রমিকরা, ঠিক কী কী দাবি?

Dooars tea workers: ২২ সেপ্টেম্বর বকেয়া মজুরি ও অন্যান্য পাওনা মেটানোর দাবিতে হাঁটাপাড়া, ধুমচিপাড়া ও গারগান্ডার চা-শ্রমিকরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পদযাত্রা শুরু করেন। একই দিনে তোর্সার প্রস্তাবিত ল্যান্ড পোর্ট প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষও জমি ও অধিকার রক্ষার দাবিতে পদযাত্রা করেন। দুই পদযাত্রাই পুলিশ আটকে দেয়।

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।