যোগ্যরা থেকেছে আড়ালে! 'অপাত্রে' দান হয়েছিল যে নোবেল পুরস্কারগুলি
Nobel Prize 2022: কারও কারও নোবেল পাওয়া অযোগ্যদের পুরস্কার দেওয়া বা অপাত্রে দান বলে বিবেচিত হয়েছে।

সম্প্রতি শেষ হয়েছে নোবেল প্রদান অনুষ্ঠান। বিশ্বের সবচেয়ে সম্মানীয় পুরস্কার হিসেবে ধরা হয় নোবেলকে। বিশ্বজুড়ে যেসব বিজ্ঞানী, চিকিৎসা-বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক, অর্থনীতিবিদ এবং সমাজকর্মী সমগ্র মানবজাতির কল্যাণ এবং বিশ্বজুড়ে শান্তি স্থাপনের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন, তাদের এই পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, সাহিত্য এবং অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়ার জন্য রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি নিজস্ব সদস্যদের নিয়েই বিভিন্ন কমিটি গঠন করে। কারোলিন্সকাইন্সটিটুটেট নামে একটি সুইডিশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় শারীরতত্ত্ব এবং চিকিৎসা-বিজ্ঞানের বেলায় এই কাজটি করে থাকে।
১৯০১ সাল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত অ্যালবার্ট আইনস্টাইন, মেরি কুরি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নেলসন ম্যান্ডেলা, মাদার টেরেসা, আন্তর্জাতিক রেড ক্রস সোসাইটির মতো মোট ৯৫৪ জন বিশ্ববন্দিত গুণী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে। তবে প্রতি বছর নোবেল প্রাপকের নাম ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে দু'টি বিষয় নিয়ে বিতর্ক হয়। প্রথম বিতর্ক, কাকে দেওয়া হলো না, অথচ তাঁর প্রাপ্য ছিল তা। দ্বিতীয় বিতর্ক, যাঁকে দেওয়া হলো, সে কতটা যোগ্য। এমন বহু ক্ষেত্রেই দেখা গিয়েছে, কারও কারও নোবেল পাওয়া অযোগ্যদের পুরস্কার দেওয়া বা অপাত্রে দান বলে বিবেচিত হয়েছে। বহুবার এমন হয়েছে যে, একই বিভাগে মনোনয়ন থাকা সত্ত্বেও এমন ব্যক্তিকে নোবেল দেওয়া হয়েছে, যাঁর চেয়ে যোগ্য ব্যক্তি তালিকায় ছিলেন। তাই নিয়ে বিশ্বজুড়ে বিস্তর বিতর্ক চলেছে বহু বছর। প্রতি বছর নোবেল দেওয়ার সময় এই বিতর্ক নতুন করে ফিরে আসে। চলুন দেখা যাক, এরকমই পাঁচটি ঘটনার কথা যখন নোবেল অপাত্রে দান করা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
জোহানেস ফিবিগার (চিকিৎসা-বিজ্ঞান, ১৯২৬)
যুগান্তকারী কিছু আবিষ্কার হলে বা কোনও বিজ্ঞানী কোনও বিষয়ের ওপর যুগান্তকারী গবেষণা করলে তাঁকে যতটা সম্ভব তাড়াতাড়ি নোবেল দেওয়ার চেষ্টা করা হতো কমিটির পক্ষ থেকে। আলফ্রেড নোবেলের এরকমই নির্দেশ ছিল। কিন্তু এই নির্দেশ মেনে চলার ফলেই পরবর্তীকালে ব্যাপক সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয়েছিল নোবেল কমিটিকে। ১৯২৬ সালে এককভাবে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পান বিজ্ঞানী জোহানেস ফিবিগার। ইঁদুরের ক্যানসারের কারণ আবিষ্কার করার জন্য এই পুরস্কার পান তিনি। নিজের গবেষণাপত্রে ড. ফিবিগার দাবি করেছিলেন, ইঁদুরের ক্যানসারের কারণ স্পিরোপ্টেরা কার্সিনোমা (Spiroptera carcinoma) নামের বিশেষ ধরনের পরজীবী কীট। কিন্তু পরবর্তীকালে দেখা যায়, ফিবিগারের দাবি সম্পূর্ণ ভুল। মূলত ভিটামিন এ-র অভাবে ইঁদুরদের ক্যানসার হয়। ঘটনাচক্রে ওই বছর এই একই বিষয়ের ওপর গবেষণা করছিলেন বিজ্ঞানী ইয়ামাগিওয়া কাটসুসাবুরো। তিনি হয়তো নোবেল প্রাইজ পাননি কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁর গবেষণাই সঠিক বলে প্রমাণিত হয়েছিল। তিনিই প্রমাণ করেছিলেন, কয়লার টারের জন্য ক্যানসার হয়।
এনরিকো ফার্মি (পদার্থবিদ্যা, ১৯৩৮)
১৯৩৮ সালে পরমাণু-বিজ্ঞানে মৌলিক আবিষ্কারের জন্য নোবেল পুরস্কার পান এনরিকো ফার্মি। ১৯৩৪-এ ফার্মি একটি প্রয়োগ করেছিলেন, যার ফলে তিনি নোবেল পুরস্কার পান। তিনি দেখিয়েছিলেন কীভাবে নিউট্রনের সঙ্গে ইউরেনিয়াম পরমাণুগুলির বোম্বার্ডিং করিয়ে নতুন উপাদান তৈরি করা যেতে পারে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তিনি দু'টি নতুন উপাদান তৈরি করেন, যাদের নাম ছিল অসোনিয়াম এবং হেসপেরিয়াম। এই নতুন উপাদানদু'টিকে সাময়িকভাবে ৯৩ এবং ৯৪ পারমাণবিক সংখ্যা দেওয়া হবে। তবে তিনি নতুন কোনও মৌল আবিষ্কার করতে পারেননি। নিজের অজান্তেই নিউক্লিয়ার ফিশন পদ্ধতির মাধ্যমে ভারী ইউরেনিয়াম মৌলকে ভেঙে হালকা কয়েকটি উপাদানে রূপান্তরিত করে দিয়েছিলেন। তিনি যে উপাদানগুলি খুঁজে পেয়েছিলেন, তা বেরিয়াম এবং কয়েকটি সাধারণ মৌলের মিশ্রণে তৈরি ছিল। পরবর্তী সময়ে নেপচুনিয়াম এবং প্লুটোনিয়াম মৌল আবিষ্কার হলে তাদের যথাক্রমে ৯৩ এবং ৯৪ পারমাণবিক সংখ্যা দেওয়া হয়েছিল। আসলে ফার্মি নিজের গবেষণার মাধ্যমে যে দাবি করেছিলেন, তাঁর সপক্ষে প্রমাণ দিতে পারেননি। কেননা, নিউক্লিয়ার ফিশন সঠিকভাবে ১৯৪৪ সালে আবিষ্কৃত হয় অটো হান দ্বারা। সেহেতু অনেকে মনে করেন, ফার্মিকে ওই প্রয়োগের জন্য নোবেল পুরস্কার দেওয়া উচিত হয়নি।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Click Chemistry: কোশটির আলো বিকিরণ করার ক্ষমতা তৈরি হওয়ায় সেটিকে প্রাণীদেহে মার্কার বা রিপোর্টার কোশ হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
আন্তোনিও ইগাস মোনিজ (চিকিৎসা-বিজ্ঞান, ১৯৩৬)
১৯৩৬ সালে, পর্তুগিজ নিউরোলজিস্ট ইগাস মোনিজ একটি অস্ত্রোপচারের পদ্ধতি প্রণয়ন করেন, যার মাধ্যমে প্রি-ফ্রন্টাল লিউকোটোমির চিকিৎসা হতো। পরবর্তী সময়ে এই চিকিৎসা-পদ্ধতি স্কিৎজোফ্রেনিয়ার চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। এই অপারেশন পদ্ধতিকে বলা হয় লোবোটমি। এই পদ্ধতিতে মস্তিষ্কের প্রি-ফন্টাল অঞ্চলের সঙ্গে মস্তিষ্কের অন্যান্য অংশের মধ্যে সংযোগ কেটে দেওয়া হতো। তিন, চার এবং পাঁচের দশকে এই পদ্ধতি এতই জনপ্রিয় হয় যে, ১৯৪৯ সালে নোবেল পুরস্কার পান পূর্বতন রাজনীতিবিদ এবং বর্তমান ডাক্তার আন্তোনিও ইগাস মোনিজ। কিন্তু ছয়ের দশকে কাউন্সেলিং এবং বিভিন্ন থেরাপির মাধ্যমে মানসিক রোগের চিকিৎসা হওয়া শুরু হলে এই লোবোটমির সমালোচনা শুরু হয় বিভিন্ন মহলে। এই লোবোটমি পদ্ধতিতে মাত্র ৪১ শতাংশ রোগী সুস্থ হতো, বাকিরা হয় আগের মতো থাকত, নয় মারা যেত। অপর পক্ষে কাউন্সেলিং ও থেরাপির মাধ্যমে সুস্থতার হার বেড়ে হলো ৬৫ শতাংশ। উপরন্তু ড. মোনিজ নিজে কখনও ছুরি-কাঁচি হাতে নিয়ে অপারেশন করেননি। তিনি শুধুমাত্র নির্দেশ দিতেন, উপস্থিত অন্যান্য ডাক্তাররা অপারেশন করতেন। এহেন সব তথ্য সামনে আসার পর প্রশ্ন উঠেই যায়, কেন তাঁকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হল।
জেমস ওয়াটসন, ফ্রান্সিস ক্রিক এবং মরিস উইলকিন্স (চিকিৎসা-বিজ্ঞান, ১৯৬২)
১৯৭৪ সালে নোবেল কমিটি নিয়ম করে, একটি নোবেল পুরস্কার সর্বোচ্চ তিন জন মিলে ভাগ করে নিতে পারেন। কিন্তু এর আগে ১৯৬২ সালে জেমস ওয়াটসন, ফ্রান্সিস ক্রিক এবং মরিস উইলকিন্স- এই তিনজন মিলে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন ডিএনএ স্ট্রাকচার আবিষ্কার করার জন্য। ঘটনাচক্রে ওই রিসার্চ টিমে শুধু এই তিনজনই কিন্তু ছিলেন না, ছিলেন আরও অনেকে। কিন্তু শুধুমাত্র এই তিনজনকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। ওয়াটসন, ক্রিক এবং উইলকিন্স নিজেদের গবেষণা এগোতেই পারতেন না, যদি না ড. রোজালিন ফ্র্যাঙ্কলিন নিজের এক্সরে-র মাধ্যমে ডিএনএ-র ডবল হেলিক্স স্ট্রাকচার আবিষ্কার করতেন। কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণভাবে নিজেদের গবেষণাপত্র জমা দেওয়ার সময় ড. রোজালিন ফ্র্যাঙ্কলিনের নাম সযত্নে এড়িয়ে যান তাঁরা। এমনকী, ওয়াটসন নিজের বই 'দ্য ডবল হেলিক্স'-এ ড. রোজালিন ফ্র্যাঙ্কলিনের নামে বেশ কিছু কটাক্ষও করেন। তবে এই সম্পূর্ণ তথ্যটি সামনে আসার পর প্রশ্নের মুখে পড়ে নোবেল কমিটি। ওই রিসার্চ টিমে অন্তর্ভুক্ত অন্যান্য বিজ্ঞানীদের দাবি ছিল ওই নোবেল কমিটি ঠিক করে অনুসন্ধান না করেই নোবেল দিয়ে দেয় ওই তিন বৈজ্ঞানিককে। এক্ষেত্রে জানিয়ে রাখি, নোবেলের ক্ষেত্রে দু'টি নিয়ম আছে, প্রথমত কাউকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হলে সেই পুরস্কার ফেরত নেওয়া যায় না। দ্বিতীয়ত, কোনও ব্যক্তিকে মরণোত্তর নোবেল পুরস্কার দেওয়া যায় না। অনেকে মনে করেন, শুধুমাত্র একজন মহিলা বলে ড. রোজালিন ফ্র্যাঙ্কলিনকে নোবেল দেওয়া হয়নি। যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও লিঙ্গবৈষম্যর শিকার হন তিনি।

ড. রোজালিন ফ্র্যাঙ্কলিন
বব ডিলান (সাহিত্য, ২০১৬)
এই তালিকায় সর্বশেষ নামটি হলো বব ডিলানের। ২০১৬ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান মার্কিন গায়ক ও গীতিকার বব ডিলান। ‘আমেরিকার মহান সংগীত-ঐতিহ্যে নতুন কাব্যিক অভিব্যক্তি সৃষ্টির জন্য’ ডিলানকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছে বলে জানায় নোবেল কমিটি। এখানেই ওঠে বিতর্ক। বব ডিলানের গানের লিরিক্স আর যাই হোক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, পাবলো নেরুদা বা টিএস এলিয়টের কবিতার মতো নয়- এমন অনুযোগ তোলেন অনেকেই।

বব ডিলান
নিঃসন্দেহে ‘এ হার্ড রেইনস আ-গনা ফল’, ‘ব্লোইং ইন দ্য উইন্ড’, ‘জাস্ট লাইক এ ওমেন’-এর মতো গানগুলি প্রজন্মের পর প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণা, কিন্তু সেগুলি তো সাহিত্য নয়। এক্ষেত্রে জানিয়ে রাখা যেতে পারে, সাহিত্যে নোবেল দেওয়া হলেও সংগীত বা অভিনয়ের জন্য নোবেল দেওয়া হয় না। এই প্রসঙ্গে নোবেল কমিটির প্রতি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ফরাসি ঔপন্যাসিক পিয়ের অ্যাসোউলিন বলেছিলেন যে, নোবেল কমিটির সিদ্ধান্ত সাহিত্যিকদের প্রতি অবমাননাকর। এর পাল্টা যুক্তি দিয়েছিলেন সলমন রুশদি। তিনি জানিয়েছিলেন, সংগীত এবং সাহিত্য পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শুরু থেকেই, সুতরাং বব ডিলানকে সাহিত্যকর্মের জন্য পুরস্কার দেওয়া কোনও ভুল সিদ্ধান্ত নয়। এভাবেই সেই সময় বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল সাহিত্যিক মহল। এই আবহে সেবার বিতর্ক বাড়িয়ে স্টকহোমে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন না বলে জানিয়ে দেন ডিলান। ডিলানের পরিবর্তে তাঁর হয়ে পুরস্কার গ্রহণ করেন সুইডেনের মার্কিন রাষ্ট্রদূত।








