গোমূত্র কি সত্যিই রোগ সারাতে পারে? কেন্দ্রের ৯৮ কোটির গবেষণা কী বলছে?
Cow Urine Benefits: গোমূত্র ও গোবরের বৈজ্ঞানিক ব্যবহার খুঁজতে ২০২০ সালে ৯৮ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছিল কেন্দ্র সরকার। ছয় বছর পর আইআইটি-সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গবেষণার ফল প্রকাশিত হতে শুরু করেছে। এই ‘কাউপ্যাথি’ প্রকল্প কি সত্যিই গরু-জাত পণ্যের উপকারিতা প্রমাণ করতে পেরেছে, নাকি বিতর্ক আরও বাড়িয়েছে?
ভারতে ধর্মীয় বিশ্বাস, কৃষি অর্থনীতি এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে গরুর সম্পর্ক বহু পুরনো। কিন্তু গত কয়েক বছরে গরুকে ঘিরে বৈজ্ঞানিক গবেষণার ক্ষেত্রেও বড় বিনিয়োগ করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। সেই উদ্যোগের নাম ছিল ‘কাউপ্যাথি’ বা গরু-ভিত্তিক চিকিৎসা গবেষণা। ২০২০ সালে এই প্রকল্পের জন্য প্রায় ৯৮ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছিল কেন্দ্র। ছয় বছর পর সেই গবেষণার ফলাফল সামনে আসতে শুরু করেছে। দেশের বিভিন্ন আইআইটি এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানীরা একাধিক গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন। কিন্তু সেই ফলাফল কি সত্যিই গোমূত্র বা গরু-জাত পণ্যের চিকিৎসাগত ক্ষমতার প্রমাণ দিল? নাকি এখনও অনেক প্রশ্নের উত্তর মেলেনি?
২০২০ সালে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রকের অধীনস্থ সরকারি সংস্থা ‘সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং রিসার্চ বোর্ড’ (SERB) 'Scientific Utilisation through Research Augmentation Prime Products from Indigenous Cows' বা SUTRA-PIC India নামে একটি কর্মসূচি চালু করে। এর মূল লক্ষ্য ছিল দেশি গরুর দুধ, গোবর, গোমূত্র এবং অন্যান্য উপাদানের সম্ভাব্য বৈজ্ঞানিক ব্যবহার খুঁজে দেখা।
এই প্রকল্প ঘোষণার সময় থেকেই বিতর্ক শুরু হয়। সমালোচকদের একাংশের অভিযোগ ছিল, সরকার বৈজ্ঞানিক গবেষণার নামে এমন একটি ক্ষেত্রকে উৎসাহ দিচ্ছে যার পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই। অন্যদিকে সরকারের যুক্তি ছিল, গবেষণা ছাড়া কোনো বিষয়কে বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই করা সম্ভব নয়। তাই গরু-জাত পণ্যের সম্ভাব্য গুণাগুণ থাকলে তা গবেষণার মাধ্যমেই সামনে আসা উচিত।
এই কর্মসূচির আওতায় দেশের বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে অনুদান দেওয়া হয়। মোট ৭৩টি প্রকল্পে প্রায় ৯৮ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়। এর মধ্যে ছিল বিভিন্ন আইআইটি, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণা সংস্থা।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
BJP and Science : কোভিড ঠেকাতে গো-মূত্র পানের দাওয়াই দেয় বিজেপি, আবার সেই বিজেপিই ভ্যাকসিনের গর্ব করে মোদিজির ঢালাও প্রশংসা করে।
সাম্প্রতিক সময়ে সেই প্রকল্পগুলির বেশ কয়েকটির গবেষণাপত্র আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। আইআইটি দিল্লি, আইআইটি বোম্বে, আইআইটি মাদ্রাজ-সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গবেষকরা নানা ধরনের ফলাফল তুলে ধরেছেন।
একটি গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, দেশি গরুর গোমূত্রে এমন কিছু জৈব রাসায়নিক উপাদান রয়েছে যা কিছু ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি রোধ করতে পারে। অন্য একটি গবেষণায় দেখা হয়েছে গোমূত্র থেকে তৈরি বিশেষ যৌগ উদ্ভিদের বৃদ্ধি বা কৃষিক্ষেত্রে কতটা কার্যকর হতে পারে।
কিছু গবেষণায় গোবর-ভিত্তিক জৈব পদার্থ ব্যবহার করে পরিবেশবান্ধব নির্মাণসামগ্রী বা বিকল্প উপকরণ তৈরির সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হয়েছে। অর্থাৎ সব গবেষণাই যে সরাসরি চিকিৎসাবিজ্ঞানের সঙ্গে সম্পর্কিত, তা নয়। অনেক ক্ষেত্রেই কৃষি, পরিবেশ এবং বায়োম্যাটেরিয়ালস সংক্রান্ত কাজও হয়েছে।
তবে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে চিকিৎসা সংক্রান্ত গবেষণাগুলি। কারণ দীর্ঘদিন ধরেই কিছু গোষ্ঠী দাবি করে এসেছে যে গোমূত্রের নানা রোগ সারানোর ক্ষমতা রয়েছে। বিজ্ঞানীরা সেই দাবিগুলির বৈজ্ঞানিক ভিত্তি খুঁজে দেখার চেষ্টা করেছেন।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Cattle Smuggling: সিবিআই সূত্রে খবর, এই পাচারচক্রের জাল সারা দেশে বিস্তৃত।
গবেষণাপত্রগুলিতে কিছু ইতিবাচক ফলাফলের উল্লেখ থাকলেও বিজ্ঞানীরা নিজেরাই সতর্ক ভাষা ব্যবহার করেছেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পরীক্ষাগুলি ল্যাবরেটরির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। অর্থাৎ কোষ, রাসায়নিক উপাদান বা প্রাণীর উপর পরীক্ষা চালানো হয়েছে। মানুষের উপর বৃহৎ পরিসরের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল এখনও হয়নি।
উদাহরণস্বরূপ, IIT-BHU-এর গবেষণায় গোমূত্রের রাসায়নিক উপাদান (metabolomic profile) চিহ্নিত করা হয়েছে এবং কিছু শিল্পক্ষেত্রে সম্ভাব্য ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সেই গবেষণা নিজেই কোনো রোগ নিরাময়ের প্রমাণ দেয়নি।
এই কারণেই বিশেষজ্ঞদের একাংশ বলছেন, ল্যাবরেটরিতে কোনো পদার্থের সম্ভাব্য কার্যকারিতা দেখা গেলেই তাকে ওষুধ বলা যায় না। চিকিৎসা বিজ্ঞানে কোনো উপাদানকে গ্রহণযোগ্য ওষুধ হিসেবে স্বীকৃতি পেতে হলে বহু ধাপের পরীক্ষা প্রয়োজন। নিরাপত্তা, কার্যকারিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার পরেই তা চিকিৎসায় ব্যবহার করা যায়।
সমালোচকদের প্রশ্ন, ৯৮ কোটি টাকার সরকারি অর্থ ব্যয়ের তুলনায় গবেষণার ফল কতটা গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের মতে, দেশে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও মৌলিক বিজ্ঞান গবেষণার আরও বহু ক্ষেত্র রয়েছে যেখানে অর্থের প্রয়োজন ছিল। তাই এই বিনিয়োগের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
তবে প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত বিজ্ঞানীদের বক্তব্য ভিন্ন। তাঁদের মতে, গবেষণার উদ্দেশ্য কোনো পূর্বনির্ধারিত বিশ্বাসকে প্রমাণ করা নয়। বরং প্রচলিত দাবিগুলিকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে যাচাই করা। গবেষণায় যদি ইতিবাচক ফল পাওয়া যায়, তাহলে তা নতুন জ্ঞান যোগ করবে। আর ফল না মিললেও সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক তথ্য।
বিজ্ঞান জগতের বহু বিশেষজ্ঞ মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে গবেষণা মানেই সাফল্য নয়। অনেক গবেষণাই শেষ পর্যন্ত কোনো ব্যবহারিক ফল দেয় না। তবুও গবেষণা চালিয়ে যাওয়া হয় কারণ বিজ্ঞান প্রশ্নের উত্তর খোঁজে।
‘কাউপ্যাথি’ প্রকল্প সেই অর্থে ভারতের বিজ্ঞান নীতির এক ব্যতিক্রমী অধ্যায়। একদিকে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আবেগ, অন্যদিকে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান—দুইয়ের সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে এই প্রকল্পকে দেখা হচ্ছে। গবেষণার প্রাথমিক ফলাফল কিছু সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিলেও এখনও পর্যন্ত এমন কোনো যুগান্তকারী আবিষ্কার সামনে আসেনি যা চিকিৎসা বিজ্ঞানে বড় পরিবর্তন এনে দিতে পারে।
তাই আপাতত বলা যায়, ৯৮ কোটি টাকার এই গবেষণা প্রকল্প গোমূত্র বা গোবরের অলৌকিক ক্ষমতার চূড়ান্ত প্রমাণ দেয়নি। আবার একেবারে অকার্যকর বলেও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কিছু ক্ষেত্রে সম্ভাব্য উপযোগিতার ইঙ্গিত মিলেছে, যা নিয়ে ভবিষ্যতে আরও গবেষণা হতে পারে।






