ইউক্রেনে থেমে থাকবে না রাশিয়ার আগ্রাসন? পুতিনের হুমকিতে নয়া আশঙ্কা বিশ্বজুড়ে

আধুনিক রাশিয়ার রূপকার বলা হয় জার পিটার দ্য গ্রেটকে, ১৬৭২ সালে যাঁর জন্ম। বলা হয়, একদা সুবিশাল সেই রুশ সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন হয় তাঁর হাত ধরেই। ইউরোপের নবজাগরণের সময় যে রাশিয়া ছিল কেবলমাত্র দর্শকের আসনে, তাঁর পাশ্চাত্যকরনের কাজ শুরু করে ভোল পাল্টে দেন পিটার। শক্তিশালী করে তোলেন রুশ সেনার সমস্ত বিভাগকে এবং শুরু করেন সাম্রাজ্য বিস্তার প্রক্রিয়া। সেই পিটার দ্য গ্রেটের জন্মের ৩৫০ বছর পর তাঁকে আবার ফিরিয়ে আনলেন রাশিয়ার আজকের শাসক ভ্লাদিমির পুতিন। নিজের তুলনা করলেন তাঁর সঙ্গে। বললেন, তাঁর ইউক্রেন অভিযান শুধু রাশিয়ার গৌরবই ফিরিয়ে আনবে না, তার সঙ্গে পড়শি দেশগুলি থেকে তাঁদের 'হারিয়ে যাওয়া' জমিও পুনরুদ্ধার হবে।

পুতিন এই মন্তব্যটি করেন সেন্ট পিটার্সবার্গে। পিটার দ্য গ্রেটের ৩৫০তম জন্মবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে। সেই সেন্ট পিটার্সবার্গ, যাকে সুইডেনের থেকে ছিনিয়ে নিয়েছিলেন পিটার দ্য গ্রেট। "পিটার দ্য গ্রেট ২১ বছর ধরে গ্রেট নর্দার্ন যুদ্ধ চালিয়েছিলেন। মনে হতে পারে যে, তিনি সুইডেনের সঙ্গে অত বছর ধরে যুদ্ধ চালিয়ে তাঁদের জমি দখল করে নিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবে, তিনি রাশিয়ারই সম্পদ পুনরুদ্ধার করেছিলেন।"

আজ ১০৬ দিন অতিক্রম করল পুতিনের ইউক্রেন অভিযান। হাজার হাজার মানুষ মৃত, কয়েকশো নারী ধর্ষিত, এক কোটিরও বেশি মানুষ ঘরছাড়া। এরপরেও অভিযানে ক্ষান্ত হওয়ার কোনও লক্ষণ দেখাচ্ছেন না পুতিন। এখনও তিনি ইউক্রেনের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব স্বীকার করেন না এবং যে কোনও প্রকারে তিনি ইউক্রেনকে রাশিয়ার অন্তর্ভুক্ত করতে চান। সেই কারণেই সুযোগ পেলেই নিজের যুদ্ধকে তিনি মান্যতা দিচ্ছেন, এবং এটাও স্পষ্ট করে দিচ্ছেন যে, তিনি এখানেই থামতে রাজি নন। তাঁর নিজেকে জার পিটারের সঙ্গে তুলনা করায় এটা একেবারেই স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে যে, তিনি রাশিয়ার সীমানা সম্প্রসারণেই আগ্রহী। ইউক্রেনে রুশ ভাষাভাষীদের স্বার্থ রক্ষা যে একেবারেই বাজে অজুহাত ছিল, তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছেন তিনি।

"কোনও ইউরোপিয়ান দেশ পিটার্সবার্গকে রাশিয়ার অংশ বলে স্বীকৃতি দেয়নি। সবাই তাকে সুইডেনের অংশ হিসেবেই দেখত। উনি কেন গিয়েছিলেন পিটার্সবার্গ? উনি পিটার্সবার্গকে ফেরত নিতে গিয়েছিলেন এবং তাকে শক্তিশালী করতে গিয়েছিলেন। দেখা যাচ্ছে, এখন সেই দায়িত্ব আবার আমাদের কাঁধে এসে পড়েছে। নিজেদের দেশের অংশ ফেরত নেওয়া এবং শক্তিশালী করার। আমাদের অস্তিত্বরক্ষার জন্য যে মূল্যবোধ ছিল, তাকে সামনে রেখে এগোলে আমরা নিশ্চিতভাবে নিজেদের কার্যসিদ্ধি করতে পারব", বলেন পুতিন।

আরও পড়ুন: রাশিয়ার টানা হুমকি সত্ত্বেও ইউক্রেনকে সাহায্য আমেরিকার, কোন অজানা পরিণতি অপেক্ষায়?

তার পরেই আসে সবথেকে রহস্যজনক তাঁর সেই বক্তব্য, যা নিয়ে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বেশ চিন্তায় পড়েছেন।

"রাশিয়ার মতো বড় দেশকে কোনও বেড়া দিয়ে ঘেরা অসম্ভব। আমরা সেই বেড়া বানাতেও চাই না।"

এই বক্তব্যের পর বিশেষজ্ঞরা এক প্রকার নিশ্চিত যে, পুতিন যে শুধু ইউক্রেনের সঙ্গে এই যুদ্ধ চালিয়ে যাবেন তা নয়, সেই সঙ্গে নিজের সাম্রাজ্যের বিস্তারের জন্য তিনি আরও অভিযান করতে পারেন।

তবে ব্রিটেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের নতুন রিপোর্ট অন্য কথা বলছে। সেখানে বলা হচ্ছে যে, রাশিয়া ইউক্রেনে যে যে স্থান এখনও পর্যন্ত দখল করতে পেরেছে, সেখানে কোথাওই তারা নূন্যতম পরিষেবাটুকুও প্রদান করতে পারছে না। আশঙ্কা দেখা দিয়েছে কলেরা ছড়িয়ে পড়ার। পানীয় জলের সরবরাহ চূড়ান্তভাবে ব্যাহত হয়েছে, সেই সঙ্গে টেলিফোন এবং ইন্টারনেট পরিষেবাও ঠিকঠাকভাবে দিতে পারছে না তারা।

খেরসনে ওষুধের সংকট দেখা দিয়েছে, মারিয়ুপোলে কলেরা মহামারীর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। জানা যাচ্ছে, গত মে মাস থেকেই সেখানে কলেরাতে আক্রান্ত হচ্ছেন শহরের মানুষ।

যে যুদ্ধ মাত্র কয়েক দিনে জিতে যাওয়ার কথা ছিল রাশিয়ার, তা এখনও চলছে। পশ্চিমি দেশগুলির সহায়তায় এখনও নিজেদের জমি আঁকড়ে লড়াই করছেন ইউক্রেনবাসীরা। কিন্তু সমস্যা দেখা দিয়েছে ইউক্রেনের অস্ত্রভান্ডারে। সেখানে দেখা দিচ্ছে ঘাটতি। শীঘ্রই যদি সাহায্য না আসে, তাহলে পূর্ব ইউক্রেনের অনেকটা অংশই হাতছাড়া হতে পারে। প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করে দেওয়ার রণনীতি সফল হয়ে যেতে পারে রাশিয়ার। সেই কারণেই কি এত আত্মবিশ্বাসী ভ্লাদিমির পুতিন? উত্তর মিলবে আগামী দিনে।

More Articles

;