আড়ালটাই ছিল সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের অলংকার...

Gautam Roy
৪ মিনিট
আড়ালটাই ছিল সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের অলংকার...

তাঁর তখন হিন্দি ভজনের একটা লংপ্লেইং রেকর্ড বেরিয়েছে। সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের সুরের দু'টি গান সেখানে আছে। আছে গঙ্গাস্তোত্রম, আদি শঙ্করাচার্যের রচিত। তাঁর খুব ইচ্ছে ছিল গঙ্গাস্তোত্রমটি পঙ্কজ কুমার মল্লিকের তত্ত্বাবধানে গাইবার।এই উদ্দেশ্য নিয়ে পঙ্কজবাবুর বাড়িতে তিনি গিয়েও ছিলেন। যাওয়া মাত্রই তাঁকে পঙ্কজকুমার সবার আগে বললেন, 'যাও আগে জগাইকে প্রণাম করে এসো।' সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় একটু থতমত খেয়ে গেলেন। পঙ্কজকুমার মল্লিকের বাড়িতে 'জগাই'-কে, সেটা ঠিক বুঝে উঠতে পারলেন না। পঙ্কজঘরণী তখন হাসতে হাসতে বললেন গৃহদেবতা জগন্নাথের কথা। সঙ্গে সঙ্গেই পঙ্কজবাবুর ঠাকুর ঘরে গিয়ে, প্রভু জগন্নাথকে প্রণাম করে অর্ঘ্য নিবেদন করলেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়।

এই ঘটনা যখন ঘটে ,তখন পঙ্কজবাবু একেবারে জীবনের শেষ প্রান্তে চলে এসেছেন। তার অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই তাঁর জীবনাবসান ঘটে। ফলে তাঁর তত্ত্বাবধানে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া হয় না আদি শঙ্করাচার্য রচিত গঙ্গাস্ত্রোত্র। এই ঘটনার বেশ কিছুদিন পরে অধ্যাপক গোবিন্দগোপাল মুখোপাধ্যায়ের তত্ত্বাবধানে রেকর্ড করেছিলেন তিনি গঙ্গাস্ত্রোত্র।

সে যুগের ফিয়েস্তা রেকর্ড প্লেয়ার নিয়ে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় গিয়েছেন বেলুড়মঠে পরমপূজ্যপাদ ভরত মহারাজের কাছে ।ভরত মহারাজের সঙ্গে তাঁর যোগসূত্র রচনা করে দিয়েছিলেন মহানায়িকা সুচিত্রা সেন। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় ও শ্যামল গুপ্তকে পূজনীয় ভরত মহারাজের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি।

পরবর্তীতে সন্ধ্যা আর পূজনীয় ভরত মহারাজের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। একবার ভরত মহারাজের ঘরে বসে আছেন কয়েকজন স্ত্রীভক্ত। এক মারোয়াড়ি স্ত্রী ভক্তের স্বামী সদ্য প্রয়াত হয়েছেন। মহারাজ তাঁর স্বভাবসুলভ গাম্ভীর্যমিশ্রিত রসিকতায় ভদ্রমহিলাকে বললেন, তা তোমার স্বামী, তোমার দানাপানির জন্য কিছু রেখে যায়নি?

সেই মারোয়াড়ি স্ত্রী ভক্তটি তখন মহারাজকে বললেন; হ্যাঁ, মাত্র চার কোটি টাকা রেখে গিয়েছেন। এই ঘটনাটি ছয়ের দশকের মধ্যবর্তী সময়ে। মহারাজ তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিমায় বললেন; তা মাত্র চার কোটি টাকা দিয়ে কি আর মা দানাপানি হয়?

এই ঘটনার ভেতর দিয়ে যে আধ্যাত্মিক শিক্ষা পূজনীয় ভরত মহারাজের দিয়ে ছিলেন, সেই ঘটনাটি কিন্তু সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় তাঁর ঘনিষ্ঠ বৃত্তে বহুবার বলতেন।অর্থাৎ; জাগতিক বিষয় যে বেঁচে থাকার একমাত্র ভিত্তি নয়, জীবনযাত্রাকে একটা উচ্চ আধ্যাত্বিক সুরে যদি না বাঁধতে পারা যায়, তাহলে সেই জীবনযাত্রার গতিপথ সঠিক হবে না, এটা বলার জন্যই পূজনীয় ভরত মহারাজের ওই শিক্ষা দিয়েছিলেন, সেই কথাটা কিন্তু সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় উল্লেখ করতেন বারবার। এটা তিনি উল্লেখই যে কেবল করতেন, তেমনটা মনে করার কোনো কারণ নেই। জীবনের নিত্যতার মাঝেই অনিত্যতার প্রতি জীবনকে প্রবাহিত করা, এটাই জীবনের শিক্ষা, সেটা গোটা জীবন ধরে কার্যত সাধনার মতো অনুশীলন করে গিয়েছেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়।

সংসারজীবন কোথাও সেই সাধনার ত্রুটি ছিল না। যতদিন অনেকটা সুচিত্রা সেনের আদলে লোকচক্ষুর আড়ালে থাকতে ভালোবাসতেন, ততদিন তাঁর ঘনিষ্ঠ বৃত্তটি খুব ছোট্ট ছিল। কিন্তু সেই আত্মীয়-পরিজন বা অনাত্মীয় দুই-চারজন মানুষ, যাঁরা সেই ঘনিষ্ঠবৃত্তে ঢোকবার সুযোগ পেয়েছিলেন, তাঁরাই জানেন; আন্তরিকতা শব্দটি, স্নেহ শব্দটি সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের জীবন এবং যাপনের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল।

তাঁর আড়ালটা তিনি তখন এতটা নিবিড়ভাবে পালন করতেন, সে প্রসঙ্গে একটা ঘটনা মনে পড়ছে। পিসি চন্দ্র গ্রুপ তাঁকে লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট দিল সায়েন্স সিটি অডিটোরিয়ামে। উনি যখন মঞ্চে পুরস্কার নিচ্ছেন, তখন তাঁরা ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন, পিতাপুত্র ছবিতে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া সেই বিখ্যাত গানটি, 'তীর বেঁধা পাখি আর গাইবে না গান'। একটু বিরক্ত হয়েছিলেন সন্ধ্যা। কিন্তু বিরক্তিটা প্রকাশ্যে একটিবারের জন্য বলেননি। ঘনিষ্ঠবৃত্তে বলেছিলেন; আমি কি মরে গেছি, যে এখনই এই গান বাজাতে হবে?

সেবার একটি অত্যন্ত নামী বাংলা পত্রিকাগোষ্ঠীর সহযোগী একটি পত্রিকার এক সাংবাদিক ওই অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন। তিনি তখন ওই পত্রিকাগোষ্ঠীর একটি ফিল্মি পত্রিকা গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত। তাঁর ভীষণ ইচ্ছে, নিজের ম্যাগাজিনের জন্য সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের একটা একান্ত সাক্ষাৎকার নেন। সেই ভদ্রলোক সায়েন্সসিটি থেকে নিজের গাড়িতে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের বাড়ি পর্যন্ত এলেন। কিন্তু সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় তাঁকে বাড়িতে প্রবেশাধিকার দিলেন না। কারণ; সংবাদমাধ্যম থেকে তিনি তখন নিজেকে অনেকটা বেশি দূরে রাখতে পছন্দ করতেন। ঠিক যেমনভাবে সুচিত্রা সেন একটা অন্তরাল বজায় রেখেছিলেন তার শেষ জীবনের দীর্ঘ একটা সময় ধরে। তেমনটাই সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ও, শ্যামল গুপ্ত জীবিত থাকাকালীন একটা দীর্ঘ সময়, বিনোদনের দুনিয়া ,ক্যামেরার ফ্ল্যাশের ঝলকানি থেকে নিজেকে খানিকটা দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন।

কিন্তু সেই দূরে সরিয়ে রাখা মানে এটা নয় যে, কারো সঙ্গে কোনো রকম দুর্ব্যবহার করেছেন। কারো মনে আঘাত দিয়েছেন। কাউকে অপমান করেছেন।তাঁর তখন ভালো লাগত না নিজেকে সেভাবে বিজ্ঞাপিত করতে, তাই তিনি স্ববিজ্ঞাপনের জায়গা থেকে নিজেকে সযত্নে দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন। খ্যাতির ওই মধ্যগগনে অবস্থান করেও ,সমস্ত রকমের আত্মপ্রচারের জায়গা থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারা, এটা কিন্তু আদৌ মুখের কথা নয়।এটা বলতে পারা যায়। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে করতে পারা, অত্যন্ত কঠিন। আর সেই কঠিন কাজটা একটা দীর্ঘ সময় ধরে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে নিজের গানের মতোই সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি যদি বিনোদন দুনিয়া প্রচলিত ধারায় নিজেকে খুব সহজলভ্য করে তুলতেন, তাহলে হয়তো তাঁকে ঘিরে আমজনতার ভিতর যে একটা প্রবল আগ্রহ, সেই আগ্রহের জায়গাটার সর্বোচ্চ দিকটা এভাবে অটুটও থাকত না।

লিখেছেন
Gautam Roy
Gautam Roy
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কেতকী কুশারী ডাইসনের গবেষণায় রবীন্দ্রনাথের বর্ণান্ধতা: কবির দেখা রঙের পৃথিবীটা কেমন ছিল?

Ketaki Kushari Dyson about Rabindranath Tagore color blindness: ডাইসনের ক্ষেত্রে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’-এর ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তরুণ বয়সে তাঁর নিজের দৃষ্টিশক্তি গুরুতর সংকটের মুখে পড়েছিল। ডাইসনের নিজের বিবরণ অনুযায়ী ১৯৫৯-৬০ সালে তাঁর চোখে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার হয়।

‘ভারতের সঙ্গে খাপ খায় না ধর্মনিরপেক্ষতা’: মোহন ভাগবতের দাবি কতটা সত্য?

Mohan bhagwat's anti secularism: উজ্জয়নীর যুব ধর্ম সংসদে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা পশ্চিমা ধারণা, ভারতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর সঙ্গে এটি খাপ খায় না। সত্যিই কি তাই? মোহন ভাগবতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর যুক্তি এবং আরএসএসের ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে অবস্থানের প্রেক্ষিতে নিবেদিতা মেননের ‘মিসডিরেকশন’ তত্ত্ব কী প্রশ্ন তুলছে?

পাতে মাছ, হাতে ‘সনাতনী’ সার্টিফিকেট, কোনটা চায় বাঙালি?

Dhirendra Shastri fish meat controversy: বিতর্কের সূত্রপাত বাগেশ্বর ধামের ধর্মগুরু ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্যে। তিনি সম্প্রতি বাংলায় এসে দুর্গাপুজোর সময় হিন্দু বাঙালিদের মাছ-মাংস না খাওয়ার আহ্বান জানান। আমিষাশী হিন্দু বাঙালিদের ‘পাখণ্ডী’ বিশেষণ উপহার দেন।

ছবির পরিকল্পনা থেকে পলিফোনিক সুর: মণিদার যে কাজগুলি শেষ পর্যন্ত হলো না

Gautam Chattopadhyay: একদিন মণিদা বলল, ‘চল তো, জয়ন্ত বোসের বাড়ি যাব। ওকে দিয়ে ছবিতে একটা পলিফোনিক আবহ সংগীত তৈরি করাব।’ তখন আমরা দূরদর্শনের জন্য ‘মহুয়া সুন্দরী’ তৈরি করছি—ময়মনসিংহ গীতিকার একটি জনপ্রিয় লোকপালা।

এক রাজকন্যার স্মৃতি যেভাবে হয়ে উঠল রাঢ় বাংলার মেয়েদের নিজস্ব উৎসব

Bhadu Festival: অবিভক্ত মানভূম জেলার পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিংহদেবের অপরূপা কন্যা ভদ্রেশ্বরী দেবীর অনূঢ়া অবস্থায় অকালে মৃত্যু ঘটে। রাজকন্যার এই আকস্মিক প্রয়াণে রাজার সঙ্গে প্রজাসাধারণও শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। কন্যার স্মৃতি অমলিন রাখতে শোকার্ত রাজা রাজ্যজুড়ে এক বিশেষ উৎসব পালনের নির্দেশ দেন।

আলো দিয়ে অন্ধকার দেখাতেন, ব্যঙ্গ দিয়ে সমাজের মুখোশ খুলে দিতেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Gaganendranath Tagore: আধুনিক ভারতীয় শিল্পের প্রেক্ষাপটে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান বুঝতে হলে তাঁকে কেবল ‘ঠাকুরবাড়ির মানুষ’ হিসেবে দেখলে চলবে না; বিচার করতে হবে একজন অনুসন্ধিৎসু ও আধুনিক শিল্পী হিসেবে।

বুদ্ধের হাত, বিশ্বকর্মার যন্ত্র! ইলোরার ১০ নম্বর গুহায় আসলে কে বসে আছেন?

The caste history of vishwakarma's: ইলোরার 'সুতারের ঝোপড়ি' থেকে আধুনিক কারিগরের কর্মশালা, বিশ্বকর্মার হাজার বছরের যাত্রা আজও অব্যাহত। ইলোরার দশ নম্বর গুহায় বুদ্ধের মূর্তিকে ভক্তরা ডাকেন বিশ্বকর্মা বলে, যিনি কারিগরদের পূর্বপুরুষ, দেবতাদের স্থপতি। ঋগ্বেদের 'সর্বকর্তা' থেকে পুরাণের 'দেবশিল্পী', ব্রাহ্মণত্বের দাবি থেকে ওবিসি সংরক্ষণ—বিজয়া রামাস্বামী, জ্যান ব্রাউয়ার ও কিরিন নারায়ণের গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে, বিশ্বকর্মাদের ঘিরে গড়ে ওঠা বর্ণবাদ, কারিগরি ও ক্ষমতাকাঠামোর জটিল ইতিহাস।

লেপচাদের দার্জিলিং যেভাবে হয়ে উঠল ব্রিটিশদের শৈলশহর

Darjeeling history: ভারতের প্রথম ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ (জিআই) ট্যাগ প্রাপ্ত পণ্য বিশ্বখ্যাত ‘দার্জিলিং টি’। অথচ এই চা গাছ কিন্তু দার্জিলিং-এর ‘ভূমিপুত্র’ নয়। সাহেবরা নিজেদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে শান দিতেই এখানকার আদি বাস্তুতন্ত্রের খোলনলচে বদলে দিয়েছিল। দেশীয় বনভূমি ধ্বংস করে পাইন আর চা রোপণের মাধ্যমেই জন্ম নিয়েছিল আধুনিক পর্যটন মানচিত্রের এই ‘খাদের ধারের দার্জিলিং’।