যেভাবে এল হাতে লাগা ভোটের কালি
Silver Nitrate Voting Ink: মহীশূর পেইন্টস শুধু ভারত নয়, বিশ্বের প্রায় ৩৫টি দেশে এই কালি রপ্তানি করে। থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, নাইজেরিয়া থেকে শুরু করে দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশগুলোও তাদের নির্বাচনের জন্য এই ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’ কালির উপর ভরসা করে।
একটা ঘটনা দিয়ে শুরু করা যাক, সম্প্রতি, বৃহন্মুম্বাই মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের (BMC) নির্বাচন ঘিরে শোরগোল উঠেছিল, ভোটের কালিতে কারচুপির। বলা হচ্ছিল, যে কালি ঘোষে মুছেও সপ্তখানেক এর আগে যেত না, স্যানিটাইজার দিতেই নাকি তা পুরোপুরি ভ্যানিশ। একাংশের অভিযোগ ছিল, এই কালি নাকি সাধারণ মার্কার পেনের।
প্রসঙ্গে ফেরা যাক, এমনিতে ভোটের মঞ্চে এই কালির ভূমিকা বিশেষ। এই কালিই নির্দিষ্ট করে ভোটারের ভোটদানের নিরপেক্ষতা। অতএব, এই কালি এক ধোয়াতে উঠে যাওয়া চিন্তার বিষয় বৈ কি।
সুতরাং ভোট এবং ভোটারের নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে এই কালিকে হেয় করা মোটেও চলে না। কিন্তু এই কালি এমন কী উপায়ে তৈরি হয় যে জল, সাবান, স্যানিটাইজারেও সপ্তাহখানেক এর আগে আপনার হাতে এর অস্তিত্ব বর্তমান থাকে!
ভোটের কালিতে থাকা প্রধান উপাদান হলো সিলভার নাইট্রেট (AgNO₃)। এটি যখন আঙুলের চামড়ায় লাগানো হয়, তখন আমাদের শরীরের প্রোটিনের সঙ্গে বিক্রিয়া করে একটি স্থায়ী কালো বা বেগুনি দাগ তৈরি করে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Vote Manipulation HIstory Of World: আদালত স্পষ্ট করে জানায় যে, শুধুমাত্র একটি প্রিন্টআউট বা ইলেকট্রনিক ডিসপ্লে যথেষ্ট নয়, কারণ এটি একটি বিশ্বাসযোগ্য নিরীক্ষণ বা যাচাই যোগ্যতা নিশ্চিত করে না।
এখন প্রশ্ন হলো স্যানিটাইজার নিয়ে। স্যানিটাইজারে থাকে প্রচুর পরিমাণে অ্যালকোহল। যদি কালি লাগানোর সঙ্গে সঙ্গে অর্থাৎ শুকিয়ে যাওয়ার আগেই কেউ স্যানিটাইজার বা কোনো শক্তিশালী কেমিক্যাল দিয়ে ঘষেন, তবে বিক্রিয়াটি সম্পূর্ণ হওয়ায় বাধা পেতে পারে। কিন্তু একবার যদি কালি শুকিয়ে চামড়ার ভিতরে বসে যায়, তবে তাকে তোলা প্রায় অসম্ভব। সেটি কেবল তখনই উঠবে, যখন আপনার আঙুলের পুরনো চামড়া উঠে নতুন চামড়া গজাবে।
মজার ব্যাপার হলো, বর্তমানে যে অভিযোগ উঠছে, ঠিক এই ধরনের সমস্যার সমাধান খুঁজতেই কিন্তু ভোটের কালির জন্ম হয়েছিল।
কীভাবে এল এই কালির ভাবনা?
ভারতের প্রথম সাধারণ নির্বাচন যখন ১৯৫১-৫২ সালে অনুষ্ঠিত হয়, তখন দেশ সবেমাত্র স্বাধীন হয়েছে। মানুষের মনে যেমন উৎসাহ ছিল, তেমনই নির্বাচন কমিশনের সামনে ছিল পাহাড়প্রমাণ চ্যালেঞ্জ। সেই সময় ভোটার কার্ড বা আজকের মতো ডিজিটাল ডেটাবেস—কিছুই ছিল না। ফলে এক বড় সমস্যা দেখা দিল—অনেকেই আঙুলের সাধারণ কালি ঘষে তুলে ফেলে বারবার ভোট দিচ্ছেন। আবার একজনের বদলে অন্যজন গিয়েও ভোট দিয়ে আসছিলেন। জালিয়াতি আটকানো তখন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Vote Manipulation HIstory Of India: কিন্তু যার নির্বাচনী কারচুপি বন্ধ করার কথা, তার বিরুদ্ধেই যদি সরকারের হয়ে ভোট চুরির অভিযোগ ওঠে, তখন তা আশঙ্কার জন্ম দেয়।
এই জালিয়াতি রুখতে তৎকালীন প্রধান নির্বাচন কমিশনার সুকুমার সেন এক অভিনব সমাধান খুঁজছিলেন। তিনি চাইলেন এমন কিছু একটা ব্যবহার করতে, যা ভোটারদের শরীরে অন্তত কয়েকদিন একটা অমোচনীয় চিহ্ন রেখে দেবে। যাতে কেউ দ্বিতীয়বার ভোট দিতে এলে সহজেই ধরা পড়ে যান। এই উদ্দেশ্যেই তিনি যোগাযোগ করেন দিল্লির 'ন্যাশনাল ফিজিক্যাল ল্যাবরেটরি' (NPL)-এর বিজ্ঞানীদের সঙ্গে।
তৎকালীন প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ডঃ জি. আই. জিসা-র নেতৃত্বে একদল বিজ্ঞানী এই অসাধ্য সাধনে নামেন। চ্যালেঞ্জটা কিন্তু সহজ ছিল না। এমন একটা রাসায়নিক তৈরি করতে হবে যা শরীরের ত্বকের কোনো ক্ষতি করবে না। জল, সাবান, তেল, এমনকি কড়া অ্যাসিড দিয়ে ঘষলেও অন্তত এক সপ্তাহ উঠবে না এবং লাগানোর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই শুকিয়ে যাবে। দীর্ঘ গবেষণার পর তাঁরা তৈরি করলেন সিলভার নাইট্রেট (AgNO₃))-ভিত্তিক এক বিশেষ ফর্মুলা। এই কালি যখন ত্বকের প্রোটিনের সংস্পর্শে আসে, তখন এটি চামড়ার সঙ্গে প্রায় মিশে যায়। সিলভার ক্লোরাইড জলে দ্রবীভূত হয় না। এটি ত্বকের প্রোটিনের সাথে শক্তভাবে আটকে থাকে। কালিতে থাকা সিলভার নাইট্রেট আলোর সংস্পর্শে এলে কালচে বর্ণ ধারণ করে। ফলে সময়ের সাথে সাথে দাগটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই দাগ ততক্ষণ পর্যন্ত পুরোপুরি মুছে যায় না, যতক্ষণ না আমাদের ত্বকের পুরনো কোষগুলি ঝরে গিয়ে নতুন কোষ বা চামড়া গজাচ্ছে। সাধারণত এটি ১৫ থেকে ২০ দিন পর্যন্ত স্থায়ী হয়। ফলে একেই আদর্শ বলে মনে করা হয়।
১৯৫২ বা ১৯৫৭ সালের নির্বাচনে কিন্তু এই কালি সেভাবে ব্যবহার হয়নি। দীর্ঘ পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে ১৯৬২ সালের সাধারণ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো সারা দেশে এই অমোচনীয় কালির ব্যবহার শুরু হয়। ফল হাতেনাতে পাওয়া গেল—জালিয়াতি এক ধাক্কায় অনেকটা কমে এল।
কালির ফর্মুলা তো তৈরি হলো, কিন্তু তৈরি করবে কে? তখন ভারত সরকার দায়িত্ব দেয় কর্ণাটকের ‘মহীশূর পেইন্টস অ্যান্ড ভার্নিশ লিমিটেড’-কে। ১৯৩৭ সালে মহীশূরের মহারাজা এই কারখানাটি তৈরি করেছিলেন রং তৈরির জন্য। কিন্তু ১৯৬২ সাল থেকে আজ পর্যন্ত, ভারতের প্রতিটি নির্বাচনের জন্য এই কালির একচেটিয়া জোগানদার তারাই। আজও এই কালির সঠিক রাসায়নিক অনুপাত বা 'রেসিপি' অত্যন্ত গোপন রাখা হয়। হাতেগোনা দুই-তিনজন বিজ্ঞানী ছাড়া এই রহস্য কেউ জানেন না। এমনকি নির্বাচনের আগে যখন এই কালি সরবরাহ করা হয়, তখন প্রতিটি শিশির জন্য কড়া নিরাপত্তার ব্যবস্থা থাকে। একেকটি ছোট শিশিতে ৫ মিমি থেকে ৭০ মিমি পর্যন্ত কালি থাকে এবং একটি ৫ মিলি-র শিশি দিয়ে প্রায় ৩০০ জন ভোটারের আঙুলে ছাপ দেওয়া সম্ভব। পুরো ভারতে এই কালি তৈরির স্বত্ব রয়েছে মাত্র একটি প্রতিষ্ঠানের হাতে। বর্তমানে এটি কর্ণাটক সরকারের অধীনে পরিচালিত হয়।
মজার বিষয় হলো, মহীশূর পেইন্টস শুধু ভারত নয়, বিশ্বের প্রায় ৩৫টি দেশে এই কালি রপ্তানি করে। থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, নাইজেরিয়া থেকে শুরু করে দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশগুলোও তাদের নির্বাচনের জন্য এই ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’ কালির উপর ভরসা করে।
ভোটের কালি শুধু একটি কালির দাগ নয়, এটি একজন নাগরিকের অধিকার ও কর্তব্যের প্রতীক। এটি প্রমাণ করে যে আপনি আপনার দেশের সরকার নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। গণতন্ত্রের এই ক্ষুদ্র চিহ্নটি ধনী-দরিদ্র, জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে প্রত্যেক ভোটারকে এক সারিতে দাঁড় করিয়ে দেয়।
প্রযুক্তির উন্নতি হয়েছে, ইভিএম (EVM) থেকে শুরু করে ভিভিপ্যাট (VVPAT) মেশিন এসেছে, কিন্তু 'মহীশূরের কালি' আজও তার গুরুত্ব হারায়নি। জালিয়াতি রুখতে এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্বচ্ছতা বজায় রাখতে এই ছোট্ট এক ফোঁটা কালির অবদান অপরিসীম।






