ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ, তারপর পাসপোর্টেও জটিলতা! প্রাক্তন সম্পাদক আর. রাজাগোপালের অভিজ্ঞতা ঘিরে নতুন বিতর্ক
SIR controversy: ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার পর পাসপোর্ট নবীকরণও আটকে যায় প্রাক্তন সম্পাদক আর. রাজাগোপালের। তাঁর দাবি, প্রশাসনিক জটিলতার কারণে তিনি মেয়ের বিয়েতেও যেতে পারেননি। এই ঘটনা ভোটার তালিকা সংশোধন, নথি যাচাই এবং নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে।
ভোটার তালিকা থেকে একটি নাম বাদ পড়লে তার প্রভাব ঠিক কতটা সুদূরপ্রসারী হতে পারে? শুধুমাত্র ভোটাধিকার হারানো নয়, একজন নাগরিকের দৈনন্দিন জীবন, সরকারি পরিষেবা পাওয়ার অধিকার এবং প্রশাসনিক পরিচয়—সবকিছুই কী ভাবে প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে, সেই অভিজ্ঞতার কথাই সামনে এনেছেন দ্য টেলিগ্রাফ-এর প্রাক্তন সম্পাদক আর রাজাগোপাল। তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ঘিরে আবারও আলোচনায় এসেছে পশ্চিমবঙ্গে স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন প্রক্রিয়া এবং ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্ক।
রাজাগোপাল জানিয়েছেন, চলতি বছরের মার্চ মাসে কলকাতার বালিগঞ্জ কেন্দ্রের ভোটার তালিকা থেকে তাঁর নাম বাদ দেওয়া হয়। প্রশাসনের তরফে জানানো হয়, ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় তাঁর বা তাঁর প্রয়াত বাবার নাম খুঁজে পাওয়া যায়নি। সেই কারণেই তাঁর নাম তালিকা থেকে মুছে ফেলা হয়েছে। অথচ তাঁর বাবা ছিলেন কেরলের একজন অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, গান্ধীবাদী সমাজকর্মী এবং গান্ধী স্মারক নিধির প্রাক্তন রাজ্য সম্পাদক। ২০১৬ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। রাজাগোপালের প্রশ্ন, সারা জীবন নিয়মিত ভোট দেওয়া একজন মানুষের নাম কী ভাবে পুরনো তালিকায় অনুপস্থিত থাকতে পারে?
তিনি জানান, এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তিনি মাধ্যমিকের শংসাপত্র-সহ বিভিন্ন নথি জমা দিয়েছেন। তবুও কেন তাঁর নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, সেই বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা এখনও পাননি। বর্তমানে তাঁর আবেদন সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে গঠিত ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন রয়েছে। এই প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি ভোটার হিসেবে পুনর্বহাল হবেন কি না, তা স্পষ্ট নয়। এর ফলেই তিনি সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে ভোট দিতে পারেননি।
তবে তাঁর মতে, ভোট দিতে না পারার চেয়েও বড় সমস্যা তৈরি হয়েছে পাসপোর্ট নবীকরণে। গত ১৯ মার্চ তিনি পাসপোর্ট নবীকরণের জন্য বায়োমেট্রিক প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করেন। কিন্তু এরপর পুলিশ ভেরিফিকেশনের সময় দেখা যায়, ভোটার তালিকায় তাঁর নাম নেই। সেই কারণ দেখিয়ে কলকাতা পুলিশের তরফে বিরূপ রিপোর্ট পাঠানো হয়েছে। ফলে তাঁর পাসপোর্ট নবীকরণের আবেদন আটকে যায়। রাজাগোপালের দাবি, তিনি বিকল্প হিসেবে একাধিক পরিচয়পত্র জমা দিলেও তা যথেষ্ট বলে গ্রহণ করা হয়নি।
তিনি লেখেন, বায়োমেট্রিক দেওয়ার ১০০ দিনেরও বেশি সময় কেটে যাওয়ার পর তাঁকে পাসপোর্ট অফিসে হাজির হতে বলা হয়েছে। কিন্তু সেখানে সাক্ষাতের সময় পেতেও তাঁকে অপেক্ষা করতে হয়েছে। প্রশাসনিক জটিলতার এই দীর্ঘসূত্রিতা তাঁর ব্যক্তিগত জীবনেও বড় প্রভাব ফেলেছে।
রাজাগোপালের মেয়ে ক্যালিফোর্নিয়ায় সাংবাদিকতা করেন। গত ১৭ এপ্রিল সান ফ্রান্সিসকোতে তাঁর বিয়ে হয়। রাজাগোপাল জানান, তাঁর কাছে বৈধ মার্কিন ভিসা থাকলেও পাসপোর্ট নবীকরণ না হওয়ায় তিনি মেয়ের বিয়েতে উপস্থিত থাকতে পারেননি। তাঁর কথায়, জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পারিবারিক মুহূর্ত তিনি শুধুমাত্র প্রশাসনিক জটিলতার কারণে হারিয়েছেন।
তিনি জানান, এখন দিনের শুরু হয় ভোট সংক্রান্ত মামলার অগ্রগতি এবং পাসপোর্ট আবেদনের অবস্থা দেখে। এরপর শুরু হয় কয়েক দশক আগের পারিবারিক নথি খোঁজার চেষ্টা। তাঁর মায়ের কর্মজীবনের নথি সংগ্রহ করতে তিনি পুরনো কলেজ ও স্কুলের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। বাবার সামাজিক কাজের প্রমাণ হিসেবে পুরনো সংবাদপত্রের কাটিং, ছবি কিংবা অন্য কোনো নথি সংগ্রহের চেষ্টা করছেন। তাঁর কথায়, যেন তাঁকে প্রমাণ করতে হচ্ছে তাঁর বাবা-মা সত্যিই ছিলেন এবং তিনি তাঁদের সন্তান।
রাজাগোপাল জানিয়েছেন, বহু বন্ধু ও পরিচিত মানুষ তাঁকে সাহায্য করছেন। কিন্তু মূলধারার সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে তিনি হতাশ। তাঁর মতে, সাংবাদিক হিসেবে দীর্ঘ জীবন কাটিয়েও নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে সংবাদমাধ্যমের আগ্রহ প্রায় নেই বললেই চলে। তিনি বলেন, তিনি নিজেকে ভুক্তভোগী হিসেবে তুলে ধরতে চান না। বরং তাঁর অভিজ্ঞতা দেখায়, একজন পরিচিত সাংবাদিক যদি এত সমস্যার সম্মুখীন হন, তাহলে সমাজের প্রান্তিক মানুষের অবস্থা কতটা কঠিন হতে পারে, তা সহজেই অনুমান করা যায়।
কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস এবং সিপিআই(এম)-এর একাধিক নেতা অভিযোগ করেছেন, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার প্রভাব শুধুমাত্র ভোটাধিকারেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, অন্যান্য সরকারি পরিষেবাতেও তার প্রভাব পড়ছে। অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশনের অবস্থান, ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ আইনি কাঠামোর মধ্যেই করা হয়েছে এবং যাঁদের নাম বাদ পড়েছে, তাঁদের জন্য আপিলের সুযোগ রয়েছে।
রাজাগোপালের অভিজ্ঞতা এমন সময় সামনে এল, যখন পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে আগেই বিস্তর বিতর্ক তৈরি হয়েছে। লক্ষ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়া, নথি যাচাইয়ের পদ্ধতি এবং আপিল প্রক্রিয়া নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে এবং সুপ্রিম কোর্টও এই প্রক্রিয়া নিয়ে একাধিক নির্দেশ দিয়েছে। আদালত স্পষ্ট করেছে, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া মানেই কোনো ব্যক্তির নাগরিকত্ব বাতিল হয়ে যাওয়া নয়। তবে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তি হবে।








