SRFTI: কীভাবে অনুষ্ঠান থেকে পরিস্থিতি গড়াল সংঘর্ষে?
SRFTI Clash: SRFTI-তে ডানপন্থী সংগঠনের অনুষ্ঠান ঘিরে কেন আপত্তি জানালেন পড়ুয়ারা? বক্তৃতায় কী বলা হয়েছিল, যা নিয়ে তৈরি হয় উত্তেজনা? কীভাবে অনুষ্ঠান থেকে পরিস্থিতি গড়াল সংঘর্ষে? পড়ুয়া ও আয়োজকদের পাল্টা অভিযোগের মধ্যে আসল ঘটনা কী?
আমাদের ক্যাম্পাসে বাইরের লোকজন ঢুকে কীভাবে এমন কথা বলতে পারেন?
২৭ সেপ্টেম্বরের ঘটনার পর এমনই প্রশ্ন তুলেছেন সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটের একাংশ পড়ুয়া। অন্যদিকে অনুষ্ঠানের আয়োজকদের দাবি, তাঁরাই অনুষ্ঠানের জন্য আইনসম্মতভাবে প্রেক্ষাগৃহ ভাড়া নিয়েছিলেন। তাঁদের অভিযোগ, পড়ুয়ারাই অনুষ্ঠানে বাধা দেন, পোস্টার-ব্যানার ছিঁড়ে ফেলেন এবং তাঁদের উপর হামলা চালান।
এই দুই বিপরীত অভিযোগের মাঝেই ২৭ সেপ্টেম্বর উত্তপ্ত হয়ে উঠল কলকাতার SRFTI ক্যাম্পাস। অখিল ভারতীয় গ্রাহক পঞ্চায়েত বা ABGP-র একটি অনুষ্ঠানে বক্তৃতাকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া উত্তেজনা পরে হাতাহাতি ও সংঘর্ষের চেহারা নেয়। একাধিক পড়ুয়া আহত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কয়েকজন অধ্যাপকও আক্রান্ত হয়েছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ক্যাম্পাসের বাইরে পুলিশ মোতায়েন করতে হয়। সন্ধ্যা পর্যন্ত ক্যাম্পাসের গেট ঘিরে উত্তেজনা বজায় ছিল।
ঘটনার সূত্রপাত রবিবার দুপুরের আগে। SRFTI-এর মূল অডিটোরিয়ামে দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৪টে পর্যন্ত একটি অনুষ্ঠান করার জন্য ABGP কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে জায়গা ভাড়া নিয়েছিল। ABGP-কে সাধারণভাবে একটি ডানপন্থী ভোক্তা সংগঠন হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। অনুষ্ঠান চলাকালীন কিছু বক্তার বক্তব্য নিয়ে পড়ুয়াদের একাংশ আপত্তি জানান। তাঁদের অভিযোগ, বক্তৃতায় তাঁদের উদ্দেশে ‘অ্যান্টি-ন্যাশনাল’, ‘আরবান নকশাল’ এবং ‘টেররিস্ট’-এর মতো শব্দ ব্যবহার করা হয়। মহিলা পড়ুয়াদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার বা হাতাহাতির অভিযোগও সামনে এসেছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
August 19 violence in Jadavpur University: ১৯ আগস্ট রাতে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে দক্ষিণপন্থী হিন্দুত্ববাদী ছাত্রসংগঠনের হামলায় আহত হলেন ২৩ জন শিক্ষার্থী। অরবিন্দ ভবনে আটক থাকলেন, 'জয় শ্রী রাম' ধ্বনি শুনলেন, পুলিশের নীরবতা প্রত্যক্ষ করলেন। এসব ঘটনা, এক শতাব্দী আগে নাৎসি জার্মানিতে বিশ্ববিদ্যালয় দখলের ইতিহাসের কথা মনে করিয়ে দেয়। ভারতীয় শিক্ষাক্ষেত্রের স্বায়ত্তশাসন কি আজ সেই পথে হেঁটেই বিপন্ন হওয়ার মুখে?
অন্যদিকে, ABGP-র বক্তব্য সম্পূর্ণ আলাদা। সংগঠনের এক সদস্যের দাবি, পড়ুয়ারা অনুষ্ঠানে ঢুকে পোস্টার ছিঁড়ে দেন এবং কর্মসূচি বন্ধ করার চেষ্টা করেন। তাঁদের আরও অভিযোগ, এই ঘটনায় সংগঠনের সদস্যদের উপর হামলা হয়। একজন সংগঠনের সদস্য দাবি করেছেন, সংঘর্ষের পরে চারজনকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে। অনুষ্ঠান চলাকালীন স্বামী বিবেকানন্দের একটি মূর্তি বা ছবিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে সংগঠনের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে। তবে এই অভিযোগগুলির স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া তথ্য এখনও সামনে আসেনি।
সংঘর্ষ বাড়তে থাকলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্যাম্পাসের ভিতরে এবং বাইরে দুই পক্ষের মধ্যে স্লোগান পাল্টা স্লোগান চলতে থাকে। পড়ুয়াদের একাংশ ‘জয় ভীম’, ‘ইনকিলাব’, ‘আজাদি’-র মতো স্লোগান দেন। অন্যদিকে ক্যাম্পাসের বাইরে ‘জয় শ্রী রাম’ এবং ‘ভারতমাতা’ স্লোগান শোনা যায়। এক পর্যায়ে পাথর ছোড়াছুড়ির অভিযোগও ওঠে এবং কয়েকজন পড়ুয়া আহত হন।
পরিস্থিতি সামাল দিতে পড়ুয়ারা ক্যাম্পাসের গেট বন্ধ করে দেন। তাঁদের আশঙ্কা ছিল, অনুষ্ঠানে আসা বাইরের লোকজনের আরও একটি অংশ ক্যাম্পাসে ঢুকে পড়তে পারে। একটি বাস আটকে রাখার ঘটনাও সামনে এসেছে। পুলিশকে পরে ক্যাম্পাসে ঢুকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হয়।গেটের দু'পাশে উত্তেজিত মানুষজন দাঁড়িয়ে রয়েছেন এবং পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে।
ঘটনার আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক, শিক্ষকদের আক্রান্ত হওয়ার অভিযোগ। পড়ুয়াদের দাবি, তাঁদের উপর হামলা ঠেকাতে গিয়ে কয়েকজন শিক্ষকও আক্রান্ত হন। ঘটনার পূর্ণ ছবি পেতে প্রশাসনিক তদন্ত বা প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
SRFTI প্রতিষ্ঠানটি ১৯৯৫ সালে ভারত সরকারের উদ্যোগে তৈরি হয় এবং ভারতের জাতীয় স্তরের চলচ্চিত্র শিক্ষাকেন্দ্রগুলির অন্যতম। তাই এই ক্যাম্পাসে মতপ্রকাশ, রাজনৈতিক বিতর্ক এবং সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার প্রশ্নটি স্বাভাবিকভাবেই আলাদা গুরুত্ব পায়।
কলকাতার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে রাজনৈতিক সংঘর্ষ অবশ্য নতুন ঘটনা নয়। মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ABVP এবং বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলির সদস্যদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছিল। SRFTI-এর ঘটনাটিও সেই বৃহত্তর ক্যাম্পাস রাজনীতির প্রেক্ষাপটে দেখা হচ্ছে। তবে দুই ঘটনার পরিস্থিতি এক নয়। SRFTI-তে এবারের ঘটনায় মূল প্রশ্নটি একটি নির্দিষ্ট অনুষ্ঠানের আয়োজন এবং সেই অনুষ্ঠানের বক্তব্যকে ঘিরে ছাত্রদের আপত্তি থেকে শুরু হয়েছে।
এই ঘটনার পর সবচেয়ে জরুরি বিষয় হল অভিযোগের ভিত্তিতে আগাম কোনো সিদ্ধান্ত না নেওয়া। কে প্রথম হামলা করেছিল, কোন বক্তৃতায় ঠিক কী বলা হয়েছিল, পোস্টার বা পতাকা কে ছিড়েছিল, বহিরাগতরা কীভাবে ক্যাম্পাসে ঢুকেছিলেন এবং সংঘর্ষের সময় পুলিশ কী ভূমিকা নিয়েছিল—প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর আলাদা করে খুঁজে দেখা দরকার।






