সুপারকিলোনোভা: এক বর্ণময় মহাজাগতিক বিস্ফোরণ
Superkilonova: এই বারের পর্যবেক্ষণটা একটু আলাদা; বিজ্ঞানীরা এবার জোড়া বিস্ফোরণ প্রত্যক্ষ করেছেন। তাঁদের ধারণা এটিই প্রথম সুপারকিলোনোভা।
জ্যোতির্বিজ্ঞানের জগৎ হরেক রকমের বর্ণময় ঘটনায় মোড়া। গত ১৫ই ডিসেম্বর প্রকাশিত একটি গবেষণায়, আইআইটি-বোম্বে এবং বেঙ্গালুরুর ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ অ্যাস্ট্রোফিজিক্স সহ একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা দল জানিয়েছেন যে, তাঁরা পৃথিবী থেকে ১.৩ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে উজ্জ্বল এক সুপারকিলোনোভার সন্ধান পেয়েছেন। কী এই সুপারকিলোনোভা? তা বুঝতে হলে, আগে আমাদের সুপারনোভা ও কিলোনোভা কী, তা জানতে হবে।
নক্ষত্রদের মৃত্যু কোনো সাদামাটা ব্যাপার নয়। সকলের অগোচরে না, জাঁকজমক করে, সবাইকে জানিয়েই বিদায় নেয় তারা। আবার আকারে বড় হলে, তো ব্যাপারই আলাদা; তাদের মৃত্যুর সময় বিরাট এক বিস্ফোরণ হয়, যাকে বিজ্ঞানীরা বলেন সুপারনোভা। এই সুপারনোভার ফলে কার্বন এবং লোহার মতো প্রয়োজনীয় ভারী উপাদানের সৃষ্টি হয়।
দুটো নিউট্রন নক্ষত্র, অথবা একটি নিউট্রন নক্ষত্র ও একটি কৃষ্ণগহ্বরের মধ্যে সংঘর্ষের ফলে চৌম্বকীয় বিকিরণের দরুণ প্রচণ্ড উজ্জ্বল এক বিস্ফোরণের সৃষ্টি হয়, যাকে বলে কিলোনোভা; সঙ্গে উৎপন্ন হয় প্রচুর সোনা ও ইউরেনিয়ামের মতো ভারী মৌল। আবার, দুটো মৃত নক্ষত্র বা নিউট্রন স্টার যখন একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খায়, তখন তৈরি হয় কিলোনোভা। সেই সময় সৃষ্টি সোনা ও ইউরেনিয়ামের পরিমাণ আরও বেশি।
মহাকাশে সুপারনোভা, কিলোনোভা, অথবা কোনো মহাজাগতিক বিস্ফোরণ শনাক্ত করার পদ্ধতিটা বেশ মজার। জ্যোতির্বিদরা প্রতি রাতে নক্ষত্রমণ্ডলের ছবি তোলেন এবং আগের ছবিগুলোর সঙ্গে তুলনা করে দেখেন, নতুন কিছু দেখতে পাচ্ছেন কি না। যদি দেখা যায়, কোনো উজ্জ্বল বিন্দু থেকে এত আলো বেরোচ্ছে যে নক্ষত্রমণ্ডলের স্বাভাবিক ঔজ্জ্বল্য ছাড়িয়ে যাচ্ছে, তখন বিজ্ঞানীরা নতুন বিস্ফোরণের জন্য সতর্ক হন।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Artificial Intelligence: আমাদের মাঝে এখন স্মার্ট ওয়াচ খুবই জনপ্রিয়; সারাদিন কতটা হাঁটছি, কীভাবে হাঁটছি, এসব নিয়ে আমরা খুবই সচেতন। সেই ট্রেন্ডটাই কাজে লাগাচ্ছে কোম্পানিরা। আর এইসব ডেটায় আরও সমৃদ্ধ হচ্ছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভিত্তিক চ্যাটবট গুলি।
আসলে মহাশূন্য তো পুরোপুরি শূন্য নয়, এর মধ্যে গ্যাস, ধূলিকণা মিলেমিশে রয়েছে, যাদেরকে বিজ্ঞানীরা বলেন ইন্টারস্টেলার পদার্থ। মহাকর্ষীয় বলের কারণে এদের মধ্যে প্রতিনিয়ত ঠোকাঠুকি লেগেই রয়েছে। সেই সংঘর্ষ থেকেই জন্ম হয় এক ধরনের শক ওয়েভের। যার ফলে আশেপাশের পদার্থ এত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে এক্স-রে রশ্মি নির্গত হয়। টেলিস্কোপের সাহায্যে বিজ্ঞানীরা সেই এক্স-রে শনাক্ত করেন। কিন্তু ওজোন স্তরের কারণে পৃথিবীপৃষ্ঠে বসে সেগুলোকে ধরা যায় না, কৃত্রিম উপগ্রহে থাকা টেলিস্কোপের মাধ্যমে সেগুলোকে শনাক্ত করতে হয়। এই কাজে বিজ্ঞানীদের প্রধান অস্ত্র 'চন্দ্র' এক্স-রে অবসারভেটরি (নোবেলজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী সুব্রহ্মণীয়ম চন্দ্রশেখরের নামাঙ্কিত)। ভরের উপর নির্ভর করে কোন নক্ষত্র কীভাবে বিস্ফোরিত হবে, তার উপর নির্ভর করে কতটা এক্স-রে নির্গত হবে, গ্যাসের তাপমাত্রার বণ্টন কী হবে ইত্যাদি। সুপারনোভার চরিত্র বোঝার জন্য এই প্যরামিটার গুলি খুবই জরুরি।
কিন্তু এই বারের পর্যবেক্ষণটা একটু আলাদা; বিজ্ঞানীরা এবার জোড়া বিস্ফোরণ প্রত্যক্ষ করেছেন। তাঁদের ধারণা এটিই প্রথম সুপারকিলোনোভা।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Digital Personal Data Protection Rules 2025: DIGIPUB মনে করছে, সংবাদ সংগ্রহের সময় প্রতিটি তথ্য ব্যবহারে ‘সম্মতি’ নেওয়ার বাধ্যবাধকতা সাংবাদিকতার স্বাভাবিক প্রবাহকে ব্যাহত করবে।
প্রথমটি একটি বিরাট নক্ষত্রের সুপারনোভা বিস্ফোরণ। মাঝেরটি সেই বিস্ফোরণের পর তৈরি হওয়া দুটি ক্ষুদ্র আকারের নিউট্রন স্টার। আর তৃতীয়টি তাদের মধ্যকার সংঘর্ষের ছবি (সুত্রঃ ক্যালটেক)
গতবছর ১৮ অগাস্ট প্রথম ধরা পড়ে এই মহাজাগতিক বিস্ফোরণের ছবি। যুক্তরাষ্ট্রের LIGO এবং ইউরোপের VIRGO ডিটেক্টরে ধরা পড়ে S250818k নামক ক্ষীণ মহাকর্ষীয় তরঙ্গ। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার পালোমার অবজারভেটরির বিজ্ঞানীরা দেখলেন, সেখান থেকে লাল রঙের আলো বেরিয়ে আসছে, যেগুলো আবার দ্রুত ম্লান হয়ে যাচ্ছে। অনেকটা ২০১৭ সালে আবিষ্কৃত GW170817-এর মতো। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, সেটিই ছিল বিজ্ঞানীদের আবিষ্কৃত প্রথম কিলোনোভা। এবার বিজ্ঞানীরা ভাবলেন তাঁরা বুঝি আরেকটা একই ধরনের কিলোনোভার সন্ধান পেয়েছেন। দিন তিনেক পর হঠাৎ দেখা গেল সেই ম্লান হয়ে যাওয়া আলো আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠছে, কিন্তু বর্ণালি বীক্ষণ যন্ত্র জানান দিচ্ছে এবার কাঁটা নীলের ঘরে! স্পেক্ট্রস্কপিক বিশ্লেষণ বলছে সেখানে নিশ্চিত ভাবে হাইড্রোজেনের আধিক্য রয়েছে অর্থাৎ এ সুপারনোভার ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিজ্ঞানীরা এই মহাজাগতিক বিস্ফোরণের ঘটনার নাম দেন at2025ulz।
আলো গুলি লাল থেকে নীল হয়ে গেল, আর এতেই ম্লান হয়ে গেল বিজ্ঞানীদের মুখ; তাঁরা ভেবেছিলেন নতুন কিছুর সন্ধান পাবেন, কিন্তু সেখানে কিনা শুধুই সুপারনোভা! কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালটেকের অধ্যাপক কাসলিওয়াল তো হার মানার পাত্র নন। তিনি ও তাঁর দলবল তথ্য বিশ্লেষণ করতে শুরু করেন। সেসময় তাঁরা দেখলেন, যে নিউট্রন স্টারগুলোর ধাক্কার আভাস মিলেছে, তাদের একটির ভর সূর্যের চেয়েও কম! সচারচর, নিউট্রন স্টারের ভর সূর্যের ভরের ২ বা ৩ গুণ পর্যন্ত হয়; সর্বনিম্ন ১.২ গুণ হতে পারে। তবে সূর্যের চেয়ে কম ভরের নিউট্রন স্টার খুব একটা নজরে পড়ে না বিজ্ঞানীদের।
দুটো প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে থাকে বিজ্ঞানীদের মাথায়—সূর্যের চেয়ে হালকা নিউট্রন স্টার কোথা থেকে এল? আর, একই সঙ্গে লাল–নীল, এই দুই রঙের আলোর কারণ কি?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা সুপারকিলোনোভার তত্ত্বের প্রবর্তন করেন। তাঁদের বক্তব্য অনুসারে, দ্রুত গতিতে ঘূর্ণায়মান একটি বিশাল নক্ষত্র শেষ সময়ে ভেঙে দুটি ছোট আকারের নিউট্রন স্টারে (সূর্যের চেয়ে কম ভর বিশিষ্ট) পরিণত হয়। এরা আবার নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে কিলোনোভার সৃষ্টি করে। প্রথমবারের লাল আলোর জন্য এই কিলোনোভাই দায়ী। বিস্ফোরণের ফলে সেসময় ভারী ধাতুর উৎপত্তি হয়। এরপর ঘটে আবার বিস্ফোরণ, সেটিই সুপারনোভা; তখনই নীল আলোর দেখা মেলে, আর সেই নীলাভ আলোর আড়ালেই ঢাকা পড়ে যায় লাল আলো। সোজা কথায় বলতে গেলে, দুটো মহাজাগতিক বিস্ফোরণের সম্মিলিত রূপই এই সুপারকিলোনোভা।
এতদিন মনে করা হতো সুপারনোভা, ও কিলোনোভা আদতে দুটি আলাদা আলাদা মহাজাগতিক বিস্ফোরণ, কিন্ত এই দ্বৈত বিস্ফোরণের ফলে নক্ষত্রদের মৃত্যু নিয়ে নতুন কিছু জানা যাবে। যদিও এই বিষয়ে আরও পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ জরুরি, কিন্তু বিজ্ঞানীরা আশাবাদী যে, এই আবিষ্কারের ফলে অদূর ভবিষ্যতে নিউট্রন স্টারের মতো ঘনতম বস্তুর আভ্যন্তরীণ গঠন, এবং স্বর্ণ, প্লাটিনাম বা ইউরেনিয়ামের মতো ভারী মৌলগুলোর উৎপত্তির রহস্যের দ্বার উন্মোচিত হবে ।






