কসমিক ভলক্যানো: এক বিশালকার ব্ল্যাকহোলের মহাজাগতিক পুনর্জন্ম
Supermassive blackhole: সম্প্রতি, মেদিনীপুর সিটি কলেজের গবেষক, ড. শোভা কুমারী ও তাঁর সহযোগীরা J 1007+3540 নামক একটি গ্যালাক্সির কেন্দ্রস্থলে, এক মিলিয়ন আলোকবর্ষ জুড়ে বিস্তৃত একটি সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোলের সন্ধান পেয়েছেন, যেটি কিনা একশ মিলিয়ন বছর ধরে ঘুমিয়ে ছিল।
অনেক বছর ধরে ঘুমিয়ে থাকা সুপ্ত আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত দেখেছি আমরা। তাই বলে ঘুমন্ত ব্ল্যাকহোল জেগে উঠতে পারে বলে কেউ কখনও আন্দাজ করতে পেরেছিল! সম্প্রতি, মেদিনীপুর সিটি কলেজের গবেষক, ড. শোভা কুমারী ও তাঁর সহযোগীরা J 1007+3540 নামক একটি গ্যালাক্সির কেন্দ্রস্থলে, এক মিলিয়ন আলোকবর্ষ জুড়ে বিস্তৃত একটি সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোলের সন্ধান পেয়েছেন, যেটি কিনা একশ মিলিয়ন বছর ধরে ঘুমিয়ে ছিল। এ যেন এক বিরাট 'মহাজাগতিক পুনর্জন্ম', যা মহাজাগতিক রহস্যময় বস্তুগুলি বুঝতে বিজ্ঞানীদের সাহায্য করবে। দ্য রয়্যাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির মান্থলি নোটিস পত্রিকায় গত ১৫ই জানুয়ারি প্রকাশিত হয়েছে তাদের এই কাজ।
J 1007+3540 গ্যালাক্সির কেন্দ্রে ধরা পড়া এক বিশালাকৃতির ব্ল্যাকহোল, যেটি ১০০ মিলিয়ন বছর ধরে ঘুমিয়ে ছিল ( সূত্র: https://doi.org/10.1093/mnras/staf2038)
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Scientists freeze light: সাংবাদিক সম্মেলনে এই আবিস্কারের ঘোষণা করার সময় ইতালীয় গবেষকরা এই অদ্ভুত ঘটনাটিকে 'কোয়ান্টাম থিয়েটারের' সঙ্গে তুলনা করেছেন।
গত কয়েক দশক আগে থেকে জ্যোতির্বিজ্ঞানের জগতে এই তত্ত্ব মোটামুটি স্বীকৃত যে, মহাবিশ্বের অধিকাংশ ছায়াপথের কেন্দ্রে সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোল লুকিয়ে রয়েছে। এদের ভর আমাদের সূর্যের চেয়ে লক্ষ কোটি গুণ বেশি, এবং এদের মহাকর্ষীয় টান এত তীব্র যে আলোও তাদের ঘটনা দিগন্তের (Event Horizon) বাইরে বেরোতে পারেনা। কিন্তু এই আপাত শান্ত ব্লাকহোলগুলি কোনো সতর্কতা ছাড়াই হঠাৎ বিস্ফোরিত হতে পারে, অনেকটা ভূপৃষ্ঠে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সুপ্ত আগ্নেয়গিরির মতো। ঠিক এরকমই একটি ব্ল্যাকহোলের দেখা মিলেছে ড. শোভা কুমারীদের গবেষণায়। রেডিও টেলিস্কোপ থেকে পাওয়া ছবিগুলিতে, যেখানে ধরা পড়েছে কৃষ্ণগহ্বরের পুনরায় সক্রিয়তা পাওয়ার মুহূর্ত। সেই মুহূর্তটির বর্ণনা করতে গিয়ে ড. কুমারী বলেন
এটি বহু বছর সুপ্ত থাকার পরে আবার মহাজাগতিক আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত দেখার মতো।
কেমনভাবে ধরা পড়ল এই অরুপ রতন?
রেডিও টেলিস্কোপগুলি এই ক্ষেত্রগুলিতে গবেষকদের পথ দেখায়। সেখান থেকে পাওয়া চিত্রগুলি বিশ্লেষণ করতে গিয়েই কৃষ্ণগহ্বর থেকে উদ্ভূত নতুন জেট এবং গ্যালাক্সি ক্লাস্টারের চাপের অসম লড়াই ধরা পড়ে। মূলত রেডিও জ্যোতির্বিজ্ঞানের (মহাকাশে উদ্ভূত বিভিন্ন রেডিও তরঙ্গ জ্যোতির্বিজ্ঞানের এই শাখায় বিশ্লেষণ করা হয়) অভূতপূর্ব উন্নতির ফলেই কৃষ্ণগহ্বরটিকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়। এই কাজে, ড. কুমারী এবং তাঁর সহযোগীরা বিশ্বের দুটি সবচেয়ে উন্নত রেডিও টেলিস্কোপ সিস্টেম ব্যবহার করেছেন—নেদারল্যান্ডসের লো ফ্রিকোয়েন্সি অ্যারে (LOFAR) এবং ভারতের আপগ্রেড করা জায়ান্ট মিটারওয়েভ রেডিও টেলিস্কোপ (uGMRT)।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Superkilonova: এই বারের পর্যবেক্ষণটা একটু আলাদা; বিজ্ঞানীরা এবার জোড়া বিস্ফোরণ প্রত্যক্ষ করেছেন। তাঁদের ধারণা এটিই প্রথম সুপারকিলোনোভা।
টেলিস্কোপে স্ক্যানিং-এর সময় দুটি প্লাজমা জেটের দেখা মেলে—একটি উজ্জ্বল অভ্যন্তরীণ জেট, যেটি মূলত অতিউষ্ণ প্লাজমার একটি রশ্মি, যা প্রায় আলোর গতিতে কৃষ্ণগহ্বর থেকে বাইরের দিকে ছুটে চলেছে। কৃষ্ণগহ্বরটি যে পুনরায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে, এটি তারই ইঙ্গিত বহন করে; পাশাপাশি কৃষ্ণগহ্বরটি যে প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত, তা-ও জানা যায়। আর এই নতুন জেটের চারপাশে প্লাজমার একটি বিশাল, ফ্যাকাশে আবরণ পাওয়া গেছে, যেটি কৃষ্ণগহ্বরটির প্রাগৈতিহাসিক বিস্ফোরণের সাক্ষ্য বহন করে। একই সঙ্গে এই নতুন ও পুরাতন জেট দৃশ্যমান হওয়া এক বিস্ময়কর বিরল ঘটনা।
একটি সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোল, তার চারপাশের গ্যাস, ধুলো, এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে আশেপাশের নক্ষত্রকে কখন, কী জন্য নিজের দিকে টেনে নেবে, তা বুঝতে হলে মহাকাশে পদার্থের বিশৃঙ্খল নৃত্য বোঝা প্রয়োজন। ব্ল্যাকহোলের চারপাশের ইন্টারস্টেলার পদার্থগুলো একটি বিশাল, ঘূর্ণায়মান চাকতি তৈরি করে, যার পোশাকি নাম 'অ্যাক্রিশন ডিস্ক'। এটি ব্ল্যাকহোলের দিকে সর্পিলাকার পথে এগিয়ে যাওয়ার সময় ঘর্ষণের কারণে প্রচণ্ড উত্তপ্ত হয়ে ওঠে; কখনও কখনও এদের তাপমাত্রা বিলিয়ন ডিগ্রিতে পৌঁছায়। এদিকে ঘূর্ণন গতির জন্য শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্রগুলি থেকে উদ্ভূত টুইস্টিং ফোর্স ক্রমশ তীব্র হতে থাকে। একসময়, চাপ এত বেশি হয়ে যায় যে সুপারহিটেড প্লাজমার বিশাল জেটগুলি কৃষ্ণগহ্বরের মেরু বরাবর বাইরের দিকে বেরিয়ে যায়, এবং লক্ষ লক্ষ আলোকবর্ষ ধরে তারা প্রায় আলোর গতিতে চলতে থাকে।
কিন্তু, কোনো সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোল এভাবে অনির্দিষ্টকাল ঘুমিয়ে থাকার কারণ কী? মহাজাগতিক পরিবেশের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে এর উত্তর। কৃষ্ণগহ্বরে খাদ্যের সরবরাহের ঘাটতি পড়লে ব্লাকহোল থেকে নির্গত জেটগুলি ম্লান হতে শুরু করে, এবং একসময় কৃষ্ণগহ্বরটি নীরব হয়ে যায়। J 1007+3540-এর সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোলের ক্ষেত্রে, এই শান্ত থাকার সময়কাল প্রায় একশ মিলিয়ন বছর! সম্ভবত নিকটবর্তী ছায়াপথের সঙ্গে মহাকর্ষীয় মিথস্ক্রিয়া বা গ্যাসের একটি বিশাল মেঘের পতনের কারণে, দীর্ঘদিনের সুপ্ত কৃষ্ণগহ্বরটি আবার জেগে উঠেছে। যদিও বিজ্ঞানীরা অন্যান্য কারণগুলো অনুসন্ধানের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
প্রশ্ন উঠতেই পারে, যে একটা দানবীয় ব্লাকহোলের পুনর্জাগরণ ঘটেছে, এতে এত হইচই এর কারণ কী? আসলে ড. কুমারীদের এই আবিষ্কার একটি মৌলিক নীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে যে, সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোলগুলি কোনো স্থির সত্তা নয়, যে চিরকাল সুপ্ত বা সক্রিয় থাকবে। এগুলি আসলে গতিশীল, চক্রাকার সিস্টেম যা মহাজাগতিক সময়সীমার উপর পর্যায়ক্রমে জাগ্রত বা সুপ্ত অবস্থায় থাকে। এই আবিষ্কার 'এপিসোডিক অ্যাক্টিভ গ্যালাক্টিক নিউক্লি' অর্থাৎ যেসমস্ত সক্রিয় ছায়াপথের কেন্দ্র থেকে পর্যায়ক্রমিক ভাবে জেট নির্গত হয়, সে সম্পর্কে আমাদের আরও জানতে সাহায্য করবে বলে বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস। প্রকৃতপক্ষে, J1007+3540 গ্যালাক্সির কেন্দ্রে থাকা কৃষ্ণগহ্বরটির পুনর্জাগরণ শুধু একটি ব্যতিক্রমী পর্যবেক্ষণই নয়, বরং বিরাট বিরাট মহাজাগতিক কাঠামোদের জটিল রহস্য উন্মোচন করার নতুন জানালাও খুলে দেয় গবেষকদের সামনে।






