স্বামী বিবেকানন্দের স্বদেশি ভাবনা: উগ্র হিন্দুত্বের বাইরে এক উদার জাতীয় চেতনা
Swami Vivekananda: হিন্দুধর্মের প্রচারক হিসেবে বিদেশে গিয়ে তিনি ইংরেজি ভাষায় যে বক্তৃতা দিয়েছিলেন তাতে দেশের সামাজিক ত্রুটির কথা প্রকাশ করতেন না। দেশের মানুষের কাছে লেখা চিঠিতে দেশের সমালোচনা থাকলেও বিদেশে তিনি দেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরতেন।
স্বামী বিবেকানন্দ ১৯০২ খ্রিস্টাব্দে মাত্র ঊনচল্লিশ বছর বয়সে প্রয়াত হয়েছিলেন। তখনও ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলন রাজনৈতিক ভাবে চূড়ান্ত রূপ লাভ করেনি। জাতীয় কংগ্রেস গঠিত হয়েছে, আবেদন নিবেদনের রাজনীতির স্তর অতিক্রম করে অগ্রসর হচ্ছে কিন্তু পরবর্তী কালে জাতীয় কংগ্রেস যে চেহারা নিয়েছিল তা তখনও প্রকাশ্যে আসেনি। চরমপন্থী বিপ্লবীদের কার্যাবলী ১৯০৬ পরবর্তী সময়কালে যেমন প্রবল হয়ে উঠেছিল তা-ও তখন ভবিষ্যৎ গর্ভে। মুসলিম লিগের প্রতিষ্ঠা হয়নি। বিশ শতকে যে স্বল্প সময় স্বামী বিবেকানন্দ জীবিত ছিলেন সেই সময় তিনি শারীরিক কারণে নিজেকে অনেকটাই কাজ থেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন। তাঁর সেই সময়ের চিঠিপত্রে প্রত্যাহারের সুর স্পষ্ট। তাই বিবেকানন্দের স্বদেশ-ভাবনা ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রেক্ষাপটেই বিচার করতে হবে।
বিবেকানন্দকে উদারনৈতিক হিন্দু সন্ন্যাসী হিসেবে বিবেচনা করাই ভালো। তাঁর আচার্য রামকৃষ্ণদেব যে মরমিয়া সাধন-ধারার অংশ সেই সাধন-ধারার কেন্দ্রে স্বদেশ-ভাবনা ছিল না। বিবেকানন্দ তাঁর পূর্বাশ্রমে নরেন্দ্রনাথ দত্ত নামে যে জীবন যাপন করেছিলেন তা মরমিয়া সাধনপন্থার অনুগামী নয়, দেশ-কাল সচেতন আধুনিক কসমোপলিটান জীবন। সেই জীবনের ছায়া তাঁর সন্ন্যাস জীবনকে আরেকভাবে নির্মাণ করেছিল। বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর ধর্মতত্ত্ব গ্রন্থে সন্ন্যাসের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লিখেছিলেন,
নিষ্কাম কর্মের ত্যাগ সন্ন্যাস নয়, সকাম কর্মের ত্যাগ সন্ন্যাস।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Swami Vivekananda: যেহেতু বাগ্মী সন্ন্যাসী হিসেবে নানা সময় নানা নিদান দিতে হয় সেহেতু কখনও একথা, কখনও ওকথা। যেন নিরুপায় হয়েই পথ অনুসন্ধান করছেন।
বিবেকানন্দ সন্ন্যাসীকে দেশের কাজে ব্রতী হওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। দেশের কাজ নিষ্কাম কর্ম। ইতিহাসবিদেরা পরবর্তীকালে যাকে গঠনমূলক স্বদেশি বলেছেন সেই গঠনমূলক স্বদেশি কার্যক্রমের নানা উপসর্গ বিবেকানন্দ ও তাঁর গুরুভাইদের জীবনে চোখে পড়ে। বিবেকানন্দের শিবজ্ঞানে জীব সেবার আদর্শ এক অর্থে দেশের সাধারণ মানুষের শিক্ষা-স্বাস্থ্য ইত্যাদির মানোন্নয়ন ঘটানোর কাজ। বিবেকানন্দ চিঠিতে তাঁর গুরুভাইদের গ্রামে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সেখানে সাধারণ মানুষকে পড়াতে বলেছিলেন। কলকাতায় প্লেগ দেখা দিলে বিবেকানন্দ ও তাঁর অনুগামীরা জনস্বাস্থ্যের কাজে আত্মনিয়োগ করেন।
বিবেকানন্দের আত্মমর্যাদা বোধ ছিল প্রবল। হিন্দুধর্মের প্রচারক হিসেবে বিদেশে গিয়ে তিনি ইংরেজি ভাষায় যে বক্তৃতা দিয়েছিলেন তাতে দেশের সামাজিক ত্রুটির কথা প্রকাশ করতেন না। দেশের মানুষের কাছে লেখা চিঠিতে দেশের সমালোচনা থাকলেও বিদেশে তিনি দেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরতেন। এমনিতেই মিশনারিরা তখন ভারতীয়দের অসভ্য বর্বর বলে মনে করতেন। কাজেই বিবেকানন্দের এই কৌশল স্বাদেশিক সন্ন্যাসীর কৌশল। বিশ্বের জ্ঞানভাণ্ডারে ও সমাজভাবনায় ভারতবর্ষের কিছু দেওয়ার আছে একথা শিকাগো বক্তৃতাতে বিবেকানন্দ একরকম ভাবে বলেছিলেন। পরে বিদেশি অনুগামীদের সঙ্গে ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় তা প্রকাশ করতেন। বিদেশে তিনি ভিক্ষে করতে যাননি, দিতে ও নিতে গিয়েছিলেন। দেওয়া ও নেওয়া দু-ই চাই। নাহলে সম্মিলন হয় না।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Swami Vivekananda Chicago Speech 1893: "আমরাই ইহুদিদের খাঁটি বংশধরদের অবশিষ্ট অংশকে সাদরে বুকে করে রেখেছি",
ছটফটে এই তরুণ সন্ন্যাসীর পর্যবেক্ষণ শক্তি ছিল প্রবল। বিদেশে গিয়ে সেখানকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও সামাজিক ভাবধারা খুঁটিয়ে দেখতেন। নিজের দেশের সঙ্গে সেই ব্যবস্থার তুলনা করতেন। তাঁর মনে হত উদ্যমশীলতা ও ঐক্যের বোধ পাশ্চাত্যকে প্রাচ্য ভারতীয় সভ্যতার থেকে এগিয়ে রেখেছে। ভারতের চাই এই উদ্যম ও ঐক্য। মনে রাখতে হবে ‘বর্তমান ভারত’ ও ‘প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য’ রচনায় তিনি ইউরোপের উপনিবেশবাদের তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। বিশেষ করে ‘প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য’ রচনার শেষে তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে উপনিবেশবাদী শক্তি অস্ট্রেলিয়া ও আফ্রিকায় সাধারণ জনজাতিকে ধ্বংস করেছে, অপরের জমি দখল করেছে। তবে যা বিদেশের ভালো তাকে অস্বীকার করেননি। তাঁর স্বদেশবোধ অন্ধ দেশজ পিছুটান নয়।
‘বর্তমান ভারত’ রচনায় বিবেকানন্দ প্রজাপুঞ্জ বিষয়ে তাঁর ভাবনা প্রকাশ করেছেন। পাশ্চাত্যের নেশন ও ভোটকেন্দ্রিক গণতন্ত্রের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ছিল। তিনি তাঁর সন্ন্যাসী সংঘে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও নির্বাচন ব্যবস্থা অনুশীলনের নির্দেশ দিয়েছিলেন। ভারতবর্ষের পুরনো ইতিহাসের দিকে তাকিয়ে তিনি একটি কথা মনে করিয়ে দিয়েছিলেন— প্রজাপুঞ্জের হাতে শক্তি না থাকলে দেশের উন্নতি হয় না। যুধিষ্ঠির, রামচন্দ্র, অশোক ও আকবর এই চারজন রাজার নাম করেছেন। তিনি মহাকাব্যিক ও ঐতিহাসিক দু’রকম রাজার কথা বলেছেন। তাঁর অভিমত এই পৌরাণিক ও হিন্দু-মুসলমান শাসকেরা ভালো, তবে প্রজার অভিমত ও শক্তি গড়ে তোলার কাজে সহায়তা করেননি। হিতবাদী রাজা প্রজার মুখে কেবল অন্ন তুলে দেবেন না, প্রজাকে প্রজাপুঞ্জ হয়ে ওঠার কাজে সহায়তা করবেন। প্রজাপুঞ্জ রাজ্য শাসনের বিষয়ে সচেতন অভিমত প্রদান করবেন। করের টাকা কোন কাজে ব্যবহৃত হবে সে বিষয়ে তাঁদের স্পষ্ট মতামত থাকা উচিত।
বিবেকানন্দের লেখায় প্রজাপুঞ্জের কথা যেমন এসেছে, তেমনই এসেছে ভারতের পিছিয়ে পড়া মানুষের কথা। বিবেকানন্দের ভাই ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত ছিলেন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তিনি দাদার লেখার মধ্যে নানা উপাদানের প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন, বিশেষ করে বিবেকানন্দ যেখানে জাতের নামে বজ্জাতির বিরোধিতা করেছেন ও শূদ্র জাগরণের কথা বলেছেন, তা ভূপেন্দ্রনাথের ব্যাখ্যায় বিশেষ তাৎপর্য লাভ করেছে। বিবেকানন্দের প্রয়াণের পর তাঁর প্রধান শিষ্যা নিবেদিতা রামকৃষ্ণ মঠ-মিশনের সঙ্গে আপাত সম্পর্ক ত্যাগ করে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের নানা ভাবে সহায়তা করা শুরু করেন। বিবেকানন্দের স্বদেশব্রত তাঁর মধ্যে বিশেষ রূপ পরিগ্রহ করেছিল। বিবেকানন্দের রচনা স্বদেশব্রতীরা মন দিয়ে পড়তেন, উৎসাহ ও উদ্দীপনা সঞ্চারিত হত তাঁদের মধ্যে।
একথা সত্য বিবেকানন্দের লেখায় অনেক সময় এমন কথা চোখে পড়ে যা আপাত দৃষ্টিতে বিশেষত এখনকার দৃষ্টিতে ‘প্রগতিশীল’ নয়। উনিশ শতকের ভারতীয় চিন্তকদের অনেকের লেখাতেই সজীব উভবলতা ও দ্বন্দ্ব আছে। এ সে যুগের দান। পাশ্চাত্যের সঙ্গে বোঝাপড়ায় কখনও তাঁরা দেশজ বিধিকে ভাঙতে চাইছেন কখনও আবার বজায় রাখতে চাইছেন। বিবেকানন্দ দেশের অবতলবর্তী মানুষদের কথা বলছেন, পুরোহিততন্ত্রের বিরোধিতা করছেন, প্রজাপুঞ্জের হাতে শক্তি যাক বলে চাইছেন অথচ বর্ণাশ্রমকে ভেঙে ফেলার পক্ষে মত দিচ্ছেন না। বিবেকানন্দ বা গান্ধী কেউ আম্বেদকর নন। আম্বেদকর জীবনে বর্ণব্যবস্থার জন্য যে বঞ্চনার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গিয়েছিলেন সেই বঞ্চনা তাঁদের সইতে হয়নি।
এই মুহূর্তে ভারতীয় রাজনীতিতে হিন্দু সন্ন্যাসী বিবেকানন্দকে হিন্দুত্ববাদের পক্ষে টেনে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। বিবেকানন্দের উদারনৈতিক স্বাদেশিক হিন্দু সাংস্কৃতিক বোধের মধ্যে ইসলাম ভীতি ছিল না। একথা মনে রাখা দরকার। বোদান্তিক মস্তিষ্ক ও ঐসলামিক দেহের যে কল্পনা তিনি করেছিলেন তা একরকম সম্মিলন ভাবনার ফল। পাশ্চাত্যের সভ্যতা সম্পর্কে তাঁর অনুরাগ ছিল। উপনিবেশবাদের সমালোচনা করলেও তিনি সংকীর্ণমনা ছিলেন না। তাঁর স্বদেশভাবনার মধ্যে ইতিবাচক যে দিকগুলি রয়েছে সে-দিকে নজর দেওয়া উচিত। হিন্দুত্ববাদীরা উদারনৈতিক হিন্দু-সন্ন্যাসী বিবেকানন্দকে তাঁদের মতো বলে দখল করে নেওয়ার চেষ্টা করবেন। বিবেকানন্দের লেখার মধ্যে হিন্দুত্ববাদ বিরোধী স্বাদেশিক ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে মানবতাপন্থী যে প্রসঙ্গ রয়েছে সেগুলিকে আলাদা করে সামনে নিয়ে আসা দরকার। একে উগ্র হিন্দুত্বের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য তুলনামূলক ভাবে কম উগ্র হিন্দুত্বের অনুশীলন বলে দাগিয়ে দেওয়া ঠিক নয়। আত্মপরিচয়ের রাজনীতির বিরোধিতা করার জন্য আত্মপরিচয় লুপ্ত করে দিতে হবে একথা বলা সহজ কিন্তু কার্যত সব মানুষের পক্ষে তা অসম্ভব। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘ভারতবর্ষের ইতিহাস’ রচনায় বিভেদকে স্বীকার করেই সামঞ্জস্য বিধান সম্ভব বলে মনে করতেন। প্রাকৃতিক ও সামাজিক বিভেদকে জোর করে লুপ্ত করতে চাইলে ভেদের রাজনীতি অন্যভাবে মাথা তুলতে পারে। বিবেকানন্দ কাণ্ডজ্ঞানপন্থী ছিলেন।







